Friday, September 05, 2014

ফুলবাড়ির লাল পতাকা অমর রহে



২০০৮ সালে ২৬ আগস্ট, ফুলবাড়ির লালশিশুরা
ফুলবাড়িতে ফুল ফোটে কীনা সেই প্রশ্ন অবান্তর, ফুলবাড়িতে মানুষ ফোটে। ফুলের মানুষেরা জ্বলে উঠলে যে সত্য চারদিকে দেখা যায় তার উৎপত্তিস্থল হচ্ছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি। ফুলবাড়িতে ফসল ফলে, বাংলায় যত রক্তের ফসল আমরা দেখি তাঁর একটির চিত্রায়ন হয় ২০০৬ সালের ফুলবাড়িতে। ফসলের মাঠ বাঁচাতে যে মানুষেরা উন্মুক্ত কয়লাখনির বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল তাঁদের চোখের দিকে তাকিয়ে শিখেছিলাম মানুষ পরমাণু বোমার চেয়েও শক্তিশালী। ফুলবাড়িতে থাকে মানুষ আর পার্লামেন্টে থাকে নরখাদকেরা, ফুলবাড়িতে না গেলে এই সত্য জানা হতো না।

ফুলবাড়িতে পৌঁছাই ২০০৫ সালের ২ জুলাই সূর্যোদয়ের আগে, ফুলবাড়ি ছেড়ে আসি ২০০৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে আটটায়। মাঝখানের সময়টুকু ফুলবাড়ির মানুষের মাঝখানে থাকা। আজ যে
প্রতিবছর ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ি দিবস পালন করা হয় দেশব্যাপী; সেই ফুলবাড়ি বিদ্রোহের ৬ মাস ১৪ দিন আগে আমি সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। যদিও বিদ্রোহের পরেও মাঝে মাঝে ফুলবাড়িতে গেছি। আমরা ফুলবাড়িকে ভুলিনি, ফুলবাড়ি ছাড়া আমার জীবন পূর্ণতাও পায়নি।  

ফুলবাড়িতে কাজ শুরু করে
সংস্কৃতির নয়া সেতুর কর্মীরা ২০০৫ এর ডিসেম্বরে। সেই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেখানে যায় বাবু নামের একজন। আর তার সাথে যায় সম্ভবত আরিফুল সজীব, বর্তমানে চ্যানেল ২৪-এর প্রতিবেদক। জানুয়ারি, ২০০৬ থেকে যেতে থাকে মঞ্জুরুল এহসান, সজীবসহ প্রপদ’-এর আরো অনেকে যাদের কথা এখন আর মনে নেই। আমার সাথে যোগাযোগটি হয়তো সাজ্জাদ জাহিদ কিংবা অন্য কেউ করিয়ে দিয়েছিলেন, যা এখন বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে। তারা ডিসেম্বরেই লিফলেট লিখে নিয়ে যায়, যেগুলো ফুলবাড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদেরসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকদের মাঝেও বিতরণ করা হতে থাকে। জানুয়ারি মাসেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে প্রতি মঙ্গলবার বিকেলে উর্বশী সিনেমা হলের সামনে সমাবেশ করা হবে। প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবারের সমাবেশটি একটানা সাতমাস চলেছিল। সাপ্তাহিক সেই সমাবেশ থেকেই জনগণ জেনে যায় ফুলবাড়িতে কী ভয়ংকর ক্ষতি করার জন্য তৎকালীন সরকার নেমেছিল।

ফুলবাড়ি নিয়ে অনেক আবেগ জমা আছে। এতো বছর চলে গেল, আমার আবেগ কমে না। যে জনগণ বাঁশের লাঠি, রামদা, কাস্তে কিংবা তীর-ধনুকে সজ্জিত হতে পারে হাজারে হাজারে তাদেরকে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই পরাজিত করতে পারে না।


জন্মের পর থেকেই দেখেছি কৃষকের দারিদ্র যত গভীরই হোক না কেন তারা প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের সাথেই আছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সিঁড়িতে হাঁটতে গিয়ে এবং ক্যাম্পাসে মিছিল করে করে যে আত্মঅহমিকায় ভুগতাম তা মুচড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেছিল ফুলবাড়িতে গিয়ে। জনগণের বিদ্রোহী শক্তি দেখেছিলাম ফুলবাড়ির সাঁওতাল গ্রামগুলোতে। পুলিশ বিডিআরের শক্তি ফুলবাড়িকে দমাতে পারেনি। মৃত্যুর কিনারা থেকে ফুলবাড়ির জনগণের সাথে সারা দুনিয়া জেগে উঠুক ফিনিক্স পাখির মতো। ফুলবাড়ির লাল পতাকার কোনো দেশ নেই। ফুলবাড়ি অমর রহে।

No comments:

Post a Comment