Friday, December 06, 2013

মান্দারিন হাঁস বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি




মান্দারিন হাঁস, Mandarin Duck, Photo: Sourav Mahmud

দ্বিপদ নাম: Aix galericulata
সমনাম: Anas galericulata Linnaeus, 1758
বাংলা নাম: মান্দারিন হাঁস
ইংরেজি নাম: Mandarin Duck
জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্যKingdom: Animalia
বিভাগ/Phylum: Chordata
শ্রেণী/Class: Aves
পরিবার/Family: Anatidae
গণ/Genus: Aix, Boie, 1828;
প্রজাতি/Species: Aix galericulata (Linnaeus, 1758)
ইংরেজি নাম: Mandarin Duck
ভূমিকাঃ বাংলাদেশের পাখির তালিকাAix গণে ১টি প্রজাতি রয়েছে এবং পৃথিবীতে রয়েছে ২ টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশর  প্রাপ্ত প্রজাতিটি হচ্ছে  মান্দারিন হাঁসগত কয়েক দশক ধরে এদের সংখ্যা কমে গেলেও আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নিসেকারণে আই. ইউ. সি. এন. এই প্রজাতিটিকে Least Concern বা ন্যুনতম বিপদযুক্ত বলে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশে এরা পরিযায়ী হয়ে আসেবাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত নয়
বর্ণনা: মান্দারিন হাঁস বাহারি রঙের ছোট জলচর পাখি (দৈর্ঘ্য ৪৪ সেমি, ডানা ২২.৫ সেমি., ঠোঁট ২.৮ সেমি, পা ৩.৮ সেমি, লেজ ১১ সেমি)ছেলে মেয়েহাঁসের চেহারায় অনেক পার্থক্য আছেছেলে মান্দারিন হাঁসের সারা শরীর জুড়ে নানান রঙের ছড়াছড়ি প্রজনন ঋতুতে ছেলেহাঁসের ডানায় কমলা রঙ; ডানায় নৌকার পালের মত দুটি খাড়া পালক; গোল মাথায় বাদামি চাঁদি; চোখের উপরে চওড়া সাদা ফেটা; ঘাড় ও চিবুক কমলা রঙের ঘন পালকে আবৃত; বগল কমলা; বুক সাদা; ঠোঁট লাল, চোখ ঘন বাদামি; এবং কমলা-পীতাভ পামেয়েহাঁসের পিঠ জলপাই-বাদামি; দেহতল সাদা; সাদা ফুটফুটে বগল ও বুকে সাদা ডোরাপ্রজনন ঋতু ছাড়া ছেলেহাঁসের চকচকে পিঠ, লালচে ঠোঁট ছাড়া দেখতে মেয়েহাঁসের মত প্রজনন ঋতু ব্যতীত অন্যান্য সময়ে ছেলেহাঁস পুরোপুরি মেয়েহাঁসের মতকেবল পিঠ চকচকে আর ঠোঁট লালচে থাকেমেয়ে মান্দারিনের আবার এত রঙের বাহার নেই, বেশ সাদামাটামেয়েহাঁসের পিঠ জলপাই-বাদামি, দেহতল সাদাবগলের উপর সারি সারি সাদা ফুটফুটে দাগবুকে অনেকগুলো সাদা রেখা দেখা যায়ডানার মাথার পালকগুলো নীল, তার উপর সাদা ছোপযুক্তমেয়েহাঁসের চোখে সাদাচশমাথাকে, চক্ষু-রেখা সাদাঠোঁট হলদেএমনিতে চোখ আর পা ছেলেহাঁসের মতোইঅপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের চেহারা প্রায় মেয়েহাঁসের মত, তবে মাথা বাদামি আর বুকে ও বগলে বিচ্ছিন্ন সাদা ফোঁটা থাকে
স্বভাবঃ মান্দারিন হাঁস মিঠাপানির আর্দ্রভূমি, প্লাবিত ধানক্ষেত, বনের জলধারা, পুকুর, হ্রদ ও তৃণময় জলাশয়ে বিচরণ করেযেসব জলাশয়ের ধারেকাছে ঘন বন থাকে সেসব জলাশয় এদের পছন্দের জায়গাসাধারণত অন্যসব প্রজাতির হাঁসের মিশ্র ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায়এরা সামাজিক হলেও ছেলেহাঁসেরা সচরাচর পরস্পরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়এরা ভাল সাঁতারু ও দ্রুত উড়তে পারে, তবে ডুব দিতে পটু নয়ঊষা আর গোধূলিবেলায় বেশি কর্মপটু থাকেদিনের অন্য সময়ে ছায়ায় বিশ্রাম নেয়অন্যান্য প্রজাতির হাঁসের পা যেখানে শরীরের পেছনে অবস্থিত, সেখানে মান্দারিন হাঁসের পা তুলনামূলক সামনে অবস্থিতসেকারণে এরা ডাঙাতেও সচ্ছন্দে চলাফেরা করতে পারেএই সুবিধার জন্য এরা গাছের ডালেও বসতে পারে বন্দী অবস্থায় এরা সহজেই ৬-৭ বছর বাঁচে, সর্বোচ্চ বাঁচে ১০ বছর পর্যন্ত
মান্দারিন হাঁস অগভীর জলে মাথা ডুবিয়ে ঘাস ও লতাপাতা থেকে খাবার সংগ্রহ করেএরা রাতেও খাবারের খোঁজে ঘুরে বেড়ায়এদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে জলজ উদ্ভিদ, শস্যদানা (বিশেষত ধান), ছোট মাছ, শামুক, কেঁচো, জলজ পোকামাকড়, চিংড়ি ও কাঁকড়াজাতীয় প্রাণী এমনকি ছোট সাপ
মে থেকে আগস্ট মান্দারিন হাঁসের প্রজনন ঋতুএ সময় এদের ডাকাডাকি বেড়ে যায়ছেলেহাঁস মেয়েহাঁসের মনোরঞ্জনের জন্য এক ধরনের নাচ প্রদর্শন করেছেলেহাঁস ঘাড় লম্বা করে মাথা উপর-নীচ করতে থাকে এবং এক ধরণের মৃদু শব্দ করতে থাকে যা অনেকটা ঢেকুরের মত শোনায়এছাড়া স্ত্রী হাঁসের পেছনে পেছনে ভেসে বেড়ানোর সময় পানি পানের ভান করে আর শরীর ঝাঁকায় ঘন বনের মধ্যে জলাশয়ের কাছাকাছি এরা বাসা করেসাধারণত গুহায়, গর্তে বা গাছের কোটরে ঘাস, উদ্ভিদাংশ ও পালক বিছিয়ে বাসা করেবাসার উচ্চতা মাটি থেকে কমপক্ষে ৩০ ফুট উঁচুতে হয়মূলত মেয়েহাঁসই বাসা বানাবার জায়গা পছন্দ করে আর বাসা বানায়ছেলেহাঁস এ ব্যাপারে মেয়েহাঁসকে সহায়তা করে সাধারণত একবারে ৯-১২টি ডিম পাড়েডিমগুলো পীতাভ রঙের হয়ডিমের মাপ ৪.৯ × ৩.৬ সেন্টিমিটারকেবল মেয়েহাঁস ডিমে তা দেয়ছেলে মান্দারিন এসময় আশেপাশেই থাকে আর বাসা পাহারা দেয়ডিম ফোটার সময় হলে ছেলেহাঁস দূরে চলে যায়শিকারী প্রাণী বাসার কাছাকাছি এলে মা হাঁস ডেকে ডেকে তাদের দূরে সরিয়ে নেয়২৮-৩০ দিন পর ডিম ফুটে ছানা বের হয়কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে সব ডিম ফুটে যায়ডিম ফোটা শেষ হলে মা হাঁস মাটি থেকে ছানাদের নেমে আসার জন্য ডাক দেয়কোটর বা গর্ত থেকে ছানারা শূন্যে ঝাঁপ দেয় আর আশ্চর্যজনক ভাবে কোন রকম গুরুতর আঘাত ছাড়াই নিরাপদে মাটিতে নেমে আসে আর মায়ের পিছু পিছু কাছাকাছি জলাশয়ে যেয়ে নামেএসময় পুরুষ মান্দারিন ফিরে এসে ছানা আর স্ত্রী হাঁসের সাথে মিলিত হয়৪০ থেকে ৪৫ দিন পর ছানারা উড়তে শেখে আর নতুন ঝাঁকে গিয়ে যোগ দেয়
বিস্তৃতি: মান্দারিন হাঁস বাংলাদেশের অনিয়মিত পাখি; সম্প্রতিকালে সিলেট বিভাগের হাওরে শীতে মাত্র একবার দেখা গেছেপ্রাকৃতিকভাবে কেবলমাত্র কোরিয়া, চীন ও জাপানে এ হাঁস আছে; ভারত ও নেপালে কয়েক বছর পর পর চোখে পড়ে; ইদানীং ইংল্যান্ডেও দেখা গেছে
অবস্থা: মান্দারিন হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিতবাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে একে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয় নি
বিবিধ: মান্দারিন হাঁসের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ টুপিপড়া ডুবুরি (গ্রিক: Aix = ডুবুরি পাখি; ল্যাটিন: galericulata = টোপর)
বাংলাদেশের উদ্ভিদ প্রাণী জ্ঞানকোষে এই নিবন্ধটির লেখক এম. মনিরুল এইচ. খান। এই লেখায় আরো কিছু তথ্য যোগ করা হয়েছে। 


আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

No comments:

Post a Comment