Sunday, June 22, 2014

সমাজ গণতন্ত্র কী এবং কেন বর্জনীয়




লাল গোলাপ, সমাজ গণতন্ত্রের লোগো
সমাজ গণতন্ত্র (ইংরেজি: Social Democracy) হচ্ছে এমন একটি রাজনৈতিক মতবাদ যা সংস্কারবাদী এবং ধারাবাহিকতাবাদী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রীতিমাফিক কাজ করে।[১] আলাদাভাবে বললে সমাজ-গণতন্ত্রের সংজ্ঞা হচ্ছে এমন এক নীতির প্রশাসনপদ্ধতি যা পুঁজিবাদী অর্থনীতির কাঠামোর ভেতরে একটি বৈশ্বিক কল্যাণ রাষ্ট্র এবং যৌথ দরকষাকষির বিন্যাস। এটাকে প্রায় ব্যবহার করা হয় সেই ঢঙকে নির্দেশ করার জন্য যা বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপের সামাজিক মডেল এবং অর্থনৈতিক নীতিকে নির্দেশ করে।[২]   
সমাজ-গণতন্ত্র কমিউনিস্ট পার্টিকে সমাজ-বিপ্লবের পার্টি থেকে রূপান্তরিত করে এটিকে বানিয়ে ফেলে সামাজিক সংস্কারের গণতান্ত্রিক পার্টিতে; বৈপ্লবিক সাম্যবাদ থেকে বুর্জোয়া সমাজ-সংস্কারবাদে পল্টি মারার পার্টিতে। তারা কমিউনিস্ট পার্টিকে বামপন্থী পার্টিতে পরিণত করে, পার্টিতে সুবিধাবাদী মতধারার স্বাধীনতা ঢোকায়, সংস্কারের গণতান্ত্রিক পার্টিতে পরিণত করে এবং সমাজতন্ত্রের ভেতরে বুর্জোয়া ভাব-ধারনা আর বিভিন্ন বুর্জোয়া উপাদান চালু করে। সমাজ গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিতে গেয়ে এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন বলেছেন,
সমাজ গণতন্ত্রের প্রত্যাশা বা আশা করা উচিত নয় বিরাজমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আসন্ন পতন... যা সমাজ গণতন্ত্রের হওয়া উচিত, এবং আগামির দীর্ঘ সময় ধরে করা উচিত, শ্রমিক শ্রেণিকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা, তাদেরকে গণতন্ত্রের জন্য প্রশিক্ষিত করা, এবং রাষ্ট্রের সব বা যে কোনো সংস্কারের জন্য লড়াই করা যা মূলত শ্রমিক শ্রেণির উত্থানে পরিকল্পনা করে এবং রাষ্ট্রকে অধিক গণতান্ত্রিক করে।”[৩]
সমাজ-গণতন্ত্রীরা প্রায়ই মার্কসবাদের নাম মুখে নিয়ে মার্কসবাদের অভ্যন্তরের বিপ্লবী সত্ত্বাকে ধ্বংস করে; পার্টির নেতৃত্বে সর্বহারার একনায়কত্ব কায়েমের বিরোধিতা করে; নির্বাচনে অংশগ্রহণের কথা বলে সংসদের ভেতরে লড়াই চালানোর ওকালতি করে, কিন্তু সংসদে একবার ঢুকলে ওখান থেকে আর বেরোয় না; নির্বাচনের মাধ্যমে একবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারলে গণতন্ত্রকে টুঁটি চেপে মারতে চেষ্টা করে, যার ফলে সমাজ-গণতন্ত্র থেকেই ফ্যাসিবাদের উৎপত্তি ঘটে।
সমাজ-গণতন্ত্রীদের ফাঁকা বিপ্লবী বুলি ও মিষ্টি কথা দ্বারা বিভ্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। সমাজগণতন্ত্রী ব্যক্তিরা মুখে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের কথা বলেন, কিন্তু নির্বাচন ও ট্রেড ইউনিয়নের বাইরে অন্য কোনো ধরনের লড়াইয়ের পথে যান না। সমাজগণতন্ত্রী সান্ধ্যকালিন বিপ্লবীরা এবং অলস আমলাতন্ত্রীরা মূলত  শ্রেণিসংগ্রামকে চুলায় ঢুকিয়ে অফিসে থাকতে পছন্দ করে। এক কথায় সমাজ-গণতন্ত্রীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওবাদ এবং সমাজ-বিপ্লব বিরোধী এক প্রতিক্রিয়াশীল এবং কতিপয় ক্ষেত্রে এক সংশোধনবাদী ধারার নাম।

তথ্যসূত্র:
১. Busky, Donald F. (2000), Democratic Socialism: A Global Survey, Westport, Connecticut, USA: Greenwood Publishing Group, Inc., p. 8, "The Frankfurt Declaration of the Socialist International, which almost all social democratic parties are members of, declares the goal of the development of democratic socialism"
২. Foundations of social democracy, 2004. Friedrich-Ebert-Stiftung, p. 8, November 2009
৩. Steger, The Quest for Evolutionary Socialism, p. 80. ইংরেজি বাক্যগুলো এইরকম: "Social democracy should neither expect nor desire the imminent collapse of the existing economic system … What social democracy should be doing, and doing for a long time to come, is organize the working class politically, train it for democracy, and fight for any and all reforms in the state which are designed to raise the working class and make the state more democratic." Eduard Bernstein

Saturday, June 21, 2014

বাসন্তী লটকনটিয়া বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি



বাসন্তী লটকনটিয়া, ছেলে, ফটো: ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে
দ্বিপদ নাম: Loriculus vernalis
সমনাম: Psittacus vernalis Sparrman, 1787
বাংলা নাম: বাসন্তী লটকনটিয়া  
ইংরেজি নাম: Vernal Hanging Parrot, (Indian Lorikeet).

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য Kingdom: Animalia
বিভাগ/Phylum: Chordata
শ্রেণী/Class: Aves
পরিবার/Family: Psittacidae
গণ/Genus: Loriculus, Blyth, 1850;  
প্রজাতি/Species: Loriculus vernalis (Sparrman, 1787)
ভূমিকা: বাংলাদেশের পাখির তালিকাLoriculus গণে বাংলাদেশে রয়েছে ১টি প্রজাতি এবং পৃথিবীতে রয়েছে এর ১২টি প্রজাতিবাংলাদেশে প্রাপ্ত এবং আমাদের আলোচ্য প্রজাতিটির নাম হচ্ছে বাসন্তী লটকনটিয়া
বর্ণনা: বাসন্তী লটকনটিয়া লাল ঠোঁট ও সবুজ দেহের ছোট্ট গোলগাল টিয়া (দৈর্ঘ্য ১৪ সেমি, ডানা ৯.৬ সেমি, ঠোঁট ১.৩ সেমি, পা ১.১ সেমি, লেজ ৪.৩ সেমি)। এর লাল কোমর, লেজউপরি-ঢাকনি ও গলার নীলকান্তমণি রঙের পট্টি ছাড়া পুরো দেহ সবুজ; লালচে-কমলা অথবা প্রবাল-লাল ঠোঁটের আগা হলুদ; চোখ বাদামি-পীতাভ কিংবা হলুদাভ-সাদা বা ধূসরাভ-খাকি; পা ও পায়ের পাতা ফিকে-কমলা কিংবা ফিকে হলুদাভ-স্লেট এবং নখর শিঙ-বাদামি। মেয়েপাখির গলার অপর্যাপ্ত নীলকান্তমণি পট্টির সাহায্যে ছেলে থেকে আলাদা করা যায়। তরুণ পাখির চোখ বাদামি, কোমর লাল ও লেজের উপরি-ঢাকনি লাল-সবুজে মেশানো।
স্বভাব: বাসন্তী লটকনটিয়া আর্দ্র পাতাঝরা ও প্রশস্ত পাতাওয়ালা চিরসবুজ বনে বিচরণ করে; সচরাচর পারিবারিক দলে কিংবা সর্বাধিক ৫০টি পাখির ঝাঁকে দেখা যায়। বনের ফলদ গাছে এরা খাবার খায়; খাদ্যতালিকায় রয়েছে বন্য ডুমুরের নরম ফলত্বক, রসালো ফল, বাঁশ বীজ ও ফুলের মিষ্টি রস। ঝুলে থাকতে এরা পছন্দ করে, গাছের ডালে উল্টো ঝুলে বিচরণ করে, খাবার খায় ও বিশ্রাম নেয়; ওড়ার সময় পুনঃপুন ডাকে: চট-চট-চট..। জানুয়ারি-জুন মাসের প্রজনন ঋতুতে মরা গাছের প্রাকৃতিক গর্তে সচরাচর সবুজ পাতার পত্রফলক বিছিয়ে ১ মিটার গভীর বাসা বানিয়ে এরা ডিম পাড়ে। ডিমগুলো চকচকে সাদা, কখনও বাদামি রঙের; সংখ্যায় ৩-৪টি; মাপ ১.৯×.সেমি.।
বিস্তৃতি: বাসন্তী লটকনটিয়া বাংলাদেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি; চট্টগ্রাম, সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বন বনভূমিতে পাওয়া যায়। ভারত, নেপাল, মায়ানমার ও ইন্দোচীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা: বাসন্তী লটকনটিয়া বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ: বাসন্তী লটকনটিয়াবৈজ্ঞানিক নামের অর্থ সবুজ লোরি (মালয়:lori = লোরি, ল্যাটিন: culus = এর; vernalis = সবুজ)।
বাংলাদেশ উদ্ভিদ প্রাণী জ্ঞানকোষে এই নিবন্ধটির লেখক কাজী জাকের হোসেন

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

বড় কুবো বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি




বড় কুবো, ফটো: ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে
দ্বিপদ নাম: Centropus sinensis
সমনাম: Polophilus sinensis Stephens, 1815
বাংলা নাম: বড় কুবো   
ইংরেজি নাম: Greater Coucal.

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য Kingdom: Animalia
বিভাগ/Phylum: Chordata
শ্রেণী/Class: Aves
পরিবার/Family: Centropodidae
গণ/Genus: Centropus, Illiger, 1811;  
প্রজাতি/Species: Centropus sinensis (Stephens, 1815)
ভূমিকা: বাংলাদেশের পাখির তালিকাCentropus গণে বাংলাদেশে রয়েছে ২টি প্রজাতি এবং পৃথিবীতে রয়েছে এর ২৬টি প্রজাতিবাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রজাতি দুটি হচ্ছে ১. বাংলা কুবো এবং ২. বড় কুবো। আমাদের আলোচ্য প্রজাতিটির নাম হচ্ছে বড় কুবো
বর্ণনা: বড় কুবো বড় কালো পর্যায়ক্রমিক বিন্যস্ত পালকে লেজওয়ালা কাকের মত পাখি (দৈর্ঘ্য ৪২ সেমি., ওজন ২৫০ গ্রাম, ডানা ১৯ সেমি., ঠোঁট ৩.২ সেমি., পা ৫.৮ সেমি., লেজ ২৪ সেমি.)। পিঠ তামাটে ও দেহতল চকচকে কালো। উজ্জ্বল তামাটে ম্যান্টল ও ডানা ছাড়া পুরো দেহই কালো। পর্যায়ক্রমিক সজ্জিত পালকের লেজ কালো হয়। চোখ লাল এবং ঠোঁট, পা, পায়ের পাতা ও নখর কালো। ছেলে মেয়েপাখিরা দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের পিছনটায় ফ্যাকাসে-লালচে ফুটকি এবং ম্যান্টল, পিঠ, ডানা ও পাছায় ডোরাসহ দেহের উপরিভাগ বাদামি-কালো । কালচে বাদামি দেহতলে সরু সাদা ডোরা থাকে। অনুজ্জ্বল তরুণ পাখির উড্ডয়ন পালক ও লেজে ডোরা থাকে। ৬টি উপ-প্রজাতির মধ্যে C. s. sinensisC. s. intermedius বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
স্বভাব: বড় কুবো আলোকময় বন, বাগান ও মানববসতির কাছাকাছি বাস করে। সাধারণত একা বা জোড়ায় বিচরণ করে। মাটিতে ধীরে হেঁটে এবং হঠাৎ শিকারকে ঠোঁট ও পা দিয়ে চেপে ধরে শিকার করে। খাবার তালিকায় পোকামাকড়, শামুক, ব্যাঙ, টিকটিকি, সাপ, ডিম, পাখির ছানা, ইঁদুর ইত্যাদি রয়েছে। একই অবস্থানে বসে দিনের অধিকাংশ সময় কাটায় ও ভূচর পাখি। ওড়ার চেয়ে বেশ দৌড়াতে পারে সচরাচর অনুরক্তিক উচ্চ থেকে নিচু গভীর ও প্রতিধ্বনিত সুরে ডাকে: কুপ-কুপ...। জুন-আগস্ট মাস প্রজনন ঋতু। পূর্বরাগের সময় ছেলেপাখি লেজ নিচু করে, ডানা নামায় ও কর্কশ গলায় চিৎকার করে স্কি-ই-ইয়া-আও ডেকে মেয়েপাখিকে অনুসরণ করে। ঘন ঝোপ, বাঁশবন ও ঘাসে পল্লব ও পাতা দিয়ে পার্শ্বীয় প্রবেশপথসহ খাদ ওয়ালা পেয়ালার মত বাসা বানায় এবং মেয়েপাখি ৩-৪টি ডিম পাড়ে। ডিম সাদা, মাপ ৪.০×২.৮ সেমি.।
বিস্তৃতি: বড় কুবো বাংলাদেশের সুলভ আবাসিক পাখি; সব বিভাগের বনপ্রান্তে গ্রামাঞ্চলে পাওয়া যায়। চীন, ফিলিপাইন ও ভারত উপমহাদেশসহ (মালদ্বীপ ব্যতিত) পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে।
অবস্থা: বড় কুবো বিশ্বে ও বাংলাদেশে বিপদমুক্ত বলে বিবেচিত। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
বিবিধ: বড় কুবোর বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ চীনের গজালের মত নখর ওয়ালা পায়ের পাখি (গ্রীক:kentron = গজালের মত নখর, pous = পা ; ল্যাটিন: sinensis =চীনের)।
বাংলাদেশ উদ্ভিদ প্রাণী জ্ঞানকোষে এই নিবন্ধটির লেখক মো: আনোয়ারুল ইসলাম ও সুপ্রিয় চাকমা

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

Recommended