Monday, January 20, 2014

সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির স্বরূপ এবং প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির পিছুটান



সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি, দিন আসবেই দিন আসবেই দিন সমতার

মানুষেরই শুধু সংস্কৃতি আছে যা অন্য প্রাণীর নেই; আর এই সংস্কৃতিই তার জীবনকে উন্নত করে। মানুষের ইতিহাস অন্য প্রাণী থেকে পৃথক হয়েছে তার সংস্কৃতির কারণে। সংস্কৃতির শক্তিতে মানুষ বেঁচে থাকে, সংস্কৃতির সাহায্যে সে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, প্রকৃতিকে কাজে লাগায়, পরিবেশকে উন্নত করে। সংস্কৃতি মানুষের জীবন, পরিবেশ, কর্ম, উদ্দেশ্য ও বেঁচে থাকার প্রক্রিয়াকে উন্নত, সুন্দর, রুচিশীল, সত্যপরায়ণ, ন্যায়বোধসম্পন্ন ও আধুনিক করে। সংস্কৃতির সাহায্যে মানুষ অতীতের অন্যায়কে বর্জন করবার ধারণা পায়, নতুন ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, নতুন মূল্যবোধ তৈরি করে, কর্মপদ্ধতিতে নৈপুণ্য অর্জন করে, অর্থাৎ মানুষের শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি ইত্যাদির অগ্রগামিতার বাহক হিসেবে কাজ করে সংস্কৃতি এবং এই সংস্কৃতি একটি নির্দিষ্ট সমাজের অর্থনৈতিক ভিত্তির সাথে মিলে কাজ করে। অর্থনীতি সামজের শিকড় হলে সংস্কৃতি তার ডালপালা।   
বাংলাদেশে এখন দুই ধরনের সংস্কৃতি বিরাজমান। প্রথমটি হচ্ছে পশ্চাৎপদ প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি। এই প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির উৎস প্রধানত তিনটি। এই উৎস তিনটি হচ্ছে যথাক্রমে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ ও পুঁজিবাদ। এই উৎস তিনটি থেকে আসে সাম্রাজ্যবাদনির্ভর দালালি সংস্কৃতি, সামন্তবাদ দ্বারা পুষ্ট সামন্তীয় সংস্কৃতি এবং পুঁজিবাদনির্ভর বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিআর অন্যদিকে এই পশ্চাৎপদ প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতির বিপরীতে আছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি। পুঁজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদনির্ভর এই তিন প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতিই ভাববাদী ও পশ্চাৎপদ ধ্যানধারনার সাথে যুক্ত। আত্মবিক্রয়, পরাধীনতা, সম্পত্তিলোভ, ব্যক্তিগত সম্পত্তিজাত মানসিকতা, নিপীড়ন, আমলাতান্ত্রিকতা, সাম্রাজ্যবাদনির্ভরতা, পূজা-অর্চনা, ধর্মব্যবসা, পরগাছাবৃত্তি, শ্রমহীনতা, পুরনো নীতি, পুরনো ভাবধারা, নারীপীড়ন ইত্যাদি পশ্চাৎপদ সংস্কৃতি এবং এ সংস্কৃতি নতুন সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিরোধিতা করে।
সামাজিক অনুশীলন, সমতাভিত্তিক মূল্যবোধ, যৌথকর্ম ও যৌথপ্রচেষ্টা, সামাজিক মূলধন, সামাজিক বিকাশ, সামজিক সম্পর্ক, যূথবদ্ধতা, গণতন্ত্র চর্চা, বস্তুবাদী দর্শন চর্চা, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্বায়ন সাম্রাজ্যবাদ ও আগ্রাসনবিরোধিতা, স্বাধীনতা-সমতা-ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদিতে যে সংস্কৃতি বিরাজমান তাই সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি। আমরা যদি রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, নারী-পুরুষ সম্পর্ক, পরিবার, সমাজ, প্রশাসন, আইন ও বিচার, অর্থনীতি, শ্রমব্যবস্থাপনা, প্রচারমাধ্যম, শিক্ষাব্যবস্থা, জ্ঞান, বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্পকলা ইত্যাদিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই তবে এসব বিষয়ের ওপরে সুস্পষ্ট ধারনা অর্জন করতে হবে এবং জনগণের জীবন ও পরিবেশকে উন্নত করার জন্য সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি দ্বারা এসব বিষয়ের উন্নতি ঘটাতে হবে। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণ করবার ধারাবাহিক চেষ্টার মাধ্যমেই প্রগতিশীলতাকে অর্জন করা যেতে পারে। এই সাম্যবাদী সমাজের আশাবাদের গানটি আছে সমতার দিন নির্মাণের অবিরত সংগ্রামের মাঝে।  
প্রতিটি সমাজের সংস্কৃতির বিকাশ ঘটান সেই সমাজের শ্রমিক, কৃষক, মনিষী, বিজ্ঞানী ও অন্যান্য সৃষ্টিশীল ব্যক্তিরা। এ-প্রসঙ্গে  শিবনারায়ণ রায় (১৯২১ - ২০০৮) লিখেছেন,
‘মনিষী তাঁরাই যারা পূর্বসূরিদের দ্বারা সৃজিত এবং অর্জিত সাংস্কৃতিক সম্পদের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত, যারা সেই উত্তরাধিকারের মূল্যায়নে সমর্থ, যারা সেই সম্পদের সংরক্ষণে সচেষ্ট এবং তারি সংগে সংগে যারা নব নব রূপের উদ্ভাবনে সক্ষম, যারা নব নব জিজ্ঞাসায় ব্যাপৃত, যারা স্বকীয় সৃষ্টির দ্বারা ঐতিহ্যকে সম্পন্নতর করতে উদ্যোগীসূক্ষ্ম অনুভূতি এবং নিপুণ প্রকাশ-সামর্থ্যের অনুশীলনে এরা নিরলস; নাচিকেত প্রশ্নশীলতা এবং অদম্য সৃজনপ্রেরণার অধিকারী হওয়ার ফলে অভ্যাসের জড়তা থেকে এঁরা অনেকটা মুক্ত। দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক, শিক্ষক, সাহিত্যিক এবং শিল্পী_ এঁরাই হলেন যে কোনো সমাজের সাংস্কৃতিক বিকাশের প্রধান উৎস। সৃষ্টি, আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনের দ্বারা এঁরা সংস্কৃতির সম্পদ বৃদ্ধি করেন; অপরপক্ষে বৈদগ্ধ এবং নিষ্ঠার দ্বারা এঁরা অর্জিত সংস্কৃতিকে অবক্ষয় এবং নিম্নগামিতার হাত থেকে রক্ষা করেন।’
এইখানে শিবনারায়ণ রায় যে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের সংস্কৃতির প্রধান কাণ্ডারি হিসেবে উল্লেখ করছেন তারা ছাড়াও শ্রমিক ও কৃষকদের সৃষ্টিকে সংস্কৃতির অন্যতম প্রেরণা ও শক্তিশালী উৎস হিসেবে বর্ণনা করলে সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে যথার্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আগামি যুগে শ্রমিক-কৃষকের সমাজতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সংস্কৃতিতেই জনমুক্তির মূল চাবিকাঠিটি নিহিত।

তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. শিবনারায়ণ রায়; গণতন্ত্র, সংস্কৃতি ও অবক্ষয়; দেজ পাবলিশিং; কলকাতা; তৃতীয় সংস্করণ, এপ্রিল ২০০০; পৃষ্ঠা-৪১।

No comments:

Post a Comment