Thursday, December 13, 2012

হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাংলা গণসংগীতের জননন্দিত মহাযোদ্ধা




হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান









হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর; বাংলা তারিখ ২৭ অগ্রহায়ণ ১৩১৯। জন্মস্থান তকালীন শ্রীহট্ট বা সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার চুনারুঘাট উপজেলার মিরাসি গ্রামে। সে হিসেবে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সিলেটের মিরাশির বাসিন্দা। তাঁর পিতার নাম হ রকুমার বিশ্বাস ও মা সরোজিনী দেবি। তাঁর মৃত্যূ তারিখ ২২ নভেম্বর ১৯৮৭। তিনি একজন বাঙালি সঙ্গীতশিল্পী, কবি, লেখক এবং সুরকারমূলত লোকসঙ্গীতকে ভিত্তি করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বাঙালির ইতিহাসে অবিস্মরণীয়
তিনি প্রথমে হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হনসেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েনতিনি ১৯৩২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। প্রথমে কারাবন্দি হন ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এবং পরে ১৯৪৮ সালে। ১৯৩৫ সালে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষারোগে আক্রান্ত হন এবং সেই কারনে তিনি মুক্তি পান১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী থাকেন
১৯৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দে বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের সাথে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আই.পি.টি.এ গঠন করেন পঞ্চাশের দশকে এই সংঘের শেষ অবধি তিনি এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন
১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রনে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করতে১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়স্বাধীনতার আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধানসেই সময়ে তাঁর গান তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান, কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে প্রভৃতি আসাম ও বাংলায় সাড়া ফেলেছিলআসামে তাঁর সহযোগি ছিলেন বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, সাহিত্যিক অশোকবিজয় রাহা, সেতারবাদক কুমুদ গোস্বামী প্রভৃতি
ষাটের দশকে সোভিয়েত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে তিনি কাজ ত্যাগ করেনচিন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিলদুবার তিনি চিনে গিয়েছিলেনচিনা ভাষায় তাঁর অনেক গান আছে
মাস সিঙ্গার্স নামে নিজের দল গঠন করে জীবনের শেষ দিকেও তিনি গ্রাম-গ্রামান্তর ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়িয়েছেনতিনি কল্লোল, তীর, লাললণ্ঠন প্রভৃতি নাটকের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেনলাললন্ঠন নাটকে তিনি বিভিন্ন চিনা সুর ব্যবহার করেছিলেন
জনগণের সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ একজন সৃজনশীল সুরকার হিসেবে তিনি জনমানুষের জীবনের সুরকে তার গানে ধারণ করেছিলেন। তাঁর সুরের ভাণ্ডারে ছিলো বাঙলার নদী মাঠ প্রকৃতি পরিবেশ ও মানুষের সুর। বাঙলার সুর ছিলো তাঁর সুরের ভিত্তি। তিনি লোকসংগীতের প্রতি তীব্র অনুরক্ত ছিলেন এবং লোকসংগীতের সুর ও গায়কীর সংগে মিলিয়েছিলেন শ্রেণিসংগ্রামের বাণী। রাঢ় বংগের ঝুমুর, বরেন্দ্রীর ভাওয়াইয়া, চটকা, ব্যাঘ্রতটীর বাগড়ির জারি-সারি, মুর্শিদি, বংগের ভাটিয়ালি, বীরভুমের বাউল, নদীয়ার ফকির বাউল হয়ে হাছন রাজায় মিলেছে তার পথের নিশানা। এছাড়াও তিনি গাজির গান, ধামাইল গান, বাইদ্যার গান, কবি গান, হোরি গানসহ নানা রাগের সুরকে আত্মস্থ করে গেয়েছেন অনেক গান। এ-পৃথিবীর স্রষ্টা শ্রমিক-কৃষকের শ্রম-ঘাম থেকে তিনি গানকে খুঁজে নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আমি কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম। লেখক শিল্পী হিসাবে কমিউনিস্ট পার্টিতে আসিনি। গান লিখেছি সরাসরি কৃষক আন্দোলনের প্রেরণা থেকে, আবার কৃষক আন্দোলনকে সাহায্য করার জন্য। তিনি আরো বলেছেন, আমার অধিকাংশ গানের সুর উপাদনকারী শ্রমজীবি জনগণের সৃষ্টি। আমার গান আমার একার সৃষ্টি নয়, একটা আন্দোলনের সৃষ্টি[১]  
তিনি নিজ দেশের গণ সুরকে যেমন ব্যবহার করেছেন গানে তেমনি চিন, সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বেশ কিছু দেশের জনসুরকেও কাজে লাগিয়েছেন।
বিপ্লবী হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ হেমাঙ্গ বিশ্বাস জন্মেছিলেন এক মানবশিশু হিসেবে এবং ধীরে ধীরে পার্টি ও নিজের চেষ্টায় হয়ে উঠেছিলেন বিপ্লবী। বিপ্লবের চিন্তা তাঁর শিল্পীজীবনকে বিকশিত করেছে। তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার ইতিহাস তিনি লিখেছেন নিজেই আমরা পার্টিতে এসেছিলাম গান করার জন্য নয়, বিপ্লব করার জন্য।[২] পার্টিতে যখন এসেছিলেন তখন সত্যি কথা বলতে বিপ্লবের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক  বাহিনীরও যে সশস্ত্র বাহিনীর মতোই প্রয়োজন, মাওয়ের এই তত্ত্ব তিনি জানতেন না। কিন্ত যখন পার্টির নেতারা বলেছেন যে তোমার শরীর খারাপ, মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানোর কাজ তুমি করতে পারবে না, তুমি বরং গান লেখো তখন তিনি মন খারাপ করেছিলেন। কিন্তু গান লিখে যখন দেখলেন সেই গানগুলো জনপ্রিয় হয়েছে, কৃষকেরা তাঁর গান লুফ্যা নিতেছে তখন তাঁর খুব আনন্দ হতো। তাঁর মনে পড়তো মায়াকভস্কির সেই কবিতার কথা _How beautiful ill.
হেমাঙ্গ সম্পর্কে সলিল চৌধুরীঃ আমরা হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ক্যাসেটে সলিল চৌধুরীর ভরাট কণ্ঠে হেমাঙ্গ বিশ্বাস প্রসঙ্গে শুনেছি, সলিল চৌধুরী বলেছেন_
কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা_গঙ্গা থেকে ভোলগার হাওয়ায় ছোটে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের গানের কথা_[তার] গানের সুর মানুষকে উদবুদ্ধ করে_করে উত্তেজিত। পৃথিবীর খেটে খাওয়া মানুষের বন্ধু তিনি। শোষিত মানুষের মুক্তির দিশারি_শোষকের ত্রাস। সাম্রাজ্যবাদিদের শত্রু তিনি। গানের সমুদ্রে তাঁর গান রোষবর্জিত ঢেউ। আর একদিকে শান্ত আকাশে কালবৈশাখীর ঝড় তাঁর গান। অশান্ত মানব জীবনে তিন শান্তির দূত। মানব চেতনার আর এক নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস। জীবন বড় সুন্দর, জীবন বড় মধুর, জীবনকে ভালবাসার প্রতীক হেমাঙ্গ বিশ্বাস। শৃঙ্খলিত মানুষের শৃংখল মুক্তির আশা হেমাঙ্গ বিশ্বাস। বিশ্বশান্তির শ্বেত পারাবত তিনি। মুক্ত নীল আকাশে ডানা মেলে যে শঙ্খচিল গান গেয়ে ফেরে সেইতো হেমাঙ্গ বিশ্বাস। কেরানির কলম তিনি। শ্রমিকের হাতুড়ি তিনি। কৃষকের কাস্তে তিনি। ধানের সোনালি শিষের নাম হেমাঙ্গ বিশ্বাস।[৩]    
পরিব্রাজক হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ তাঁর একটি বিখ্যাত গানের চারটি লাইন এই রকম_
হবিগঞ্জের জালালী কইতর,
সুনামগঞ্জের কুরা,
সুরমা নদীর গাংচিল,
আমি শুন্যে দিলাম উড়া।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস আমাদের দেশের মানুষ; এই জালালি কইতর তিনি নিজেই; শুন্যে উড়াল দিয়ে ডানা ভেঙ্গে কলকাতায় গিয়ে পড়েছিলেন। তাঁর কয়েকটি বিখ্যাত গান আমরা করবো জয়, তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা, উদয় পথের যাত্রী ওরে ছাত্রছাত্রী, তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান, হায়_হায় ঘোর কলিকাল আইল আকাল সোনার বাংলায়, বাঁচবো বাঁচবোরে আমরা বাঁচবো রে বাঁচবো, ওরা আমাদের গান গাইতে দেয়না ইত্যাদি।
গণসংগীতের প্রচারে হেমাঙ্গ বিশ্বাসঃ গণসংগীত সৃষ্টি, প্রচার ও প্রসারে যাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য তাদের মধ্যে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের নাম আসে সবার আগে। তিনি সারা জীবন গণসংগীতের প্রচার প্রসার ও সৃষ্টিতে ছিলেন। তিনি তাঁর লোকসঙ্গীত সমীক্ষাঃ বাংলা ও আসাম গ্রন্থে লিখেছেন, লোকসঙ্গীত গুরুমুখী নয়, গণমুখী। আর তাই তিনি জনগণের চেতনাকে গণসংগীতে ধারন করেছিলেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখেছেন,
লোকসংগীত একটি দেশজ প্রচলিত art form, যা একান্তই মাটি থেকে জন্ম নিয়ে স্বীয় ভৌগোলিক সীমায় যুগ যুগ ধরে প্রবহমান। এক একটি উপজাতির মাতৃভাষার বা dialect-এর মতো তাদের সুরের total formation-ও আলাদা। যদিও human basic feelings- গুলো সর্বত্রই এক, তথাপি পাহাড়, নদী, সাগর, উপত্যকা, মরুভূমি এবং মানুষের বিভিন্ন শ্রম প্রক্রিয়ার প্রভাব এসে পড়ে সুরের আঞ্চলিক প্রভেদ আনে।... গণসংগীত কিন্তু ভিন্ন জিনিস। এ মানুষের সচেতন জীবন সংগ্রামের ফসল। বলা যেতে পারে, জাতীয় চেতনার ধারা যেখানে আন্তর্জাতিক মেহনতি মানুষের আন্দোলনের সমুদ্রে মিশেছে, সেই সাগর সঙ্গমে গণসংগীতের উপত্তি। এর form বা আঙ্গিক ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু content বা ভাব একতাবদ্ধ।[৪]
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গ্রন্থপঞ্জিঃ তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্যঃ
* বিষাণ, ডিসেম্বর, ১৯৪৩; 
* Witnessing CHINA with eyes, April 1960;
* সীমান্ত প্রহরী, নভেম্বর, ১৯৬১;
* আবার চিন দেখে এলাম, অক্টোবর, ১৯৭৫;
* চিন থেকে ফিরে, ভাদ্র, ১৩৮৪;
* লোকসঙ্গীত শিক্ষা, বাংলা ও আসামি ভাষায়, জৈষ্ঠ্য, ১৩৮৫;
* হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, সেপ্টেম্বর, ১৯৮০;
* শঙ্খচিলের গান, বৈশাখ, ১৩৮১;
* আকৌ চিন চাই আঁহিলো, মে, ১৯৭৭
* কুল খুরার চোতাল, ১৯৭০
* জীবনশিল্পী জ্যোতিপ্রসাদ
* উজান গাঙ বাইয়া ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৮;
* জন হেনরীর গান
* মাউন্টব্যাটেন মঙ্গলকাব্য
* বাঁচব বাঁচব রে আমরা
* মশাল জ্বালো
* সেলাম চাচা
* আমি যে দেখেছি সেই দেশ

তথ্যসূত্রঃ
১. হেমাঙ্গ বিশ্বাস; উজান গাঙ বাইয়া; মৈনাক বিশ্বাস সম্পাদিত; শতবর্ষ সংস্করণ; অনুষ্টুপ, ২ই নবীন কুণ্ডু লেন, কলকাতা ৭০০০০৯, মাঘ, ১৪১৮, পৃষ্ঠা নং ৯১।
২. হেমাঙ্গ বিশ্বাস; উজান গাঙ বাইয়া; মৈনাক বিশ্বাস সম্পাদিত; শতবর্ষ সংস্করণ; অনুষ্টুপ, ২ই নবীন কুণ্ডু লেন, কলকাতা ৭০০০০৯, মাঘ, ১৪১৮, পৃষ্ঠা নং ৯৫।
৩. হরিদাস ঠাকুর; হবিগঞ্জের জালালি কইতর হেমাঙ্গ বিশ্বাস শ্রমিক কারিগর শিল্পী; রায়প্রকাশ, ময়মনসিংহ; পৃষ্ঠা_৮২।
৪. সংবর্তক, সাহিত্য ও সমাজ বিষয়ক পত্রিকা; জন্মশতবর্ষে হেমাঙ্গ বিশ্বাস; বিশেষ সংখ্যা; অষ্টম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা; জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ২০১।

No comments:

Post a Comment