Wednesday, January 30, 2013

রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রে বাঙলার রূপ



রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র
ছিন্নপত্রকে এক কথায় কী বলা যায়? ছিন্নপত্র উনিশ শতকের শেষ দশকের বাংলাদেশ। ১৮৮৫ থেকে ১৮৯৫ সালের বাঙলা দেশ। মনে হয় উত্তরটি সম্পূর্ণ হলও না, ছিন্নপত্র হলও উনিশ শতকের শেষ দশকের বাঙলাদেশের পরিবেশ ও প্রকৃতি। ছিন্নপত্রে আছে অনেক কিছু, নেইও অনেক কিছু, থাকতে পারতোও অনেক কিছু। এক চব্বিশ বছরের তরুণ পত্রগুলো লিখতে শুরু করেছেন, লিখেছেন চৌত্রিশ বছরের তারুণ্য প্রযন্ত।তারুণ্যের চোখে দেখা সুন্দর বাঙলাদেশের রূপটি ধরা আছে ছিন্নপত্রে, অবশ্যই এক রোম্যান্টিকের দৃষ্টিতে। কিন্তু ছিন্নপত্রে নেই এক বাস্তববাদীদের দৃষ্টিতে দেখা অভাব-যন্ত্রণা-ক্লান্তি ও রাজনীতির উত্থানপতন সামাজিক টানাপোড়েন। নেই সব শ্রেণির মানুষের জীবনের কথা, জীবনের সর্বদিকের বর্ণনা; যা আছে তা খুবই যসামান্য। সে হিসেবে ছিন্নপত্রকে বলা যায় জীবনানন্দ দাশের রূপসী বাংলার পূর্ববর্তী চিঠির সংস্করণ। ছিন্নপত্রে আছে বাঙলাদেশের প্রকৃতি, নেই বাঙলাদেশের মানুষের জীবন-মরণের সংগে সম্পৃক্ত টানাপড়েন।
ছিন্নপত্রে আছে প্রকৃতির বর্ণনার ঠাসবুনন, রয়েছে অজস্র উপমা রূপকের ব্যবহার, তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়বস্তু, প্রাণি-উদ্ভিদের নিখুঁত বর্ণনা; মনে হবে কবির চোখে কিছুই এড়ায়নি; ছোট্ট তৃণটি থেকে বৃহদাকার হাতি, বর্ষার পদ্মার স্রোত থেকে ঝিলের এক টুকরো নিস্তব্ধ জল, কোলকাতার কোলাহল থেকে শিলাইদহের চরের নির্জনতা-সব কিছুর অনুপঙ্খ বর্ণনা পাওয়া যায় ছিন্নপত্রে। আরো পাওয়া যায় মনের অবস্থা, হৃদয়ের ব্যাকুলতা, ভালোবাসার আধিক্য, হৃদপিণ্ডের গান, দৃশ্যের সৌন্দর্য, কবিতার প্রাবল্য, প্রকৃতির ঘাত-প্রতিঘাত।
ছিন্নপত্রের নিসর্গ বর্ণনা আমাদের মুগ্ধ করে। ছিন্নপত্রে নিসর্গের বিবরণের সাথে আমরা পাই জনজীবনের রূপ যদিও সে রূপ একজন সমাজতাত্ত্বিক বা অর্থনীতিবিদের মতো পূর্ণাঙ্গ নয় তিনি শিলাইদহ, সাজাদপুর এবং পতিসর অঞ্চলের মানুষ ও নিসর্গকে দেখেছেন কবির কৌতূহল ও সহমর্মিতা নিয়ে। কলকাতা থেকে খুব স্বতন্ত্র পল্লীর কোলে এসে তাঁর মনে কৌতূহল জেগে উঠেছিলো।[]   
১৮৯১ সালে জমিদারির ভার গ্রহণের পরই কেবল রবীন্দ্রনাথের সুযোগ হয়েছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, পাবনা ও রাজশাহি অঞ্চলের মানুষের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের। এই সময়েই তিনি গ্রামের মানুষ ও তার পরিবেশ এবং সমাজকে গভীরভাবে দেখতে পেলেন। দেখতে পেলেন বাংলার প্রকৃতি।
ছিন্নপ্ত্রেই মূলত আমরা পাবো নদী, প্রকৃতি পরিবেশ ও পথের বর্ণনা এবং গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস, রুচি ও দৈন্যের নিবিড় চিত্র। ছোটো নদী্র উপরে কবি সারাটা দিন ভেসে চলেছেন। দুই ধারে গ্রাম ঘাট ফসলের খেত চর, বিচিত্র ছবি, দেখা দিচ্ছে এবং চলে যাচ্ছে; আকাশে মেঘ ভাসছে এবং সন্ধ্যার সময় নানারকম ফুল ফুটছে; জেলেরা মাছ ধরছে, অহর্নিশি জলের এক প্রকার আদর পরিপূর্ণ তরল শব্দ শোনা যাচ্ছে।[]  
ছিন্নপত্রে রয়েছে গ্রামের বর্ণনা, বহু প্রজাতির গাছ-পালার নাম। কবি দেখতে পাচ্ছেন টিনের ছাত-ওয়ালা বাজার, বাখারির বেড়া-দেওয়া গোলাঘর, বাঁশঝাড়, আম, কাঁঠাল, কুল, খেজুর, শিমুল, কলা, আকন্দ, ভেরেণ্ডা, ওল, কচু, লতাগুল্ম তৃণের সমষ্টিবদ্ধ ঝোপঝাড় জঙ্গল, ঘাটে বাঁধা মাস্তুলতোলা বৃহদাকার নৌকার দল, নিমগ্নপ্রায় ধান এবং অর্ধনগ্ন পাটের খেত।[] নৌকো চলছে; বেশ একটু বাতাস দিচ্ছে। তিনি দেখতে পাচ্ছেন শৈবালের উপরে অনেকগুলো ছোটো ছোটো কচ্ছপ আকাশের দিকে সমস্ত গলা বাড়িয়ে দিয়ে রোদ পোহাচ্ছে। অনেক দূরে দূরে একটা একটা ছোটো ছোটো গ্রাম আসছে। গুটিকতক খোড়ো ঘর, কতকগুলি চাল, শুন্য মাটির দেয়াল, দুটো একটা খড়ের স্তুপ, কুল্গাছ, আমগাছ, বটগাছ এবং বাঁশের ঝাড়, গোটা তিনেক ছাগল চরছে, গোটাকতক উলঙ্গ ছেলে মেয়ে[] হয়তো খেলছে।  
বাংলার মানুষের চেয়েও ছিন্নপত্রে সবচেয়ে বেশি রয়েছে ঝোড়ো হাওয়া, বরিষণ ও বর্ষাকালের বর্ণনা। বাঙলাদেশ নদীর দেশ বলে নয়, বাঙলাদেশ বৃষ্টির দেশ বলে নয়, বাঙলাদেশের প্রাণ বর্ষাকাল বলে; বিশেষ করে যখন বৃষ্টির জলের উপর নির্ভর করে চলতো কৃষকের ফসলের প্রাণ, প্রকৃতির অন্য সব প্রাণি ও উদ্ভিদের প্রাণ। বর্ষা ও বাঙলাদেশ একই সুত্রে গাঁথা; যেমন গাঁথা রবীন্দ্রনাথ-বাঙলাদেশ ও বর্ষা একই সুতোয়।
বর্ষার কয়েকটি বাক্য খেয়াল করলে দেখবো এক উত্তাল বর্ষার রূপ, কাল সমস্ত রাত বাতাস পথের কুকুরের মতো হু হু করে কেঁদেছিল_আর বৃষ্টিও অবিশ্রাম চলছে। মাঠের জল ছোটো ছোটো নির্ঝরের মতো নানা দিক থেকে কল কল করে নদীতে এসে পড়ছে...।[] কিংবা কাল সমস্ত রাত্রি খুব অজস্রধারে বৃষ্টি হয়ে গেছে। আজ ভোরে যখন উঠলুম তখনো অশান্ত বৃষ্টি।[]
বর্ষার প্রথম দিনটা কবির কাছে বরঞ্চ ভেজাও ভালো। তবু তিনি অন্ধকূপের মধ্যে দিনযাপন করবেন না। তিনি লিখছেন,
কাল আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বর্ষার নব রাজ্যাভিষেক বেশ রীতিমত আড়ম্বরের সংগে সম্পন্ন হয়ে গেছে। দিনের বেলাটা খুব গরম হয়ে বিকেলের দিকে ভারি ঘনঘটা মেঘ করে এল।
জীবনে ৯৯ সাল আর দ্বিতীয়বার আসবে না_ভেবে দেখতে গেলে পরমায়ুর মধ্যে আষাঢ়ের প্রথম দিন আর কবারই বা আসবে_ সবগুলো কুড়িয়ে যদি ত্রিশটা দিন হয় তা হলে খুব দীর্ঘজীবন বলতে হবে। মেঘদূত লেখার পর থেকে আষাঢ়ের প্রথম দিনটা একটা বিশেষ চিহ্নিত দিন হয়ে গেছে, নিদেন আমার পক্ষে।[]
তারপর তিনি কালিদাস আর ইতিহাস আর সূর্যাস্ত লোহিতসাগর চন্দননগর দার্জিলিং দ্যুলোক-ভুলোককে একত্রে মিশিয়ে কাব্যিক ভাষায় বরিষণের দীর্ঘ বিবরণ দিচ্ছেন।
রবীন্দ্রনাথের কালো অক্ষরের আঁচড়ে এসেছে পদ্মার বর্ণনা, গড়াইয়ের রূপ। পদ্মাকে দেখে একসময়ে তার মনে হয়েছে, একটি পাণ্ডুবর্ণ ছিপছিপে মেয়ের মতো, নরম শাড়িটি তার গায়ের সংগে সংলগ্ন। সুন্দর ভঙ্গিতে সে চলে যাচ্ছে এবং তার শাড়িটি তার গতির সংগে বেঁকে যাচ্ছে।[] আবার এক সময় এই পদ্মাকেই তার মনে হয় উন্মাদিনীর মতো _খেপে নেচে সে বেরিয়ে যায়। কালীর মতোই সে যেন নৃত্য করে, ভাঙে এবং চুল এলিয়ে দিয়ে ছুটে চলে। ... নতুন বর্ষায় পদ্মার খুব ধার হয়েছে। ... তীব্র স্রোত যেন চকচকে খড়্গের মতো, পাতলা ইস্পাতের মতো একেবারে কেটে চলে যায়। প্রাচীন ব্রিটনদের যুদ্ধরথের চাকায় যেন কুঠার বাঁধা_দুই ধারের তীরে একেবারে অবহেলা ছারখার করে দিয়ে চলেছে।[] নদী একেবারে কানায় কানায় ভরে এসেছে। ও পারটা প্রায় দেখা যায় না। জল এক এক জায়গায় টগবগ করে ফুটছে, আবার এক এক জায়গায় কে যেন অস্থির জলকে দুই হাত দিয়ে চেপে চেপে সমান করে মেলে দিয়ে যাচ্ছে।[০]
রবীন্দ্রনাথ নদীর সাথে নিজেকে মিশিয়ে নেন, ভালোবাসেন তার রূপ। বাস্তবিক পদ্মাকে আমি বড় ভালোবাসি। ইন্দ্রের যেমন ঐরাবত আমার তেমনি পদ্মা_আমার যথার্থ বাহন; খুব বেশি পোষ-মানা নয়, কিছু বুনোরকম; কিন্তু ওর পিঠে এবং কাঁধে হাত বুলিয়ে ওকে আমার আদর করতে ইচ্ছে করে।[১১]
নদীর রূপ দেখে তিনি আঁকেন সেই ছবি যা কালের প্রবাহে গড়াই নদীকে বাঁচিয়ে রাখে না। বর্ষা ছাড়া বাংলাদেশের গড়াই আজ ২০০৮ সালে মরা খাল। চৈত্র মাসে এই নদীতে ২০০৮ সালে হাঁটু পানিও থাকে না। অথচ রবীন্দ্রনাথের লেখায় এখনো বেঁচে আছে গড়াই নদীর এক কোণে নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে জলিবোটের উপর বিছানা পেতে পড়ে থাকা, আছে গড়াই ব্রিজের নিচে স্রোতের আবর্তে পড়া কবিকে উদ্ধার করা মাঝি-মাল্লাদের সাঁতার, জড় পদার্থের ব্রিজের অবিচল মূর্তি।[১২]  
ছিন্নপত্রে রয়েছে অনেক নাম না জানা ছোট ছোট শাখানদী, উপনদী, খাল, বিল, ঝিলের বর্ণনা; রয়েছে ছোট খাট পাখির নাম যেমন পানকৌড়ি, হাঁস, মোরগ, কোকিল, চিল, মাছরাঙা; অনেক পশু যেমন গরু, বাছুর, ছাগল, শুয়োর, ব্যাঙ, ঝিঁঝিঁপোকা আর এসবের সাথেই আছে কৃষক, মাঝি, গ্রামের বধূ, ছোট ছেলেমেয়েদের খেলাধুলা, খেয়া নৌকায় চাষিদের পার হওয়া ও কচু পাতা মাথার উপর ধরে বৃষ্টির মধ্যে চাষিদের নিজেদের গন্তব্যে যাওয়ার মুহূর্ত। এইরকম ছবিময় বর্ণনার মধ্যেই রয়েছে ছোটখাট নিজস্ব মন্তব্য।
বাংলার আকাশে বর্ষাকালে ঝড় হয়, পদ্মার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে এবং চরাঞ্চলে ঝড় এসে উপস্থিত হয়; রবীন্দ্রনাথ সেই ঝড়ের বিবরণ দিতে গিয়ে লিখছেন;
ধুলোয় আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে গেল, এবং বাগানের যত শুকনো পাতা একত্র হয়ে লাটিমের মতো বাগানময় ঘুরে বেড়াতে লাগলো, যেন অরণ্যের যত প্রেতাত্মাগুলো হঠাত জেগে উঠে ভুতুড়ে নাচন নাচতে আরম্ভ করে দিলে[৩] বাঁশগাছগুলো হাউমাউ শব্দে একবার পূর্বে একবার পশ্চিমে লুটিয়ে পড়তে লাগলো, ঝড় যেন সোঁ সোঁ করে সাপুড়ের মতো বাঁশি বাজাতে লাগলো। আর জলের ঢেউগুলো তিনলক্ষ সাপের ফনা তুলে তালে তালে নৃত্য আরম্ভ করে দিলে। ... ঝড়ের সে শব্দ আর থামে না_ আকাশের কোনখানে যে একটা আস্ত জগত ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।[৪]
রবীন্দ্রনাথের কলমে সন্ধ্যা এসেছে তার মায়াময় রূপ নিয়ে;
বহুদূর দিগন্তের শেষপ্রান্তে নীলাভ আলোতে মিশে সন্ধ্যা তার রাঙা আঁচলটি শিথিলভাবে এলিয়ে দেয়, নিভৃত নির্জনতার মধ্যে সিঁদুর পরে বধূর মতো প্রতীক্ষায় বসে থাকে, গুনগুন করে স্বপ্ন রচনা করে;”[৫] সন্ধ্যায় গাছপালা কুটির সমস্ত একাকার হয়ে একটা ঝাপসা ছেলেবেলাকার রূপকথার জগত তৈরি করে। নদীর ধারে পশ্চিমে সোনালী সূর্যাস্ত আর পূবদিকে রূপের রূপার চন্দ্রোদয়।[৬]
চাঁদ এসেছে কবির কাছে প্রেমিকার মতো বা রাধার অভিসারের মতো, তারারা এসেছে জ্বালাময় স্নিগ্ধ বেদনার মতো। কবি পরাবাস্তববাদী ভাবনায় দেখছেন, উদাসীন চাঁদের উদয় হচ্ছে অথচ রাজা রাজকন্যা পাত্র মিত্র স্বর্ণপুরী কিছুই নেই, কেবল সেই গল্পের তেপান্তরের মাঠ ও সাত সমুদ্র তের নদী ম্লান জ্যোস্নায় ধু ধু করছে।[৭]
সব মিলিয়ে প্রকৃতির বর্ণনায় মুখরিত ছিন্নপত্র। বর্ণনার আলোকচ্ছটায় ফুটে উঠেছে জলের শব্দ, রোদ্দুরের দিন, বালির চর, ছোট ছোট বনঝাউগাছ, দুপুর বেলাকার নিস্তব্ধতার ঝাঁ ঝাঁ, মশার ঝাঁক, নালবনের মধ্যে সাদা সাদা নালফুল, বড় বড় ঘাস, ভরা ভাদরে ভরা নদী, জলে শ্যাওলা ভাসছে, মাঝে মাঝে প্যাঁকের মধ্যে ধানের গাছ, পচা পচা পাটের গন্ধ, অনন্ত কোটি জ্যোতিষ্ক, বসন্তের বাতাস ইত্যাদি হাজারো রকম প্রকৃতির অবারিত বস্তু ও তাদের জীবন্ত উপস্থিতি। 
প্রকৃতির মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষ; অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নাম উল্লেখহীন রবীন্দ্রনাথের পরিচিত-অপরিচিত মানুষ, কিন্তু সেইসব মানুষের পরিপূর্ণ পরিচয় আমরা কখনোই পাই না; কিছু পরিচয় তিনি ইচ্ছে করেই দেন না। রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনটিই দেখেন, কিন্তু তাদের উপরে হাজার বছর ধরে চলে আসা শোষণটি ও তার কারণটিকে দেখেন না; বেশিরভাগ সময় সাধারণ মানুষদের জীবনটি দেখেন কল্পনার রঙে রঙিন করে। ফলে চাষাদের ও গ্রাম্য মেয়ে কূলবধূদের যে বর্ণনা দেন তা হয়ে দাঁড়ায় এক রোম্যান্টিক কবির কল্পনার আতিশয্যে ভরপুর চমকার শব্দে সাজানো চমকার বর্ণনা। কিন্তু এর গভীরে যে অনাহার, কষ্ট, যাতনা, শোষণ তা ফুটে উঠে না; ফলে অন্ধকারে বরকন্দাজের ডাক শোনা যায়, বেহারা বিজাতীয় ভাষা বোঝা যায় না, যাদের ঘাড়ে চেপে তিনি চলেছেন তাদের বাড়ি ঘর জন্ম কোথায় তা জানার প্রয়োজনও তিনি বোধ করেন না।
তিনি দেখেন ছোকরা মাঝি ডিঙ্গিতে গান গাইছে, তিনিও তার গান শুনে গোটা পৃথিবী দেখতে চান। আবার যখন অনেকগুলো ছোকরা ঝপঝপ শব্দে দোলে এবং সেই তালে গান গায়, যোবতি, ক্যান কর মন ভারি/ পাবনা থ্যাকে এনে দেব ট্যাকা দামের মোটরি তখন এই গান শুনে কবির লজ্জা লাগে। তিনি ভাবেন এ অঞ্চলের মানুষ বেশ সুখে আছে। হয়তোবা সেই সুখ ছিলোও কারণ শত অভাবেও মানুষ গান গায়, কারণ গানই অভাবি মানুষের জীবন।
ছিন্নপত্রে আছে নারী, বিশেষভাবে তিনি যাদেরকে বলছেন মেয়ে, যারা কাপড় কাচছে, জল তুলছে, স্নান করছে এবং উচ্চস্বরে বাঙাল ভাষায় হাস্যালাপ করছে, যারা অল্পবয়সি মেয়ে তাদের জলক্রীড়া আর শেষ হয় না।.... পুরুষরা গম্ভীরভাবে এসে গোটাকতক ডুব মেরে তাদের নিত্যকর্ম সেরে চলে যায়; কিন্তু কবির কল্পনা লাগাম ছাড়িয়ে বর্ণনা করে চলে,
মেয়েদের যেন জলের সংগে বেশি ভাব, পরস্পরের যেন একটা সাদৃশ্য ও সখিত্ব আছে
৫৯ নং চিঠি থেকে জানা যায় পোস্টমাস্টার গল্প লেখার পটভূমি। সাজাদপুরের কুঠিবাড়ির একতলাতে একটা পোস্ট অফিস ছিলো, সেই অফিসে তিনি এক পোস্টমাস্টারকে প্রতিদিন দেখতেন এবং তখনই একদিন দুপুরবেলায় তিনি পোস্টমাস্টার গল্পটি লিখেছিলেন।
এক এক সময় এক একটি সরল ভক্ত বৃদ্ধ প্রজা আসে, তাদের অকৃত্রিম ভক্তিতে রবীন্দ্রনাথ অভিভূত হয়ে পড়েন। তিনি দেখেন এই জীর্ণ শীর্ণ কুঞ্চিত বলিত বৃদ্ধ দেহখানির মধ্যে একটি শুভ্র সরল কোমল মন রয়েছে; তিনি তুলনা করেন শিশুদের মনে কেবল সরলতা আছে, কিন্তু এমন স্থির বিশ্বাসপূর্ণ একাগ্রনিষ্ঠতা নেই। তিনি দেখেন জনপদবধূরা তাঁর সামনে ভিড় করে দাঁড়িয়েছে; এক বালিকাবধূ শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে তাকে বিদায় দিতে এবং অনেকগুলো কচি ছেলে, অনেকগুলো ঘোমটা, ও অনেকগুলো পাকাচুল এই উপলক্ষে একত্রিত হয়েছে। কবি শুধু ঘোমটা ও পাকাচুল দেখেন, তারাও যে আর দশজন নারী ও মানুষ_সেকথা উল্লেখ করেন না, কারণ তারা হয়তো ইংরেজ-সাহেব-মেম বা তাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেউ নন। দশ বছর সময়ের ভেতরে লেখা ছিন্নপত্রে ইংরেজ সাহেব-মেমরা চা-বিস্কুট কান্ট্রি সুইটস ভালোবাসে এ খবর পাই; কিন্তু গ্রামের কৃষকেরা কে কী খায়, কবার খায়, কোন বছর বন্যা বা খরা হলও, কোন বার ফসল ভালো হলও সে খবর পাই না। আমরা খবর পাই না বাঙালি কৃষকেরা কী কারণে এতো রাজভক্ত, কী কারণে কৃষক-প্রজারা অনেক দুঃখ ধৈর্য্য সহকারে সহ্য করে, কিন্তু এদের ভালোবাসা কোনো কিছুতেই ম্লান হয় না। এরকম কৃষকদের সরলতা তিনি দেখছেন, সেইসাথে পূর্ববঙ্গে এসে তিনি সমাজ ও অভাব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিলেন। যেমন তিনি এক চিঠিতে লিখেছেন,
আমার এই দরিদ্র চাষি প্রজাগুলোকে দেখলে আমার ভারি মায়া করে, এরা যেন বিধাতার শিশু সন্তানের মতো নিরুপায়। সোসিয়ালিস্টরা যে সমস্ত পৃথিবীময় ধনবিভাগ করে দেয় সেটা সম্ভব কি অসম্ভব জানি নে_যদি একেবারেই অসম্ভব হয় তবে বিধির বিধান বড়ো নিষ্ঠুর, মানুষ ভারি হতভাগ্য।[৮]
যদিও সেই সময়ে তাঁর প্রবন্ধ ক্যাথলিক সোসিয়ালিজম এবং সোসিয়ালিজম প্রবন্ধ দুটিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। আর বছর দশেক পরেই রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় আমরা বড় পরিবর্তন দেখবো এবং বুঝবো যে তিনি কৃষকের দারিদ্র সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন হয়ে উঠেছেন।
প্যারিসের জটিল সভ্যতার সংগে কালিগ্রামের সরল চাষী প্রজাদের সরলতার তিনি তুলনামূলক আলোচনা করেছেন; সিদ্ধান্ত দিয়েছেন সরলতাই মানুষের স্বাস্থ্যের একমাত্র উপায়, সে যেন গঙ্গার মতো, তার মধ্যে স্নান করে সংসারের অনেক তাপ দূর হয়ে যায়; অথচ ইউরোপ সমস্ত তাপকে লালন করে নিজেকে রাত দিন উত্তেজিত করে তুলছে। কবি বলেছেন যতক্ষণ না সভ্যতার মাঝখানে এই স্বচ্ছ সরলতার প্রতিষ্ঠা হয় ততক্ষণ সভ্যতা কখনোই সম্পূর্ণ ও সুন্দর হবে না। শুনতে চমকার হলেও কী পথে এই সরলতার বিজয় হবে তা তিনি বলেন না।
তিনি নিজে বাঙালি। রুদ্ধ জীবনে ঘরের কোণে বসে খুঁত খুঁত করবেন, বিচার তর্ক করবেন কিন্তু আরব বেদুইনদের মতো জীবনকে উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খলভাবে ছেড়ে দিতে পারবেন না, তদুপরি উদ্দাম উচ্ছৃঙ্খল জীবন তাকে টানে। তেমনি তিনি কবিতায় স্বাচ্ছন্দবোধ করেন, একটি কবিতা লিখে আনন্দ পান, হাজার গদ্য লিখেও তার তেমন আনন্দ হয় না তা তিনি আমাদের জানিয়ে দেন। তিনি কবিতা সম্পর্কে মন্তব্য করেন যে কবিতায় মনের ভাব সম্পন্নতা লাভ করে কিন্তু গদ্য একবস্তা আলগা জিনিস, এক জায়গা ধরলে সমস্তটি উঠে আসে না।
শহর ও গ্রামের তুলনামূলক আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ আমাদের জানান শহরে মনুষ্য সমাজ অত্যন্ত প্রধান, সেখানে নিজের সুখ-দুঃখ নিয়েই মানুষ ব্যস্ত, অন্য প্রাণির সুখ-দুঃখ গণনার মধ্যেই আনে না; আবার ইউরোপের মানুষের জীবন এতো জটিল যে তারা জন্তুকে কেবল জন্তু মনে করে; অন্যদিকে ভারতীয়রা মানুষ থেকে জন্তু এবং জন্তু থেকে মানুষ হওয়াটাকে কিছুই মনে করে না; কবিও তখন সর্বগ্রাসী রহস্যময়ি প্রকৃতির কাছে নিজের সংগে অন্য জীবের প্রভেদ দেখেন না। কখনো তিনি নিজেকে দেখেন সজীব পিয়ানো যন্ত্রের মতো; ভেতরে অন্ধকারের মধ্যে অনেকগুলো তার এবং কলবল আছে, কখন কে এসে তাকে বাজায় তিনি জানেন না, কেন বাজে তাও বোঝা শক্ত; কেবল তালে না বেতালে, সুখ না ব্যথা, কোমল না কড়া বাজে সেইটাই তিনি জানতে পারেন।
ছিন্নপত্রে আছে জীবন, আছে জীবনের প্রবাহ। সেই জীবনের সামাজিক-নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নাই থাকুক, নাই থাকুক সব শ্রেণির সব পেশার মানুষের জীবন ও তাদের কর্মচাঞ্চল্য; কিন্তু আছে রবীন্দ্রনাথের মনের প্রাণচাঞ্চল্য, আছে বাংলাদেশের প্রকৃতির সংগে তার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। মাঠ ঘাট জল নদী চাঁদ সূর্য সবই যেন বাংলার বাঙালির; সমস্ত প্রকৃতিই ধরা দিয়েছে তাঁর ছিন্নপত্রে যে পত্র ফুটিয়ে তুলেছে জন্মভূমিকে অবিস্মরণীয় মর্যাদায়, ফুটিয়ে তুলেছে এক তরুণ মনের কল্পনার রঙিন তুলিতে। যিনি জীবনের প্রথম পর্বে পূর্ববঙ্গে এসে দেখছেন বাংলাদেশের প্রকৃতি আর চিঠির প্রতিটি লাইনের প্রতিটি শব্দ-উপমা-রূপকে তা জমিয়ে রাখছেন। সেই বাংলাদেশের প্রকৃতি বদলে গেছে, হারিয়ে গেছে বহু আগেই, কিন্তু এখনো আছে ছিন্নপত্র।    
কটকে থাকাকালিন ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩ তে কবি একটি চিঠি লেখেন যেখানে মহামানুষের জন্য তার হাহাকার প্রকাশ পেয়েছে। তিনি লিখেছেন যে দশ-বিশ ক্রোশের মধ্যে কথা বলে প্রাণ সঞ্চয় করা যায় এমন একজন লোকও পাওয়া যায় না। সমস্ত মানুষগুলো যেন উপছায়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। খাচ্ছে-দাচ্ছে, আপিস যাচ্ছে, ঘুমুচ্ছে, তামাক টানছে আর নিতান্ত নির্বোধের মত বকর বকর করছে। ঠিক যেন অবিকল ২০০৮ সালের বাংলাদেশের সব শহরের চিত্র।

তথ্যসূত্রঃ
১. গোলাম মুরশিদ; রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা; বাংলা একাডেমি, ঢাকা; প্রথম পুনর্মুদ্রণ, মার্চ, ১৯৯৩; পৃষ্ঠা-৩৮।
২. পত্র সংখ্যা ৫৮, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।   
৩. পত্র সংখ্যা ১০৫, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৪. পত্র সংখ্যা ১১, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৫. পত্র সংখ্যা ..., ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৬. পত্র সংখ্যা ..., ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৭. পত্র সংখ্যা ৫৫, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৮. পত্র সংখ্যা ৯৩, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
৯. পত্র সংখ্যা ৬৮, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১০. পত্র সংখ্যা ১৪১, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১১. পত্র সংখ্যা ৯৩, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১২.
১৩. ৪৭ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১৪. ২৪ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১৫. ১৪ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১৬. ১৩ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১৭. ১১৬ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।
১৮. ৮১ নং পত্র, ছিন্নপত্র, রবীন্দ্র রচনাবলী।

No comments:

Post a Comment