Tuesday, September 24, 2013

নেতৃত্বের ভূমিকা ও জনগণের সীমাবদ্ধতা




প্রগতিতে জনগণের ভূমিকা আলোচনা গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি প্রয়োজনীয় বিষয়। জনগণের কার্যক্রম সঠিক চিন্তাধারা ধরে যেমন এগোতে পারে তেমনি ভুল পথেও জনগণ পরিচালিত হতে পারে। জনগণ কি সবসময় ঠিক থাকে নাকি জনগণও ভুল করতে পারে? জনগণের সীমাবদ্ধতা থাকে কি বা থাকলে কি পরিমাণে থাকে? জনগণের চিন্তাধারা নির্ভুল হয় কী পরিমাণে_ এসব প্রশ্নের উত্তর গণতন্ত্রের বিকাশের স্বার্থে আলোচনা করা প্রয়োজন।

জনগণের চিন্তাধারা যেমন ভুল হতে পারে তেমনি সঠিকও হতে পারে। জনগণ যেমন সঠিক কাজ করতে পারে তেমনি ভুল কাজও করতে পারে। জনগণের যেমন সীমাবদ্ধতা থাকে তেমনি সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের ক্ষমতাও থাকে। আবার সব জনগণের যেমন একই সময়ে একই রকমের ভুল থাকে না তেমনি, তেমনি সব জনগণ একই সময়ে একই সাথে সঠিক থাকে না। অর্থা কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো নির্দিষ্ট স্থানের জনগণের চিন্তাধারায় সঠিকতা ও ভুলের মাত্রাগত পার্থক্য থাকে। এই ঠিক-বেঠিকের লড়াই মূলত প্রগতিশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার মধ্যেকার লড়াই। 

জনগণ সামাজিক অনুশীলনে বিভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে নানা বিষয়ে নানামুখি ধারনা অর্জন করে এবং যেসব ধারনা ও চেতনা অনুশীলনের মাধ্যমে সফল হয় এবং জনগণের পক্ষে প্রগতিতে ভূমিকা রাখে সেগুলো নির্ভুলরূপে প্রতীয়মান হয়। ফলে জনগণ অভিজ্ঞতা ও অনুশীলনের মাধ্যমে নির্ভুল চিন্তাকে গ্রহণ করে এবং ভুল চিন্তাকে বর্জন করে।

এসব বিবেচনায় সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়, জনগণ সর্বদা সঠিক থাকে না। জনগণ ভুল করতে পারে এবং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা সঠিকপথে পরিচালিত হতে পারে। জনগণ ভুল করলে তাদের ভুলকে শুধরিয়ে নিতে হয়। আর জনগণ যদি বারবার একই ভুল করে তবে ক্ষতি হয়, সম্পদনাশ হয়, উন্নতি হতে জনগণ পিছিয়ে পড়ে। তাই জনগণকে সংগঠিত করার জন্য করার জন্য তাদেরকে যেমন প্রশংসা করতে হবে তেমনি জনগণের সীমাবদ্ধতাসমূহকে দূর করার জন্য তাদের সমালোচনাও করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, জনগণ ধোয়া তুলসিপাতা নয়; সুতরাং সর্বদাই তাদের প্রশংসা করার মানে হয়। বাঙালির প্রধান তিনজন নেতা এ কে ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) এবং শেখ মুজিবর রহমান (১৯২০-১৯৭৫) বাঙালির প্রশংসা এত বেশি করেছেন এবং বাঙালিকে এত বেশি উত্তেজিত রেখেছিলেন যে, বাঙালিরা একুশ শতকে এসেও রাজনৈতিক বিষয়ে যুক্তিহিন উত্তেজনায় উত্তেজিত থাকে। রাজনৈতিক বিষয়ে এই তিন নেতার অবিমৃষ্যকারিতার কারণে বাঙালি যুক্তি-বুদ্ধি-বিচার-বিবেচনা-কাণ্ডজ্ঞানের অনুশীলন করে না; বরং তারা রাজনীতিতে হুযুগে, মাতমে, হঠকারিতায় পরিচালিত হয়।

জনগণের সাথে নেতৃত্বের সম্পর্কটি হওয়া উচিত দ্বান্দ্বিক। নেতা জনগণের চেতনা ও সংস্কৃতিকে উন্নত করবেন, জনগণকে শিক্ষিত করে তুলবেন; আবার জনগণও নেতৃত্বের ভুলত্রুটি শুধরিয়ে মহত নেতৃত্ব তৈরি করবেন। নেতা যদি সর্বদাই জনগণের প্রশংসা করেতবে জনগণ আত্মতুষ্টিতে ভুগে নিজেদের ক্ষতি করতে পারে এবং বিশ শতকের শেষ তিন দশক এবং একুশ শতকের প্রথম দশকটিতে বাঙালির ক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। আমাদের আগামির নেতৃত্বের দায়িত্ব হবে জনগণের ভুল শুধরানোর দায়িত্ব। তবে কোনোভাবেই জনগণের উপর থেকে আস্থা হারালে চলবে না। কারণ জনগণ কখনোই সংগ্রামবিমুখ নয়। জনগণ সবসময় সংগ্রাম করেই টিকে থাকেন এবং সংগ্রাম করেই সমাজকে এগিয়ে নেন। তারা যতবারই ব্যর্থ হোন না কেন সংগ্রামের পথ থেকে সরে যান না। এ বিষয়ে মাও সেতুং বলেছেন,
জনসাধারণের উপর অবশ্যই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে, পার্টির উপর অবশ্যই আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে; এ হচ্ছে দুটি মৌলিক নীতি। যদি আমরা এ দুটি নীতিতে সন্দেহ করি, তাহলে কোনো কাজই সম্পন্ন করতে পারবো না।[১]  

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
. কৃষি-সমবায়করণের সমস্যা সম্পর্কে (৩১ জুলাই, ১৯৫৫); নিবন্ধটি আমার সম্পাদিত বাঙালির গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গ্রন্থের বাঙালির অগণতান্ত্রিকতা প্রবন্ধের অংশবিশেষএখানে কিছুটা সম্পাদনা ও সংযোজন করা হয়েছে

No comments:

Post a Comment