Sunday, July 13, 2014

জনগণের গণতান্ত্রিক আচরণের অনুশীলন প্রসঙ্গে



আমরা সত্য দেখি না, শুনিও না
গণতন্ত্র কোনো চাপিয়ে দেবার বিষয় নয়। গণতন্ত্রকে জনগণের মাঝে প্রচার করা দরকার। গণতন্ত্রের ভালো-মন্দ জনগণের মাঝে উপস্থাপন করা দরকার। জোর করে বা হুকুমনামা জারি করে বা আমলাতান্ত্রিক নির্দেশে বা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাউকে গণতান্ত্রিক করা যায় না। গণতান্ত্রিক আচার-আচরণকে যেমন জনগণের দিক থেকে শিখে নিতে হয় তেমনি সামাজিক-রাষ্ট্রিক সমস্ত কর্মকাণ্ডে ব্যক্তিকে গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ প্রয়োগ করতে হয়; নতুবা গণতন্ত্র কথার কথা অথবা পুস্তকের বাণী হিসেবে থেকে যাবে।
তবে সামাজিকভাবে ভাবে যারা গণতন্ত্রকে অকার্যকর করে, যারা জনগণের মতের তোয়াক্কা করে না, যারা জনগণের ওপর নিপীড়ন করে তাদেরকে গণশত্রু হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে গণতন্ত্রের শত্রুদের স্বাধীনতা খর্ব করা গণতান্ত্রিকদের অধিকার।
সামজিক জীব হিসেবে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মানুষ গণতান্ত্রিক আচরণ করে থাকে। সমস্যা তৈরি হয়েছে মূলত বৈষম্য সৃষ্টির পরবর্তীকাল থেকে। সমাজ শ্রেণিবিভক্ত হবার পর থেকে দাসমালিক, সামন্তপ্রভু ও পুঁজিপতিরা মানুষকে নির্যাতন করে আসছে। এক্ষেত্রে মানবেতিহাসে গণশত্রু হিসেবে দাসমালিক, সামন্তপ্রভু ও পুঁজিপতিদেরই বিবেচনা করতে হবে এবং বাংলাদেশের মাটি থেকে এদের অবশেষকে উচ্ছেদ করতে হবে।
জনগণ যেহেতু গণতন্ত্রের প্রত্যাশা করেন তাই তারা যাতে গণতান্ত্রিক আচার-আচরণ ও কর্মকাণ্ডের চর্চা করতে পারে সে পরিবেশ পরিস্থিতি সৃষ্টি করাই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। জনগণের ভেতরে নানা ধরনের দ্বন্দ্ব বিরাজ করে এবং এসব দ্বন্দ্বের সমাধান আমলাতান্ত্রিক জবরদস্তিমূলকভাবে করতে গেলে সমস্যা আরো বাড়বে এবং জনগণ, রাজনৈতিক দল ও সংগঠনসমূহ অগণতান্ত্রিক হয়ে যাবে। রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতারা যেমন জোর করে কাউকে কোনো মতবাদ পরিত্যাগ করতে বলতে পারেন না, জোর করে ধর্ম পালন বা পরিত্যাগ করতে বলতে পারেন না, তেমনি জোর করে কাউকে গণতন্ত্র বা সমাজতন্ত্রে দীক্ষিত করতে পারেন না। জনগণের ভেতরের ভুলত্রুটিকে দূর করতে হলে, তাদের আদর্শগত ও চেতনাগত সীমাবদ্ধতাসমূহকে দূর করতে হলে, তাদেরকে বিকাশশীল গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ করতে হলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি, বুঝিয়ে বলার পদ্ধতি, পছন্দ করবার স্বাধীনতা অবলম্বন করতে হবে।  
গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বলতে আমরা বুঝবো ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা, অন্যের কথা শোনা, মতপ্রকাশ, অন্যের প্রতি মনোযোগ, চিন্তার স্বাধীনতা, শুভবুদ্ধির প্রকাশ, তর্ক-বিতর্ক, মতাদর্শগত প্রচার, আদর্শিক বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা সম্বলিত পুস্তিকা লিফলেট প্রচার, ইত্যাদির ব্যবহারিক প্রয়োগ। মাও সেতুং-এর ‘শত ফুল ফুটুক ও শত রকমের মতবাদ পরস্পরের সংগে প্রতিযোগিতা করুক’ নীতিতে যে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাকেই জনগণের মাঝে গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রচারের পদ্ধতিরূপে গণ্য করা যায়।
গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতির ব্যাখ্যায় বলা যায়, গণতান্ত্রিক কর্ম জনগণের মাঝে হটাত আবির্ভূত হয় না। গণতান্ত্রিক আচরণ যেমন প্রয়োগের ব্যাপার তেমনি অর্জনেরও ব্যাপার। সকল ধরনের গণতান্ত্রিক কর্ম জনগণের মঙ্গলের জন্য নিবেদিত। জনগণের পক্ষে কাজ করার জন্যই গণতন্ত্রে জনগণের নেতৃত্ব ও জনগণের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন। একুশ শতকে জনগণ সংক্রান্ত আলোচনায় প্রথমেই আসবে শ্রমিক ও কৃষকশ্রেণির কথা। এই কৃষক ও শ্রমিকশ্রেণির শোষণকারি সকল শ্রেণিই জনগণের উপর নির্ভরশীল পরগাছাশ্রেণি। এই পরগাছাশ্রেণিকে উৎখাতের জন্য কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ ও সে অনুযায়ি কার্যক্রম পরিচালনাকে গণতান্ত্রিক কর্মপদ্ধতি বলা যায়
গণতান্ত্রিক সমাজে নতুন চিন্তাকে প্রকাশিত হতে দিতে হয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সমাজে নতুন চিন্তা কারো দ্বারা উত্থাপিত হলে তা প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হয়। যেমন, সৌরজগত সম্পর্কিত মতবাদ, বিবর্তনবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ ইত্যাদি ধারণা শুরুতেই জনগণের দ্বারা গৃহীত হয়নি; কিন্তু ধীরে ধীরে এসব মতবাদ ঠিকই জনগণের মাঝে স্থান করে নিয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় নতুন চিন্তার ভালমন্দ বিচার-বিশ্লেষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে বিদেশ হতে আমদানিকৃত প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাসমূহকে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তশ্রেণিটি অন্ধভাবে গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে প্রগতিশীল চিন্তাগুলোকে বিচার-বিশ্লেষণ করে আমাদের ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের সাথে আত্মীকৃত করে তার ভাল দিকগুলো গ্রহণ করা হয় না, বরং অনেক সময় অন্ধ অনুকরণের চেষ্টা করা হয়। এই অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে এদেশের জনগণের অতীত অভিজ্ঞতা ও তাদের শিক্ষাকে অবমূল্যায়ন করা হয়। তাই এদেশের জনগণের ভেতরে গণতন্ত্র তার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। বিশেষ করে ঢাকা শহরের প্রতিক্রিয়াশীল মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীদের ঘাড়ে ইউরোপের মৃত ভূত যেমন ইউরোকেন্দ্রিকতাবাদ, আধুনিকবাদ, উত্তরাধুনিকবাদ, উপনিবেশবাদ, নয়া-উপনিবেশবাদ, দাদাবাদ, অস্তিত্ববাদ, পরাবাস্তববাদ ইত্যাদি প্রতিক্রিয়াশীল চিন্তাধারা চেপে বসে আছে। অথচ এসব মতবাদের অনেকগুলোর গুরুত্ব পৃথিবীতেই নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখনও প্রভাবশালী মতাদর্শ হচ্ছে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাস্তববাদ, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। এসব প্রভাবশালী মতবাদ নিয়ে ঢাকা বা কলকাতায় আলোচনা খুবই সামান্য কিন্তু ছোটখাট হারিয়ে যাওয়া মতবাদ নিয়েও ঢাকা-কলকাতার তরুণ-তরুণীরা মাথা ঘামায়।

No comments:

Post a Comment