Friday, June 13, 2014

বিপ্লবের পরিব্রাজক চে গ্যেভারা



চে, টাকা সম্পর্কে

এর্নেস্তো গ্যেভারা দে লা সের্না (স্পেনীয় ভাষায় Ernesto Guevara de la Serna) বা চেগ্যেভারা, (Che Guevara) (জুন ১৪, ১৯২৮-অক্টোবর ৯, ১৯৬৭) বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে খ্যাতিমান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীদের অন্যতম। তার আসল নামএর্নেস্তো গেভারা দে লা সেরনা। জন্মসুত্রে তিনি আর্জেন্টিনার নাগরিক হলেও ছিলেন বিপ্লবের এক লড়াকু পরিব্রাজক তিনি পেশায় একজন ডাক্তার এবং ফিদেল কাস্ত্রোর দলে প্রথমে চিকিৎসক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদী প্রচারমাধ্যম তাঁকে গোটা দুনিয়ার তরুণদের কাছে অনুকরণীয় এক বিপ্লবীর মডেলে পরিণত করে

যুবক বয়সে মেডিসিন বিষয়ে পড়ার সময় চে দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন যা তাকে অসহায় মানুষের দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করার সুযোগ এনে দেয়। চে বুঝতে পারেন ধনী-গরিবের এই ব্যবধান ধ্বংস করে দেবার জন্য বিপ্লব ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন থেকেই তিনি মার্কসবাদ নিয়ে পড়ালেখা শুরু করেন এবং স্বচক্ষে এর বাস্তব প্রয়োগ দেখার জন্য গুয়াতেমালা ভ্রমণ করেন।

তরুণ বয়সে ডাক্তারি ছাত্র হিসেবে চে সমগ্র লাতিন আমেরিকা ভ্রমণ করেছিলেন। এই সময় এই সব অঞ্চলের সর্বব্যাপী দারিদ্র্য তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। এই ভ্রমণকালে তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে এই অঞ্চলে বদ্ধমূল অর্থনৈতিক বৈষম্যের স্বাভাবিক কারণ হল রাষ্ট্রের একচেটিয়া পুঁজিবাদ, নব্য ঔপনিবেশিকতাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ; এবং এর একমাত্র সমাধান হল বিশ্ব বিপ্লব।[১] এই বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে চে রাষ্ট্রপতি জাকোবো আরবেনজ গুজমানের নেতৃত্বাধীন গুয়াতেমালার সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৪ সালে সিআইএ-এর ষড়যন্ত্রে গুজমানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে চে-র বৈপ্লবিক চেতনা বদ্ধমূল হয়। তিনি মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো  ধ্বংস হবার জন্য পুঁজি ও টাকাকেই দায়ি করেন এবং বলেন,
পুঁজিবাদি ব্যবস্থায় মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রিত হয় মানুষের ধারণাতীত একটি নিষ্ঠুর নিয়মের বাঁধনেবিচ্ছিন্ন ব্যক্তিটি সমাজের সমষ্টির সংগে বাঁধা থাকে একটি অদৃশ্য নাড়ির টানে_ টাকার নিয়মের বাঁধনেজীবনের সমস্ত ক্ষেত্রেই তা সক্রিয় এবং নির্ধারিত করে জীবনের গতি ও ভাগ্যকে।”[২]

পরবর্তীকালে মেক্সিকো সিটিতে বসবাসের সময় তাঁর সঙ্গে রাউল ও ফিদেল কাস্ত্রোর আলাপ হয়। ১৯৫৬ সালে চে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সংগঠন ছাব্বিশে জুলাই আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৫৯ সালে এই সংগঠন কর্তৃক কিউবার ক্ষমতা দখলের পর তিনি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন নিবন্ধ ও বই রচনা করেন।
১৯৬৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, আলজিয়ার্সে “আফ্রো-এশীয় সংহতি” আয়োজন করে এক “অর্থনৈতিক সেমিনারের” যেখানে চে বক্তৃতায় সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আগুন বর্ষণ করেন এবং এটিই চে’র সবশেষ প্রকাশ্য আন্তর্জাতিক বক্তৃতা হিসেবে গণ্য হয়। এখানেই তিনি রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি সাম্রাজ্যবাদী শোষণকারী হিসেবে উল্লেখ করেন। ৩ নভেম্বর, ১৯৬৬-তে চে বলিভিয়ার রাজধানী লাপাজে পৌঁছান। তার ইচ্ছা ছিল কঙ্গো-কিনশাসা ও বলিভিয়াতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। বলিভিয়াতে থাকার সময় গেরিলা যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি সিআইএ-র মদদপুষ্ট বলিভিয়ান বাহিনীর কাছে ধরা পড়েন। ১৯৬৭ সালের ৯ই অক্টোবর, বলিভিয়ার শহর লা হিগুয়েরাতে বলিভিয়ার সেনাবাহিনী তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তিনি গেরিলা যুদ্ধ এবং অস্ত্র হাতে তুলে নেবার যুক্তি সম্পর্কে বলতে গিয়ে যা বলেন তাতে এই কথায় সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে বিদ্রোহ ন্যায়সংগত,
গেরিলা যোদ্ধারা কেন যুদ্ধ করে? শেষ পর্যন্ত অনিবার্যভাবেই আমাদের বুঝতে হবে যে গেরিলা যোদ্ধা হচ্ছে একজন সমাজ সংগঠক, যে অস্ত্র তুলে নেয় নিপীড়ক শাসকের বিরুদ্ধে জনতার হয়ে উত্তর দেবার জন্য, এবং সে যুদ্ধ করে সেই সমাজব্যাবস্থার বিরুদ্ধে যা তার অস্ত্রহীন ভাইদের অবমাননা ও দুর্দশার ভেতরে রাখে।”
মৃত্যুর পর তিনি যুগে যুগে সাম্যবাদ অনুসারী বিদ্রোহীদের কাছে কাছে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ও অসীম প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র:  
১. A speech by Che Guevara to the Second Economic Seminar of Afro-Asian Solidarity in Algiers, Algeria on February 24, 1965;
২. সুজিত সেন সম্পাদিত; লাতিন আমেরিকা ও কিউবা, বিপ্লবি সংগ্রামের ধারা; পুস্তক বিপণী; কোলকাতা; পৃষ্ঠা ২৮৯। চে লিখিত প্রবন্ধ সমাজতন্ত্র ও মানুষ থেকে;

No comments:

Post a Comment