Monday, December 02, 2013

একটি সমবায়ের পরিচিতি ---মাও সেতুং



মাও সেতুঙ, একটি সমবায়ের পরিচিতি
(১৫ এপ্রিল, ১৯৫৮)
“দুই বছরের তিক্ত সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যে সমবায়টি নিজেকে রূপান্তরিত করেছে” শীর্ষক প্রবন্ধটি পড়বার মতো।  গোটা দেশে দ্রুত তালে বেড়ে উঠছে কমিউনিস্ট ভাবমানস। দ্রুত বেড়ে উঠছে ব্যাপক জনসাধারণের রাজনৈতিক সচেতনতা। জনসাধারণের পশ্চাৎপদ অংশ অগ্রবর্তীদের সমান হওয়ার জন্য প্রচণ্ড প্রয়াস করছেন। এটা স্পষ্ট প্রমাণ করে দেয় যে আমাদের দেশে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে (সেই সব জায়গায় যেখানে উৎপাদন সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি রূপান্তরিত হয়নি), এবং রাজনৈতিক, মতাদর্শগত, প্রযুক্তিগত ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দৃঢ়পদে এগিয়ে চলেছে। এ দিক থেকে বিচার করলে মনে হয় আগে যেমন অনুমান করা গিয়েছিল তার থেকে সম্ভবত কম সময়ের মধ্যেই আমাদের শিল্প ও কৃষি পুঁজিবাদী শক্তিগুলির শিল্প ও কৃষির সমান হয়ে উঠবে। পার্টির নেতৃত্ব ছাড়াও আমাদের ৬০ কোটি জনসংখ্যা হচ্ছে একটা নির্ণায়ক উপাদান। বেশি লোকের অর্থ বেশি ধ্যানধারণার আলোড়ন, বেশি উৎসাহ, বেশি কর্মোদ্যম। জনসাধারণ আজ অভূতপূর্বভাবে অনুপ্রাণিত, সংগ্রামে দৃঢ়সংকল্প এবং সাহসে পরিপূর্ণ। মেহনতি মানুষের সীমাহীন মহাসমুদ্রে সম্পূর্ণ নিমজ্জিত হয়ে গেছে আগের দিনের শোষক শ্রেণিগুলি। অনিচ্ছাতে হলেও বদলাতে তাদের হবেই। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে এমন লোক আছেন যারা কোনো দিনই বদলাবেন না এবং শেষের দিন অবধি নিজেদের চিন্তাধারাকে অশ্মীভূত করে রাখবেন। কিন্তু তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না। কালপ্রবাহের সাথে সাথে সব অবক্ষয়ী মতাদর্শ ও উপরিকাঠামোর সব অসঙ্গতিপূর্ণ অংশগুলি ধ্বসে পড়ছে। এই আবর্জনারাশিকে সম্পূর্ণভাবে দূরে ফেলে দিতে এখনও আরও কিছু সময় লাগবে। কিন্তু তাদের অনিবার্য ও সামগ্রিক পতন সম্পর্কে কোনো সংশয় নেই। অন্যান্য বৈশিষ্ট্য ছাড়াও চিনের ৬০ কোটি জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে “দারিদ্র্য ও দাগহীনতা”। এটা দেখতে খারাপ ব্যাপার হতে পারে, কিন্তু আসলে তা ভাল। দারিদ্র পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা জাগায়, কর্মোদ্যম এবং বিপ্লবের প্রেরণা দেয়। যার উপর কোনো দাগ নেই এমন একটা সাদা কাগজে সবচেয়ে নতুন ও সুন্দর অক্ষর লেখা যায় এবং সবচেয়ে নতুন ও সুন্দর চিত্র অংকন করা যায়। বৃহৎ চিত্রাক্ষর পোস্টার হচ্ছে অত্যন্ত উপযোগী নতুন হাতিয়ার। শহরে, পল্লী অঞ্চলে, কারখানায়, সমবায়ে, দোকানে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে, বিদ্যালয়ে, সৈন্য ইউনিটে ও রাস্তায়_ সংক্ষেপে, যেখানেই জনসাধারণ আছে, সেখানেই এই নতুন হাতিয়ারকে ব্যবহার করতে পারা যায়। ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে এর ব্যবহার করা হয়েছে এবং সর্বদাই ব্যবহার করা উচিত। ছিং বংশের কোং জি-চেন-এর লিখিত একটি কবিতা বলেঃ
শুধু ঝড়ঝঞ্ঝার রুদ্ররোষে
দৃপ্ত আমার দেশ
শৌর্য নির্নিমেষ
থেমে যায় হায় অযুত ঘোড়ার
হ্রেষামুখরতা
হে বিধাতা
জাগো আজ তুমি
প্রতিভার বরপুত্র যাচে বিশ্বভূমি।
যে নিষ্প্রাণতায় “থেমে যায় হায় অযুত ঘোড়ার হ্রেষামুখরতা” তাকে দূর করে দিয়েছে বৃহৎ চিত্রাক্ষর পোস্টার। দেশের পল্লী অঞ্চলের সাত লাখের বেশি সমবায়ের কমরেডদের কাছে এবং শহরের কমরেডদের কাছে এখন আমি একটি সমবায়ের হয়ে সুপারিশ করতে চাই। হোনান প্রদেশের ফেংছিউ জেলায় অবস্থিত এই সমবায়টির নাম ইংচু সমবায়। এটি আমাদের অনেক গভীর চিন্তার খোরাক দিয়েছে। চিনের মেহনতি জনগণ তাঁদের অতীতের দাসসুলভ বৈশিষ্ট্যের কিছু কি আঁকড়ে রেখেছেন? এতটুকুও না। তাঁরা এখন নিজেরা মালিক হয়েছেন। গণপ্রজাতন্ত্রী চিনের ৯৬ লাখ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত দেশের বুকে মেহনতি মানুষ আজ সত্যি সত্যি আমাদের দেশের শাসক হতে শুরু করেছেন।

টিকাঃ  
. এই প্রবন্ধটি হোনান প্রদেশের ফেংছিউ জেলার অন্তর্গত ইংচু কৃষি উৎপাদক সমবায়কে পরিচিত করিয়ে দিচ্ছে। নিচু জমিতে এটি অবস্থিত আর এখানে জলরোধে অর্থাৎ জল নিষ্কাশন না হয়ে জমে থাকায় প্রায়শই বিপর্যয় ঘটে। মুক্তির আগে এখানে জনসাধারণ নিয়তই দারিদ্র্যে ও দুর্দশায় জীবন যাপন করতেন। মুক্তির পরে তাঁদের জীবনের উন্নতি ঘটেছে। ১৯৫৫ সনে এই সমবায়টি গঠিত হয়। প্রথম দুই বছরে পরপর কয়েকবার মারাত্মক বন্যায় আক্রান্ত হয়। নিজেদের শক্তির ওপরে নির্ভর করে এবং তাঁদের যৌথ প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে এই সমবায়ের কর্মী ও সদস্যরা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে তীব্র সংগ্রাম চালান। দুই বছরের স্বল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জল সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলে, শুকনো জমিকে সেচের আওতায় এনে আর ক্ষারযুক্ত জমিকে ধানী জমি করে নিয়ে সমবায়টি নিজেকে খরা ও বন্যার প্রকোপ থেকে মূলত মুক্ত করে এবং তার চেহারাটিই পুরোপুরি বদলে দেয়।
. চেচিয়াং প্রদেশের রেনহোর (বর্তমানে হাংচৌ) কোং জি-চেন (১৭৯২-১৮৪১) ছিলেন ছিং রাজবংশের একজন প্রগতিশীল চিন্তাবিদ ও লেখক। ১৮৩৯ সালে পিকিং থেকে হাংচৌয়ে আসবার পথে কোং জি-চেন চেনচিয়াং-এ দেবতাদের কাছে প্রার্থনা জানিয়ে এই কবিতাটি লেখেন।  

No comments:

Post a Comment