Monday, July 07, 2014

পাবলো নেরুদা, তুমি আছো তাই, আমরা স্বপ্ন বুনে যাই



ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের কাছে সত্যধর্মী কবি খুবই বিপদজনক।-- পাবলো নেরুদা
মহাকবি পাবলো নেরুদার (১২ জুলাই, ১৯০৪ ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৩) আত্মজীবনী অনুস্মৃতি কিনেছিলাম ২০০০ সালের দিকে। ১৯৯৭ সালে তাঁকে চিনেছিলাম তার অমর নামে ও কবিতায়। ভবানীপ্রসাদ দত্তের করা অনুবাদে অনুস্মৃতি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম জীবনের প্রতি। সেই জীবন শুধু নেরুদার জীবন নয়, আমার নিজের জীবনেরও অনেক আনন্দ মিশে গেছিল হাজারো জীবনের সাথে। অনুস্মৃতি পড়ে আরও ভালো লেগেছিল সমাজতন্ত্র ও স্তালিনকে। আমার জীবনটা ভেতর থেকে বদলে দিয়েছিলেন নেরুদা আর তাঁর অনুস্মৃতি

আমি নিশ্চিত নেরুদার জন্ম না হলে আমি অন্যরকম হতাম। এতো শ্রম দিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছি নেরুদার দেয়া শক্তিতে। আমি যখন ঘুমিয়ে থাকি, নেরুদা যেন আমাকে জাগিয়ে তোলে আর বলে পশুরা জেগে আছে মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করার জন্য আর তুমি এখনো ঘুমোচ্ছো
আমার মতো বিশ শতকের অনেক তরুণকে তিনি লড়তে শিখিয়েছিলেন সাম্যবাদের জন্য।

তিনি মিছিলে, প্রতিবাদে এবং আগুনের হলকায় আমাদেরকে শোনান এমন গান যা দুঃসময়েও অবিরাম গাওয়া যায়। তাঁর ‘কুড়িটা প্রেমের কবিতা এবং একটি হতাশার গান’ গ্রন্থের একটি কবিতার একটি লাইন হচ্ছে ‘আজ রাতে আমি লিখতে পারি সবচেয়ে করুণ পংক্তিগুলো’।[১] এই করুণ পংক্তিগুলোই শক্তি হয়ে বয়ে চলেছে শ্রমিকদের রক্তে আর ধমনিতে। সেই মহান সাধারণ মানুষগুলোর জন্য তিনি লিখেছেন,
পৃথিবীর সাধারণ ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষ আজ কোনো না কোনো প্রতিকূল অবস্থার সম্মুখীন এবং সেই সকল প্রতিকূলতার প্রতিবাদ ধ্বনিত হচ্ছে এখনকার অনেক কবিতায় আর মিছিলে।”[২]

কবি ও লেখকদের সংগ্রামী ভূমিকার কথা তিনি ভোলেন না। তিনি দেখেছেন যে ‘ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদের কাছে সত্যধর্মী কবি খুবই বিপদজনক[৩]

মানুষকে ভালোবেসেই তিনি আমাদের কাছে আছেন। ভালোবাসার কাছে দায়বদ্ধ, জনগণের মুক্তির জন্য জীবনদানকারী এই মহান মানুষটি বলছেন, ‘ভালবাসা কত ক্ষণিকের, আর বিস্মৃতি কি বিশাল[৪] সব রকমের বিস্মৃতির কাছে অপরাজেয় এবং ভালোবাসার কাছে জয়ী এই মানুষটি ভোলা যায় না কবিতায় প্রশ্ন করছেন,
যদি আমায় জিগ্যেস করো এতোদিন কোথায় ছিলাম
তখন আমাকে বলতেই হবে, এরকমটাই হয়।
বলতে হবে পাথরের ছায়ায় ঢাকা রুক্ষ মাটির কথা,
নদীর কথা, অসীম ধৈর্য ধরে যে নিজেকে নিঃশেষ করে ফেলেছে:
পাখিরা যা হারিয়েছে সেসব আমি কিছুই জানি না,
পেছনে ফেলে আসা এক সমুদ্র আর আমার বোনের কান্না।
কেন যে এতো প্রান্তর? কেন একটা দিন অন্য দিনের সাথে
তালায় আটকানো? কেন এতো কালরাত্রি গড়গড়ায়   
মুখের ভেতরে? কেন এতো লাশ?”[৫]

হ্যাঁ, আজ গোটা দুনিয়ায় লাশ আর লাশ। সেই লাশেরা আজ যদি জীবিত হয়ে আমাকে আপনাকে প্রশ্ন করে কেন আমরা মারা পড়লাম, তাহলে আমাদের জবাব হারিয়ে গেছে পুঁজিবাদ আর সাম্রাজ্যবাদের ভয়ানক নখরের আঁচড়ে। এই ভয়ানক নখরের নিচেও শ্রেণিসংগ্রাম ও যুদ্ধে ছিলেন নেরুদা। তিনি এক রেডিও সাক্ষাতকারে বলেছেন,
আমরা আমাদের মহান পূর্ববর্তীদের উদাহরণ অনুসরণ করেছি। আমাদের চোখ রেখেছি জীবনের উপর, জনগণের দুর্ভোগ ও দুর্দশার উপর এবং আমাদের ল্যাটিন আমেরিকার অসাধারণ ভূমি ও চমৎকার আবাসস্থল, গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক বিষয়বস্তু, সৌন্দর্যমণ্ডিত প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর। এটা নতুন কোনো বিষয় ছিল না। কিন্তু আমরা এমন একটি নতুন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম যেখানে শ্রেণিসংগ্রাম অনেক, অনেক বেশি নিদারুণভাবে প্রকট হয়ে উঠেছিল। আমরা শ্রমিকদের আলাদা অথবা সামষ্টিক ব্যক্তিগত জীবন সংগ্রামেও সম্পৃক্ত হয়েছিলাম।”[৬]

আমরা কী সেই জীবন-সংগ্রাম ও যুদ্ধকে এগিয়ে নিতে পারছি? আজ বাংলায় কত শত কলমবাজ-মতলববাজ ফ্যাসিবাদিদের পক্ষে, গণশত্রুদের পক্ষে, বুর্জোয়াদের রক্ষার জন্য কলম ধরেছে। এরকম এক দুঃশাসনের কালে, নেরুদাকে মনে রাখা সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের সকল সৈনিকেরই অবশ্য কর্তব্য।

তথ্যসূত্র:
১. আজ রাতে আমি লিখতে পারি, কুড়িটা প্রেমের কবিতা এবং একটি হতাশার গান থেকে;
২. অনুস্মৃতি থেকে
৩. অনুস্মৃতি থেকে
৪. আজ রাতে আমি লিখতে পারি, কুড়িটা প্রেমের কবিতা এবং একটি হতাশার গান থেকে;
৫. ভোলা যায় না, অনুপ সাদি অনূদিত, এ পৃথিবীর আবাসভূমি থেকে;  

৬. পাবলো নেরুদার রেডিও সাক্ষাৎকার; মেহেদী হাসান অনূদিত।

 
আপনারা পাবলো নেরুদার ইংরেজি উদ্ধৃতি পড়ুন এই লিঙ্কে

No comments:

Post a Comment