Wednesday, August 13, 2014

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্রসঙ্গে ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন



এঙ্গেলস প্রসঙ্গে লেনিন
১৮৯৫ সালের ৫ আগস্ট  লন্ডনে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের মৃত্যু হয়েছে। স্বীয় বন্ধু কার্ল মার্কসের (১৮৮৩ সালে তাঁর মৃত্যু হয়) পর এঙ্গেলসই ছিলেন গোটা সভ্য দুনিয়ার আধুনিক প্রলেতারিয়েতের সবচেয়ে বিখ্যাত মনীষী ও গুরু। ... ... মার্কস ও এঙ্গেলস সর্বপ্রথম দেখান যে শ্রমিক শ্রেণি ও তার দাবীদাওয়া হল বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আবশ্যিক সৃষ্টি, এ ব্যবস্থা ও তার বুর্জোয়ারা অনিবার্যভাবেই প্রলেতারিয়েতকে সৃষ্ট ও সংগঠিত করে; তাঁরা দেখান যে মানবজাতি বর্তমানে যে দুর্দশায় নিপীড়িত তা থেকে তার পরিত্রাণ ঘটায় বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তির শুভ প্রচেষ্ঠা নয়, সংগঠিত প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রাম। মার্কস ও এঙ্গেলস তাঁদের বৈজ্ঞানিক রচনায় প্রথম ব্যাখ্যা করেন যে সমাজতন্ত্র স্বপ্ন দ্রষ্টার কল্পনা নয়, বর্তমান সমাজের উৎপাদন শক্তিগুলোর বিকাশের চরম লক্ষ্য ও অপরিহার্য পরিণাম। .... ...
প্রুশীয় রাজ্যের রাইন প্রদেশের বার্মেন শহরে ১৮২০ সালে এঙ্গেলস জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন কারখানা মালিক। ১৮৩৮ সালে সাংসারিক কারণে এঙ্গেলস উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ না করেই ব্রেমেনের একটি সওদাগরি অফিসে কর্মচারী হিসেবে ঢুকতে বাধ্য হন। বাণিজ্যের কাজের মধ্যেও নিজের বৈজ্ঞানিক ও রাজনৈতিক শিক্ষার কাজ চালিয়ে যেতে বাধা হয় না। ছাত্র অবস্থাতেই তিনি স্বৈরাচার ও আমলাদের স্বেচ্ছাচারিতা ঘৃণা করতে শুরু করেন। দর্শনের চর্চা মারফত তিনি আরো অগ্রসর হন। সে সময় জার্মান দর্শনের ক্ষেত্রে ছিল হেগেলীয় মতবাদের প্রাধান্য, এবং এঙ্গেলস তার অনুগামী হয়ে উঠেন। ... ... হেগেলের দর্শনে বলা হয়েছিল আত্মার ও ভাবের বিকাশের কথা, এটা ভাববাদী। আত্মার বিকাশ থেকে এ দর্শন পৌঁছাত প্রকৃতি, মানুষ ও জনগণের, সমাজসম্পর্কের বিকাশে। বিকাশের চিরন্তন প্রক্রিয়া বিষয়ে হেগেলের ভাবনা অব্যাহত রেখে মার্কস ও এঙ্গেলস আগে থেকেই ধরে নেওয়া ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গিটি বর্জন করেন; জীবনের দিকে ফিরে তারা দেখলেন যে আত্মার বিকাশ দিয়ে প্রকৃতির বিকাশ তো হয়ই না বরং উল্টো প্রকৃতি দিয়ে, পদার্থ দিয়েই ব্যাখ্যা করা উচিত আত্মার ... হেগেল ও অন্যান্য হেগেলপন্থিদের বিপরীতে মার্কস ও এঙ্গেলস ছিলেন বস্তুবাদী। বিশ্ব ও মানব সমাজের উপর বস্তুবাদী দৃষ্টিপাত করে তাঁরা দেখলেন যে প্রকৃতির সমস্ত ঘটনার পেছনে যেমন আছে বস্তুগত কারণ, মানব সমাজের বিকাশও তেমনি বস্তুগত, উৎপাদন শক্তির বিকাশের শর্তাধীন। মানব চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী উৎপাদনে লোকে পরস্পরের সংগে যে সম্পর্ক স্থাপন করে তা নির্ভর করে উৎপাদন শক্তির বিকাশের উপর। আর এই পরস্পর সম্পর্ক দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায় সামাজিক জীবনের সমস্ত ঘটনার, মানবিক প্রচেষ্টা, ভাবনা ধারণা ও আইনের। উৎপাদন শক্তির বিকাশ থেকে সৃষ্ট হয় ব্যক্তি মালিকানার উপর স্থাপিত সামাজিক সম্পর্ক, কিন্তু আবার দেখি যে উৎপাদন শক্তির ঐ বিকাশেই ফের অধিকাংশের সম্পত্তি লোপ পায় আর তা কেন্দ্রীভূত হয় নগণ্য সংখ্যাল্পের হাতে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার যা ভিত্তি সেই মালিকানাই লুপ্ত হয় তাতে, তার বিকাশ হয় সেই লক্ষ্যের দিকে যা গ্রহণ করেছে সমাজতন্ত্রীরা। সমাজতন্ত্রীদের শুধু এটুকুই বুঝতে হবে কোন সামাজিক শক্তি বর্তমান সমাজে তার স্বকীয় অবস্থানের কারণেই সমাজতন্ত্র স্থাপনে আগ্রহী এবং আপন স্বার্থ ও ঐতিহাসিক কর্তব্যের চেতনা সে শক্তিকে দিতে হবে। এ শক্তি হল  প্রলেতারিয়েত। এ শক্তির সঙ্গে এঙ্গেলসের পরিচয় হয় ইংল্যন্ডে, ব্রিটিশ শিল্পের কেন্দ্র ম্যাঞ্চেস্টারে। ১৮৪২ সালে তিনি এখানে এসে একটি সওদাগরি অফিসে কর্মচারী হিসেবে ঢুকেন, তাঁর বাবা ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম অংশীদার। এঙ্গেলস এখানে কেবল কারখানার আপিসে বসে থাকেননি, শ্রমিকেরা যেখানে গাদাগাদি করে থাকত, সেইসব নোংরা বস্তির মধ্যে ঘুরে ঘুরে তাদের নি:স্বতা ও দারিদ্র্য দেখেন। শুধু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে তৃপ্ত না হয়ে তিনি ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা সম্পর্কে তখন পর্যন্ত যা প্রকাশিত হয়েছিল সব পাঠ করেন, আয়ত্ত্বাধীন সমস্ত সরকারি দলিল তিনি খুঁটিয়ে অধ্যয়ন করেন। এই অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণের ফল হল ১৮৪৫ সালে প্রকাশিত তার বই ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থা’।... ... 
এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রী হয়ে ওঠেন কেবল ইংল্যান্ডেই। ম্যানচেস্টারে তিনি তদানীন্তন ইংরেজ শ্রমিক আন্দোলনের কর্মীদের সংগে যোগাযোগ করেন ও ইংরেজ সমাজতন্ত্রী প্রকাশনাগুলোতে লিখতে শুরু করেন। ১৮৪৪ সালে জার্মানীতে ফেরার পথে প্যারিসে মার্কসের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয় হয়, চিঠিপত্রের যোগাযোগ আগেই ঘটেছিল। মার্কসও প্যারিসে ফরাসী সমাজতন্ত্রী ও ফরাসী জীবনের প্রভাবে সমাজতন্ত্রী হয়ে উঠেছিলেন। দুই বন্ধু এখানে একত্রে লেখেন ‘পবিত্র পরিবার অথবা সমালোচনামূলক সমালোচনীর সমালোচনা’। বইটি প্রকাশিত হয় ‘ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা’র এক বছর আগে, এবং তার বেশির ভাগটাই মার্কসের লেখা; বিপ্লবী বস্তুবাদী সমাজতন্ত্রের প্রধান যে সব কথা আগে বলেছি, তারই বুনিয়াদ পেশ করা হয় এই বইয়ে। দার্শনিক ব্রাউয়ের ভ্রাতারা ও তাঁদের অনুগামীদের ব্যঙ্গ নাম হল ‘পবিত্র পরিবার’। এই ভদ্রলোকেরা এমন সমালোচনার প্রচার করতেন, যা সবকিছু বাস্তবতার ঊর্ধ্বে, পার্টি ও রাজনীতি ঊর্ধ্বে, সমস্ত ব্যবহারিক ক্রিয়াকলাপ তা বর্জন করে পরিপার্শ্বের জগত ও তার ঘটনাবলি নিয়ে কেবল ‘সমালোচনামূলক’ ভাবনায় ব্যাপৃত। শ্রীমান ব্রাউয়েররা অসমালোচক জনগণ হিসেবে প্রলেতারিয়েতের প্রতি নাক উঁচু ভাব করতেন। ... ...  
১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত সময়টা এঙ্গেলস ব্রাসেলস ও প্যারিসে কাটান, এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গে  ব্রাসেলস ও প্যারিসের জার্মান শ্রমিকদের মধ্যে ব্যবহারিক কাজ মিলিয়ে নেন। এইখানে গুপ্ত জার্মান সমিতি কমিউনিস্ট লিগের সঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের যোগাযোগ হয়, এ সংঘ তাঁদের ওপর ভার দেয় তাঁদের রচিত সমাজতন্ত্রের মূলনীতি উপস্থিত করার জন্য। এভাবেই জন্ম নেয় ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’। ছোট্ট এই পুস্তিকাখানি বহু বৃহৎ গ্রন্থের মূল্য ধরে সভ্য জগতের সমস্ত সংগঠিত ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত আজও তার প্রেরণায় সজীব ও সচল।
১৮৪৮ সালের যে বিপ্লব প্রথমে ফ্রান্সে শুরু হয়ে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত হয় সেই সময় মার্কস এঙ্গেলস দেশে ফেরেন। সেখানে, প্রুশিয়ার রাইন অঞ্চলে তাঁরা কলোন থেকে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক ‘নতুন রাইনিশ গেজেটের’ প্রধান হয়ে ওঠেন। রাইনিশ প্রুশিয়ার সমস্ত বিপ্লবী গণতান্ত্রিক প্রচেষ্ঠার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন দুই বন্ধু। ... ... এঙ্গেলস সশস্ত্র গণবিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন, তিনটি সংঘর্ষে লড়াই করেন স্বাধীনতার জন্যে, এবং বিদ্রোহীদের পরাজয়ের পর সুইজারল্যান্ড হয়ে লন্ডনে পালান। ... ... এরপর এখান থেকে গিয়ে আগের অফিসে কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন এবং শ্রমিকদের আন্তর্জাতিক গড়ে তোলার চেষ্ঠা করেন। ১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লন্ডনে ফেরেন এবং ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের কর্মভারাক্রান্ত মিলিত মানসিক জীবন চালিয়ে যান। এর ফল হল মার্কসের দিক থেকে পুঁজি আর এঙ্গেলসের দিক থেকে ছোট বড় একসারি বই। পুঁজিবাদী অর্থনীতির জটিল ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করেন মার্কস। আর অতি সহজ ভাষায় প্রায়ই বিতর্কমূলক রচনার সাধারণ বৈজ্ঞানিক সমস্যা এবং অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে ইতিহাসের বস্তুবাদি বোধ ও মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলসের এইসব রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্যুরিঙের বিরুদ্ধে বিতর্কমূলক রচনা, পরিবার ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (১৮৯৫), ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ (১৮৯২), রাশিয়ার প্রসঙ্গে এঙ্গেলস (১৮৯৪)। মার্কস মারা যান, পুঁজি বিষয়ে তার বৃহৎ রচনা সম্পূর্ণরূপে গুছিয়ে যেতে পারেননি। খসড়া হিসেবে অবশ্যই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর মৃত্যুর পর পুঁজির ২য় ও ৩য় খন্ড গুছিয়ে তোলা ও প্রকাশনের গুরুভার শ্রমে আত্মনিয়োগ করলেন তাঁরই অকৃত্রিম বন্ধু শ্রমিক শ্রেণির মহান শিক্ষাগুরু কমরেড ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস।

তথ্যসূত্র: এই প্রবন্ধটি ভি. আই. লেনিন রচিত মার্কস এঙ্গেলস মার্কসবাদ শিরোনামের প্রগতি প্রকাশন, মস্কো প্রকাশিত ১৯৭৫ পুস্তক থেকে গৃহীত এবং এখানে অংশবিশেষ সংকলিত।

No comments:

Post a Comment