Monday, April 02, 2012

বাংলাদেশের শকুনেরা ভালো নেই




বাংলা শকুন, ছবিঃ কিরণ খান, বাংলাদেশ।

বর্তমানে সারাবিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। এর মধ্যে পশ্চিম গোলার্ধে ৭ প্রজাতির এবং পূর্ব গোলার্ধে (ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া) ঈগলের সঙ্গে সম্পর্কিত ১১ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ বাংলাদেশে ৬ প্রজাতির শকুন রয়েছে। এর মধ্যে ৪ প্রজাতি স্থায়ী আর ২ প্রজাতি পরিযায়ী। বাংলা শকুন ছাড়াও বাংলাদেশে দেখা যায় রাজশকুন, গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী, হিমালয়ী গৃধিনী, সরুঠুঁটি শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। তবে এখন শুধু বাংলা শকুন এবং গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনীই মাঝে মাঝে দেখা যায়। এসব প্রজাতির শকুন সারাবিশ্বে বিপন্ন। আর স্থায়ী প্রজাতির মধ্যে রাজশকুন তো মহাবিপন্ন।
বাংলাদেশের শকুন বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের গবেষক ড. লিন্ডসে ওক তার এক গবেষণায় প্রমাণ করেন, পশু চিকিত্সায় ডাইক্লোফেনের ব্যবহারই শকুন বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। ভারতে প্রতি বছর ৩০ শতাংশ শকুন মারা যাওয়ার কারণও ডাইক্লোফেন। ডাইক্লোফেননামে ব্যথানাশক ওষুধের ব্যাবহার রয়েছে পশু চিকিতসায়। গত তিন দশক ধরে এশিয়ার দেশগুলোতে ডাইক্লোফেনের ব্যবহার যে হারে বেড়েছে, সেই হারেই প্রকৃতির বন্ধু হিসেবে চিহ্নিত শকুন পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। ২০০৩ সালে এক গবেষণায় জানা যায়, যেসব পশুর দেহে ডাইক্লোফেনরয়েছে, সেসব মৃত পশুর মাংস খেলেই তিন দিনেই শকুনের কিডনি অচল হয়ে যায়। সোজা কথায় মৃতপশুর মাংসই শকুনের জন্য যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
পরিসংখ্যান জানিয়ে দিচ্ছে, ৮০'র দশকে সার্কভুক্ত দেশে প্রায় ৪ কোটি শকুনের অস্তিত্ব ছিল, অথচ এই সংখ্যা এখন কমে মাত্র ৪০ হাজারে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই সারাবিশ্বে শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের ৫ তারিখ আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা এই মানবসৃষ্ট কারণে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে পশু-চিকিত্সায় ডাইক্লোফেনের পরিবর্তে সমান কার্যকর অথচ শকুনের ক্ষতি করে না মেলোক্সিক্যামনামের ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। কিন্তু শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে কার্যকরভাবে বাঁচানো যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের পাখি গবেষক সীমান্ত দীপু গত২ এপ্রিল, ২০১২ আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, ৪৭টি বাংলা শকুন বাংলাদেশের সিলেট বিভাগের কালাছড়ার গভীর জংগলে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে দেখা গিয়েছিল। তার পরের বছর সেখানে শকুনের পরিমাণ কমে দাড়িয়েছিল ৭টিতে। বর্তমানে কালাছড়ায় প্রায় ২০ টি বাংলা শকুন রয়েছে। এছাড়া ১৩ মার্চ ২০১১ দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ডিসেম্বর, ২০১০-এ বাংলাদেশের পঞ্চগড়ের দেবিগঞ্জের দণ্ডাপাল ইউনিয়নের রাজারহাট, সুন্দরদীঘি, ফুলবাড়ী ও খকেরহাটে একঝাঁক গ্রিফন শকুন বা ইউরেশীয় গৃধিনী আসে। স্থানীয় লোকজন ৮টি দুর্বল শকুন ধরে ফেলে। পরে পঞ্চগড়ের ততকালীন জেলা প্রশাসকবনমালী ভৌমিক আটক শকুনগুলো না মারার নির্দেশ দেন। কিন্তু আহত একটি শকুন মারা যায়। পরে ১১ মার্চ, ২০১১ আরেকটি অসুস্থ শকুন মারা যায়। একই দিন বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে পঞ্চগড় যান এবং বিরল শকুনগুলো কক্সবাজারের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের শকুন কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তিনি তখন আশা করেছিলেন, শকুনগুলো সুস্থ হলেই এগুলো প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হবে।
আন্তর্জাতিক শকুনশুমারির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে পৃথিবীর ৯৯ দশমিক ৯শতাংশ বাংলা-শকুন মারা গেছে। এ কারণে অনেক দেশে ওষুধটি নিষিদ্ধ হয়েছে এবং বিকল্প ওষুধ ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১১ সালে ঘটা করে বাংলাদেশে ওষুধটি নিষিদ্ধ করাহয়েছে কিন্তু ওষুধটির ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি।
মৃত পশুর মাংস খেয়ে লোকালয় ও বনবাদাড় দূষণমুক্ত রাখার কাজে শকুনের বিকল্পনেই।পশুর ক্ষুরা ও তড়কা রোগের জীবাণু কেবল শকুন হজমের মাধ্যমে ধ্বংস করতে পারে। শকুন না থকার কারণেই ক্ষুরা ও তড়কা রোগের প্রাধান্য বাংলাদেশে বেড়েছে।
শকুনসমৃদ্ধ সুন্দরবন ও হাওরাঞ্চল এখন প্রায় শকুনশূন্য। গবাদিপশুর বিষাক্ত মাংস থেকে দূরে রাখার জন্য কোনো কোনো দেশে শকুনের আবাসে নিয়মিত কুকুর মেরে রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশে এ ধরনের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হয় কিনা তা পরীক্ষা করা যেতে পারে। এছাড়াও শকুন বিলুপ্ত হবার আরো অন্যান্য কারণের মধ্যে রয়েছে শকুনের খাবার ও আবাসস্থলের সংকট। যার ফলে বাংলাদেশের শুকুন হারিয়ে যাচ্ছে। শকুনেরা সাধারণত পুরনো বড় বড় গাছে বাসা বাঁধে এবং ডিম পাড়ে। পুরনো বড় বড় গাছগুলো নিধন করে ফেলায় পরিবেশের বন্ধু শকুন হারিয়ে গেছে। পরিবেশ দূষণের কারণেও শকুনের ডিম থেকে ছানা হচ্ছে না। দূষণের কারণে শকুনসহ বিভিন্ন পাখির ডিমের খোলস পাতলা হয়ে যাচ্ছে এবং তার ফলে ডিম থেকে ছানা হচ্ছে না এবং অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
সাহিত্যে শকুনঃ মাঠ থেকে মাঠে মাঠেসমস্ত দুপুর ভরে এশিয়ার আকাশে আকাশে/শকুনেরা চরিতেছে; মানুষ দেখেছে হাট ঘাঁট বস্তি, নিস্তব্ধ প্রান্তর/শকুনের; যেখানে মাঠের দৃঢ় নীরবতা দাঁড়ায়েছে আকাশের পাশে’—রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী শকুনকবিতার অংশ এটি। এছাড়াও অনেক সাহিত্যিক শকুনকে তাদের সাহিত্যে স্থান দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আরো পড়ুন

No comments:

Post a Comment