Sunday, February 17, 2013

সংশোধনবাদ কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে






Revisionism বা সংশোধনবাদ বা শোধনবাদ বলতে বুঝতে হবে কোনো মতাদর্শকে বা তত্ত্বকে বিজ্ঞানের মতো অনুধাবন ও অনুশীলন না করে তাকে স্বতন্ত্রভাবে পুনঃপরীক্ষা করা। সংশোধনবাদ হলো মার্কসবাদের সংশোধিত তত্ত্ব। অর্থা সংশোধনবাদ হলও মার্কসবাদের পরিপূর্ণভাবে বিকৃতি, এটি প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক সংগ্রাম বিরোধি, শ্রেণিসংগ্রাম বিরোধি, বুর্জোয়া শ্রেণির দলগুলোর বিপরীতে শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব দল গঠন বিরোধি, শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিকতা বিরোধী তথা বিপ্লব বিরোধী তত্ত্ব। সংশোধনবাদ হলও বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের তত্ত্ব ও প্রয়োগ বিরোধি এক মতবাদ।  
সংশোধনবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধারার একটা স্বাভাবিক পরিণতি হলও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চুড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি তার উদাসীন মনোভাবঅনেকগুলো প্রবন্ধ লেখার চেয়েও সংশোধনবাদের সারমর্ম প্রকাশিত হয় যে কথাটি দ্বারা সেটি হচ্ছে আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়অর্থা সংশোধনবাদে আন্দোলনের উপর অতিমাত্রায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়
লেনিন বলেছেন,
উপলক্ষে উপলক্ষে নিজের আচরণ বদলানো, দৈনন্দিন ঘটনাবলির সংগে এবং সংকীর্ণ রাজনীতির ক্রমাগত পরিবর্তনশীলতার সংগে নিজেকে খাপ খাওয়ানো, প্রলেতারিয়েতের মুল স্বার্থগুলি এবং সমগ্র পুঁজিবাদি ব্যবস্থার, সমস্ত পুঁজিবাদি বিবর্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিস্মৃত হওয়া, ক্ষণিকের বাস্তবিক কিংবা কল্পিত সুবিধার খাতিরে মুল স্বার্থ বলি দেওয়া_এইই হলও সংশোধনবাদের কর্মনীতি।[১]
রাজনীতির ক্ষেত্রে সংশোধনবাদ নানাভাবে মার্কসবাদের বুনিয়াদটিকে এবং শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদটিকে রূপান্তরের চেষ্টা করেসংশোধনবাদ বারবার শোনায় যে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ইত্যাদির মাধ্যমে বুর্জোয়ারা শ্রেণিসংগ্রামের প্রয়োজনীয়তাটাকে কমিয়ে ফেলেছে এবং রাষ্ট্রকে এখন আর শ্রেণিগত শাসনের যন্ত্র মনে করার কারণ নেইসংশোধনবাদিরা আরো বলে সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছার মূল্য দেবার কারণে এখন শ্রমিকের স্বাধীনতা অনেক বেশি এবং তাদের শ্রেণিসংগ্রাম ও সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই
সংশোধনবাদ শ্রমিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক ভাবাদর্শীয় রাজনৈতিক ধারা, যা নবায়ন, পুনর্বিচার বা সংশোধনের নামে মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের মতবাদকে পরিপূর্ণভাবে বিকৃত করে, মার্কসীয় লেনিনীয় পার্টিগুলোর প্রতি শত্রুতার মনোভাব নেয়উনিশ শতকের নব্বই-এর দশকে সংশোধনবাদের উদ্ভব ঘটে
বিশ শতকের ষাটের দশকে মার্শাল টিটোর প্রতিনিধিত্বে আধুনিক সংশোধনবাদিরা সাম্রাজ্যবাদের চাহিদা পূরণের জন্য লেনিনের শিক্ষাবলীর সংশোধন হাজির করে যা আধুনিক সংশোধনবাদ নামে পরিচিত। এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি, ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিগুলোর প্রতিনিধিদের বৈঠকের ঘোষণায় সংশোধনবাদের উস সম্পর্কে দেয়া বক্তব্যের দিকে; সেখানে দেখানো হয়,
সংশোধনবাদের অভ্যন্তরীণ উস হচ্ছে বুর্জোয়া প্রভাবের অস্তিত্ব, আর এর বহিস্থ উস হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদি চাপের কাছে আত্মসমর্পণ।[২]
পুরাতন সংশোধনবাদ চেষ্টা করত মার্কসবাদকে অচল প্রমাণ করতে। আর আধুনিক সংশোধনবাদ চেষ্টা করে লেনিনবাদকে অচল প্রমাণ করতে। সেই মস্কো ঘোষণার বৈঠকে আরো বলা হয়েছিল,
আধুনিক সংশোধনবাদ চায় মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মহান শিক্ষাকে প্রলেপ দিয়ে ঢেকে দিতে, ঘোষণা করে যে তা হলো অচল এবং অভিযোগ করে যে সামাজিক প্রগতির জন্য তা স্বীয় তাপর্য হারিয়ে ফেলেছে। সংশোধনবাদিরা মার্কসবাদের বৈপ্লবিক আত্মাকে মেরে ফেলতে চায়, শ্রমিক শ্রেণির আর সাধারণভাবে মেহনতি জনগণের মধ্যে সমাজতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে চায়। [২]  
আধুনিক সংশোধনবাদের ডানপন্থি বামপন্থি বৈশিষ্ট্য হলও সমাজতন্ত্রের উপর আক্রমণ, সমাজতান্ত্রিক বিকাশের সাধারণ নিয়মাবলী অস্বীকার
ডানপন্থি সংশোধনবাদ বিপ্লবি প্রক্রিয়া ও সমাজতান্ত্রিক নির্মাণকার্য পরিচালনায় মার্কসবাদি লেনিনবাদি পার্টির নেতৃতের, মুক্তি আন্দোলনে শ্রমিক শ্রেণির প্রাধান্যের বিরোধি। বামপন্থি সংশোধনবাদ বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের তত্ত্ব ও প্রয়োগের উপর আক্রমণ চালায়, অতিবিপ্লবি বুলি দ্বারা প্রলেতারিয়েত আন্তর্জাতিকতাবাদ থেকে বিচ্যুতিকে ঢেকে রাখে।  
সংশোধনবাদ সম্পর্কে মাও সেতুং বলেছেন,
মার্কসবাদের মৌলিক নীতিকে অস্বীকার করা মার্কসবাদের সার্বিক সত্যকে অস্বীকার করাই হচ্ছে সংশোধনবাদসংশোধনবাদ হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণির চিন্তাধারাই একটা রূপসংশোধনবাদীরা সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের মধ্যকার পার্থক্য এবং সর্বহারা শ্রেণির একনায়কত্ব বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্বের মধ্যকার পার্থক্যকে মুছে দেয়তারা যার ওকালতি করে তা প্রকৃতপক্ষে সমাজতান্ত্রিক লাইন নয় বরং পুঁজিবাদের লাইন বর্তমান অবস্থায়, মতান্ধতাবাদের চেয়ে সংশোধনবাদই বেশি অনিষ্টকরমতাদর্শগত ফ্রন্টে আমাদের বর্তমানের একটা গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হচ্ছে সংশোধনবাদের সমালোচনা প্রসারিত করা[৩]


তথ্যসূত্রঃ
১. ভি.আই. লেনিন; মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ, মার্চ, ১৯০৮
২. সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহের কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কার্স পার্টিগুলোর প্রতিনিধিদের মস্কো বৈঠকের ঘোষণা, ১৯৫৭[লেনিনবাদ দীর্ঘজীবী হোক, ইন্টারন্যশ নাল পাবলিশার্স, পৃষ্ঠা ১২।  
. প্রচারকার্য সম্পর্কে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ, ১২ মার্চ, ১৯৫৭

No comments:

Post a Comment