Wednesday, September 25, 2013

আমলাতন্ত্রের ঐতিহাসিক গণতন্ত্রবিরোধিতা ও তার প্রকৃতি




আমলাতন্ত্র শুরু থেকেই গণতন্ত্রের বিরোধীআমলারা কখনোই গণতন্ত্র চায় নাআমলাতন্ত্র জনগণকে জিম্মি করে, জনগণকে শোষণ ও নির্যাতন করে, জনগণের সম্পদ কুক্ষিগত করে সুবিধাভোগী শ্রেণিতে পরিণত হয়গরিব দেশগুলোর আমলারা জনগণকে পরাধীন করে রাখে, জনগণের শ্রমফল ভোগ করে, জনগণকে বিপদে ফেলে দুর্নীতি করে, দেশীয় সম্পদ বিদেশে পাচার করে পশ্চাপদ গরিব দেশগুলোতে গণতন্ত্রের শত্রুদের ভেতরে ক্রিয়াশীল রয়েছে পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও অবশ্যই আমলাতন্ত্র আর পশ্চাপদ গরিব দেশই হয় আমলানির্ভরযে দেশ যত পিছিয়ে পড়া, সেদেশে আমলার সংখ্যা ও ক্ষমতা তত বেশি থাকেযেখানে মানুষ যত অজ্ঞ ও স্বায়ত্তশাসনে অনভিজ্ঞ সেখানে তত আমলাদের দোর্দণ্ড প্রতাপ ক্ষমতাপশ্চাপদ গরিব দেশগুলোতে আমলারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে, জনগণের হাতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের বিরোধিতা করে, নিজেদের সুযোগসুবিধা ও বেতন বাড়ানোর তালে থাকে, বিন্দুমাত্র উপাদনে অংশগ্রহণ করে না আর রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসতে চায়বাংলাদেশের ইতিহাসে এই সামরিক-বেসামরিক আমলারা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েছে, জনসম্পদ লুট করেছে, গরিবকে নির্যাতন করেছে, আরো গরিব বাড়িয়েছে, আমলাগিরি শেষ করে অনেকে রাজনীতিতে অংশ নিয়েছে এবং দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থেকেছে
জনগণকে আমলাদের কাছে যেতে হয়; কারণ পশ্চাপদ দেশে জনগণ ভোট কিংবা বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় গেলেও তারা জানে না কীভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে হয়। তাই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দরিদ্র জনগণ পশ্চাপদ নতুন রাষ্ট্রগুলোতে শাসনকার্যের অনভিজ্ঞতার কারণে আমলানির্ভর হয়ে পড়ে। আর এসব আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খায়। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ব্যর্থতার ইতিহাস হচ্ছে আমলাতন্ত্রের শক্তিশালী হওয়ার ইতিহাস।
আমাদের গণতন্ত্র সর্বদাই শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের গণতন্ত্র। আমরা পুঁজিবাদী বুর্জোয়া লুটেরা ধনিদের গণতন্ত্রের কথা বলছি না। পুঁজিবাদী দেশগুলোতে আমলাদের শক্তি পশ্চাপদ দেশগুলোর চেয়ে কম হলেও পুঁজিবাদী দেশের আমলারা অনেক ক্ষমতার অধিকারি। এই আমলারাই রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করে; যুদ্ধ বাঁধায়; গণতান্ত্রিক নেতৃত্বকে ব্যর্থ বা হত্যা করে; দরিদ্র দেশসমূহকে দখলে প্ররোচনা দেয় আর সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত দরিদ্র দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে সেই দেশগুলোকে ঋণে জর্জরিত করে।
কিন্তু শ্রমিক-কৃষকশ্রেণির গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলাদের অবস্থান কী হবে? এ প্রসঙ্গে পল দত্ত তার প্রতিবিপ্লব গ্রন্থে ভি. আই. লেনিনের আমলাতন্ত্র সম্পর্কিত চিন্তাধারা উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন,
লেনিন তাঁর রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থে শ্রমিক রাষ্ট্রে আমলা ও শাসকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার যে পরিকল্পনা পেশ করেছিলেন, তা ছিল এইঃ (১) সব কর্মচারী জনতার ভোটে নির্বাচিত হবেন; এবং যে কোনো সময়ে তাকে ভোট দিয়ে বরখাস্ত করা চলবে; (২) একজন সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে বেশি মজুরি কেউই পাবেন না; (৩) সমগ্র জনতাই সরকারি ক্ষমতার অংশীদার হবেন; অর্থা সবাই আমলার কাজ করবেন, ফলে কোনো আমলাই আর থাকবে না।
এবং লেনিন চেয়েছিলেন বিপ্লবের পরমুহূর্তে যে সরকার গঠিত হবে তাকেই এভাবে গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থা করা যাবে, এ রকম মনোভাব বিপদ ডেকে আনবে, কেননা লেনিন জানতেন একবার আমলাদের বাড়বার সুযোগ দিলে তারা দ্রুত নিজেদের সংগঠিত করে এমন দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ গোষ্ঠী তৈরি করে ফেলবে, এমনভাবে সুযোগসুবিধা বিলিয়ে এত মানুষকে স্বপক্ষে টেনে আনবে যে আরেকটা রক্তাক্ত অভ্যুত্থান ব্যতীত এদের ক্ষমতাচ্যুত করাই অসম্ভব হয়ে পড়বে।
বিশ্ববিপ্লবের দুর্ভাগ্য যে সোভিয়েত সরকারকে লেনিনীয় মডেলে গড়া যায়নি। নির্বাচিত শাসকমণ্ডলী গড়ার কাজ শুরুই করা যায়নি।[১]
এই ভ্রান্ত গণবিরোধি আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে চিনে শুরু হয়েছিল সাংস্কৃতিক বিপ্লব। চিনসহ বিভিন্ন দেশেই দেখা যায় অনেক আমলাই হয়ে থাকে বিশেষজ্ঞ এবং একই সাথে আমলাও। চিনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল আমলাদের চিন্তার সংস্কার এবং প্রশাসনে গতিশীলতা ও গণতন্ত্রকে কার্যকর করা। চিনের অভিজ্ঞতায় দেখা যায় ম্যানেজার ও প্রযুক্তিবিদদের ক্ষমতাকে কমিয়ে দিয়ে ক্রমশ সেখানে যৌথ পরিচালনা সংস্থা হিসেবে বিপ্লবী কমিটি গঠনের উদ্যোগ। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ষোড়শ কংগ্রেসেও আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। সেখানেও জনগণের অংশগ্রহণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বাস্তবে কিন্তু উভয় দেশের অভিজ্ঞতাতে বেশিদূর এগোনো যায়নি।[২]  
আমলাতান্ত্রিক মনোভাব প্রশাসন থেকে পার্টিতেও দেখা যায়। মাও সেতুং সে সম্পর্কে সপ্তম কংগ্রেসের দ্বিতীয় প্লেনারি সম্মেলনে বলেন, বিজয়লাভের সংগে সংগে কিছু মনোভাব পার্টির ভেতরে মাথাচাড়া দিতে পারে যেমন ঔদ্ধত্য, স্বারোপিত বীরত্বের আবহাওয়া, অলসতা, এগিয়ে চলতে অনাগ্রহ, সুখের প্রতি আসক্তি প্রভৃতি।[২]
আমলাতন্ত্র শ্রেণিসমাজের দীর্ঘদিনের সৃষ্টি। একে শক্তিশালী করেছে পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদী শাসনব্যবস্থা বিশেষজ্ঞদের গুরুত্বকে ভীষণভাবে বৃদ্ধি করেছে। ভাববাদীরা এই আমলাতন্ত্রকে প্রয়োজনীয় পাপ বলে মনে করেছেন। এই ভাববাদীরা ভাবতে চাননি যে আমলাতন্ত্র ছাড়াও রাষ্ট্র ও প্রশাসনব্যবস্থা সম্ভব। মাও সেতুং সারা জীবন নানাভাবে আমলাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালান সেটির নানা রকম প্রায় বিশটি চিত্র তুলে ধরেন।[২]     
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্ত টানা যায় যে, আমলাতন্ত্রকে পরাজিত করা ছাড়া গণতন্ত্রের সাফল্য অসম্ভব।

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
. পল দত্ত; প্রতিবিপ্লব; এম সি সরকার এন্ড সন্স প্রা লি; কলকাতা; দ্বিতীয় সংস্করণ; ভাদ্র-১৪০০; পৃষ্ঠা ৩২-৩৩।
. দেখুন, সমীরণ মজুমদার; চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব; ঋ্যামন পাবলিসার্স; ফেব্রুয়ারি, ২০১০; পৃষ্ঠা, ১৮১-১৮২।  

No comments:

Post a Comment