Friday, April 11, 2014

জাসদ, ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের এক গণবিরোধী দলের নাম



জাসদের প্রতীক

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বা সংক্ষেপে জাসদ, গঠিত হয় ১৯৭২ সালে। এই দলটির নামের সাথে মিল পাওয়া যায় হিটলারের নামের দলটির। আডলফ হিটলারের (১৮৮৯ - ১৯৪৫) দলের নাম ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দল। শুরু থেকেই দলটির নাম নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয় এবং মার্কসবাদীরা এটিকে ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে বলতে শুরু করে। কেননা মার্কসবাদ কোনো জাতীয় ব্যাপার নয়। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের সংগ্রাম একটি অন্তর্জাতিকতাবাদী সংগ্রাম। মার্কসবাদে জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
জন্মলগ্ন থেকেই জাসদের মার্কসবাদবিরোধী অবস্থান নানাজনের মাধ্যমে উল্লেখিত হতে থাকে। এই দলের নেতারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান চালু করে জনপ্রিয়তা অর্জন করেএভাবে তারা মূলত মার্কস-যুগের শত বছরের পুরোনো বিতর্কটিকে ১৯৭২ সালে জাগিয়ে তোলেঅথচ মার্কস কাল্পনিক সমাজতন্ত্রকে বাতিল করেবৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করেছিলে এই বিতর্ককে সামনে এনে তারা মূলত সাম্রাজবাদের যুগের মার্কসবাদকে নাকচ করে বা লেনিনবাদকে নাকচ করে। সাম্রাজ্যবাদের সাথে নিপীড়িত জাতিগুলোর দ্বন্দ্বটিকে তারা আড়াল করে মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে।
১৯৯০ পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থায় সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের বিলুপ্তির পর সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বটির বিলুপ্তি ঘটে। এই দ্বন্দ্বটির স্থলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের নিজেদের সৃষ্ট মৌলবাদ নামক একটি দ্বন্দ্বকে সামনে আনে এবং বেতার-দূরদর্শন-পত্রিকা-অন্তর্জালে প্রচার চালায় গণতন্ত্রের এক নম্বর শত্রু এই মৌলবাদ। সাম্রাজ্যবাদের নিজেদের ভেতরের এই দ্বন্দ্বটিকেই বাংলাদেশে জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ন্যাপ নিজেদের কাজে লাগায় এবং বাংলাদেশের জনগণকে মৌলবাদী-অমৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক ভাগে বিভক্ত করে আওয়ামি লিগকে রক্ষার ও সমর্থনের ধারায় ঢুকে পড়ে। সমাজ ব্যাখ্যায় ধনী-গরিব, মালিক-শ্রমিক, জনগণ ও গণশত্রু ইত্যাদি মার্কসবাদী বিভাগের বিপরীতে তারা বুর্জোয়াদের ভাগ করা আর শাসন-শোষণ করার নীতিকে অবলম্বন করে। এভাবেই জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও ন্যাপ এখন গণবিরোধী মার্কসবাদবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল শিবিরের ঝাণ্ডা বহন করে চলেছে।
জাসদ, বাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি ১৯৭২ সালের সংবিধানে ফিরে যেতে চায়। তারা এই সংবিধানটিতেও প্রগতির বাণী খুঁজে পায়। তারা শেখ মুজিবের অগণতান্ত্রিকতাকে চোখে দেখেন না। অন্য জাতিগুলোর অধীনতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, সামন্তবাদ তোষণ, আমলাতন্ত্রের শক্তিবৃদ্ধির সাংবিধানিক নীতিটি তারা দেখেন না। এক্ষেত্রে ১৯৭২ সালের প্রতিক্রিয়াশীল সংবিধানটিকে সমর্থন করে এই দলগুলি সুবিধাবাদ-সংশোধনবাদে আত্মসমর্থন করেছে। ওই সংবিধানে জাতি সমস্যার সমাধান হয়নি বরং ফ্যাসিবাদী-বুর্জোয়ারা ওই সমস্যার সমাধান না করে সেটিকে জিইয়ে রেখে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগুলোকে অব্যাহতভাবে শোষণ করে যাচ্ছে।
জাসদ গণবাহিনী গঠন করেছিল যা হঠকারিতায় পর্যবসিত হয়। জনমত তৈরি না করে এবং শত্রুর শক্তির বেঠিক উপলব্ধির ফলে তারা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়। জনগণের সাথে সম্পর্কহীনতা এবং ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারার কার্যক্রম জাসদকে এক গণবিরোধী অবস্থানে দাঁড় করায়।
বিভিন্ন বস্তুর আলাদা আলাদা দ্বন্দ্বগুলো ও তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে বুঝেই সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট ও বামপন্থিদের বিকাসে বাংলাদেশের সমাজে প্রধান শত্রু বুর্জোয়া একনায়কত্বকে উৎখাত করার লড়াইটিই প্রধান দ্বন্দ্ব, বা সাম্রাজ্যবাদনির্ভর আওয়ামি-বিএনপিকে ক্ষমতা থেকে সরানোটাই প্রধান কাজ। আর বিশ্বসমাজে প্রধান শত্রু সাম্রাজ্যবাদফলে বাংলাদেশের সমাজের ও বিশ্বসমাজের এই দুই শত্রুর মোকাবেলা কীভাবে করা হবে সে প্রশ্ন মার্কসবাদীদের কাছে খুব জরুরি প্রশ্ন কিন্তু যদি শ্রেণিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মযুদ্ধ; রক্ষণশীলতা, প্রতিক্রিয়াশীলতা, মৌলবাদ ইত্যাদিকে জগাখিচুড়িরূপে বিশ্লেষণ করা হয় তবে প্রধান দ্বন্দ্বের সমাধান করে এগোনোর নীতিটি হারিয়ে যায়, এবং জাসদের তাই হয়েছে।
একসময় ইউরোপীয়রা এমন ছিটগ্রস্ত হয়েছিল যে, সবকিছুতে দেখতো কমিউনিজমের ভুত। আর আজ বাংলাদেশের ভুয়া-কমিউনিস্টরা এমনি ব্যধিগ্রস্ত হয়েছে যে তারা মৌলবাদের ভূতের ভয়ে ছিটগ্রস্ত। এবং এই ভূতের বিরুদ্ধে তারা নির্বাচনী ভুতের পিঠে সওয়ার হয়ে দেখছে কমিউনিজমের স্বপ্ন। কিন্তু মার্কসবাদে নির্বাচনটা বিপ্লবের অধীন, আর কমিউনিস্ট পার্টির কাজ বিপ্লব করা; কিন্তু বিপ্লবের নাম করে ১০টি নির্বাচনের ভেতর ৭-৮টিতে অংশ নেয়া লেনিনের নীতিবিরোধি। আর আজ যেখানে নির্বাচন মানেটাকা, পেশিশক্তি, প্রচারমাধ্যমের মাস্তানি, সেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ মার্কসবাদে না খুঁজে কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে বুঝলেই আমরা বুঝবো বাংলাদেশে নির্বাচনপন্থী ভুয়া-কমিউনিস্টরা নির্বাচনের প্রতিক্রিয়াশীলতাকে আড়াল করছেন।
১৯৮০ সালে বাসদ গড়ে ওঠার সময়ে জাসদ-বাসদ কোনো পক্ষে না গিয়ে লক্ষ্মীপুরের কিছু নেতাকর্মী আলাদা অবস্থান গ্রহণ করেন এবং এই দুই দলের মূল্যায়ন করে একটি বই লেখেন। সেখানে তারা জাসদ সম্পর্কে মোট ১১টি বক্তব্য তুলে ধরেন। সেসব বক্তব্যের বিষয় হচ্ছে জাসদ রাজনীতির মতাদর্শগত শৃঙ্খলাবোধ, বিপ্লবী পার্টির প্রক্রিয়া পদ্ধতি, কর্মসূচি ও কর্মকাণ্ড, ভ্রান্ত ও দোদুল্যমান রাজনৈতিক লাইন, গণবাহিনী সৃষ্টি ও বিলুপ্তি, মতাদর্শগত সংগ্রামের প্রক্রিয়া পদ্ধতি এবং তৎকালীন তাত্ত্বিক নেতাদের অতীত সম্পর্কে। বইটির শুরুতেই তারা লেখেন,
জাসদ মূলত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনাবিহীন গতানুগতিক রাজনৈতিক ধারায় বিশ্বাসী একটি সংগঠন যার উদ্দেশ্য ছিল যেনতেনভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করা। জাসদ নেতৃত্ব প্রধানত পেশাদার উকিল, মোক্তার, ডাক্তার, ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী ইত্যাদি ধরনের বুর্জোয়া ক্ষুদে-বুর্জোয়া চরিত্র সম্পন্ন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে _ যারা বিপ্লবী রাজনীতির জ্ঞান বিবর্জিত, ক্ষমতালোভী, সুবিধাবাদী ও দোদুল্যমান, যারা নিজেরাই বিশ্বাস করে না, সর্বহারার সমাজ বিপ্লব সম্ভব।
লক্ষ্মীপুরের নেতাকর্মীরা গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব একত্রে সম্পন্ন করার ভ্রান্ত তত্ত্বের জাসদীয়-বাসদীয় যুক্তিকে খণ্ডন করেন। জাসদ সম্পর্কে একই প্রশ্ন ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে সিরাজ শিকদারের (২৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৪ - ২ জানুয়ারি, ১৯৭৫) নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিলতিনি লিখেছিলেন, 
সর্বহারার একনায়কত্ব ব্যতীত সমাজতন্ত্র হচ্ছে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা ফ্যাসিবাদ আপনারা মার্কসবাদ মানেন, মার্কসবাদ শিক্ষা দেয় যে, জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করতে হয় পূর্ব বাংলায় কি জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে?… আপনারা গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার পরিবর্তে সমাজতন্ত্রের কথা বলে জনগণকে তাদের বর্তমানের প্রকৃত শত্রু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের দালালদের আড়াল করছেন ইহা প্রকৃতপক্ষে শত্রুর তাবেদারী ব্যতীত আর কিছুই নয়জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা করতে হবে 
বর্তমানে জাসদের একটি খণ্ডের নেতা হচ্ছে হাসানুল হক ইনু। সেই নেতা ইতিমধ্যে ঘোষণা দিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র চালু হয়ে গেছে। ফ্যাসিবাদী কায়দায় সে আরো বলেছে, বাংলাদেশে যেহেতু হাসিনার মাধ্যমে ‘সমাজতন্ত্র ফিরে এসেছে’ তাই এখন ‘সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না’।  
মার্কসবাদ-লেনিনবাদবিরোধী এই পার্টিটি ১৯৭১ পরবর্তী উত্তেজনাকালে বাংলাদেশের তারুণ্যকে ভুলপথে পরিচালিত করে নেকড়ের খাঁচায় নিক্ষেপের জন্য আগামিতে বহুদিন দায়ি থাকবে।

তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. আ. ও. ম. শফিকউল্লা এবং অন্যান্য; জাসদ-বাসদের ভ্রান্ত, দোদুল্যমান ও বিভ্রান্তিকর রাজনীতি প্রসঙ্গে; লক্ষ্মীপুর গ্রুপ; ঢাকা; ১৬ জুলাই, ১৯৮১; পৃস্থা-৩।
. সিরাজ শিকদার; জাসদ রব গ্রুপের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন; সিরাজ শিকদার রচনা সংগ্রহ, শ্রাবণ, ফেব্রুয়ারি, ২০০৯; পৃষ্ঠা-৩৪৯-৩৫১।
৩. Tue, 06 May, 2014, খবরের লিংক

No comments:

Post a Comment