Monday, September 15, 2014

বৈরি সমাজ বিকাশের চালিকাশক্তি শ্রেণিসংগ্রামের স্বরূপ



শ্রেণিসংগ্রাম কী

শ্রেণিসংগ্রাম (Class struggle) হচ্ছে শ্রেণি বিভক্ত সমাজে পরস্পরবিরোধী স্বার্থসংশ্লিষ্ট মুখ্য দুটি শ্রেণির মধ্যে প্রকট আকারের দ্বন্দ্ব-সংঘাত বা সংঘর্ষ যা বৈরি উৎপাদন সম্পর্কের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শ্রেণি বিভক্ত সমাজব্যবস্থা শুরুর পরে দাসপ্রথা থেকে শুরু করে যত সমাজ দেখা দিয়েছে তাদের ইতিহাস হলো শ্রেণিগুলোর মধ্যে সংগ্রাম, শোষিত ও শোষক, নিপীড়িত ও নিপীড়ক শ্রেণিগুলোর মধ্যে সংগ্রামের ইতিহাস। এটি হচ্ছে বিপরীত স্বার্থের বহনকারী সামাজিক শ্রেণিগুলোর মধ্যেকার লড়াই। যেসব সামাজিক শ্রেণির স্বার্থ আপোষহীনরূপে বিপরীত সেইসব শ্রেণির মধ্যে পারস্পরিক সংগ্রামকে বলা হয় শ্রেণিসংগ্রাম। অর্থাৎ সুবিধাভোগী, অত্যাচারী, পরজীবীদের বিরুদ্ধে অধিকারহীন, অত্যাচারিত ও মেহনতিদের ব্যাপক জনগণের সংগ্রামই হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রাম। পুঁজিবাদী সমাজে এই শ্রেণিসংগ্রাম হচ্ছে সম্পত্তি মালিক তথা বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম। উৎপাদনের উপায় এবং উৎপাদন-সম্পর্কের মধ্যে যে বিরোধ, তা শ্রেণিসংগ্রামেরই প্রকাশ। মানবিক সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ দীর্ঘকাল ধরে নির্ধারিত হয়েছে বৈরি শ্রেণিগুলোর সংগ্রামের মাধ্যমে। সেই কারণে মার্কসবাদী তত্ত্ব শ্রেণিসংগ্রামকে মনে করে ইতিহাসের চালিকাশক্তি এবং সামাজিক বিপ্লবের অনুঘটক। পুঁজিবাদের আমলে সামাজিক বিপ্লবের ঐতিহাসিক রণাঙ্গনে অবতীর্ণ হয় প্রলেতারিয়েত শ্রেণি যারা শোষক শ্রেণির হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করে গোটা সমাজকেই মুক্ত করে শোষণ থেকে।
উৎপাদনের উপায়ের উপর ব্যক্তিগত মালিকানার প্রতিষ্ঠা এবং শ্রেণির উদ্ভব কাল থেকে সমাজের গোটা ইতিহাস হলো শোষক ও শোষিত, নীপিড়ক ও নিপীড়িত শ্রেণিদের মধ্যে অবিরাম শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। উৎপাদনের উপায় সমাজের যখন যেই শ্রেণির করায়ত্ত হলো সে শ্রেণিরই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হলো, প্রতিষ্ঠিত হলো তাদেরই রাষ্ট্র ও সমাজ। এভাবে ক্রমান্বয়ে এলো বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থা, যেমন দাসতান্ত্রিক সমাজ, সামন্তবাদী সমাজ ও বর্তমান পুঁজিবাদী সমাজ। ইতিহাসের ধারায় এবং সমাজ বিকাশের পথে সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করে এই শ্রেণিসংগ্রাম।
সামাজিক ঐতিহাসিক বাস্তবতায় যা দেখা যায় তা হচ্ছে বৈরগর্ভ সমস্ত সমাজব্যবস্থার ইতিহাস হলো শ্রেণিসংগ্রামের ইতিহাস। শ্রেণিসমাজের উদ্ভবের একেবারে গোড়া থেকেই দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক গ্রুপ, সম্প্রদায়, শ্রেণির মধ্যে শত্রুতার ওপর খাস উৎপাদনটাই স্থাপিত হতে শুরু করে। সমাজ শ্রেণিতে ভেঙে যাবার সময় থেকে শোষক আর শোষিতের মধ্যে অবিরাম চলতে থাকে কখনো প্রকাশ্য কখনো প্রচ্ছন্ন কখনো সশস্ত্র কখনো শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম। বৈরগর্ভ সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রেণিসংগ্রাম হলও সামাজিক বিকাশের প্রবল চালিকাশক্তি। শোষিত শ্রেণিদের বৈপ্লবিক সংগ্রাম সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়, পুরনো অচল হয়ে পড়া সমাজকে ঝেঁটিয়ে সাহায্য করে নতুন প্রগতিশীল সমাজ স্থাপনে। একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জায়গায় অন্যটার প্রতিষ্ঠা হলও বেড়ে ওঠা উৎপাদনী শক্তি আর পুরনো পিছিয়ে পড়া উৎপাদনী সম্পর্কের মধ্যে সংঘাত সমাধানের পরিণাম। বৈরি শ্রেণিতে বিভক্ত সমাজে এ সংঘাত প্রকাশ পায় শ্রেণিসংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধির মাধ্যমে। এক একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার শ্রেণিসংগ্রাম তার স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত।[১]
শ্রেণিসংগ্রামের রূপ শ্রেণিসংগঠনের রূপের সংগে সংশ্লিষ্ট। সেটা বিশেষ জাজ্বল্যমানরূপে দেখা যেতে পারে পুঁজিবাদী সমাজজীবনের সবক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রামের বিস্তৃত আকারের দৃষ্টান্তসমূহ থেকে। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েত শ্রেণিসংগ্রাম চালায় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ও ভাবাদর্শের ক্ষেত্রে।
ভি. আই. লেনিন তাঁর রাষ্ট্র  ও বিপ্লব বইয়ে শ্রেণিসংগ্রাম প্রসঙ্গে মার্কসবাদের বিশ্লেষণ করেন এবং উল্লেখ করেন শ্রেণিসংগ্রাম বুর্জোয়ারাও সমর্থন করে। মার্কসবাদী হতে হলে শ্রেণিসংগ্রামের সাথে প্রলেতারীয় একনায়কত্বকেও স্বীকৃতি দিতে হবে। লেনিন লিখেছেন,
“মার্কসের শিক্ষার প্রধান কথা শ্রেণিসংগ্রাম। প্রায়ই এই কথা বলা ও লেখা হয়। কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। এবং এই বেঠিকতা থেকেই প্রায়ই আসে মার্কসবাদের সুবিধাবাদী বিকৃতি, বুর্জোয়ার কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার মতো কারচুপি। কেননা শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদ মার্কস নয়, তাঁর আগে কিন্তু গড়ে তোলে বুর্জোয়ারা, এবং সাধারণভাবে বললে, তা বুর্জোয়ার কাছে গ্রহণযোগ্য। যে শুধু শ্রেণিসংগ্রাম স্বীকার করে, সে তখনো মার্কসবাদী নয়, এমন দেখা যাওয়া সম্ভব যে, সে তখনো বুর্জোয়া চিন্তা ও বুর্জোয়া রাজনীতির কাঠামো থেকে মুক্ত হয়নি। মার্কসবাদকে শ্রেণিসংগ্রামের মতবাদে সীমাবদ্ধ রাখার অর্থ তাকে ছেঁটে দেয়া, বিকৃত করা, বুর্জোয়ার কাছে যা গ্রহণযোগ্য তাতে পর্যবসিত করা। শুধু সেই মার্কসবাদী যে শ্রেণিসংগ্রামের স্বীকৃতিকে প্রসারিত করে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের স্বীকৃতিকে। এই হল চলতি পেটি (এবং বৃহত) বুর্জোয়া থেকে মার্কসবাদীর গভীরতম পার্থক্য। মার্কসবাদের সত্যকার বোধ ও স্বীকৃতিকে পরখ করা দরকার এই কষ্টিপাথরে।”[২]  
মার্কসবাদ ইতিহাসের শ্রেণি পর্যায়ে শ্রেণি-ঊর্ধ্ব কোনো সর্বজনীন ও চিরন্তন নৈতিকতাকে নাকচ করে। লেনিনবাদী মতে, প্রলেতারিয়েত শ্রেণি সংগঠিত হয়ে যে তীব্র শ্রেণিসংগ্রাম চালায় তাকে এগিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়াই হচ্ছে সাম্যবাদী নৈতিকতা। লেনিন আরো বলেছেন,
“আমরা বলি আমাদের নৈতিকতা সর্বতোভাবে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রামের বশবর্তী। প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রামের স্বার্থ থেকেই আসছে আমাদের নৈতিকতা। ... ... তাই আমরা বলি: আমাদের দিক থেকে, মানবসমাজের বাইরের দিক থেকে নেওয়া নৈতিকতা বলে কিছু নেই; সেটা ভাঁওতা; আমাদের কাছে নৈতিকতা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিসংগ্রামের স্বার্থের বশবর্তী।
শ্রেণিসংগ্রাম বস্তুটা কী? জারের উচ্ছেদ, পুঁজিপতিদের উচ্ছেদ, পুঁজিপতি শ্রেণি লোপ_ এই নিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম।”[৩]   
মানবজাতির ইতিহাস বিচার করে আমরা নিঃসন্দেহ হই যে শ্রেণিসংগ্রাম হলো সমস্ত বৈরি সমাজব্যবস্থা বিকাশের নৈর্বক্তিক নিয়ম। যে কোনো সমাজের ইতিহাসকে জানতে হলে সেই সমাজের শ্রেণিসংগ্রামমূলক বিন্যাসকে ঐতিহাসিক বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে দৃষ্টিপাত করতে হবে। এই শ্রেণিসংগ্রামই সমাজের মৌল দ্বান্দ্বিক চালিকাশক্তি এবং কেবল শ্রেণিসংগ্রামের মাধ্যমেই নির্দিষ্ট সমাজটির বৈরবিরোধের সমাধান হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে নির্দিষ্ট শ্রেণিগুলোর জন্মদাতা উৎপাদনের প্রণালীটি, সামাজিক বিপ্লবের মাধ্যমে উত্তরণ ঘটেছে সমাজজীবনের অন্য একটি উন্নততর ধাপে।
তথ্যসূত্র:
১. আ. ইয়ের্মাকোভা ও ভ. রাত্নিকভ, শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো,১৯৮৮, পৃষ্ঠা ১০৬-১০৭।
২. ভি. আই. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব; প্রগতি প্রকাশন মস্কো; তারিখহীন; পৃষ্ঠা-৩৫।
৩. রাশিয়ার যুব কমিউনিস্ট লিগের তৃতীয় সারা রাশিয়া কংগ্রেসে বক্তৃতা, ২ অক্টোবর, ১৯২০, Collected Works, Vol. 31, p-291-2

No comments:

Post a Comment