Sunday, July 13, 2014

রাজনৈতিক দল গঠন প্রসঙ্গে



পার্টির নীতি ও কৌশল প্রসঙ্গে মাও সেতুং
বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম শক্তিমান উন্নতিকামি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে রাজনৈতিক দল গঠনে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে। দল গঠন বলতে বোঝানো হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনগণের দ্বারা পরিচালিত জনগণের জন্য জনগণের সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে জনগণ থাকে বিভক্ত এবং তাদের স্বার্থকে বাস্তব রূপ দেবার জন্য প্রয়োজন পড়ে রাজনৈতিক সংগঠনের। জনগণের রাজনৈতিক সংগঠনটিকে অবশ্যই জনগণের পক্ষে রাখা চায় এবং সেজন্য রাজনৈতিক দল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট ধারনা জনগণের থাকা দরকার। নতুবা জনগণের সংগঠন জনগণের উপরই জগদ্দল পাথর হিসেবে চেপে বসবে। রাজনীতি হচ্ছে শ্রেণিসমূহের মধ্যে সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে পারে জনগণের মুক্তিকামী একটি রাজনৈতিক পার্টি
বাংলাদেশে যত রকমের শ্রেণি-দৃষ্টিভঙ্গির পার্টি রয়েছে তাদের অধিকাংশেরই চেষ্টা হলও ব্যক্তিগত মালিকানাভিত্তিক সমাজ-অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা। বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের এবং শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ রক্ষাকারী পার্টিগুলোর অর্থনীতিবাদী-সংস্কারবাদী কিছু মিছিল-মিটিং থাকলেও তাদের সমাজ-বৈপ্লবিক কোনো দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেই। ফলে এদেশে কোনো যথার্থ গণস্বার্থ রক্ষাকারী পার্টি এখনো গড়ে ওঠেনি। এদেশের শক্তিশালী পার্টিগুলি জনগণের শক্তিতে বলশালী নয়, তাদের শক্তি মূলত সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদের কাছ থেকে পাওয়া।
বাংলাদেশে যে পার্টি তৈরি করতে হবে সেই পার্টিকে হতে হবে জনগণের শক্তিতে বলিয়ান জনগণের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষার সাথে পরিচালিত একটি কমিউনিস্ট সমাজ-বিপ্লবের রূপকার জনগণের পার্টি। এরকম একটি পার্টি যারা নির্মাণ করতে চান তারা পার্টির রণনীতি ও রণকৌশল ঠিক করবেন। কেননা, ‘নীতি এবং কৌশলই হচ্ছে পার্টির প্রাণ, সকল স্তরের নেতৃস্থানীয় কমরেডদের অবশ্যই এদের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে হবে এবং হাজার কারণেও তাদের অমনোযোগি হওয়া উচিত নয়।’[১]
জনগণের মুক্তিকামী রাজনৈতিক দলটি জনগণ ও গণশত্রুর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্যরেখা নির্ধারণ করবে। বর্তমানে জনগণ বলতে দেশের কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ ও তাদের পক্ষে দেশপ্রেমিক সকল শক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনকে বুঝতে হবে; যেমন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ, লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীকে বুঝতে হবে এবং গণশত্রু বলতে বুঝতে হবে বিদেশি সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের দেশিয় দালাল রাজনীতিবিদ আমলা বুদ্ধিজীবী শ্রেণি, জনগণের সম্পদের লুটেরাগোষ্ঠী, জনগণের শোষক ও নির্যাতকেরা ‘জনগণ’ ও ‘গণশত্রু’র ধারনাকে সময়, অবস্থা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তন করে নিতে হবে। রাজনৈতিক দলের নেতা হবেন এদেশের শ্রমিক-কৃষক মেহনতি জনগণকে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে প্রগতিশীল করার জন্য শ্রমিক ও কৃষক। সেই শ্রমিক ও কৃষক নেতা হবেন এদেশের জলে-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা এদেশের মানুষকে মর্যাদাবান সমৃদ্ধশালী করবার দৃঢ়প্রত্যয়ী নেতা। রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ যেমন দলকে গঠন করবেন তেমনি দল গঠিত হবে দলের সকল সদস্য ও কর্মীর কর্ম ও উদ্যোগে। দলের কেন্দ্রীয় কমিটিসহ প্রতিটি অঙ্গ সংগঠন ও ইউনিটের নেতা দলিয় সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন। দলের কাউন্সিল নির্দিষ্ট সময় অন্তর অনুষ্ঠিত হবে।  
দলের লিখিত সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, কর্মসূচি ও কর্মনীতি থাকবে এবং তা সময়ের সাথে সাথে সময়োপযোগী করতে হবে। দলের উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও কর্মসূচিকে জনগণের সামনে উপস্থাপন ও প্রচার করতে হবে। দল কাজ করবে লিখিত ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে। প্রতিটি দলের গঠনতন্ত্র, গঠন কাঠামো, নীতিমালা ও কর্মসূচি জনগণের কাছে সহজলভ্য করে দিতে হবে। দলকে আদর্শনিষ্ঠ সুশৃঙ্খল ও আদর্শ বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। দলকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের আকাঙ্ক্ষী হতে হবে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জনের পর কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধ্য থাকতে হবে। দলীয় নেতাকর্মীরা দলের ঐক্য বজায় রেখে বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে প্রকাশ্য জনসভাসহ সর্বত্র দলের কর্মকাণ্ড ও কর্মনীতির আলোচনা ও সমালোচনা করতে পারবে। প্রতিটি দলের নেতাকে জনগণের, সাংবাদিকের বা যে কোনো ব্যক্তির যে কোনো প্রশ্নের জবাব জনসভায় বা সাংবাদিক সম্মেলনে বা যে কোনো স্থানে করার স্বাধীনতা দিতে হবে। গণতন্ত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রথম অগ্রাধিকার দিয়ে রক্ষা করতে হবে; তবে গণশত্রু, শোষক, নির্যাতক, অপরাধীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
তথ্যসূত্র:
১. মাও সেতুং, পরিস্থিতি সম্পর্কে বিজ্ঞপ্তি (২০ মার্চ, ১৯৪৮)

No comments:

Post a Comment