Tuesday, August 12, 2014

গুলঞ্চ লতা বাংলাদেশ ভারতের ঔষধি লতা



গুলঞ্চ লতা, গুড়ুচ লতা ফটো: ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে
বৈজ্ঞানিক নাম: Tinospora cordifolia
বাংলা নাম: গুড়ুচ, গুলঞ্চ লতা
ইংরেজি নাম: Guduchi and Giloy

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae - Plants
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণি: Magnoliopsida
বর্গ: Ranunculales
পরিবার: Menispermaceae
গণ: Tinospora
প্রজাতি: Tinospora cordifolia.
পরিচিতি: প্রায় ১২ হাজার বছর আগে থেকে আমরা যখন বনজঙ্গলের কঠিন জীবন থেকে খাদ্য বাসস্থান, পোশাকের সহজ সংস্থান এবং নিরাপত্তার জন্যে শহর পত্তন করেছি তখন আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি বয়ে এসেছে কিছু অনাদুরে পাখি যেমন, কাক চিল চড়ুই। কিছু অপাংক্তেয় গুল্মলতাও যেন এসেছে আমাদের সঙ্গে যা এখনও বাস করে আমাদের সমান্তরালে, যাদের দেখতে পাই ফুটপাথ-সংলগ্ন দেয়ালে, পরিচর্যাহীন জায়গায়, ঝোপঝাড়ে, আমগাছ নিমগাছের সঙ্গে। সেই লতাদের অন্যতম একটি হল গুলঞ্চ লতা, শীতকালে যার পাতা ঝরে যায়, বসন্তে সমাগম। এহেন লতা যেন চোখেই পড়তে চায় না আমাদের, আগাছা ভেবে আমরা চিরকাল অবজ্ঞাই করে এসেছি এদের, উপকারিতা এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বুঝে উঠতে পারিনি।
প্রাচীন কালে এদের ব্যবহার ছিল সীমিত ও সাধারণ। কখনো জ্বর হলে এর পাতা ভাজি করে খাওয়ানো হয়েছে বা লতার কাণ্ড ছেঁচে রস করে খাওয়ানো হয়েছে রোগীকে। শিশুদের বুকের দুধ ছাড়ানোর জন্যে এর পাতার তিক্ত রস ব্যবহার করা হয়েছে, অরুচিতে চিবোনো হয়েছে এর পাতা। তবে চরক আমল থেকে এদের ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বেড়ে চলেছে। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের জ্ঞান আমাদের এই লতার উপযোগিতা সম্পর্কে ধারণা বিস্তৃত করেছে নিঃসন্দেহে।
ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে উদ্ভূত এই লতার বৈজ্ঞানিক নাম Tinospora cordifolia যা সহজপ্রাপ্য। ব্যবহার, আকার-আকৃতি এবং গুণকে কেন্দ্র করে অনেক লতার মত এরও রয়েছে অনেক নাম, তবে তা সোমলতার মত চরম বিভ্রান্তির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। মোটামুটিভাবে সারা উপমহাদেশেই একে গুড়ুচ, গুড়ূচী বা গিলোয় নামে চিহ্নিত করা হয়। পৌরাণিক কাহিনীতে গিলোয়কে মনে করা হয় স্বর্গের আরক যা খেয়ে দেবদেবীরা তাদের যৌবন অক্ষুণ্ণ রাখেন। এর অভূত গুণ বিচার করে একে অমৃতবল্লী বলা হয়েছে হিন্দি-সংস্কৃতে। বাংলায় একে গুলঞ্চ বলে যা হয়ত গুড়ুচ শব্দ থেকেই এসেছে। আর এক প্রকার লতা পাহাড়ে, পার্বত্য চটগ্রামের দিকে বেশি দেখা যায় তার বৈজ্ঞানিক নাম Tinospora crispa যাকে বলা হয় পদ্ম গুড়ূচ বা পদ্ম গুলঞ্চ। এই গুলঞ্চের পাতাও পানের আকার, তবে একটু বড় এবং কাণ্ডের গায়ে পদ্মগোটার ন্যায় বুটি থাকে। এর পাতার রস অধিক তিক্ত যে কারণে উপকারিতাও বেশি।
প্রাচীন বাংলায় গুড়্‌ শব্দটির অর্থ আত্মরক্ষণ। এই লতা আত্মরক্ষা করতে পারে। আঙ্গুলের সমান মোটা কাণ্ড হলে এর সন্ধি থেকে সুতোর মত এক ধরণের ঝুরি নামে। ঝুরিসহ এই লতা কেটে এনে ঘরে রাখলে এটা দীর্ঘিদিন বেঁচে থাকতে পারে। প্রথমে লতাটি এর ঝুরি থেকে একটু একটু করে রস খেয়ে বেঁচে থাকে এরপর শুকোতে থাকে বেশ ধীর গতিতে।
গুলঞ্চের ঝুরি বেশ শক্ত এবং সূক্ষ্ম যে কারণে প্রাচীনকালে এক সময় সেলাইয়ের কাজে ক্যাটগাটের মত এর ব্যবহার হয়েছে সার্জারিতে। এর কাণ্ড ছিন্ন করে নতুন গাছ জন্মানো যায় বলে এর এক নাম ছিন্নরুহা। তিব্বতে এর চাষ করা হয় কাণ্ডকে ছিন্ন করে। ফসল তোলা হয় গ্রীষ্মে ও বসন্তে। বসন্তে এর কার্যকরি তিক্ততা বেশি থাকে আর বসন্তে বা শিশির মৌসুমে এর উৎপাদন হয় সবচে বেশি। এর ফুল হয় শাদাটে, ফল হয় মটর আকারের, পাকলে কমলা-লাল হয়ে ওঠে। লতার ছাল খুব পাতলা, নখ দিয়ে সহজে আঁচড়ে নিলে এর ভেতর থেকে বের হয়ে পড়ে পেঁচানো দড়ির মত কাণ্ড। এই কাণ্ডকে টুকরো করে কেটে পাউডার তৈরি করা হয় যা ব্যবহৃত হয় ট্যাবলেট এবং ক্যাপসিউল হিশেবে। কাণ্ড এবং শেকড় থেকে তৈরি রসায়ন ছাড়াও গুলঞ্চ রস থেকে ঘৃত এবং তেল উদ্ধার করা যায়। পাকা আমের রস থেকে আমসত্ত্ব তৈরি হয়, গুলঞ্চ লতার সবুজ কাণ্ডের রস থেকে তৈরি করা যায় গুলঞ্চসত্ত্ব যা নানবিধ চিকিৎসায় কাজে লাগে।
ব্যবহার: গুলঞ্চের ব্যবহারের কোনো শেষ নেই। ম্যালেরিয়া, ভাইরাস, শ্বাসরোগ, বসন্ত, জন্ডিস, ডায়াবেটিস, রক্তস্বল্পতা, জ্বালাপোড়া, বাতব্যাধি, শূলব্যথা, অর্শ, ডায়েরিয়া, আমাশয়, যকৃৎব্যাধি, পিত্তবমন, মস্তিষ্কের রোগ, প্রমেহ, মেদবৃদ্ধি, উচ্চচাপ, কৃমি, হৃদরোগ, ক্যান্সার প্রভৃতি কিছু রোগের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার শুরু হয়েছে, কিছু রয়েছে গবেষণাধীন। ভারত ও তিব্বতের মত মালয়েশিয়াতেও গুলঞ্চ থেকে তৈরি কিছু ওষুধ বাজারজাত করা হয়েছে। গুলঞ্চ লতা থেকে অ্যালিলো রসায়ন পাওয়া যায়। এই ধরণের আলিলো রসায়ন ইউক্যালিপ্টাস গাছের শেকড় এবং পাতা থেকেও নিঃসৃত হয় যা অন্য গাছের অঙ্কুরোদ্গম বা বৃদ্ধির অন্তরায় ঘটিয়ে থাকে। উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা এখন ভেবে দেখছেন এই প্রাকৃতিক রসায়ন ইনসেক্‌টিসাইড হিশেবে ব্যবহার করা যায় কি না।
গুলঞ্চ লতা শুধু আমাদের এই উপমহাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর জন্যেই রোগ নিরাময়ে এক আশীর্বাদ স্বরূপ। এর সুষ্ঠু চাষাবাদ নিয়ে পরিকল্পনা এখন থেকেই করা প্রয়োজন বলে মনে হয়।
বি. দ্র: উদ্ভিদের ঔষধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।
লেখার উৎস: ফেসবুক গ্রুপ বৃক্ষকথার জায়েদ ফরিদ-এর লেখা থেকে

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

৪. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

1 comment:

  1. আপনার লেখা গুলি অনেক ভাল কিন্তু আপনি গাছের ছবি দেননি ছবি দিলে আরও ভাল হত সুন্দর মানের ছবি দেখতে চাইলে নিচের লিংক যান
    https://goo.gl/oIJ7ZB

    ReplyDelete