Wednesday, April 18, 2012

ঘড়িয়াল বাংলাদেশসহ পৃথিবীর মহাবিপন্ন সরীসৃপ



Photo: Sujoy Banerjee

বৈজ্ঞানিক নাম: Gavialis Gangeticus
বাংলা নামঃ ঘড়িয়াল
ইংরেজি নামঃ Gharial, Gavial.

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগ/রাজ্যঃ Animalia
বিভাগঃ Chordata
শ্রেণীঃ Reptilia
বর্গ: Crocodylia
পরিবারঃ Gavialidae
গণঃ Gavialis
প্রজাতিঃ Gavialis Gangeticus (Gmelin, 1789)
ভূমিকা: বাংলাদেশের সরীসৃপগুলোর যে তালিকা রয়েছে তাতে ঘড়িয়াল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রানি। ঘড়িয়াল সম্পর্কে আমার সংগৃহীত তথ্যগুলো আপনাদের জ্ঞাতার্থে পেশ করছি। আমরা কী বাংলাদেশে মহাবিপন্ন এই প্রানিটিকে ফিরিয়ে আনতে পারি না।
পরিচিতি: সরিসৃপ শ্রেণির কুমির বর্গের ঘড়িয়াল পরিবারের একমাত্র প্রজাতি ঘড়িয়ালপূর্ণ বয়স্ক ঘড়িয়ালের গায়ের রঙ ঘন জলপাই-সবুজকুমির সাদৃশ্য প্রাণীটির চোয়াল সরু ও লম্বা, লেজ থেকে মাথা পর্যন্ত দৈর্ঘ্য পাঁচ মিটার এবং ওজন ৬৮০ কেজি পর্যন্ত হতে পারেসাধারণত এর ওপরের পাটিতে ২৭ থেকে ২৯টি এবং নিচের পাটিতে ২৫ থেকে ২৬টি ক্ষুরধার দাঁত থাকে
স্বভাব ও আবাসস্থল: জনবিরল ও নিরিবিলি চরাঞ্চলে এর বসবাসনভেম্বর, ডিসেম্বর ও জানুয়ারি_এই তিন মাস এর প্রজনন মৌসুমশুকনো মৌসুমে মার্চ থেকে মে মাসে বালুচরে লোকচক্ষুর আড়ালে মা ঘড়িয়াল নীড় রচনা করে ৩০ থেকে ৫০টি ডিম পাড়ে ও বাচ্চা ফোটায়পূর্ণ বয়স্ক ঘড়িয়াল রাক্ষুসে মাছ, নদীতে ভেসে আসা নানা ধরনের মৃত প্রাণী ও বাচ্চা ঘড়িয়াল পোকা-মাকড়, ব্যাঙ ও ছোটখাটো জলজ প্রাণী খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে
বিস্তৃতি: একসময় এদের বাস ছিল ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা, পাকিস্তানের সিন্ধু, মিয়ানমারের কলাদান নদী এবং বাংলাদেশের পদ্মা-যমুনার সঙ্গমস্থলের উচ্চ অববাহিকায়
বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের ইতিহাস:  এক সময় পদ্মা ও যমুনা নদীতে প্রচুর ঘড়িয়ালের আনাগোনা ছিল একদল বন্য প্রাণী গবেষক ১৯৯০ সালের দিকে সর্বশেষ পদ্মার উচ্চ অববাহিকায় একটি মাত্র ঘড়িয়ালের সাক্ষা পেয়েছেগবেষকদল সেদিন ঘড়িয়ালের ডিম সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে এসেছেপরে ডিম ফোটাতে পেরেছে কি না তা জানা যায়নিএকই সালে একই স্থানে জেলেদের জালে চারটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা ধরা পড়েছেতারপর থেকে এ প্রাণীটি বাংলাদেশের নদ-নদীতে আর দেখা যায়নিমনে করা হচ্ছে বাংলাদেশে প্রকৃতিতে আর কোনো ঘড়িয়াল নেই
ঘড়িয়াল উদ্ধারঃ: ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপকরা পদ্মার চরে একটি বাচ্চা ঘড়িয়ালের সন্ধান পানপরে সেটিকে কক্সবাজারের বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে অবমুক্ত করা হয়২০০৯ সালে পদ্মা নদীর জেলেদের জালে আটকা পড়ে আরো একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চাসেটিকে রাজশাহী চিড়িয়াখানায় রাখা হলেও পরে সেটি মারা যায়২০১০ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পাচারকালে ঢাকা বিমানবন্দরে প্রায় এক হাজার কচ্ছপের সঙ্গে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চাও উদ্ধার করা হয়সবশেষ ২০১০ সালের ৩১ অক্টোবর মানিকগঞ্জের শিবালয়ের আরুয়া ইউনিয়নসংলগ্ন পদ্মা নদীতে জেলেদের জালে আটকা পড়ে আরো একটি বাচ্চা ঘড়িয়ালপরদিন আড়াই ফুট দীর্ঘ ও দেড় বছর বয়সী ঘড়িয়ালটিকে আবার পদ্মাতেই অবমুক্ত করা হয়এছাড়া ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ শিলাইদহের কাছে, কুষ্টিয়াতে পদ্মা নদীতে ধরা পড়ে একটি ঘড়িয়ালের বাচ্চা২১ সেপ্টেম্বর ২০১১ বুধবার রাজবাড়ি জেলার সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়ন এর আম্বারিয়া চরের পদ্মা নদীতে ওরাকান্দা গ্রামের আমজাদ হোসেনের জালে আটকা পড়ে একটি ঘড়িয়ালতাক্ষণিকভাবে বন বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার ও ফরেস্টার ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত ঘড়িয়ালটি উদ্ধার করেনআনুমানিক দুই বছর বয়সী ঘড়িয়ালটি লম্বায় ৪ ফুট ৪ ইঞ্চি, ওজন ৪.৫ কেজি এছাড়া গত ৩০ মে ২০১৩ রাজশাহীর গোদাগাড়ি থেকে উদ্ধার করা ঘড়িয়াল ছানাটি চিড়িয়াখানা বা অন্য কোথাও সংরক্ষণ সম্ভব না হওয়ায় আবার পদ্মা নদীতেই অবমুক্ত করা হয়।
ঘড়িয়াল কমে যাবার কারণ: বাংলাদেশ এবং ভারত দুদেশেই ঘড়িয়ালের ওপর অত্যাচার করে কিছু মানুষওরা নানাভাবে ঘড়িয়াল শিকার করে ডিম ছিনিয়ে নিয়ে ওদের বংশবিস্তার রোধ করে দিয়েছেচোরাই শিকারিদের কাছে ঘড়িয়াল অত্যন্ত লোভনীয় শিকারশিকার করতে পারলে চড়াদাম পায় ওরাসাধারণত ঘড়িয়ালের চামড়া দিয়ে লেডিস ব্যাগ, মানিব্যাগ, জুতা তৈরি হয়আর এদের তেল ও চর্বি ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা হয়ঘড়িয়াল দ্রুত বিলুপ্তির পথে ধাবিত হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে জেলেদের জালে ধরা পড়াজেলেরা বাগে পেলেই ঘড়িয়ালদের নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেওদের ধারণা এরা কুমিরজাতীয় প্রাণী এবং মানুষখেকোআসলে ঘড়িয়ালরা মানুষখেকো হওয়া তো দূরের কথা, এগুলো মানুষের ধারে-কাছেও পারতপক্ষে ঘেঁষে নাএর কারণ ঘড়িয়াল শুধু মাছ, সাপ, ব্যাঙ ছাড়া অন্যকিছু খায় নাকালেভদ্রে জলজ পাখি খায়; অর্থাস্যভূক প্রাণী এগুলোএভাবে ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনেক ঘড়িয়ালকে জেলেদের হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে  
বাংলাদেশে ঘড়িয়ালের সংখ্যা: বর্তমানে ঢাকা চিড়িয়াখানায় ৪টি, রাজশাহী চিড়িয়াখানায় ৩টি, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের পুকুরে ২টি এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারী পার্ক, কক্সবাজারে ১টি ঘড়িয়াল আছে
বিবিধ: ২০০৭ সালে কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব এনডেঞ্জার্ড স্পিসিস (সিটস) ঘড়িয়ালকে বিশ্বের অতিবিপন্ন প্রাণী হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করেছেঘড়িয়াল নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত, বাংলাদেশে প্রায় বিলুপ্ত। ২০০৬ সালের এক জরিপ অনুসারে ভারতে ২০০টি পূর্ণবয়স্ক ঘড়িয়াল টিকে আছেএই প্রাণীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে ভারতে ঘড়িয়ালের অন্তত ৯টি নিরাপদ আবাসস্থল ঘোষণা করা হয়েছে। আইইউসিএন-এর ২০০৬ সালের তথ্য মতে ৪৮% ঘড়িয়াল চম্বল নদীতে টিকে আছে। চম্বল নদীর অবস্থান উত্তর প্রদেশের আগ্রায়।
জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ঘড়িয়াল টিকিয়ে রাখতে জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি জরুরিভিত্তিতে ভারত ও নেপালের মতো এ দেশে কৃত্রিম প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি করা প্রয়োজন
ছবির ইতিহাস: তিন চার দিন বয়স্ক ঘড়িয়াল ছানারা সাতার কাটছে চম্বল নদীর অল্প জলে। পাশে তাদের মা-বাবারা খুব সতর্ক দৃষ্টিতে পাহারা দিচ্ছে। লেখক সুজয় ব্যানার্জি ১৫টি বাসায় আনুমানিক ৫০০ ঘড়িয়ালছানা দেখেছেন। সময়কাল আগস্ট, ২০১৩। এই লিংকের খবর 



আরো পড়ুন:

৬. বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর তালিকা


No comments:

Post a Comment

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের

Recommended