Friday, May 17, 2013

গণতন্ত্র ও নীতিশাস্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক






গণতন্ত্রে ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত, ভালো-মন্দের বোধকে সমসাময়িক কালের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নবায়ন করে নিতে হয়। গণতন্ত্রে নীতিশাস্ত্রকে সময় পরিবর্তনের সাথে যুগোপযোগী করে নিতে হয়। বাংলা ভাষায় ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত ইত্যাদি শব্দ থাকলেও এসব কথা সম্পর্কে বিস্তারিত লিখিত আলোচনা নেই। আর নীতিবিদ্যা বা নীতিশাস্ত্র (ethics) বলে যে একটি বিষয় আছে সেই বিষয়টিকে এদেশে কোনো গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এদেশে নীতি-নৈতিকতা, নীতিশাস্ত্র, মূল্যবোধ ইত্যাদি বিষয়ের সাথে ধর্মপালন করাকে গুলিয়ে ফেলা হয়। এদেশের মানুষ নীতি ও মূল্যবোধ বলতে ধর্মগ্রন্থ অনুসারে নিয়মিত ধর্মপালন করাকেই বোঝে।

নীতিশাস্ত্র বা নীতিবিদ্যা মানব নৈতিকতার সাথে সম্পর্কিত প্রশ্ন যথা_ ভাল-মন্দ, সঠিক-বেঠিক, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায়ের ধারনাসমূহ সেসব সম্পর্কিত প্রশ্নসমূহের সমাধান চায়সমাজবদ্ধ জীব হিসাবে মানুষের আচরণের নৈতিকতার মূল্যায়ন করা নীতিশাস্ত্রের অনেক কাজের একটি 

কেমব্রিজ দর্শনের অভিধানে বর্ণনা করা হয়েছে যে নীতিশাস্ত্রকে সাধারণভাবে নৈতিকতার সাথে (Morality) আন্তঃপরিবর্তিত করে ব্যবহার করা হয়..... এবং মাঝেমাঝে এটিকে আরো সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করা হয় একটি বিশেষ ঐতিহ্য, দল বা ব্যক্তির নৈতিক বিধি বোঝাতে।[১]    

আমরা জানি, যুগ পরিবর্তনের সাথে সাথে সবকিছুই বদলে যায়। নতুন জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতির আবির্ভাবের ফলে মানুষের চিন্তাও বদলে যায়। ফলে পুরনো নীতি-নৈতিকতা দিয়ে নতুন সমাজব্যবস্থা চলে না। নতুন সমাজে নতুন নীতি প্রণয়ন করার দরকার পড়ে। রাষ্ট্রীয় আইনগুলো থেকে যায় অতীতের, কিন্তু সমাজ বদলে যায়। এই বদলে যাওয়া সমাজের জন্য দরকার পড়ে প্রগতিশীল আইন। কারণ অতীতের আইনগুলো রাষ্ট্রসম্মত হলেও তা ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিযুক্ত  বা মানবিক না হবার সম্ভাবনাই বেশি থাকে। সমাজ বদলে গেলে ন্যায়নীতি, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচারকে কেন্দ্র করে নতুন চিন্তা ও নতুন মূল্যবোধ দানা বাঁধতে থাকে; যার ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রীয় আইন ও নায্যতা সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন ও ধারনার জন্ম হয়। এই নতুন প্রশ্নটিই তোলে সমাজপ্রগতির পতাকার ধারক সমাজের নতুন শ্রেণিটি।

বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক নৈতিকতা নির্মিত হয়েছিল বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে সাংবিধানিক রূপ দিতে গিয়ে। সেই সংবিধানে সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বাকস্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, চিন্তার ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, চলাফেরা ও উপার্জনের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার পাবার স্বাধীনতার সাথে সাম্য, মৈত্রী, নাগরিকের সমান সুযোগ ও অধিকার এবং ধর্মের প্রতি আস্থা-অনাস্থার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে উনিশ শতকে মার্কস-এঙ্গেলস ও অন্যান্য শ্রেষ্ঠতম দার্শনিকদের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল সমাজতান্ত্রিক নৈতিকতা।    

সামন্তীয় ও বুর্জোয়া পুঁজিবাদী সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত নীতি দ্বারা বর্তমান বাংলাদেশের বেশিরভাগ কর্মকাণ্ড ও নিয়মবিধি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। দেশ পুঁজিবাদী হলেও দেশের সৃষ্টিশীল শ্রমিক-কৃষক অনেক এগিয়ে গেছে। আর পরগাছা পুঁজিপতি, আমলা, বুর্জোয়া রাজনীতিবিদেরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে জনগণকে শোষণ করছে। এ অবস্থায় দেশে স্থিতিশীল পরিবেশ বজায় রাখার জন্য শাসকগোষ্ঠী পুলিশ ও আমলাদের দিয়ে জনগণকে পীড়ন করছে। গণতান্ত্রিক মানুষ হিসেবে গণতান্ত্রিকদের প্রথম কাজ হচ্ছে শাসকগোষ্ঠীর নিপীড়ন দূর করার জন্য সামন্তীয় ও বুর্জোয়া সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত নিয়মকানুনকে বর্জন করা এবং নতুন নীতি-নৈতিকতা নির্মাণ করা। যারা গণতন্ত্র চায় তাদের জানা প্রয়োজন, দাস ও সামন্তীয় সংস্কৃতিতে কিছু কাজকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, কিছু কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সেসব পুরনো দাস ও সামন্তীয় যুগের ধর্মীয় বিধানের নৈতিক উপদেশ দিয়ে বর্তমানকালের জটিল অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, প্রযুক্তিবিদ্যা, বিবর্তনবিদ্যা, মানবিক আইন, জাতিয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং বর্তমানকালের উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, আগ্রাসন ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বর্তমান সমস্যাসমূহের সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। বর্তমানের জটিল পৃথিবীর নানা জটিল বিষয়কে যখন রক্ষণশীল গোষ্ঠী ব্যাখ্যা করতে পারে না তখন তারা সকল আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিপক্ষে দাঁড়ায়। রক্ষণশীল ধর্মীয় উপদেশ দিয়ে একুশ শতকের জীবন চলতে পারে না, চলছেও না। প্রতিটি নতুন যুগের মানুষকে নতুন নৈতিকতা তৈরি করে নিতে হয়। বাংলাদেশেও এখন নতুন নৈতিকতা ও নতুন নীতিশাস্ত্র সৃজন দরকার। নতুন নৈতিকতার রূপ কী হবে তা নির্ধারণ করা দরকার।[২]  

তথ্যসূত্র ও টীকাঃ
১. John Deigh in Robert Audi (ed), The Cambridge Dictionary of Philosophy, 1995.
২. নিবন্ধটি আমার সম্পাদিত বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গ্রন্থের বাঙালির অগণতান্ত্রিকতা প্রবন্ধের অংশবিশেষ। এখানে কিছুটা সম্পাদনা ও সংযোজন করা হয়েছে।

No comments:

Post a Comment