Sunday, September 07, 2014

মৈত্রীর স্বরূপ এবং ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার উৎস



স্বাধীনতা, সমতা, মৈত্রী অথবা মৃত্যু; ১৭৯২-এ অংকিত
সামাজিক শ্রেণির ভেতরের মানুষগুলো যখন নানা উদ্দেশ্যে একত্রিত হয়, সংগঠন গড়ে তোলে, চিন্তার আদান-প্রদান করে, সংগঠনের কর্মসূচি প্রণয়ন করে তখন তাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্ব, ঐক্য, সংহতি ইত্যাদি গড়ে ওঠে। দর্শনের আলোচনায় মৈত্রী (Fraternity) হচ্ছে প্রেম আর সংহতির ভিত্তিতে জনগণের ভেতর এক ধরনের নৈতিক সম্পর্ক। শিল্প, সংস্কৃতি, নৈতিকতা, দান, দক্ষতা ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে মৈত্রী  গড়ে ওঠে। মৈত্রীকে ফ্রান্স ও হাইতি প্রজাতন্ত্রের জাতীয় মূলমন্ত্রের, স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী, একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ধর্মীয়, সরকারি, রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক বা পারিবারিক বন্ধনের বাইরে কিছু মানুষের কোনো সামাজিক, সেবামূলক, পেশাগত উদ্দেশ্যমুখী ঐক্যকে মৈত্রী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ভ্রাতৃত্ব বা সৌভ্রাতৃত্ব (Brotherhood) মূলত একটি ধর্মীয় ভাবধারাযুক্ত শব্দ। এর দ্বারা গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজে ভাইকে বোঝানো হলেও একেশ্বরবাদী ধর্মগুলো দুনিয়ার দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লে খ্রিস্টীয়, মুসলিম, হিন্দু বা অন্যান্য ধর্মীয় মানুষের ভ্রাতৃত্বকে বোঝানো হয়।
এই ভ্রাতৃত্ব ও মৈত্রীই সামন্তযুগ ভেঙে পড়ার পর পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের প্রথমদিকের সংগঠন গড়ে উঠার ক্ষেত্র তৈরি করে। ভ্রাতৃত্বমূলক সংগঠন থেকেই ইয়োরোপে গিল্ড চালু হয়। পরে আসে নানারকম বন্ধুত্বমূলক সামাজিক সংগঠন। ফরাসি বিপ্লবে মৈত্রীর চেতনা শক্তিশালী রূপ ধারণ করে। পারস্পরিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক প্রয়োজনে মৈত্রী প্রতিষ্ঠিত হয়। পেশাগত ভিন্নতা আধুনিক বড় বড় নগরগুলোতে নাগরিকদেরকে মৈত্রীমূলক সংগঠন গড়তে সহায়তা করে। বের হয়ে আসে ফরাসি বিপ্লবের ও গণতন্ত্রের এই ভিত্তিটি। কিন্তু পুঁজিবাদের মূলনীতি ব্যক্তিগত মালিকানার সাথে মৈত্রীর দ্বন্দ্বটির সমাধান হয় না। ব্যক্তিগত মালিকানার উৎখাত করে সমাজের সদস্যদের সাথে মৈত্রীর সম্পর্কটি তাই সমাজতন্ত্রের আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়ে।
উনিশ বিশ শতকের মালিকশ্রেণি ও শাসকেরা বিচ্ছিন্নতাকে মহিমান্বিত করার প্রক্রিয়াটি বাদ দেয় না। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোর বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠী নানাভাবে বিচ্ছিন্নতা ও বিযুক্তিকে কাজে লাগায়। জনগণকে পরস্পরের থেকে দূরে সরানোর জন্য পুঁজিবাদ পরস্পরের মাঝে দেয়াল গড়ে, ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন করে, জনগণের নিজেদের চারিদিকে খোলস তৈরি করার উপাদান সরবরাহ করে ব্যক্তিবাদচর্চায় উৎসাহিত করে। বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদের ধ্বজা। শেকসপিয়ারের নাটকের সব ভিলেনরাই ব্যক্তিবাদের চূড়ান্ত প্রতিনিধি। শেকসপিয়ারের চোখে পাপের অর্থই সমষ্টি বিরোধিতা।
পুঁজিবাদ চায় মানুষ বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো, খড়কুটো-ধূলিকণা-বালুকণার মতো একাকি নিঃসঙ্গ হয়ে রাষ্ট্রে বাস করুক। পুঁজিবাদ চায় না মানুষের মধ্যে যৌথশক্তি বেড়ে উঠুক। পুঁজিবাদ চায়, সবকিছু হোক ব্যক্তিগত, সব সম্পদ হোক ব্যক্তিগত। নদী, পাহাড়, সমুদ্র, জল, জলাশয়, আকাশ, বাতাস ইত্যাদি অনেক কিছু যা যৌথ ছিল সব কিছুকেই পুঁজিবাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত করতে চায়। এই বিযুক্তির বিপরীতে গণতন্ত্র আর সমাজতন্ত্রের একটি নীতিরূপে কিছু দার্শনিকের কাছে সামাজিক জীব হিসেবে পুরনো সামাজিকতার চিন্তাটিই আসে মৈত্রীরূপে।

No comments:

Post a Comment