Saturday, June 29, 2013

সাঁওতাল বিদ্রোহ চলছে, গণমুক্তির লড়াই থামে নাই




সিধু কানহু


৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৫তম বার্ষিকী বা মহান সান্তাল হুলদিবস। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বিশেষ এবং উজ্জ্বলতম দিবস এই সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। সুদখোর মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ-অত্যাচার ও পুলিশ-দারোগার নির্যাতনে অতিষ্ঠ সাঁওতাল জনগণের মুক্তির পথ খুঁজতে ১৮৫৫ সালের এই দিনে সিধু মূরমূ এবং কানহু মূরমূ তাঁদের নিজ গ্রাম ভগনাডিহিতে এক গণসমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময় সুদখোর মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ ও ঠকবাজীতে সাঁওতাল জনগণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। মহাজনের ঋণ যতই ফের দিক, কখনও শোধ হতো না। বংশ পরম্পরায় পরিশোধ করতে হতো, ঋণ পরিশোধের নামে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে সারাজীবন গোলাম করে রাখা হতো। পুলিশের সহায়তায় তারা সাঁওতালদের গরু-ছাগল কেড়ে নিতো, জমি কেড়ে নিতো, প্রতিবাদ করলে গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখতো। ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রতিকার চাইলে উল্টো অত্যাচারের খড়গ নেমে আসতো।
সেসময় ভারতের ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকা দামিন-ই-কোহ্ বা পাহাড়ের ওড়নাএলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ৩০ জুন গণসমাবেশ আয়োজন প্রক্রিয়ার লড়াকু সৈনিক ছিলেন তাঁদের আপন দুই ভাই চাঁন্দ মূরমূ, ভায়রো মূরমূ এবং বিদ্রোহী-লড়াকু-প্রতিবাদী দুই বোন ফুলো মূরমূ এবং ঝানো মূরমূ। সিধু-কানহু, চান্দ-ভায়রো চার ভাই সাঁওতাল সমাজের ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে আম গাছের ডাল কাঁধে নিয়ে দামিন-ই-কোহ্ এলাকার চারশতাধিক সাঁওতাল গ্রামে গণসমাবেশের প্রচার করেন। ফলে দুর্গম গহীন বনাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও ৩০ হাজার, মতান্তরে ৫০ হাজারেরও অধিক, সাঁওতাল জমায়েত হয়েছিলেন। সেদিনের ঐতিহাসিক গণসমাবেশে সমবেত জনতার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিধু-কানহু তাঁদের আবাসভূমিকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। সমবেত জনতা রাজ্যের সকল দায়-দায়িত্ব সিধু-কানহুর ওপর অর্পণ করেন। তাঁরা সকল সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রিটিশরাজকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন, সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে তাঁরা রাজ্যের সকল দায়-দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
সেই ঐতিহাসিক গণসমাবেশের মাধ্যমে উত্থাপিত দাবিসমূহ বড় লাটকে জানানোর উদ্দেশ্যে হাজার হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ সিধু-কানহুর নেতৃত্বে কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে পারগানা সাম টুডু প্রেরিত সংবাদ আসে যে জঙ্গিপুরের মহেশ দারোগা এলাকার অত্যাচারি সুদখোর মহাজন কেনারাম ভগত এর সহযোগিতায় ৬/৭ জন সাঁওতাল সামাজিক নেতাকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে ভাগলপুরে নিয়ে যাচ্ছে। পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা ৭ জুলাই পাঁচকাঠিয়া নামক স্থানে মহেশ দারোগা গংদের পথ রোধ করে সাঁওতাল সামাজিক নেতাদের ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয়। এ সময় মহেশ দারোগা সিধু-কানহুকে আটক করতে উদ্যোত হলে সমবেত জনতা মহেশ দারোগা ও কেনারাম ভগতসহ তাদের দলের ১৯ জনকে সেখানেই হত্যা করে এবং হুল’, ‘হুল,’ ‘হুলে হুলস্লোগান দেয়। হুল শুরু হয়। গোটা সাঁওতাল এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়। বিদ্রোহী কণ্ঠে সাঁওতালরা শ্লোগান দেয়ঃ আবুদ শান্তি বোন খজোয়া; জমিবুন হাতা ওয়াঅর্থা জমি চাই, মুক্তি চাই
হুল শুরু হবার পর তীর ধনুকে সজ্জিত সাঁওতাল নারী-পুরুষ যোদ্ধারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ মাস যুদ্ধ করে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য এই গণযুদ্ধে দামিন--কোহ্ অঞ্চলের সাঁওতাল ছাড়াও কামার-কুমার, তাঁতি, মুসলমান কৃষকসহ সর্বস্তরের শোষিত নির্যাতিত জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন
 
সমবেত সাঁওতাল কৃষকেরা সেদিন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় শপথ নিয়েছিলেন। সেদিনের শপথ ছিল বিদ্রোহের শপথ। জমায়েতে সিদ্ধান্ত হয়, অত্যাচারী শোষকদের হাত থেকে রক্ষায় সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে, জমির খাজনা দেওয়া হবে না, প্রত্যেকের যত খুশি জমি চাষ করার স্বাধীনতা থাকবে, নিজেদের মতো করে সরকার কায়েম করা হবে ইত্যাদি। জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ওই বিদ্রোহের পরে এলাকার শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ও বিহারি হিন্দু-মুসলমান গরিব কৃষক এবং কারিগরেরাও যোগ দেন।
সাঁওতাল বিদ্রোহ বাংলার ও ভারতের কৃষক-সংগ্রামের ঐতিহ্যকে শুধু উজ্জ্বল আর গৌরবান্বিতই করেনি; বরং সামন্তবাদের রক্ষক বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মোড় নেয়া এই মহাবিদ্রোহ, যা দুই বছর পর ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহকেও উসাহ জোগায়।
 
সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসে আদিবাসীদের আজও গাইতে শোনা যায়, ‘সিদো-কানহু খুড়খুড়ি চাঁদ-ভায়রো ঘোড়া উপরে দেখ সে রে! চাঁদ রে! ভায়রো রে! খোড়া ভায়য়োরে মুলিনে মুলিনে।বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া সিধু ও কানু পালকিতে এবং চাঁদ ও ভৈরব ঘোড়ায় চড়ে বিদ্রোহীদের পাশে থেকে উসাহ দিতেন। হুলে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা পরাজয় বরণ করেছেন, আত্মসমর্পণ করেন নাই। সেই যুদ্ধ এখনও চলমান।

No comments:

Post a Comment