Tuesday, June 24, 2014

সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা, সভাপতি মাও সেতুঙের উদ্ধৃতি



পুরো বস্তুবাদীরা নির্ভীক, মাও সেতুং
২৭. সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা
*** কমিউনিস্ট পার্টি সমালোচনাকে ভয় করে না, কারণ আমরা মার্কসবাদী, সত্য আমাদের পক্ষে এবঙ বুনিয়াদি জনসাধারণ_ শ্রমিক ও কৃষকেরা আমাদের পক্ষে। প্রচার কার্য সম্পর্কে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ, (১২ মার্চ, ১৯৫৭)  
*** পুরো বস্তুবাদীরা নির্ভীক, আমরা আশা করি যে, সমস্ত লোক যাঁরা আমাদের সংগে একত্রে সংগ্রাম করেন, তাঁরা সাহসের সংগে তাঁদের দায়িত্ব বহন করবেন, বাধাবিঘ্নকে অতিক্রম করবেন, অকৃতকার্যতাকে ভয় করবেন না, কেউ গুজব রটালে কিংবা বিদ্রুপ করলে তা'ও ভয় করবেন না এবং আমাদের কমিউনিস্টদের প্রতি সমালোচনা চালাতে ও প্রস্তাব পেশ করতেও ভয় করবেন না। “সমস্ত শরীর ক্ষতবিক্ষত হলেও সম্রাটকে ঘোড়া থেকে সাহসের সংগে টেনে নামিয়ে দিতে হবে”_সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের জন্য সংগ্রামে আমাদের অবশ্যই এই ধরনের নির্ভীকতার মহান মনোবল থাকতে হবে। প্রচার কার্য সম্পর্কে চিনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় সম্মেলনে প্রদত্ত ভাষণ, (১২ মার্চ, ১৯৫৭)
*** সমালোচনা ও আত্মসমালোচনা_এই মার্কসবাদী-লেনিনবাদী হাতিয়ার আমাদের কাছে রয়েছে। আমরা অশুভ রীতিকে ত্যাগ করতে পারি এবং শুভ রীতিকে বজায় রাখতে পারি। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সপ্তম কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বিতীয় পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে প্রদত্ত রিপোর্ট; ৫ মার্চ, ১৯৪৯
*** প্রকৃত আত্মসমালোচনা করা হয় কি না, এটাও হচ্ছে অন্যান্য রাজনৈতিক পার্টির থেকে আমাদের পার্টির পারস্পরিক পার্থক্যের অন্যতম সুস্পষ্ট নিদর্শন। যেমন আমরা বলি, ঘরে নিয়মিত ঝাড়ু দিতে হবে, ঝাড়ু না দিলে ধূলো জমবে; মুখ নিয়মিত ধুতে হবে, না ধুলে মুখও নোংরা হয়ে যাবে। আমাদের কমরেডদের চিন্তাধারায়ও আমাদের পার্টির কাজেও ধূলো জমতে পারে, তাও ঝাড়ু দেয়া ও ধোয়া প্রয়োজন। “স্রোতের জল দূষিত হয় না, কপাটের কব্জা পোকায় খায় না”_ এ প্রবাদের অর্থ হচ্ছে যে, তারা অবিরাম গতির মধ্যে জীবাণু বা অন্যান্য জীবসত্তার অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করে। আমাদের পক্ষে, আমাদের কাজকে নিয়মিতভাবে যাচাই করা, যাচাইয়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক রীতির বিস্তার করা, সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার ভয় না করা এবং “যা জানেন বলুন, যদি বলেন সবটাই বলুন,” “বক্তাকে দোষ দেবেন না, তাঁর কথাকে সতর্কবাণী হিসেবে গ্রহণ করুণ”, “ভুল থাকলে তাকে শুধরে নিন, না থাকলে সতর্ক হোন” চীনা জনগণের এসব হিতকর নীতিকথা প্রয়োগ করা_ এটাই হচ্ছে আমাদের কমরেডদের চিন্তাধারায় ও আমাদের পার্টির দেহে নানা রকম রাজনৈতিক ধূলো ও রাজনৈতিক জীবাণুর অনুপ্রবেশকে প্রতিরোধ করার একমাত্র কার্যকরী উপায়। “যুক্ত সরকার সম্পর্কে” (২৪ এপ্রিল, ১৯৪৫)
*** পার্টির ভেতরে বিভিন্ন চিন্তাধারার বিরোধ ও সংগ্রাম নিরন্তর ঘটতে থাকে। এ হচ্ছে পার্টির ভেতরে সমাজের শ্রেণীর দ্বন্দ্বের এবং নূতন ও পুরাতনের মধ্যকার দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। পার্টির ভেতরে যদি দ্বন্দ্ব না থাকে এবং তা সমাধান করার জন্য মতাদর্শগত সংগ্রাম না থাকে, তাহলে পার্টির জীবন শেষ হয়ে যাবে। দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে (আগস্ট, ১৯৩৭) 
*** আমরা সক্রিয় মতাদর্শগত সংগ্রামের পক্ষ নেই, কারণ এটা হচ্ছে লড়াইয়ের স্বার্থে পার্টির ভেতরকার ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর ভেতরকার ঐক্যলাভের হাতিয়ার। প্রত্যেক কমিউনিস্ট ও বিপ্লবীর এই হাতিয়ার গ্রহণ করা উচিত।
কিন্তু উদারতাবাদ মতাদর্শগত সংগ্রামকে বাতিল করে দেয় এবং নীতিহীন শান্তির পক্ষ নেয়, এর ফলে ক্ষয়িষ্ণু ও অশিষ্ট রীতির সৃষ্টি হয় এবং পার্টি ও বিপ্লবী সংগঠনগুলোর কোনো কোনো ইউনিট এবং কোনো কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক অধঃপতন ঘটে। উদারতাবাদের বিরোধিতা প্রসঙ্গে (সেপ্টেম্বর, ১৯৩৭)
*** আত্মমুখীবাদ, সংকীর্ণতাবাদ ও পার্টিতে একঘেয়ে ধরনের লেখার বিরোধিতা করার সময় আমাদের অবশ্যই দু’টি কথার প্রতি মনোযোগ দিতে হবে: প্রথমটা হচ্ছে “অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের ভুল এড়ানো”, দ্বিতীয়টা হচ্ছে “রোগ সারিয়ে রোগীকে বাঁচানো”। মুখ না দেখে অতীতের ভুলগুলো অবশ্যই প্রকাশ করে দিতে হবে, অতীতের খারাপ বস্তুকে বৈজ্ঞানিক মনোভাব দিয়ে বিশ্লেষণ করা ও সমালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে করে ভবিষ্যতের কাজ আরও সতর্কতার সংগে ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। এটাই হচ্ছে “অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতের ভুল এড়ানোর” অর্থ। কিন্তু ভুল উদঘাটন করার ও ত্রুটি সমালোচনা করার আমাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেমন চিকিৎসক রোগীর চিকিৎসা করেন সম্পূর্ণভাবে রোগীকে বাঁচানোর জন্যই_ তাকে মেরে ফেলার জন্য নয়। একজন এপেন্ডিসাইটিস রোগে ভুগছে, এমন ব্যক্তির উপাঙ্গটি চিকিৎসক যদি কেটে দেন তখনই সে বাঁচে। কোনও লোক ভুল করে, যদি সে চিকিৎসার ভয় না করে, রোগকে গোপন না রাখে, ভুলকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে না ধরে, চিকিৎসার সাধ্যাতীত অবস্থায় না পড়ে এবং সত্যি সত্যি আন্তরিকভাবে চিকিৎসা করতে চায় ও ভুল শোধরাতে ইচ্ছুক থাকে, তবে আমাদের উচিত তাকে স্বাগত জানানো ও তার রোগ সারানো, যাতে সে একজন ভালো কমরেড হয়ে উঠে। যদি ক্ষণিক আত্মতুষ্টির জন্য তীব্র কশাঘাত করা হয়, তাহলে একাজ কখনো সফল হবে না। মতাদর্শগত বা রাজনৈতিক ব্যাধির চিকিৎসায় কখনো রুক্ষ ও বেপরোয়া মনোভাব গ্রহণ করা উচিত নয়, বরং “রোগ সারিয়ে রোগীকে বাঁচানো”_ এই মনোভাব গ্রহণ করা উচিত, শুধু এটাই নির্ভুল ও ফলপ্রদ পদ্ধতি। “পার্টির রীতির শুদ্ধিকরণ” (১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪২)
*** পার্টির ভেতরকার সমালোচনার সমস্যা সম্পর্কে আর একটি বিষয়ের উল্লেখ করা উচিত, টা হচ্ছে এই যে, কোনো কোনো কমরেড সমালোচনা করার সময় বড় বড় বিষয়ের উপর মনোযোগ না দিয়ে কেবলমাত্র ছোটখাটো বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেন। তাঁরা বোঝেন না যে, সমালোচনার প্রধান কর্তব্য হচ্ছে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভুল-ভ্রান্তি দেখিয়ে দেওয়া। ব্যক্তিগত ত্রুটির ব্যাপারে, যদি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভুল-ভ্রান্তির সংগে জড়িত না হয়, তাহলে ছিদ্রানুসন্ধানের কোনো দরকার নেই। অন্যথায়, কমরেডরা হতভম্ব হয়ে পড়বেন। অধিকন্তু, এ ধরনের সমালোচনা যদি একবার বিকাশ লাভ করে, তাহলে পার্টির ভেতরের মনোযোগ শুধু ছোটখাটো ত্রুটির উপরেই কেন্দ্রীভূত হবে এবং প্রত্যেকেই ভীরু ও অতি সাবধানী ভদ্রলোক হয়ে পড়বেন, আর ভুলে যাবেন পার্টির রাজনৈতিক কর্তব্য। এটা খুবই বিপদজনক। “পার্টির ভেতরকার ভুল চিন্তাধারা সংশোধন করা সম্পর্কে” (ডিসেম্বর, ১৯২৯)
*** পার্টির ভেতরকার সমালোচনায়, আত্মমুখীতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও সমালোচনার ইতরামির বিরুদ্ধে সতর্ক হতে হবে, কথা বলার সময় তথ্যভিত্তিক হতে হবে এবং সমালোচনায় রাজনৈতিক দিকের উপর মনোযোগ দিতে হবে। “পার্টির ভেতরকার ভুল চিন্তাধারা সংশোধন করা সম্পর্কে” (ডিসেম্বর, ১৯২৯)
*** পার্টির ভেতরকার সমালোচনা হচ্ছে পার্টির সংগঠনকে সুদৃঢ় করার ও পার্টির সংগ্রামী শক্তিকে বৃদ্ধি করার একটা হাতিয়ার। কিন্তু লাল ফৌজের পার্টির ভেতরকার সমালোচনা যে সব সময়েই এই প্রকৃতির হয় তা নয়, কোনো কোনো সময় তা ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত হয়। তার ফলে, শুধুমাত্র ব্যক্তি-বিশেষেরই নয়, বরং পার্টির সংগঠনেরও সর্বনাশ হয়। এটা হচ্ছে ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণির ব্যক্তিতাবাদের অভিব্যক্তি। শুধরানোর পদ্ধতি হচ্ছে পার্টি-সদস্যদের বুঝানো যে, সমালোচনার উদ্দেশ্য হলো শ্রেণিসংগ্রামে জয়লাভের জন্য পার্টির সংগ্রামী শক্তিকে বাড়ানো; আর সমালোচনাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। “পার্টির ভেতরকার ভুল চিন্তাধারা সংশোধন করা সম্পর্কে” (ডিসেম্বর, ১৯২৯)
*** আমরা জনগণের সেবা করি, তাই আমাদের কোনো ত্রুটি থাকলে, তা দেখিয়ে কোনো লোক আমাদের সমালোচনা করলে, আমরা ভয় করি না। যিনিই হোন না কেন, সবাই আমাদের ত্রুটি দেখিয়ে দিতে পারেন। যদি আপনার কথা ঠিক হয়, তাহলে আমরা নিজেদের ত্রুটি শুধরে নেব। আপনি যে প্রস্তাব করবেন তাতে যদি জনগণের উপকার হয়, তবে আমরা আপনার প্রস্তাব অনুসারেই কাজ করবো। “জনগণের সেবা” (৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৪)
*** আমরা চীনা কমিউনিস্টরা ব্যাপকতম চীনা জনগণের সর্বোচ্চ স্বার্থকে আমাদের সমস্ত কাজের যাত্রাবিন্দু বলে মনে করি; আমাদের কার্য সম্পূর্ণ ন্যায়সঙ্গত বলে আমরা বিশ্বাস করি, নিজদের সবকিছু ত্যাগ করতে মোটেই দুঃখবোধ করি না, নিজদের কার্য সাধনের জন্য আমরা সব সময়েই প্রাণ বলিদানে প্রস্তুত। তাই জনগণের অনুপযোগী চিন্তাধারা, দৃষ্টিকোণ, মতামত বা পদ্ধতি ত্যাগ করতে কি অনিচ্ছুক হতে পারি? আমরা কি কোনো রাজনৈতিক ধূলো ও রাজনৈতিক জীবাণুকে আমাদের নির্মল মুখমণ্ডলকে নোংরা করতে অথবা আমাদের সুস্থ দেহে সংক্রমিত হতে স্বাগত জানাতে পারি। অসংখ্য বিপ্লবী শহীদ, জনগণের স্বার্থে জনগণের স্বার্থে প্রাণ বলি দিয়েছেন, তাঁদের কথা মনে পড়লেই আমাদের প্রতিটি জীবিত লোকের হৃদয় বেদনায় ভরে ওঠে, এমন কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ কী থাকতে পারে যা আমরা বিসর্জন দিতে পারবো না? অথবা এমন কোনো ভুল কি থাকতে পারে যা আমরা ত্যাগ করতে পারবো না? “যুক্ত সরকার সম্পর্কে” (২৪ এপ্রিল, ১৯৪৫)
*** সাফল্য দেখলে আমাদের কখনো আত্মতুষ্ট হওয়া উচিত নয়। আত্মতুষ্টতাকে আমাদের সংযত করতে হবে এবং প্রতিক্ষণেই নিজদের ত্রুটি সমালোচনা করতে হবে, যেমন পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং ধূলো দূর করার জন্য আমরা রোজ মুখ ধুয়ে থাকি ও মেঝে ঝাড়ু দিয়ে থাকি। “সংগঠিত হোন” (২৯ নভেম্বর, ১৯৪৩)
*** সমালোচনা যথাসময়ে করা উচিত, ঘটনা ঘটে যাবার পর সমালোচনা করার শখ থাকা উচিত নয়। “কৃষি-সমবায়করণের সমস্যা সম্পর্কে” (৩১ জুলাই, ১৯৫৫)
*** ভুল-ভ্রান্তি ও অকৃতকার্যতা আমাদের শিক্ষা দিয়েছে, ফলে আমরা আরো বিজ্ঞ হয়েছি এবং আমাদের কাজ আরো ভালোভাবে করছি। যে কোনো রাজনৈতিক পার্টি যা যে কোনো লোকের পক্ষেই ভুল এড়িয়ে যাওয়া কঠিন, কিন্তু আমাদের যথাসম্ভব কম ভুল করা উচিত। যদি ভুল ঘটে, তাহলে আমাদের তা শুধরানো উচিত, যত দ্রুত ও সম্পূর্ণরূপে তা শুধরানো যায়, ততই ভাল। “জনগণের গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব সম্পর্কে” (৩০ জুন, ১৯৪৯)

No comments:

Post a Comment