Tuesday, October 15, 2013

মহান চিন বিপ্লবের নেত্রী মাদাম চিয়াং চিং



মাও সেতুং ও চিয়াং চিং, ১৯৪৬ সালে

চিয়াং চিং (Jiang Qing; ১৯ মার্চ, ১৯১৪ – ১৪ মে, ১৯৯১) বিশ্বের মাওবাদী কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এক মহীয়সী নেত্রীর নাম। তিনি সানতু প্রদেশের এক শ্রমজীবী পরিবারে ১৯১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন যে সময় পশ্চাৎপদ সামন্ততান্ত্রিক চিনা নারীরা শোষণ নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে পুনর্জন্মে কুকুর হয়ে জন্মগ্রহণ করতে চাইতেন। শৈশব থেকে দারিদ্র ও অনাহারে বেড়ে ওঠা চিয়াং চিং প্রথমে ক্ষুধা নিবারণের জন্য একটি নাট্যদলে যোগদান করেন। এবং পরবর্তীতে রাজধানী পিকিং চলে আসেন। এখানেই তার জীবনের মোড় পালটে যেতে শুরু করে যখন জাপানি সাম্রাজ্যবাদীরা মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। ১৯৩১ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি দ্বারা পরিচালিত বামপন্থী নাট্যদলে যোগদান করেন এবং ১৯৩৩ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। কমরেড চিয়াং চিং-এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন না থাকলেও এ সময় তিনি প্রচুর পরিমাণে মার্কসবাদ লেনিনবাদের ওপর অধ্যয়ন করেন। লাইব্রেরিতে চাকরিরত অবস্থায় সমাজবিজ্ঞানের উপর ব্যাপক পড়াশোনা ও গবেষণা করেন।
১৯৩৩-এর বসন্তে তাকে সাংহাইতে নিয়োগ করা হলো, যখন কিনা মাও-লাইনের প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী ওয়াং মিং ও তার শহরকেন্দ্রিক লাইনের প্রভাবে পার্টি কাঠামো ধ্বংসপ্রায় এবং সুবিধাবাদ ছড়িয়ে পড়ছিলো। চিয়াং চিং সাংহাইতে প্রথম কাজ শুরু করেন মঞ্চ অভিনেত্রী হিসেবে। এখানে তিনি কয়েকটি প্রগতিশীল নাটক মঞ্চস্থ করেন। এতে দরিদ্র শ্রেণির জনগণের মাঝে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। একই সাথে তিনি নারী শ্রমিকদের মাঝেও কাজ করেন। শ্রমিকদেরকে তিনি সচেতন করে তোলেন যে কীভাবে বৃটিশ ও জাপানি মালিকানাধীন কাপড়ের মিল ও সিগারেটের কারখানাগুলোতে শ্রমচুক্তির দুরবস্থা চলছে। এখান থেকেই তিনি শত্রুর হাতে গ্রেফতার হন এবং আট মাস জেল খেটে জেলরক্ষীদের বোকা বানিয়ে পালিয়ে আসেন।
চিয়াং চিং যখন দেখেন যে, দু’চারটি চলচ্চিত্র বাদে সমস্ত চলচ্চিত্র পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রতিক্রিয়াশীল কেন্দ্র হলিউড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, তখন তিনি আওয়াজ তোলেন “জাতীয় বিপ্লবের জন্য জনগণের সাহিত্য”। শিল্পকলার ক্ষেত্রে কমরেড মাও এই আওয়াজকে অনুমোদন করেন। সাংহাই শহর জাপানিরা আক্রমণ করলে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির অষ্টম রুট বাহিনীতে তিনি যোগ দেন এবং ৩০০ মাইল পাহাড় পায়ে হেঁটে ইয়েনানে পৌঁছান। ১৯৩৮ সালের শেষের দিকে চিয়াং চিং – এর সাথে মাও সেতুং-এর বিয়ে হয়। পরবর্তীতে তাদের একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে।
পরবর্তী বছরগুলোতে চিয়াং চিং চিনা কমিউনিস্ট পার্টিতে একাগ্রচিত্তে কাজ করেছেন এবং শত্রুর বিরুদ্ধে মাও-এর পাশে থেকে লড়াই করেছেন। ১৯৪৯ সালে চিনা পার্টি ক্ষমতায় এলে তথা সর্বহারা শ্রেণির রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম হলে কমরেড চিয়াং চিং সাংহাইতে ভূমি সংস্কার কর্মসূচিতে সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। এক্ষেত্রেও তিনি নারীদেরকে অসম ভূমি, খারাপ ও পতিত ভূমি দেয়ার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে ব্যাপক সংগ্রাম পরিচালনা করেন। ১৯৫০ সালে চিয়াং চিং-এর গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে পশ্চাৎপদ চিনা নারীদের জন্য চিনা পার্টিতে সরকারিভাবে বিবাহ সংস্কার, স্বামী নির্বাচন, নারীদের তালাক দেয়ার আইন গৃহীত হয়।
১৯৬০-এর দশকের পূর্ব পর্যন্ত তিনি চিনা শিল্পকলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অব্দান রাখেন। প্রতিক্রিয়াশীল শিল্পকলাতে তিনি আমূল বিপ্লবী রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম হন। ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এই দশ বছর মাও-এর নেতৃত্বে পরিচালিত মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবে তিনি ছিলেন মাও-এর পাশে অন্যতম বলিষ্ঠ নেতৃত্ব। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যকার ঘাপটি মেরে থাকা বুর্জোয়া মতাদর্শধারীরা যদিওবা শর্তারোপ করেছিলো চিয়াং চিং কোনো সরকারি পদে অধিষ্ঠিত হতে পারবেন না। কিন্তু চিয়াং চিং তার যোগ্যতা ও মাও-এর লাইনের আনুগত্যতায় ওই বুর্জোয়া পথগামীদের জবাব দিয়েছেন যখন তিনি ১৯৬৯ ও ১৯৭৩ সালে নবম ও দশম কংগ্রেসে পলিটব্যুরোর সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর মাও সেতুং-এর মৃত্যুর পর মাও সেতুং-এর চিন্তাধারাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরা ও অব্যাহতভাবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার তত্ত্ব শক্ত হাতে তুলে ধরলে এক মাসের মাথাও অক্টোবরে মাও-এর আদর্শ বর্জনকারী চিনা জনগণ ও বিশ্ববিপ্লবের শত্রু তেং-হুয়া চক্র ক্যু-দেতা করে চিনা পার্টি ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে। তারা চিয়াং চিংসহ সাংস্কৃতিক বিপ্লবে মাও-এর প্রধান চার সহযোগী নেতৃত্বকে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করে বন্দি করে। এই ভণ্ডরা ১৯৭৬ সালের তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারের দাঙ্গায় নগ্নভাবে উসকানি দিয়েছিলো। তারাই আবার এই দাঙ্গার জন্য চিয়াং চিং-কে অভিযুক্ত করে।
সংশোধনবাদী চক্র মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পতাকা বহনকারী মহান নেত্রী চিয়াং চিং-কে কুচক্রী আখ্যা দিয়ে মাও-এর লাইন তুলে ধরার নামে মাও-এর লাইনের প্রতি এক সর্বব্যাপী আক্রমণ চালায়। ১৯৮০-৮১ সালব্যাপী এক প্রহসনমূলক বিচার চলে। তেং চক্র আদালতে তার দোষ স্বীকার করতে বললে চিয়াং চিং বলেন, আদালতে আমি যদি কিছু স্বীকার করি তাহলে আমি বলবো ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত এই ১০ বছর সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে মরণপণ সংগ্রাম করেছি এবং তা মাও-এর নেতৃত্বেই। আমি যা করেছি মাও তা সমর্থন করেছেন। প্রসিকিউটর চিয়াং চিং-এর মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করলে চিয়াং চিং দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, চেয়ারম্যান মাও একজন সেরা নারী কমরেডের মাঝে পাঁচটি গুণের সমাবেশ দেখতে চাইতেন _ ক. পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার ভয়ে কখনো ভীত হয়ো না; খ. যে পদে অধিষ্ঠিত হয়েছো সেখান থেকে চ্যুত হওয়ার ভয় পেয়ো না; গ. বিবাহ বিচ্ছেদকে ভয় পেয়ো না; ঘ. কারারুদ্ধ হতে হলেও ভয় পেয়ো না; ঙ. ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হলেও তা হাসিমুখে বরণ করে নিও। মহান মাও-এর এই পাঁচটি নির্দেশের চারটি আমি ইতিমধ্যেই পালন করেছি। পঞ্চমটি বরণ করার জন্য আমি প্রস্তুত হয়েই আছি। তিনি তেং-হুয়া চক্রের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন_ তোমাদের সাহস থাকলে তিয়েন-আন-মেন স্কোয়ারে দশ লক্ষ জনগণের সামনে আমাকে ফাঁসি দাও।
দুই বছরেরও অধিক সময় বিচার চলার পর ১৯৮১ সালে বিচারে চিয়াং চিং-কে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ১৯৮৩ সালে সাজা কমিয়ে সেটিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়। ১৯৯০ সালে চিনা জনগণের শত্রু তেং চক্র প্রচার দেয় যে, চিয়াং চিং আত্মহত্যা করেছেন। তেং কুচক্রীদের এই মিথ্যা প্রচারে বিশ্বের মাওবাদী পার্টি ও সংগঠনগুলো চিয়াং চিং-কে বন্দি অবস্থায় হত্যার প্রতিবাদ জানায় এবং সংশোধনবাদী তেং চক্রের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানায়। বিশ্বের সাম্যবাদী বিপ্লবের ইতিহাসে এই নেত্রীর নাম লাল আলোয় লেখা থাকবে।[১]   
তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
১. এই লেখাটির অধিকাংশ তথ্যই বিপ্লবী নারীমুক্তির মুখপত্র নারীমুক্তি’র প্রথম সংখ্যা ফেব্রুয়ারি, ২০০১ থেকে নেয়া হয়েছে।

No comments:

Post a Comment