Friday, April 13, 2012

ছোট মদনটাক বাঁচানোর চেষ্টায় তিন বছর



ফটোঃ সৌরভ মাহমুদ

মদনটাকসহ আরো নানা প্রজাতির পাখি আমি দেখেছিলাম খুব ছোটবেলায়। এরপর ঢাকা শহরে দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলে সমস্ত পাখিরা আমার মন ও মগজ থেকে হারিয়ে যায়। প্রায় দশ বছর পর আবার আগ্রহ জন্মায় পাখির প্রতি। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসের ছুটিতে ঠাকুরগাঁও ভ্রমণে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া পাখি সংক্রান্ত আলোচনা চলাকালে একজন জানায় সে কয়েকদিন আগে একটি হাড়গিলা সিংহারি গ্রামের একটি পুকুরে দেখেছে। আমি আশান্বিত হই এবং তখনই সিদ্ধান্ত নিই খোঁজ নিয়ে দেখব। এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই সিংহারি গ্রামের এক লোকের সাথে দেখা হয়। সেই লোকের নাম মজিবুর রহমান। তিনি জানান সেই গ্রামের একটি শিমুল গাছে পাখিগুলো থাকে তবে এখন আছে কিনা জানে নাকারণ ১৪ এপ্রিল ২০১০ সালের প্রবল কালবৈশাখিতে পাখিগুলো আহত হয় এবং এক লোক দুটি পাখি ধরে বাজারে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করেছে। একথা শুনে আমার মন খারাপ হলেও কিছুই করার নেই আপাতত। আমি তাকে পাখিটির গুরুত্ব বুঝিয়ে বলি এবং পাখিগুলো থাকলে দেখামাত্র আমাকে খবর দিতে বলি। তিনি সপ্তাহখানেরকের মধ্যেই আমাকে জানান পাখিগুলো এখন নেই। আমি তাকে জানাই পাখিগুলো যদি ফেরত আসে তবে যেকোনোভাবে পাখিগুলোকে রক্ষা করতে এবং খোঁজ রাখতে। আমি যে কদিন সেখানে ছিলাম সে স্থানে থাকাকালীন উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তার সাথে পাখিগুলোর নিরাপত্তার ব্যাপারে কথা বলি। পরে ডিসেম্বর, ২০১০-এ আবার বাড়িতে গিয়ে পাখির খোঁজ নিই এবং জানতে পারি পাখিরা ফেরত এসেছে। ২৭ ডিসেম্বর, ২০১০ তারিখে আমি নিজে উক্ত গ্রামে যাই এবং বইয়েরছবির সাথে মিলিয়ে ছোট মদনটাকের অবস্থান নিশ্চিত করি। পরদিন ২৮ ডিসেম্বর আমি সৌরভ মাহমুদকে মুঠোফোনে জানাই মদনটাকের দেখা পাওয়া এবং বাসা তৈরি ও ছানার কথা। তিনি শুনেই আগ্রহি হন এবং ৫ জানুয়ারি তিনি ও সায়েম ইউ চৌধুরী ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ের উদ্দেশে রওয়ানা হন। তারপর ঢাকায় ফিরে এসে দৈনিক প্রথম আলোতে তারা প্রতিবেদন করেন যা ১০ জানুয়ারি, ২০১০[১] তারিখে প্রকাশিত হয়। সেই প্রতিবেদনে সৌরভ মাহমুদ ও সায়েম ইউ চৌধুরী লিখেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে মদনটাক বাসা করেছে। আমাদেরমানে আমার আর সায়েমের বিশ্বাস হচ্ছিল না। কারণ অনেক বছর ধরে সুন্দরবন ছাড়া দেশের অন্য কোথাও এদের তেমন দেখা মেলেনি। এ পাখি সাধারণত বড় কোনো বিলের কাছে, নদীর মোহনার কাছাকাছি নিরাপদ স্থানে বাস করে। সারা বিশ্বে বিপন্ন ও বিরল পাখি হিসেবে পরিচিত মদনটাককে স্থানীয়ভাবে হাড়গিলাও বলা হয়।
অনুপ সাদির কথা সত্যি হলো, ৬ জানুয়ারি, ২০১১ সালে যখন সেই গ্রামে গিয়ে প্রথমেই একটিঅশ্বত্থ গাছে একটি প্রাপ্তবয়স্ক মদনটাকের দেখা পেলাম। পাখিদের নিরাপত্তা তথা শিকারি আর উৎসুক মানুষের উপদ্রবের কথা ভেবে গ্রামটির নাম প্রকাশ করা হলো না। আরও কিছুটা পথ এগিয়ে দেখা গেল, একটি বাঁশঝাড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা শিমুলগাছে অন্তত ছয়টি বাসা। বাসা ও বাসার আশপাশের ডালে বসে ছিল ছানাসহ কয়েকটি মদনটাক। শিমুলগাছ ও জায়গার মালিক আইনুল হক ও তাঁর বড় ভাই শামসুল হক জানান, সর্বমোট ২৪টি পাখি এখানে আছে, এর মধ্যে ১২টি ছানা, ১২টি বড় পাখি।
সেই প্রতিবেদনে তারা আরো লিখেছিলেনবার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ১৯২৯ সালে বেকার সিলেটে মদনটাকের একটি কলোনি দেখেছিলেন। ১৯৯৯ সালে পাখি গবেষক পল থমসন ২৫টির মতো পাখি দেখেছেন সুন্দরবনে। এর বাইরে একসঙ্গে এতগুলো মদনটাক ও বাসা করার কোনো বৈজ্ঞানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ রেজা খান জানিয়েছেন, তিনি ২০০৪ সালে পঞ্চগড়ের একটি গ্রামের শিমুলগাছে এক জোড়ামদনটাককে বাসা করতে দেখেছেন। মাঝেমধ্যে দু-একটি পাখি দেখা গেছে চলনবিল, পাবনা, টেকনাফ, হাকালুকি হাওর, সোনাদিয়া দ্বীপ ও সুন্দরবনের কচিখালিতে।
সুন্দরবন এ পাখির প্রধান আবাস হলেও সুন্দরবনের কোথাও মদনটাকের বাসা খুব একটা দেখা যায়নি। তবে পল থমসন, রোনাল্ড হালদার ও রেজা খানের লেখায় সুন্দরবনের কোথাও না কোথাও এদের বাসা থাকার কথা বলা হয়েছে। এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফ্লোরা অ্যান্ড ফনা অব বাংলাদেশে এ পাখির বিস্তার শুধু খুলনা, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের কোথাও কোথাও বলে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়া ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, চীন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় এ পাখি দেখা যায়।
সেই প্রতিবেদনে তারা মদনটাক যে গাছটিতে বাসা করেছে তার মালিক শামসুল হকের উদ্ধৃতির মাধ্যমে জানান, “‘এ পাখিরা ২০০৭ সালে এখানে আসে। তখন ছিল মাত্র দুটি, এখন ২৪টি হয়েছে। গত বছর (২০০৯ সালে) কালবৈশাখী ঝড়ে চারটি ছানা হারিয়ে গিয়েছিল।শামসুল হক তাদেরকে জানান, পাখির জন্যই এই গাছ, তারা এ গাছ কাটবেন না। গ্রামের মানুষকে তারা বলেছেন, এ পাখিদের যেন কোনো ক্ষতি না করে।
সেই প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, এ পাখির বৈজ্ঞানিক নাম Leptoptilos javanicusইংরেজি নাম Lesser Adjutant Storkতবে গ্রামটির মানুষ এ পাখিকে গোগরোল বলে ডাকে। লম্বা গোগ, গগ মানে গলা, তাই এমন নামকরণ। মদনটাকের উচ্চতা মাটি থেকে চার-সাড়ে চার ফুট। ডানা বড়। গায়ের ওপরের অংশের রং হালকা ধাতব কালো। পিঠ থেকে লেজের পালকের ধার ময়লাটে সাদা, বুকের পালক সাদা, পালকহীন লম্বা গলা ও টাকমাথা লালচে হলুদ। পা মলিন ধূসর ও লম্বা। প্রধানত একাকী খাবার খেতে বের হয় নির্জন নদীর চর, উপকূলীয় নদী ও বিলে। শামুক, মাছ, ব্যাঙ, পানিতে বসবাসকারী সাপ খায়। বড় গাছে ডালপালা দিয়ে পাটাতনের মতো বিরাট বাসা বানায়। বর্ষার সময় সাধারণত বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে তিন থেকে চারটি। ছানা উড়ার উপযুক্ত হলেও বাসা মেরামত চলে।
বড় গাছ সংরক্ষণ এবং শিকার বন্ধ করতে পারলে এ পাখি রক্ষা করা যাবে। তবে এর জন্য মানুষকে সচেতন করা এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে তহবিল সংগ্রহ করে কনজারভেশন প্রোগ্রাম নেওয়া জরুরি।
এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হলে সেদিনই ব্যাপক সাড়া পড়ে। ওইদিনই বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফোন করে পাখিটির অবস্থান ও গ্রামের নাম জেনে নেন, তিনি জেলা প্রশাসক ছাড়াও হরিপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হারুন-অর-রশিদকে টেলিফোন করেন। এরপরই পাখিটি সম্পর্কে এলাকাবাসিসহ অনেক মানুষ সচেতন হন এবং আমার কাজ করতে সুবিধা হয়। যারা একসময় আমার কথায় গুরুত্ব দিতো না তারাও গুরুত্ব দিতে শুরু করে। মার্চ মাস থেকেই সিংহারি গ্রামের মদনটাকের খবর নিয়মিত পত্রিকা ও টেলিভিশনে আসতে থাকে, যা এখনও অব্যাহত আছে।এমনকি যখন মদনটাক গ্রামে থাকে না তখনও সাংবাদিকেরা ঠাকুরগাও শহরে বসেই পুরনো ছবি ব্যবহার করে ঢাকা শহরে প্রতিবেদন পাঠাতে থাকেন। সেইসব প্রতিবেদনে উঠেছে নানা ধরনের বক্তব্য। কোনো কোনোটিতে আছে পাখিগুলোর বাঁচার আকুতি আবার কোনো কোনোটিতে আছে পাখিগুলোর প্রতি গ্রামবাসির সীমাহীন ভালোবাসার কথা। যেমন একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়ঃ গ্রামবাসী জানান, শীতকালে ঠাণ্ডার প্রকোপে পাখিগুলো অসুস্থ হয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তারা উদ্ধার করে আগুনের তাপ ও প্রয়োজনীয় সেবা-যত্ন দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। পরে আবার ছেড়ে দেন। শুধু তাই নয়, স্থানীয় পশুসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারাও গ্রামবাসীর ডাকে যখন তখন ছুটে যান ওই গ্রামে। এ অবস্থায় মদনটাক পাখি নিয়ে স্থানীয় মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই তাদের দেখভাল করেন। একই সঙ্গে শিশুরাও আছে পাখিগুলোর অভিভাবকত্বের দায়িত্বে। গ্রামের দুই শিশু হোসেন আলী ও সোহেল রানা বলে, পাখিগুলো দেখতে খুব ভালো লাগে। প্রতিদিন সময় পেলেই এই ঝাড়ের পাশে এসে দেখি। আমরা কেউই তাদের ঢিল মারি না। কাউকে ঢিল মারতেও দিই না।”[২]
সিংহারির অবস্থানঃ সিংহারি গ্রামের অবস্থান ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার উত্তরে। গ্রামটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে নাগর নদী। নদীটির উৎপত্তিস্থল সেই অঞ্চল থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এছাড়া গ্রামটির পাশে রয়েছে অনেকগুলি বিল যেগুলতে মোটামুটি পাখির খাবার রয়েছে। এছাড়া গ্রামটিতে তেমন কোনো পরিবেশ দূষণের যন্ত্রণা এখনও পৌঁছেনি। গ্রামটি সীমান্তঘেঁষা হওয়ার কারণেও অযাচিত মানুষের যাতায়াত নেই। আর এসব কারণেই এ গ্রামে মদনটাক টিকে গেছে।
আমার পর্যবেক্ষণঃ আমি নিয়মিত এই মদনটাকের খোঁজ নিই মুঠোফোনের মাধ্যমে। তাতে দেখা গেছে মদনটাকগুলো এপ্রিল-জুন এই তিন মাস উক্ত গ্রামে থাকছে না। এই তিন মাস তারা থাকে সেই গ্রাম থেকে কিছুটা দূরের গ্রাম কাতরগঞ্জে। এই গ্রামটি ভারতের একটি গ্রাম যা বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থিত এবং উক্ত নদী নাগরের তীরবর্তি।
বিবিধঃ Leptoptilos এই গণে পৃথিবীতে তিন প্রাজাতির পাখি রয়েছে। বাংলাদেশের পাখির ভেতরে এই গণের রয়েছে তার দুইটি প্রাজাতি। সেগুলো হলো আমাদের আলোচ্য ছোট মদনটাক, Lesser Adjutant ও অন্যটি বড় মদনটাক, Greater Adjutant. আমরা বাংলাদেশে আর কোনোদিনই বড় মদনটাক দেখার আশা করি না। কেন না, বড় মদনটাক বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অনেক আগেই।
মদনটাক উদ্ধার ও দেখাঃ ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের ১২ তারিখে সুন্দরবনের কলাগাছিয়ায় দেখা যায় একটি মদনটাক। সুন্দরবনের মদনটাকগুলোকে খাদ্যাভাবে রুগ্ন দেখায়। এখনো সুন্দরবনেই রয়েছে মদনটাকের কলোনি। ২০১৩ সালের এপ্রিলে দুটি ছোট মদনটাক চাপাইনবাবগঞ্জ এবং দিনাজপুর থেকে উদ্ধার করা হয় যা পাবেন ফেসবুকের এই লিঙ্কে। ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৩ তে একটি মদনটাক দেখা যায় পঞ্চগড়ের বোদা থানায় যার ছবি পাবেন ফেসবুকের এই লিঙ্কে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ রাজশাহীর পুঠিয়া থেকে একটি অসুস্থ মদনটাক উদ্ধার করা হয় যা পাবেন ফেসবুকের এই লিঙ্কে

তথ্যসূত্রঃ
১. দৈনিক প্রথম আলো, ১০ জানুয়ারি, ২০১০।
২. দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ এপ্রিল, ২০১২।
আরো পড়ুনঃ

. ঠাকুরগাঁয়ের সিংহারি গ্রামের মদনটাক কলোনিতে এবছর নেই বাসা তৈরি ও ছানা বড় করার তোড়জোড়

. বড় মদনটাক বাংলাদেশে বিলুপ্ত এবং পৃথিবীর মহাবিপন্ন পাখি

. ছোট মদনটাক বাংলাদেশের মহাবিপন্ন পাখি 

No comments:

Post a Comment