Monday, August 25, 2014

কবি সমর সেন বাঙালি মধ্যবিত্তের কুণ্ডলায়িত জীবনের চিত্রকর



সমর সেনের কবিতা

সমর সেন (১০ অক্টোবর, ১৯১৬ _ ২৩ আগস্ট, ১৯৮৭) বাংলা ভাষার সেই মহান কবি যিনি মধ্যবিত্তের ছ্যাবলামো কামনা বাসনাকে কবিতায় তুলে এনেছিলেন। তাঁর ছোট ছোট কবিতাগুলো মধ্যবিত্তের সুশীল পশ্চাৎদেশে একাধিক লাথি মেরে গেছে। সেইসব লাথিতে তীব্র জোর না থাকায় বাঙালির বোধোদয় আজও ঘটেনি। মধ্যবিত্ত বাঙালির পেছনে লাত্থি দেবার জন্য আমাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে কবি নবারুণ ভট্টাচার্য (জুন ২৩, ১৯৪৮ _ জুলাই ৩১, ২০১৪) পর্যন্ত যার শব্দের ধার টাকা আর ক্ষমতালোভি মধ্যবিত্তকেও তীব্রভাবে আঘাত করতে পারেনি।
সমর সেন সেই মধ্যবিত্তের আশপাশে টিকে ছিলেন যারা কলকাতা এবং পরবর্তীতে ঢাকায় বসে গোটা বাংলার জনগণের ওপরে মস্তানি ফলাত। সেই মস্তানি শুধু সাম্প্রদায়িক রক্তের হোলিখেলায় মত্তই হয়নি, আরো দৃঢ়ভাবে বাঙালি শ্রমিক কৃষক ও প্রলেতারিয়েতকে বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত করে শোষণের কলে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সেই নরপিশাচ বিত্তলোভি মস্তানদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাতে গিয়ে তিনি যে মহান মানুষটিকে সমর্থন করেছিলেন তাঁর নাম চারু মজুমদার এবং যে মহান সংগ্রামের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন তার নাম নকশাল আন্দোলন। ‘যে মধ্যবিত্ত গণ্ডিটাকে তিনি সারা জীবন উপলব্ধি করেছিলেন কিন্তু ভাঙতে পারেননি_ নকশালপন্থিরা খানিকটা জোর করে সে’ গণ্ডিতে নাড়া দিতে পারায় তিনি নকশাল আন্দোলনের পক্ষপাতী হয়েছিলেন। নকশাল আন্দোলনের কমিউনিস্টরা মধবিত্ত ক্ষুদে বুর্জোয়াদের জগত থেকে ‘রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রাঙ্গণকে বিস্তৃত করতে চেয়েছিলেন’ এবং সমর সেন সেই বিস্তৃত জগতে নির্ভয়ে পা রেখেছিলেন; অন্যান্য সব ক্ষেত্রেই তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার’ প্রতিবাদের কাজটি দৃঢ়ভাবে পালন করেছিল যার প্রমাণ পাওয়া যাবে গণশত্রু ইন্দিরা গান্ধীর (১৯১৭ _ ১৯৮৪) জারীকৃত ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার সময়ে।[১]    
সমর সেন কবি ছিলেন, ন্যায় যুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, প্রলেতারিয়েতের মুক্তি নিয়ে ভাবিত ছিলেন। একুশ শতকের শুরুতে বাঙালির অজস্র কবিদের ভেতরে সমর সেন যেন অযাচিত দুর্বল শ্রেণিযোদ্ধাদের মতোই বাংলার বিপন্ন আকাশে হারিয়ে গেছেন। তাঁকে আজ তরুণ কবিদের খুব সামান্য অংশই চেনে। আজ যত কবি দেখি, তাদের মেরুদণ্ডের খোঁজ নিতে গেলে দেখতে পাই, কাকও প্রতিবাদ করে; কিন্তু কবিরা মুনাফাপূজারি।
যেই সময়ের কবি তিনি তখনই ‘সমুদ্র শেষ’ হয়ে যেত, ‘চাঁদের আলোয়’ ‘সময়ের শূন্য মরুভূমি জ্বলে’[২] উঠত। সেই শূন্য মরুভূমিতে বণিকেরা সভ্যতা গড়ে আর ‘একটি বেকার প্রেমিকের’ সকালবেলায় ঘুম ভাঙে ‘কলতলার ক্লান্ত কোলাহলে’। বেকার প্রেমিকের ‘রক্তে জ্বলে’ ‘মৃত্যুহীন প্রেম থেকে মুক্তি’র আকাঙ্খা।
সমর সেন যেই সমাজের আশা নিয়ে বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ শুনেছিলেন সেই বসন্ত আজো সুদূরপরাহত। আমাদের দিনগুলো কয়লার মতো কালো হয়ে যায়। তবুও সমর সেন-এর কবিতা কানে বাজে,
“বসন্তের বজ্রধ্বনি অদৃশ্য পাহাড়ে।
আজ বর্ষশেষে
পিঙ্গল মরুভূমি প্রান্ত হতে
ক্লান্ত চোখে ধানের সবুজ অগ্নিরেখা দেখি
সুদূর প্রান্তরে।”[৩]
তিনি সাংবাদিক হয়েছিলেন, শ্রমিক কৃষকের মুক্তির জন্য সম্পাদনা করেছেন ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামের ইংরেজি পত্রিকা, এ যুগে যেকথা শুনে হয়ত কৌতুক মনে হতে পারে। কিন্তু ইন্দিরার জরুরি অবস্থার সময়ে সেন্সরধারী মূর্খ মধ্যবিত্তকে ধাপ্পা দিতে সেটি কাজে লেগেছিল। সমর সেন আলাপের কণ্ঠে আমাদেরকে শুনিয়ে দেন রক্তের আগুনের কথা যা একুশ শতকের রক এন রোল শোনা তরুণদের কাছে মশকরা বৈকি। তিনি ৩০ বছরে পৌঁছতে না পৌঁছতেই কবিতা ছেড়েছিলেন, কবিতায় আর ফিরে যাননি। ছাপোষা মধ্যবিত্ত না হলে যিনি গেরিলা হতে পারতেন, তিনি হয়ত কোনো গ্রামে কবিতার কাছে পরাজিত হন, কিন্তু কৃষক তাঁকে মনে রাখে। আমাদের এটিই বড় ট্রাজেডি যে সমর সেন আমাদের স্মৃতিভারাতুর মনে নাড়া দেয় না।
কবি সরোজ দত্তরা অভিযোগ করলে ১৯৪০ পরবর্তীকালের কবিতায় ‘সমান জীবনের চকিত স্বপ্ন’ নাড়া দেবে তাঁর কবিতায়। ‘মৃত্যু’ কবিতায় ‘কলের বাঁশির হাহাকারে’ ধরা পড়বে শ্রমজীবীর উপরে পুঁজিবাদী শোষণের নির্মমতা, ‘নাগরিক’ কবিতায় ‘পাটের কলের উপরে আকাশ তখন / পাথরের মতো কঠিন’। পাটকল শ্রমিকদের প্রতি কবির সহানুভূতি ছড়িয়ে পড়বে। সামাজিক বৈষম্য অবসানের প্রত্যাশা দেখা যাবে ‘নাগরিক’ শিরোনামের কবিতায়,
“কিছুক্ষণ পরে হাওয়ায় জোয়ার আসবে
দুর সমুদ্রের দ্বীপ থেকে_
সেখানে নীল জল, ফেনায় ধূসর-সবুজ জল,
সেখানে সমস্ত দিন সবুজ সমুদ্রের পরে
লাল সূর্যাস্ত
আর বলিষ্ঠ মানুষ, স্পন্দমান স্বপ্ন_”[৪]
লাল সূর্যাস্ত আর বলিষ্ঠ মানুষ নিঃসন্দেহে শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবের দ্যোতক। সেই বিপ্লবী স্বপ্ন তাঁর কবিতার এক অমূল্য দিক। তিনি বলছেন জোয়ার আসছে, প্লাবন আসছে কৃষক জাগছে, শ্রমিক জাগছে। তিনি, খাপ ছাড়া ঘুমে দূরে শুনছেন জোয়ারের জল, কীসের কল্লোল! বাঁধ ভেঙে বন্যার জল আসছে; এ পৃথিবীকে মুক্ত করবে অসাম্যের অভিশাপ থেকে।  
সাপের মতো মসৃণ, ধূসর অন্ধকারের ভিতরে যখন একটি জাতি সাময়িক বন্দি হয় তখন সমর সেন বিস্মৃত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। জনগণের কবি সমর সেন বেঁচে থাকবেন জনগণের হৃদয়ে। ‘মধ্যবিত্তের সাহসের দৌড়’ সম্পর্কে সুবিদিত এই মহান মানুষটি তাঁর লড়াইয়ের জন্যই আমাদের কাছে স্মরণীয়। কবিতার এই শিল্পী তাঁর জীবনের লড়াইয়েও এগিয়ে ছিলেন কৃষক শ্রমিকের সংগ্রামের সাথে। মুক্তির সকল লড়াইয়ে সমর সেনরা অমর রহে।

তথ্যসূত্র:
১. আরো দেখুন, খালেদ হোসাইন ও সাজ্জাদ আরেফিন সম্পাদিত, সমর সেন; দিব্য প্রকাশ, ঢাকা; সেপ্টেম্বর, ২০০২, পৃষ্ঠা- ২৮৬।
১. সমর সেন-এর কবিতা ‘স্বর্গ হ’তে বিদায়’ থেকে
৩. সমর সেন-এর কবিতা ‘বসন্ত’
৪. ‘নাগরিক’, কয়েকটি কবিতা কাব্যগ্রন্থ থেকে

No comments:

Post a Comment