Tuesday, March 27, 2012

বকুল এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী এলাকার গাছ


বকুলের পাতা ও ফুল

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস
জগ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Magnoliopsida
বর্গ: Ericales
পরিবার: Sapotaceae
গণ: Mimusops
প্রজাতি: M. elengi L.

বৈজ্ঞানিক নামঃ Mimusops elengi L.

বাংলা ভাষায় - বকুল, বহুল, বুকাল, বাকুল, বাকালতবে বকুল নামেই বেশি পরিচিত
ইংরেজি নাম- Spanish cherry, Indian Medlar, and Bullet wood.
বকুলের আদি আবাস ওয়েস্ট ইন্ডিজ, আন্দামান ও বার্মা। তবে বর্তমানে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর তীরবর্তী এলাকার ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, বার্মা, ইন্দো-চীন, থাইল্যান্ড, আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ এলাকা জুড়ে এই গাছ দেখতে পাওয়া যায়এছাড়া, মালয়েশিয়া, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, নিউ ক্যালিডোনিয়া (ফ্রান্স), ভানুয়াতু, এবং উত্তর অস্ট্রেলিয়াতে এই গাছ চাষ করা হয়
বাংলায় বকুল ফুলের জন্যে পরিচিত এই গাছবকুলের অন্যান্য ব্যবহার বাংলায় তেমন নেইএটি একটি অতি পরিচিত ফুলবাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায় এ গাছ পাওয়া যায়বাগানে ছায়া পাওয়ার জন্য সাধারণত বকুল গাছ লাগানো হয়ে থাকে এটি মাঝারি আকারের গাছ এবং এর পাতাগুলি হয় ঢেউ খেলানোফুলগুলো খুব ছোট হয়বড় জোর ১ সেঃ মিঃফুলগুলো দেখতে ছোট ছোট তারার মতো হলুদাভ সাদা বা ক্রীম রঙেরএই ফুল রাত্রে ফোটে এবং সারাদিন ধরে টুপটাপ ঝরতে থাকে ফুলগুলো যখন ফোটে তখন গাছের চেহারা হয় অন্যরকমএবং মাটিতে যখন ঝরে পরে তার দৃশ্য নয়নাভিরামভারি সুগন্ধী এই বকুল ফুলশুকনো বকুল ফুলের সুগন্ধটা অনেকদিন থাকে তাই এই ফুলের মালা অনেকদিন ঘরে রেখে দেয়া যায়ফুলে থাকে উদ্বায়ী তেল
বকুল একটি চিরহরি মধ্যম_বিরাট বৃক্ষএটি ১৬ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়এর কচি কাণ্ড, বৃন্ত এবং বৃতিপৃষ্ঠ বিবর্ণ-রোমশ। এই বৃক্ষের পাতাগুলো ঘন-বিক্ষিপ্ত, মসৃণ, উজ্জ্বল-সবুজ, ডিম্বাকৃতি, হ্রস্ববৃন্তক, ঢেউ খেলানো, শীর্ষ ঈষত বর্ধিত, সুক্ষ্ম। পাতা আকারে ৫ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার লম্বা এবং আড়াই থেকে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া হয় এই গাছের ফল ডিম্বাকৃতি, প্রায় ১ ইঞ্চি দীর্ঘ, পাকা অবস্থায় হলুদ বর্ণের, একবীজীয়। এই ফল দরিদ্রের খাদ্য, তৈল জ্বালানি ও ছবি আঁকার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পাকা ফল কোকিল পাপিয়া ও আরো বেশ কিছু পাখির খাদ্য। হাজার হাজার মাইল পথ পেরিয়ে বসন্তকালে এদেশে আসে যেসব পরিযায়ী কোকিল ও পাপিয়ারা, তাদের খাবার যোগান দেয় এই বকুল গাছ। মাঝারি আকারের এই গাছ দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও উত্তর অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মমন্ডলীয় বনাঞ্চলে জন্মে বকুল ফুল, ফল, পাকা ফল, পাতা, গাছের ছাল, কাণ্ড, কাঠ সব কিছুই কাজে লাগেবিভিন্ন দেশে বিভিন্নভাবে এর ব্যবহার রয়েছে
আয়ুর্বেদিক ব্যবহারঃ বকুল ফুল, ফল, পাতা, কাণ্ড দিয়ে বিভিন্ন অসুখ নিরাময়ের নানারকম আয়ুর্বেদিক ব্যবহার রয়েছে
ফুল-ফুলের রস হৃদযন্ত্রের অসুখ, leucorrhoea, menorrhagia নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়
শুকনা ফুলের গুড়া দিয়ে তৈরি ঔষধ "আহওয়া" নামক এক ধরনের কঠিন জ্বর, মাথা ব্যাথা এবং ঘাড়, কাঁধ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে সৃষ্ট ব্যাথার নিরাময়ে ব্যবহার হয়
শুকনা ফুলের গুড়া মাথা ঠান্ডা রাখে ও মেধা বাড়াতে উপকারী
শুকনো বকুল ফুলের গুড়া নাক দিয়ে নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলে মাথা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে
বকুল গাছের ছাল দিয়ে কাটা-ছেঁড়ার ক্ষত পরিষ্কার করা যায় এছাড়াও বকুল গাছের ছাল ও তেঁতুল গাছের ছাল সিদ্ধ করে পাচনের মাধ্যমে তৈরি তরল ঔষধ ত্বকের নানারকম রোগ সারাতে ব্যবহৃত হয়
বকুলের কাণ্ড থেকে পাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এক ধরনের ঔষধ তৈরি করা হয় যা দাঁতের সমস্যা নিরাময়ে অনেক উপকারীএই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় ফিলিপাইনে এছাড়াও এই ঔষধ জ্বর ও ডায়রিয়া থেকে আরোগ্য লাভের জন্যে ব্যবহার করে ফিলিপাইনের অধিবাসীরাস্থানিয় লোকেরা এই তরল পানি দিয়ে গার্গল করে গলার অসুখের নিরাময়ের জন্যেমুখ ধোয়ার তরল প্রতিষেধক হিসেবেও কাজ করে এই তরল ঔষধ যা মাড়ি শক্ত করে
বকুলের পাতা সিদ্ধ করে মাথায় দিলে মাথা ব্যাথা কমে যায়পাতার রস চোখের জন্যেও উপকারী
অন্যান্য ব্যবহার:
ফুল - ভারতে এই ফুল দিয়ে তৈরি তরল, সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহারে প্রচলন রয়েছে ফুল দিয়ে মালা গাথার প্রচলন অনেক পুরনো দিন থেকে চলে আসছেবিভিন্ন  দেশের বিভিন্ন এলাকার নারীরা এই ফুলের মালা চুলে পরে সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যে
ফল - পাকা ফল খাওয়া যায়মালয়'রা বকুল ফল সংরক্ষণ করে রাখে এবং আচার তৈরি করে
কান্ড - অনেক এলাকায় বকুল গাছের কাণ্ড বা নরম ডাল দাঁত মাজার জন্যে ব্যবহার করা হয়
কাঠ - বকুল কাঠ অনেক দামি আর দুষ্প্রাপ্য কাঠএর কাঠ অনেক শক্ত, কঠিন হয় কিন্তু খুব সহজে কাটা যায় আর খুব সুন্দর পালিশ করা যায় এই কাঠের রঙ গাঢ় লালএই কাঠ ঘর-বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা যায়
Mimusops গ্রিক শব্দ, অর্থ বনমানুষের মুখ। সম্ভবত ফুলের আকৃতির জন্যই এমন নামকরণ। elengi হলো বকুলের মালাবারীয় নাম।

সাহিত্যে বকুলঃ 
বাংলা সাহিত্যে বকুলের কথা নানাভাবে এসেছে। কাজী ন জ রুল ইস লাম লিখেছেন, 'বেল ফুল এনে দাও চাই না বকুল', হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ''ভাল থেক ফুল মিষ্টি বকুল', ময়মনসিংহ গীতিকায় আছে 'গাঁথ গাঁথ সুন্দর কন্যা লো মালতীর মালা/ ঝইরা পড়ছে সোনার বকুল গো ঐ না গাছের তলা।'

No comments:

Post a Comment

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের

Recommended