Tuesday, October 29, 2013

দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী



যমুনেশ্বরী নদীর প্রবাহপথ
দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদী (ইংরেজি: Jamuneshwari River) বাংলাদেশ পশ্চিমবঙ্গের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ১১৬ কিলোমিটার, গড় প্রশস্ততা ৫০ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো কর্তৃক যমুনেশ্বরী নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর হচ্ছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৫৮।[১]
প্রবাহ: দেওনাই-চাড়ালকাটা-যমুনেশ্বরী নদীটির উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলীগঞ্জ মহকুমার হলদিবাড়ি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের হেমকুমারি গ্রাম পঞ্চায়েতের বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া ভারতের সীমান্ত সড়কের বিলাঞ্চল থেকে। নদীটি সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের নীলফামারী জেলার ডোমার উপজেলার গোমনাতি ইউনিয়ন দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। একই ইউনিয়নে পশ্চিম দিক থেকে নদীটির একটি শাখা এসে মিশেছে এবং এই শাখাটির উৎপত্তিস্থলকেই পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীটির উৎপত্তিস্থল বলে উল্লেখ করে। ফলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতানুসারে বর্তমানে যমুনেশ্বরী নদীর উৎপত্তি হয়েছে নীলফামারী জেলার কেটকিবাড়ি ইউনিয়নের বিলাঞ্চল থেকে। নদীটি পরে নীলফামারী জেলার ডোমার, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ এবং রংপুর জেলার বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর ও তারাগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে দিনাজপুর জেলাধীন নবাবগঞ্জ উপজেলার মিলানপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে করতোয়া (নীলফামারী) নদীতে নিপতিত হয়েছে। যমুনেশ্বরী নদীর প্রবাহ বারোমাসি হলেও শুষ্ক মৌসুমে এই প্রবাহ আশংকাজনকভাবে হ্রাস পায়। তবে বর্ষাকালে পর্যাপ্ত পরিসরে পানি প্রবাহিত হয়। এই সময় তীরবর্তী এলাকা যেমন বন্যায় প্লাবিত হয় তেমনি ভাটির দিকে ভাঙনপ্রবণতা পরিলক্ষিত হয়।

অন্যান্য তথ্য: বারোমাসি প্রকৃতির এই নদী বন্যাপ্রবণ এবং এই নদীর অববাহিকায় তিস্তা প্রকল্প চালু আছে। বাংলাদেশে এই নদীতে কোনো ব্যারাজ বা রেগুলেটর নেই তবে ডানতীরে ০.৪৯ এবং বামতীরে ০.৭০৭ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ আছে। এই নদীটিতে জোয়ারভাটার প্রভাব নেই। এই নদীর তীরে বাংলাদেশের ডোমার পৌরসভা ও বদরগঞ্জ পৌরসভা অবস্থিত।

তথ্যসূত্র:  
১. মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫, পৃষ্ঠা ১২৬-১২৭, ISBN 984-70120-0436-4.

আরো পড়ুন:

. বাঙলার নদীগুলো মারা যায় যেসব কারণে

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা

৪. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ


Monday, October 28, 2013

বিশ্বের বঞ্চিত নারীদের মহান নেত্রী ক্লারা জেটকিন



ক্লারা জেটকিন ও রোজা লুক্সেমবার্গ

কমরেড ক্লারা জেটকিন (৫ জুলাই, ১৮৫৭ ২০ জুন ১৯৩৩) জার্মান ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং নারী অধিকারআন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির এই নারী নেত্রী সমাজতান্ত্রিক নারীবাদী হিসেবেও পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজতন্ত্রই একমাত্র নারীকে মুক্তি দিতে পারে।
তিনি বুর্জোয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এবং বুর্জোয়া একাডেমিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও জার্মান সমাজের অভ্যন্তরে শ্রেণিবৈষম্য ও পুঁজিবাদ উৎখাতের লক্ষ্যে মার্কসবাদী দর্শন গ্রহণ করেছিলেন। জার্মানির স্যাক্সোনি প্রদেশের ওয়াইডোরায়ু নামক গ্রামে জন্মগ্রহণকারী ক্লারা জেটকিনের পিতা গটফ্রাইড আইজেনার ছিলেন একজন স্কুল শিক্ষক এবং ধর্মপ্রাণ প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ সংগঠক। কিন্তু মা জোসেফিন ভিটালে আইজেনার ছিলেন লেইপজিগের সম্ভ্রান্ত এবং সুশিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার জন্মের সময়গুলোতে জার্মানিতে মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। তারপরেও তিনি লেইপজিগের একটি কলেজে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিলেন। আর এ বিষয়ে তিন লেইপজিগের মাতৃকুল থেকে সহায়তা পেয়েছিলেন। শৈশবে জেটকিন শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করলেও, অচিরেই তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন। ১৮৭৪ সালের দিকে তার সাথে বিশেষ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল জার্মানির নারী আন্দোলন এবং শ্রম-আন্দোলনের সাথে জড়িত সংগঠনগুলোর।
তিনি নিজেকে গড়ে তোলেন মার্কসবাদী দর্শন অনুযায়ী সমাজের আমূল রূপান্তর ঘটানোর লক্ষ্যে। তিনি বুঝেছিলেন পশ্চাৎপদ নারীদেরকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করে তুলতে হবেনারীকে তার শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত করতে না পারলে মানবজাতির সামগ্রিক মুক্তি সম্ভব নয়। সেই লক্ষ্যে তিনি নারীদের মাঝে ব্যাপকভাবে কাজ করেন।
সেই লক্ষ্যে ক্লারা ১৮৭৮ সালে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলে যোগ দেন। এই দলটি গড়ে ওঠার এক ইতিহাস আছে। ১৮৭৫ সালে দুটি দল একত্রিত হয়ে এই দলটি গড়ে উঠে। দল দুটি ছিল ফার্ডিনান্ড লাসালে (১৮২৫ ১৮৬৪) কর্তৃক গঠিত সাধারণ জার্মান শ্রমিক সংগঠন বা General German Workers’ Association বা সংক্ষেপে ADAV এবং আগস্ট বেবেল (১৮৪০ ১৯১৩) ও ভিলহেল্ম লাইবনেখত (১৮২৬ ১৯০০) কর্তৃক গঠিত জার্মানির সমাজগণতান্ত্রিক শ্রমিক দল বা Social Democratic Workers’ Party of Germany বা সংক্ষেপে SDAP. পরে ১৮৯০ সালে এই দলটির আধুনিক সংস্করণ তৈরি হয়েছিল এবং নাম গ্রহণ করেছিল জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা Social Democratic Party of Germany বা সংক্ষেপে SPD.
১৮৭৮ সালে বিসমার্ক জার্মানিতে সমাজতন্ত্র-বিরোধী জরুরি আইন এবং সমাজতান্ত্রিক কাজকর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জেটকিন ১৮৮২ সালে জুরিখ চলে যান এবং সেখান থেকে প্যারিসে নির্বাসনে যান। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর কিছুদিন পর তিনি রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা মার্কসবাদী বিপ্লবী এবং তার অন্যতম বন্ধু ওসিপ জেটকিনকে (১৮৫০ - ১৮৮৯) বিবাহ করেন এবং তার নামের জেটকিন অংশটুকু গ্রহণ করেন। ১৮৮৩ সালে প্রথম সন্তান ম্যাক্সিম জেটকিন জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তিনি চিকিৎসক ছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান কোনস্টানটিন জেটকিনের জন্ম হয় ১৮৮৫ সালে। ক্লারার সম্পাদিত নারী বিষয়ক পত্রিকাDie Gleichheit (Equality) শেষের দিকে কোনস্টানটিন তাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেছেন। ১৮৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে যক্ষ্মা রোগে তার স্বামী ওসিপ মৃত্যুবরণ করেন। পরে জেটকিন শিল্পী জর্জ ফ্রিডরিখ যুন্ডেলকে (১৮৭৫ ১৯৪৮) বিয়ে করেন। যুন্ডেল ছিলেন তার চেয়ে আঠার বছরের ছোট এবং এই বিবাহ ১৮৯৯ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত ছিল।
এই দলে থাকাকালীন সময়ে তার সাথে রোজা লুক্সেমবার্গের বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। জার্মানীর নারী আন্দোলনে তিনি এই বান্ধবীকে গভীরভাবে পেয়েছিলেন। রোজাও নারীর অধিকার এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার পক্ষে অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন। তাছাড়া বিশ শতকে মার্কসবাদের উপর সংশোধনবাদের আক্রমণ বাড়লে গড়ে ওঠা বিতর্কে তিনি এবং রোজা এদুয়ার্দ বার্নস্তাইনের সংশোধনবাদী থিসিসকে আক্রমণ করেন।
ক্লারা জেটকিন নারীদের সমস্যা নিয়ে ব্যাপকভাবে লেখালেখি করেন। নারীর রাজনীতি এবং নারীর ভোটাধিকার ও সমানাধিকার নিয়ে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি জার্মানিতে সমাজ-গণতান্ত্রিক নারী আন্দোলন বিকশিত করেন; ১৮৯১ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দলের পত্রিকা সমতা বা Die Gleichheit সম্পাদনা করেন। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, জার্মান নারীরা পুঁজিবাদের শ্রম শোষণের শিকার এবং যৌন নিপীড়নের শিকার, পুঁজিবাদ নারীকে ভোগ্যপণ্যে পরিণত করেছেগৃহে স্বামী বুর্জোয়া ও স্ত্রী সর্বহারা শ্রেণি গঠন করে” _ ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের (১৮২০ ১৮৯৫) এই বিখ্যাত উক্তিকে তিনি জোরালোভাবে আঁকড়ে ধরে তার ব্যাখ্যা করেন। এছাড়াও তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এটা শুধু জার্মান নারীদের সমস্যা নয়, শ্রেণিবিভক্ত সমস্ত দেশের নারীদেরই এটাই সমস্যা।
ক্লারা জেটকিন ১৮৯৬ সালে অনুষ্ঠিত তার পার্টি কংগ্রেসে নারীদের সমস্যার উপর এক দীর্ঘ বক্তৃতা করেন। কংগ্রেসে প্রদত্ত বক্তৃতায় তিনি বেকোফেন, মর্গান ও বুর্জোয়া নারীবাদীদের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ঘোষণা করেন, ব্যক্তিগত মালিকানাই হচ্ছে নারী নিপীড়নের মূল উৎস এবং সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদই পারে নারী নিপীড়নের মূল শিকড় উপড়ে ফেলতে। তিনি নারীমুক্তির এই ধারনাকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেবার আহ্বান জানান এবং কিছু দিকনির্দেশনামূলক চিন্তা পেশ করেন। তিনি বিশ্লেষণ করে দেখান নারীদেরকে শ্রেণি সচেতন করে তুলতে হবে, শ্রেণি সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে হবে, ট্রেড ইউনিয়নগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়াতে হবে, বৃহত শিল্প ছাড়াও কুটির শিল্প ও কারখানার নারীদেরকে জাগিয়ে তুলতে হবে। উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি ঘটে ১৮৮৯ সালে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে কমিউনিস্ট নেত্রী ক্লারা জেটকিন সর্বপ্রথম রাষ্ট্র ও সমাজজীবনের সর্বক্ষেত্রে পুরুষদের সাথে নারীর সমানাধিকারের দাবি তোলেন। এরকম একজন নারী নেত্রীই তাই বলতে পারেন,
পুঁজিবাদীদের কাছে স্বল্প মজুরিই নারীর শ্রমকে শুধু বিশেষভাবে আকর্ষণীয় করেনি, নারীর অধিকতর আনুগত্যও তা করেছে।
১৯০৭ সালে দলের নারী বিষয়ক বিভাগ "Women's Office" প্রতিষ্ঠিত হলে, ইনি এই বিভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯০৮ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্ক শহরের শ্রমিক নারীরা তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন করেন। ১৯১০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কোপেনহেগেন শহরে। এই সভায় ১৭টি দেশের শতাধিক নারী-প্রতিনিধি যোগদান করেন। এই সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক দলেনারী-কার্যালয়ের (Women's Office) নেত্রী হিসাবে তিনি যোগদান করেন এবং ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক সর্বহারা ও নিপীড়িত নারীদের অধিকার আদায়ের প্রতীক দিবস করার একটি খসড়া প্রস্তাব পেশ করেন। কংগ্রেস ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রস্তাবে তিনি বলেন, প্রতি বৎসরে একই দিনে প্রত্যেকটি দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করতে হবে। একই সাথে তিনি ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে নিজে পালন করেন। এরপর থেকেই পৃথিবীব্যাপী ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে।
১৯০৮ সালে জার্মান সরকার নারীদের রাজনৈতিক দলে অর্ন্তভুক্ত করার অনুমতি দিলে তিনি নারীদের জন্য পার্টিতে আলাদা ফোরাম গঠনের প্রয়োজন অনুভব করেন। তিনি মনে করতেন, শুধু পুরুষদের দ্বারা দল পরিচালিত হলে সেখানে নারীদের দাবি যথাযথ গুরুত্ব পাবে না।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে দল থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় যে, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে কোনো আন্দোলন করা যাবে না। এর প্রতিবাদে ইনি, কার্ল লিবনেখত ( ১৮৭১-১৯১৯), রোজা লুক্সেমবার্গ এবং দলের আরও কিছু প্রভাবশালী সদস্যবৃন্দ জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD থেকে সরে আসেন। কারণ যুদ্ধের সময় দলের কিছু সদস্য সরকার ও বিশ্বযুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আন্দোলন না করার সুবিধাবাদী নীতি গ্রহণ করে। ফলে বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রম ও আন্দোলন করার জন্য তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন। যুদ্ধবিরোধী কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তিনি ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক নারীদের নিয়ে যুদ্ধবিরোধী সম্মেলন করেন। ১৯১৬ সালে স্পার্টাকাসপন্থী লিগের তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯১৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল বা SPD ভেঙে Independent Social Democratic Party of Germany বা সংক্ষেপে USPD গঠিত হলে এটিরও তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি বা Communist Party of Germany বা সংক্ষেপে KPD প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রাইখস্ট্যগে ( Reichstag) এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯২০ সালে তিনি লেনিনের একটি সাক্ষাৎকার নেন। এই সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিলো- The Women's Question. ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের সদস্য ছিলেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য পদে ছিলেন। এসবের ভিতরেই ১৯২৫ সালে জার্মান বাম সংগঠন Rote Hilfe বা লাল সাহায্য”-এর সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে প্রবীণ সদস্য হিসাবে রাইখস্ট্যাগের চেয়ার-ওম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। ক্লারা জেটকিন রুশ বিপ্লবের মহান নেতা কমরেড লেনিনের সাথে বহুবার সাক্ষাত করেছেন। কমরেড লেনিন ক্লারা জেটকিনের নারী প্রশ্নে কিছু ভুল দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা করেছেন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছেন। ক্লারা জেটকিন কমরেড লেনিনের সমালোচনা, পরামর্শগুলো গুরুত্বসহকারে শুনেছেন এবং গ্রহণ করেছেন।
জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ায় কাটিয়েছেন এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণ পর্যবেক্ষণ করেছেন। সোভিয়েত যৌথখামারের নারীদের মাঝে তিনি ছিলেন অতি প্রিয়জন।
জার্মানিতে এ্যাডলফ হিটলারের National Socialist German Workers Party ক্ষমতায় এলে রাইখস্ট্যাগের জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ১৯৩৩ সালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে পুনরায় নির্বাসনে চলে যান। এর কিছুদিন পর শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করে তিনি জার্মানির রাইখস্টাগে বক্তৃতা দিতে যান। ১৯৩২ সালের ৩০ আগস্ট ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের বিরুদ্ধে তিনি বক্তৃতা দেন। এই বক্তৃতায় তিনি শ্রমজীবী সর্বহারা নারীদের উদ্দেশ্যে বলেন;_ মনে রেখ বোনেরা, ফ্যাসিবাদ চায় তোমাদের শুধু দাসি ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বানাতে। ভুলো না সেই নারী যোদ্ধাদের যারা ফ্যাসিবাদীদের হাতে প্রাণ দিয়েছে এবং কারাগারের অন্তরালে আছে। রাইখস্টাগে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ভাষণ দেয়ার সময় তিনি জার্মান ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন এবং তাদের অত্যাচারে ১৯৩৩ সালের ২০ জুন ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৩৮ সালের ৮ মার্চ নারী মুক্তির মহান নেত্রী ক্লারা জেটকিনকেঅর্ডার অব লেনিন”_ এই মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
১. এই লেখাটির অধিকাংশ তথ্য ইংরেজি উইকিপিডিয়া এবং বিপ্লবী নারীমুক্তির মুখপত্র নারীমুক্তি’র দ্বিতীয় সংখ্যা ফেব্রুয়ারি, ২০০৪ থেকে নেয়া হয়েছে।