Thursday, August 07, 2014

চার্বাক সুমনের ব্যঙ্গগল্প দলভাঙা নেতার একটি পর্যালোচনা



চার্বাক সুমন
চার্বাক সুমনের গল্প দলভাঙা নেতা বঙ্গদেশের বিপ্লবাকাঙ্ক্ষী কিছু ভাঁড়ামোপূর্ণ নেতার জীবনচরিত। এই নেতাজিরা প্রায় একশো বছর ধরে যা চর্চা করেছেন তার কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে এমন এক গল্পে যেই গল্পের নাম 'দল ভাঙা নেতা'এই গল্প পড়তে গেলে আমরা দেখবো যেই লোকটির হবার কথা ছিল রামকৃষ্ণ মিশনের সাধু এবং যার নাম হতে পারতো স্বাম শিবদাসানন্দ মহাথেরো, তিনি কীভাবে হয়ে যান একটি কমিউনিস্ট পার্টির নেতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মানুষগুলোর ক্রিয়াকলাপ জনগণের সামনে ফুটে উঠেই এবং সেই ক্ষেত্রে আমরা পাই একজন গল্পকারকে যার নাম চার্বাক সুমন। এই গল্প ইতিহাসের বিবরণ নয়, তবে এর মাঝে সত্যের ঘাটতিও নেই। মহাচিনের গল্পকার লু স্যুন(২৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৮১_ ১৯ অক্টোবর, ১৯৩৬) তাঁর 'বিদ্রুপ কী' প্রবন্ধে বলেছিলেন যে, সত্যই হচ্ছে বিদ্রুপের প্রাণশক্তি। এই গল্পেও আমরা পাবো সত্যরূপি বিদ্রুপকে যা আমাদেরকে চেনাতে সাহায্য করবে বিশ শতকের সেইসব সামন্তীয় ও খুদে বুর্জোয়া নেতাদের যারা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে কতিপয় ক্ষেত্রে কৌতুকের উৎসে পরিণত হয়েছেন।

‘দল ভাঙা নেতা’ নামক ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মিশ্রিত যে রচনাটি নয়টি পর্বে লেখা হয়েছে তা হয়ে উঠেছে বাঙলার বামপন্থিদের অজানা ইতিহাসের বাস্তব চিত্র। এই চিত্রটি বাঙালি মধ্যবিত্তের কাছে সুখকর নয়, যেমন সুখকর নয় সেই ভালো মানুষ নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের কাছে ১৯৭১_ এর শ্রেণিযুদ্ধটি, যা মাত্র চার দশক অতিবাহিত হবার মধ্যেই বেহাত হয়ে যায় টাকার মালিকদের কাছে। সেই শ্রেণিযুদ্ধটি সুখের বদলে কাড়ি কাড়ি যন্ত্রণা হয়ে দেখা দেয় যুদ্ধের ময়দানে লড়ে হারিয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের এবং তার সমর্থকদের কাছে। কেন ১৯৭১ তৎকালীন বিপ্লবীদেরকে হেয় করে তুলেছিল পরবর্তীকালের ইতিহাসে, তাও যেন আমরা এই ব্যঙ্গরচনায় দেখতে পাই। জনগণের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ঘটাতে অসমর্থ সেই বিপ্লবীরা হারিয়ে যায় ইতিহাসের গ্রাসে। কিন্তু এই কথাগুলোই সব শেষ কথা নয়।
গল্পটি শুরু হয়েছে গল্পকার লু স্যুনের গল্প ‘আ’ কিউ’র সত্য ঘটনা’র কথা স্মরণ করে এবং লেখক স্বীকার করছেন যে আ’ কিউ’র ন্যায় আমাদের নেতাজী সদর ভাইয়ের জীবন তত ‘চমকপ্রদ নহে’এই চমকহীন নেতার গোপন জীবনের পরতে পরতে লুক্কায়িত আত্মনিগ্রহ, অপমান, ভাঁড়ামো, উচ্চাশা, অবৈজ্ঞানিকতা, কুযুক্তিপনা পাঠককে দেখিয়ে দেয় বিপ্লব ও সাম্যবাদ সম্পর্কে বিহ্বলতা তাদেরকে ভাঁড়ে পরিণত করেছে। কিন্তু নেতাজি ও তার সাগরেদ কমেস, পেলু, ফিরাচল প্রভৃতি চরিত্ররা ‘আ’ কিউ’র মতোই দমবার পাত্র নন।
‘আ’ কিউ’ কৃষক হলেও নেতাজি সামন্ত পরিবারের প্রতিভু। এই নেতা ও তার অনুসারীরা হয়ে উঠেছে একেকজন সামন্তীয় সমাজতন্ত্রী, উদার গণতন্ত্রী এবং সমাজ গণতন্ত্রীদের বিদ্রূপাত্মক চরিত্র; যারা শ্রমিক কৃষককে বিপ্লব বোঝাতে চান; কিন্তু বিপ্লবের মূল শক্তি প্রলেতারিয়েত, শ্রমিক ও কৃষকগণ তাদেরকে নিয়ে অনবরত মস্করা করে যায়। এই নেতাজি ও তাদের সাগরেদরা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে থাকে, সামন্তবাদের তীব্র বিরোধিতা করে না, বুর্জোয়া বিরোধিতায় ভুল জায়গায় আঘাত করে। পুরুষতন্ত্রের সমর্থন ও নারী শোষণে পারঙ্গম এই নেতারা মার্কস লেনিনের মুখস্ত বুলি কপচায়, কিন্তু নিজেদের বাঁচানোর ও তাদের পরজীবিতাকে টিকিয়ে রাখতে কার্পণ্য করে না।
একুশ শতকের ২০১৪ সালে লেখা এই গল্প যেন জমিদার জ্যোতি বসু, বিমান বসু, মনি সিংহ, শিবদাস ঘোষ, খালেকুজ্জামান ভুঁইয়া ও তাদের সাথে চলমান সেইসব ক্ষুদে বুর্জোয়া ভাঁড়দের জীবনকাহিনী যারা বিপ্লব ফাটাতে গিয়ে জনগণের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাম্রাজবাদ পুঁজিবাদের ঘাত প্রতিঘাতে নিজেদেরকে আউলিয়ে ফেলে। পথহারা এই নেতাজি ও তাদের সাগরেদদের দল ভাঙার ঐতিহ্য এবং তাদের নিচতা, ক্ষুদ্রতা আর শঠতার বিদ্রূপাত্মক গল্প রচিত হলও চার্বাক সুমনের লেখায়। আমরা তার কাছে আরো অনেক লেখার প্রত্যাশা করি যে লেখাগুলো ফুটিয়ে তুলবে সত্যকে, বিদ্রুপের অফুরন্ত শক্তিতে।

নয় পর্বের লেখাটি পড়তে পারবেন এই লিংকে গিয়ে

No comments:

Post a Comment