Monday, January 21, 2013

সাম্যের লেনিন, শ্রমিকের লেনিন, লেনিনময় পৃথিবী








লেনিন ও শ্রেণিবিলুপ্তি

১৯১৭ সালের মহান রুশ বিপ্লবের মহানায়ক কমরেড লেনিনের জন্মঃ ২২ এপ্রিল, ১৮৭০ এবং মৃত্যুঃ ২১ জানুয়ারি, ১৯২৪ সালে লেনিনহীন পৃথিবী বৈষম্যে ভরা, আর লেনিন পরবর্তী পৃথিবী সাম্যের সূতিকাগারসাম্যের স্বপ্নহীন মানুষ পশুরও অধমআর এই পশুর রাজত্ব শুরু হয়েছিলো ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা উদ্ভবের পর থেকেইমানুষের সৃষ্ট এই বৈষম্যকে দূর করার জন্য লেনিন মার্কস-এংগেলসের দেখানো পথে রাশিয়ায় বিপ্লব করেছিলেন যা ছিলো দুনিয়ার প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবতিনি মার্কসবাদের বিপ্লবী সারবস্তু যথা- শ্রেণিসংগ্রাম, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ও প্রলেতারীয় একনায়কত্বের মতাবাদকে আঁকড়ে ধরে বিপ্লব সফল করেছিলেনতিনি রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে লিখেছেন, শুধু সেই মার্কসবাদী যে শ্রেণিসংগ্রামের স্বীকৃতিকে প্রসারিত করে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের স্বীকৃতিতে
লেনিনবাদ: লেনিনের সৃষ্ট চিন্তাধারা একত্রে লেনিনবাদ নামে পরিচিতলেনিনবাদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে জে ভি স্তালিন বলেছেন,
লেনিনবাদ হলো সাম্রাজ্যবাদ এবং শ্রমিক-বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদআরো সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, লেনিনবাদ হলো সাধারণভাবে শ্রমিক-বিপ্লবের মতবাদ ও রণকৌশল এবং বিশেষভাবে এ হলো শ্রমিক শ্রেণির একনায়কত্বের মতবাদ ও রণকৌশলবিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যখন জন্ম হয়নি, সর্বহারারা যখন বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, শ্রমিক-বিপ্লব যখন আশু এবং অবশ্যম্ভাবি হয়ে উঠেনি সেই প্রাক-বিপ্লব যুগে (আমরা এখানে শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবের কথাই বলছি) মার্কস আর এঙ্গেলস তাঁদের কার্যকলাপ চালাতেনআর মার্কস আর এঙ্গেলসের শিষ্য লেনিন তাঁর কাজ চালিয়েছেন বিকশিত সাম্রাজ্যবাদের যুগে, শ্রমিক-বিপ্লবের বিকাশের যুগে_ যখন শ্রমিক-বিপ্লব একটি দেশে ইতিমধ্যেই জয়যুক্ত হয়েছে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে চূর্ণ করে, শ্রমিক শ্রেণির গণতন্ত্রের সোভিয়েত তন্ত্রের যুগের সূত্রপাত করেছে
এই কারণেই লেনিনবাদ হলো মার্কসবাদের আরো বিকশিত রূপ”[১]   
স্তালিনের মতানুসারে মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান রয়েছে ছয়টি ক্ষেত্রেযে ছয়টি ক্ষেত্রে লেনিনের অবদান রয়েছে সেগুলো হলো পুঁজিবাদের নতুন পর্যায় হিসেবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের_ সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্ন, সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্বের প্রশ্ন, পুঁজিবাদী রাষ্ট্রসমূহ দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি দেশে সাফল্যের সাথে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলার রূপ ও পদ্ধতির প্রশ্ন, বিপ্লবে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বের প্রশ্ন, জাতীয় ও ঔপনিবেশিক প্রশ্ন এবং সবশেষে সর্বহারা শ্রেণির পার্টি সম্পর্কিত প্রশ্নে।[২]  
লেনিন ও শ্রেণি: তিনি  সকল সমস্যার মূল শ্রেণিবিভেদকে বিলুপ্ত করার মহান উদ্দেশ্যে লিখেছেন,
একথা পরিষ্কার যে শ্রেণির পূর্ণ বিলুপ্তির জন্য দরকার কেবল শোষক, জমিদার ও পুঁজিপতিদের উচ্ছেদ শুধু নয়, কেবল তাদের সম্পত্তি খারিজই নয়, আরো দরকার উতপাদন উপায়ের ওপর সর্ববিধ ব্যক্তিমালকানার উচ্ছেদ, যেমন শহর ও গ্রামের মধ্যে, তেমনি কায়িক শ্রমের লোক ও মানসিক শ্রমের লোকেদের মধ্যে সব কিছু পার্থক্যের বিলোপ[৩]
লেনিন ও নারিমুক্তি: লেনিন সেই মানুষ, যিনি নারীকে পণ্য করতে চাননি লেনিন সেই মানুষ, যে মানুষটি নারীকে মানুষ বলে ভেবেছেন, পুঁজিবাদীর শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে নারীকে অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখিয়েছেন লেনিন সেই মানুষ যিনি নারীকে রান্নাঘর ও আঁতুড়ঘর থেকে কারখানায় এনেছেন, মিছিলে এনেছেন, পাঠশালায় এনেছেন তিনি বলেছেন,
বুর্জোয়া গণতন্ত্র শুধু মুখে মুখেই সাম্য ও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়কাজের বেলায় একটি বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশে, এমন কি সবচেয়ে উন্নত দেশেও মানবজাতির অর্ধেক যে নারী সমাজ তাদের আইনত পুরুষের সমান অধিকার অথবা পুরুষদের শাসন ও দমন থেকে মুক্তি দেয়নি
বুর্জোয়া গণতন্ত্র শুধু জাঁকালো গালভরা কথার বড় বড় প্রতিশ্রুতির আর স্বাধীনতা ও সাম্যের নামে আড়ম্বর ভরা ধ্বনির গণতন্ত্রকিন্তু কাজের বেলায় এই গণতন্ত্র নারীদের স্বাধীনতাহীনতা ও নিকৃষ্ট অবস্থা, এবং শ্রমিক ও শোষিতের স্বাধীনতাহীনতা ও নিকৃষ্ট অবস্থাকে ঢাকা দিয়ে রাখে[]
লেনিনের বিশ্লেষণে বুর্জোয়া গণতন্ত্র: লেনিন পুঁজিবাদি সমাজের গণতান্ত্রিকতা ও সমাজতান্ত্রিক সমাজের গণতান্ত্রিকতা বিষয়ে পার্থক্যরেখা টেনেছেন রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে লিখেছেন,
পুঁজিবাদি সমাজে তার বিকাশের সর্বাধিক অনুকূল পরিস্থিতিতে আমরা পাই গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে ন্যূনাধিক পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিকতাকিন্তু এ গণতান্ত্রিকতা সর্বদাই পুঁজিবাদি শোষণের সংকীর্ণ গণ্ডিতে পিষ্ট, সংকুচিত এবং সেইহেতু সর্বদাই হয়ে থাকে কেবল অল্পাংশের জন্য, কেবল সম্পত্তিবান শ্রেণিগুলোর জন্য, কেবল ধনীদের জন্য গণতন্ত্রপুঁজিবাদি সমাজে স্বাধীনতা সর্বদাই থেকে যায় মোটামুটি প্রাচীন গ্রিক প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতার মতোঃ দাস-মালিকদের স্বাধীনতা[৫]
তিনি আরো বলেছেন,
মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার তুলনায়, বুর্জোয়া গণতন্ত্র যদিও এক বিরাট ঐতিহাসিক অগ্রগতির পরিচায়ক, তথাপি সে-গণতন্ত্র সব সময়ই হলো সীমাবদ্ধ, খণ্ডিত, মিথ্যাচারী ও ভণ্ডামিপূর্ণ, ধনীদের জন্য স্বর্গ আর শোষিত ও দরিদ্রদের কাছে এক ফাঁদ ও প্রতারণা, আর পুঁজিবাদের আওতায় সেটা তাই হতে বাধ্য।[৬]   
লেনিন ও সংস্কৃতি: মহামতি লেনিন শ্রমিকের সংস্কৃতিকে এক মহান সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন,
মানবজাতির সমগ্র বিকাশের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট সংস্কৃতির যথাযথ জ্ঞান লাভ করেই এবং সে সংস্কৃতিকে ঢেলে সাজিয়েই কেবল আমরা প্রলেতারীয় সংস্কৃতি গড়তে পারি।... ... 
পুঁজিবাদি সমাজ, জমিদারি সমাজ, আমলাতন্ত্রি সমাজের জোয়ালের নিচে মানব জাতি যে জ্ঞানভাণ্ডার জমিয়েছে, প্রলেতারীয় সংস্কৃতিকে হতে হবে তারই সুনিয়মিত বিকাশ[৭]  
লেনিন জন্মেছিলেন পৃথিবীর বুকে এক মহাস্বপ্নের কাণ্ডারি হয়ে যিনি শ্রমিক-কৃষককে জাগিয়ে তুলেছিলেন হাজার বছরের দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে মহামানবের মর্যাদায়কৈশোরে তিনি জারের পুলিসকে বলেছিলেন_ এ দেয়াল ভাঙবে, যৌবনে সহকর্মীকে বলেছিলেন_ সাইবেরিয়া বদলাবে, প্রোঢ় বয়সে ওয়েলসকে বলেছিলেন_ রুশদেশের অন্ধকার গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের বাতি জ্বলবে, মৃত্যুর আগে দেশবাসীদের বলেছিলেন_ শিশু সোভিয়েতকে রক্ষা করো ... দুনিয়া পালটে যাবে
লেনিনের জীবন: লেনিনের বিপ্লবী কার্যকলাপের জন্য লেনিনকে স্বৈরাচারী জার নির্যাতনে পিছপা হয়নি। ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাইবেরিয়ায় তিন বছরের নির্বাসন দণ্ডাজ্ঞা জানানো হলও লেনিনকেনির্বাসনে পাঠালো জার সরকার। ১৮৯৭ সালের মে মাসে লেনিন তাঁর নির্ধারিত নির্বাসনস্থল ইয়েনিসেই গুবের্নিয়ার মিনুসিনস্ক এলাকার শুশেনস্কয় গ্রামে পৌঁছলেন। গ্রামটা ছিল রেল লাইন থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে এক অজ সাইবেরীয় গ্রাম । এখানে থাকা লেনিনের পক্ষে সহজ ছিল না। বোনের কাছে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন – নির্বাসনের প্রথম দিকটায় ইউরোপের মানচিত্রটা পর্যন্ত ছোঁব না ঠিক করি। মানচিত্র টা খুলে তার কালো কালো বিন্দুগুলো দেখতে ভারি কষ্ট হতো।কিন্তু প্রত্যক্ষ বিপ্লবী কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেও তিনি তাঁর উদ্যম- প্রাণোচ্ছলতা হারাননিওই সময় প্রচুর পড়াশুনা করেন - কৃষকদের অবস্থা মন দিয়ে দেখতেন - গ্রামের জীবনযাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন তখন। আশেপাশের লোকেরা বিভিন্ন অসুবিধায় প্রায়ই সময় লেনিনের কাছে আসসাহায্যের আশায়। যেমন লেনিন একবার স্বর্ণখনিওয়ালার বিরুদ্ধে এক মজুরকে মামলায় জিততে সাহায্য করেন । প্রায় ২৫ বছর পর ভ্লাদিমির সেই কথা স্মরণ করে বলেছিলেন – যখন আমি সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত ছিলাম, তখন আমাকে উকিল হতে হয়েছিল। অবশ্য আন্ডারগ্রাউন্ড উকিল, কেননা আমি ছিলাম প্রশাসনিক ভাবে নির্বাসিত, তাতে ওকালতি নিষিদ্ধ, কিন্তু আর কেউ না থাকায় আমার কাছেই লোকে এসে কিছু কিছু মামলা - মোকদ্দমার কথা বলত।”[৮]
লেনিনের সব স্বপ্নই পূরণ হচ্ছে, লেনিনের সব আশা আবার পৃথিবীতে ঝলকে উঠছে, লেনিনের সব আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে যাচ্ছে মহাবিশ্বের দশ দিকে; এ পৃথিবী ক্রমাগত লেনিন হচ্ছেলেনিনবাদ বেঁচে থাকুক; লেনিন বেঁচে থাকুন মহাবিশ্বের সর্বত্র  

তথ্যসূত্রঃ
১. জে ভি স্তালিন, লেনিন স্মরণে প্রবিষ্ট ছাত্রদের প্রতি উৎসর্গীকৃত, লেনিনবাদের ভিত্তি ও সমস্যা; এপ্রিল, ১৯২৪
২. এ বিষয়ে দেখুন, জে ভি স্তালিন, মার্কসবাদী তত্ত্বের বিকাশে লেনিনের সৃজনশীল অবদান, সেপ্টেম্বর, ১৯২৭
৩. ভ. ই. লেনিন, রচনা সংকলন, তৃতীয় ভাগ (চার ভাগে সম্পূর্ণ), প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, পৃষ্ঠা_১৯০-১৯১  
৪. ভ. ই. লেনিন, নারীমুক্তি, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; তারিখহীন, পৃষ্ঠা, ৮৭
৫. ভ. ই. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; তারিখহীন, পৃষ্ঠা, ৮৬
৬. ভ. ই. লেনিন, সর্বহারা বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউতস্কী।
৭. ভ. ই. লেনিন, যুব লীগের কর্তব্য।  
৮. গ. দ. অবিচকিন ও অন্যান্য, ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭১; পৃষ্ঠা-৩৭-৩৮।

1 comment:

  1. লেনিন পরবর্তী পুঁজির যে পরিবর্তন সেই জন্য যে নতুন তাত্ত্বিক বিশ্লেষনের প্রয়োজন আমার মনে হয় সেটা এখনও হয় নি। লেনিন পর্যন্ত যে কংক্রিট যৌক্তিক ভিত্তি ছিল পুঁজির চরিত্র বোঝার জন্য সেই পরিস্থিত কিন্তু এখন আর নাই। কারন পুঁজি তার চরিত্র প্রতিদিন পাল্টাচ্ছে।

    ReplyDelete

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের

Recommended