Saturday, June 09, 2012

মহানদের মানবচিন্তা



এরিখ ফ্রম -এর উদ্ধৃতি



এরিখ ফ্রম দার্শনিক লেখক১৯৮০ সালে তিনি যখন মারা যান তখন সমস্ত প্রচারমাধ্যম তাকে মনঃসমীক্ষক হিসেবে গুণগান করেছিলোতবে তিনি তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু ছিলেনএই দার্শনিক মানুষটি আগাগোড়াই জানতেন পুঁজিবাদ জানে কেবল মানুষের সামনে মিথ্যার আকর্ষণীয় পসরা সাজিয়ে মুনাফা লুটতেতিনি কার্ল মার্কসের ছাত্র হিসেবে পুঁজির অধীনতা থেকে মানুষের সর্বাঙ্গীন স্বাধীনতা ছেয়েছিলেন

এই মহান মানুষটির একটি উক্তি আমরা সর্বদাই মনে রাখি। উক্তিটি হচ্ছে, মানুষ পরিস্থিতির তৈরি, তবে সেই পরিস্থিতিও মানুষের তৈরি। এক অনন্য ক্ষমতা মানুষকে বাকি সব জীবন্ত জিনিস থেকে আলাদা করেছে; তা হলো নিজ আর নিজ পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া। তাই সেই সচেতনতা অনুযায়ী নিজেদের কাজ ঠিক না করলে মানুষ হওয়া যায় না[১]  

মানুষ শুধু তার চারপাশ সম্পর্কে সচেতন হয় না, সে চারপাশকে পরিবর্তন করে, তার প্রয়োজনে। এই প্রয়োজন থেকে যে পরিবর্তন ঘটে তা মানুষেরই কাজে লাগে এবং মানুষকে এগিয়ে দেয়। মানুষ অন্যের কাছ থেকে প্রাপ্ত উন্নতির জন্য অন্যের উপর কৃতজ্ঞও থাকে। যেমন, আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন দিনে শতবার আমি নিজেকে কথাই স্মরণ করাই যে, আমার গোটা জীবনটাই নির্ভর করে আছে অপরের শ্রমের উপর_তাদের কেউ জীবিত, কেউ বা মৃত এবং তাদের কাছ থেকে যা আমি পেয়েছি আজো পাচ্ছি ঠিক সমানভাবেই তার প্রতিদান আমাকে অবশ্যই দিতে হবে।....

আমরা যে খাদ্য গ্রহণ করি তা অপরে তৈরি করে, যে বস্ত্র পরিধান করি তাও অপরের প্রস্তুত, যে গৃহে বাস করি অপরেই তা নির্মাণ করেঅপরের দ্বারা জ্ঞান উপলব্ধির প্রায় সমস্ত অংশের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটেছে ভাষার মধ্য দিয়ে_ যে ভাষা অপরেই সৃষ্টি করেছে[২]   

কার্ল মার্কস মানুষকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, মানুষ মানুষের কাছে সবচেয়ে সমুন্নত জীব। তাই প্রয়োজন সেই সমস্ত সম্পর্কের শর্তহীন উচ্ছেদ যেখানে মানুষ হয়ে রয়েছে হেয়, দাসে পরিণত, বিস্মৃত ও ঘৃণিত জীব[৩]  

মানুষ সম্পর্কে মাও সেতুং-এর ধারণা ছিলো চমকারযেমন তিনি বলেছেন, দুনিয়ার সব জিনিসের মধ্যে মানুষই সবচেয়ে মূল্যবানকমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যতদিন জনগণ থাকবেন ততদিন যে কোনো বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটিয়ে দেয়া যাবে।... বিপ্লব সব কিছু পালটে দিতে পারে[৪] 

চে গ্যেভারা মানুষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটির সমস্ত সম্পদের চেয়েও ১০ লক্ষ গুণ অধিক মূল্যবান একজন মানুষের জীবন

শরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মানুষ ও তার মহত্ত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, মহত্ত্ব জিনিসটা কোথাও ঝাঁকে ঝাঁকে থাকে না। তাকে সন্ধান করে নিতে হয়। মানুষ যখন মহত্ত্বের সন্ধান করতে ভুলে যাবে তখন সে নিজেকে ছোট করে আনবে[৫]  

তিনি মানুষের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির উপর বিশ্বাসের কারণ সম্বন্ধে বলেছেন চিরদিন সংসারে অত্যাচারিত, পীড়িত, দুর্বল বলিয়া মানুষের সহজ অধিকার হইতে যাহারা সবলের দ্বারা প্রবঞ্চিত, নিজের উপরে বিশ্বাস করিবার কোনো কারণ যাহারা দুনিয়ায় খুঁজিয়া পায় না, দেবতা দৈবের প্রতি তাহাদেরবিশ্বাস সবচেয়ে বেশি[৬]  

সব মহান ব্যক্তিই মানুষকে বড় করতে চেয়েছেন এক্ষেত্রে একেক ব্যক্তির পথ একেক রকম। রবীন্দ্রনাথ মানুষকে বড় করার জন্য বলেছেন, মনের চলাচল যতখানি, মানুষ ততখানি বড়। মানুষকে শক্তি দিতে হইলে মানুষকে বিস্তৃত করা চাই।[৭]   
এর বিপরীত কিছু দিকও আছে। টমাস হবস মানুষকে দেখেছেন খুব নিকৃষ্ট জীব হিসেবে। আর ফ্রিডরিখ নিটশে বলেছেন, "পৃথিবীটা সুন্দর, কিন্তু এর একটাই অসুখ, যার নাম মানুষ।" 

তথ্যসুত্রঃ
১. এরিখ ফরম; Our Way of Life Makes us Miserable, 1964.
২. আলবার্ট আইনস্টাইন
৩. কার্ল মার্কস,  হেগেলের আইনের দর্শনের পর্যালোচনায় প্রদত্ত রচনা
. মাও সেতুং; ইতিহাসের ভাববাদি ধারণার দেউলিয়াপনা থেকে; ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৯
. শরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়;বাংলা সাহিত্যসভার বার্ষিক অধিবেশনে অভিভাষণ থেকে।
. শরচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; পথের দাবি।
৭. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; লোকহিত; কালান্তর।  

No comments:

Post a Comment