Thursday, January 24, 2013

মতান্ধতাবাদ কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে







মতান্ধতাবাদ বা dogmatism হচ্ছে অধিবিদ্যাগতভাবে একপেশে, ছকে-বাঁধা শিলীভূত চিন্তা, যা কাজ করে অন্ধ মতগুলি নিয়ে। মতান্ধতার ভিত্তি হলো কোনো কর্তৃতবক্ষমতায় অন্ধ বিশ্বাস এবং অচল-সেকেলে প্রতিজ্ঞাগুলি সমর্থন, সাধারণত ধর্মীয় চিন্তায় চিহ্নিত শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে মতান্ধতার ফলে দেখা দেয় মার্কসবাদের বিকৃতিসাধন, দক্ষিণপন্থি বামপন্থি সুবিধাবাদ, সংকীর্ণতাবাদ রাজনৈতিক হঠকারিতা। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ মতান্ধতার মোকাবিলা করে তত্ত্বের সৃষ্টিশীল বিকাশ মূর্ত সত্যের দ্বান্দ্বিক নীতি নিয়ে।[১] মতান্ধতাবাদকে বাংলা ভাষায় গোড়ামিবাদও বলা হয়।

মতান্ধতাবাদিরা অনুশীলনকে ছোটো করে দেখে এবং যে কোনো মতবাদ বা আদর্শকে আপ্তবাক্য হিসেবে দেখাতে চায়ফলে তারা একপেশে অচল, স্থিচিন্তা দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে পড়েতারা শুরু করে তত্ত্বকথা দিয়ে এবং শেষও করে তত্ত্বকথা দিয়েকিন্তু একজন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদির কাছে অনুশীলন হচ্ছে প্রাথমিক স্থানে এবং তত্ত্ব পরের স্থানেঅর্থা অনুশীলন থেকেই আসে তত্ত্ব বা জ্ঞান এবং সমস্ত জ্ঞানই অনুশীলনের জন্

অনাপেক্ষিক আপেক্ষিক সত্যের দ্বান্দ্বিকতা সম্বন্ধে ভুল ধারনা থেকে মতান্ধতাবাদের উদ্ভবমতান্ধতাবাদ অবধারণা বা Cognition-এর অনাপেক্ষিক উপাদানটিকে অতিরঞ্জিত করে এবং তার আপেক্ষিক চরিত্রকে অস্বীকার করে অর্থা মতান্ধতার বৈশিষ্ট্য হল সত্য সম্বন্ধে একটা একপক্ষীয় মনোভাব। জীবন কর্মপ্রয়োগের সংগে সংস্পর্শহীন হওয়ায় মতান্ধতাবাদিরা কাজ করে স্থির, নিশ্চল, ধ্রুব ধারণা আর সূত্র নিয়ে, সেগুলোকে প্রয়োগ করে এমন সব ব্যাপার ঘটনার ক্ষেত্রে যেখানে সেগুলো প্রয়োগ করা চলে নামতান্ধতাবাদ প্রকাশ পায় যান্ত্রিকভাবে মুখস্ত করা প্রতিজ্ঞা, একগুঁয়ে মনোভাব আমলাতান্ত্রিক কর্মপ্রক্রিয়ার বারংবার পুনরাবৃত্তির মধ্যেঅর্থা জ্ঞান বা তত্ত্বের কোনো কোনো প্রতিজ্ঞা, সিদ্ধান্ত বা সূত্রকে সেই প্রতিজ্ঞা, সিদ্ধান্ত বা সূত্রের মূর্ত-নির্দিষ্ট অবস্থা, স্থান কালের প্রেক্ষিতের বাইরে বিবেচনা করা থেকে মতান্ধতাবাদ জন্ম নেয়মতান্ধতাবাদিরা বিজ্ঞান ও কর্মপ্রয়োগের প্রয়োজন-নির্বিশেষে অপরিবর্তনীয় ধারনাকে সূত্রাকারে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।
মতান্ধতাবাদিরা একটি দেশের একটি নির্দিষ্ট সময়ের সেই অবস্থার জন্য কোনো মত বা তত্ত্বকে উপযোগি কি অনুপযোগি তা বিবেচনা না করেই সেই পুরোনো মতের পক্ষে কাজে নেমে পড়েঅর্থা মতান্ধতাবাদিদের চিন্তা পরিবর্তনশীল বাস্তব পরিস্থিতির সংগে এগিয়ে যেতে পারে না এবং তাদের চিন্তাধারা সামাজিক অনুশীলন থেকে বিচ্ছিন্নঅনুশীলন জ্ঞানের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, করা জানার মধ্যে বিচ্ছিন্নতা, বাস্তব অবস্থা আত্মগত বিচ্ছিন্নতা থেকে আসে ভাববাদ যান্ত্রিক বস্তুবাদ এবং সুবিধাবাদ হঠকারিতা।[২]  

মাও সেতুং আরো বলেছেন,
মতান্ধতাবাদ সংশোধনবাদ উভয়ই মার্কসবাদের পরিপন্থীমার্কসবাদ অবশ্যই এগিয়ে যাবে, অনুশীলনের বিকাশের সংগে সংগে অবশ্যই বিকাশ লাভ করবে, এটা অচল থাকতে পারে নানিশ্চল অপরিবর্তিত থাকলে এটা হয়ে পড়বে প্রাণহীন কিন্তু মার্কসবাদের মৌলিক নীতিকে অবশ্যই লঙ্ঘন করা চলবে না, অন্যথায়, ভুল করা হবে আধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ দিয়ে মার্কসবাদকে দেখা এবং এটাকে অনড়-অটল কিছু একটা বলে ভাবাই হচ্ছে মতান্ধতাবাদ।[৩]  

মতান্ধতাবাদকে প্রতিরোধ করতে হবে ভাববাদ যান্ত্রিক বস্তুবাদ এবং সুবিধাবাদ হঠকারিতার কানাগলি থেকে বিপ্লবকে এগিয়ে নেয়া এবং বিপ্লবী তত্ত্বের সৃজনশীল বিকাশের জন্য

তথ্যসূত্রঃ
১. ভাসিলি ক্রাপিভিন; দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ কী; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৮৯; পৃষ্ঠা ৩৫২।
২. মাও সেতুং, দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে, নির্বাচিত রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, চলন্তিকা বইঘর, ঢাকা, পৃষ্ঠা ৩০২।
. মাও সেতুং, প্রচারকার্য সম্পর্কে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ, ১২ মার্চ, ১৯৫৭

No comments:

Post a Comment