Thursday, October 23, 2014

সমাজতান্ত্রিক নারীনেত্রী এডভোকেট রোকেয়া বেগম




এডভোকেট রোকেয়া বেগম


এডভোকেট রোকেয়া বেগমকে (১ মার্চ, ১৯৪০ - ২৪ অক্টোবর, ২০১২) নানা নামে ডাকা যায়। তিনি সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রিয় কমিটির উপদেষ্টা এবং ময়মনসিংহ জেলা শাখার আহ্বায়ক, নারী জাগরণের সংগঠক, সমাজতন্ত্রের যোদ্ধা, প্রগতিশীল আন্দোলনের কাণ্ডারি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের ময়মনসিংহ জেলা কমিটির প্রবীণ সদস্য, সমাজতান্ত্রিক নারীনেত্রী, বাসদ পরিবারের খালা। তিনি ২৪ অক্টোবর, ২০১২ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটায় মারা যান। প্রবীণ বয়সে মরণ ব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তিনি মারা গিয়েছিলেন মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৩ বছর

এডভোকেট রোকেয়া বেগম ছিলেন সমাজতন্ত্রের অকুতোভয় সংগ্রামি এবং বাংলাদেশের নারীমুক্তির এক সাহসী সৈনিকতিনি নারী শিক্ষা ও নারীমুক্তির জন্য নিরলস কাজ করেছেনতিনি ময়মনসিংহের সকল গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেনগত ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলন, নারীমুক্তি সংগ্রাম, বর্তমান আওয়ামি সরকারের (২০০৮-২০১২) স্বেচ্ছাচারি নারী নীতি ও শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ পরবর্তীকালে তিনি কতিপয় বামপন্থিদের আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করেনতিনি চার দশকের লুটপাটের রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন সর্বদাই উচ্চকণ্ঠ

ময়মনসিংহসহ সারাদেশে তার গুণগ্রাহী অনেকেই আছেন, কারণ তিনি যে শ্রেণিতে অবস্থান করতেন তাতে নুন অনেককেই খাওয়ানো যেত। কিন্তু তার যে গুণটির জন্য তাকে স্মরণ করা যায় সেটি হচ্ছে তিনি সুবিধাবাদীদের সুবিধাবাদীই বলতেন। সুবিধাবাদীদের সাথে সম্পর্ক শেষ করার ক্ষমতাও তিনি রাখতেন।

তার হৃদয়টি ছিল সমাজতন্ত্রী, সমাজ-গণতন্ত্রী, প্রগতিশীল ও মানবতাবাদীদের আশ্রয়স্থল। তিনি আজ নেই; কিন্তু সুবিধাবাদী, সংশোধনবাদী, মতান্ধতাবাদী ও অসর্বহারা চিন্তার তল্পিবাহকেরা তার পার্টি সিপিবি-বাসদসহ আরো নানা জায়গায় আছে। এদের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোটাই মার্কসবাদী পার্টিকে শক্তিশালী করার একমাত্র পথ; এবং সেপথে তিনি হয়তো তীব্রভাবে লড়াই করতে পারেননি, কিন্তু নানা সময়ে ভুল পথের পথিকদের সমালোচনা করেছেন। তিনি ১৯৯০ দশকের আগেই সিপিবিকে ত্যাগ করেছিলেন তার সুবিধাবাদীতার কারণে, সেই সিপিবির সাথে সুবিধাবাদী বাসদ এখন একসাথে থেকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল কামাল হোসেনকে নিয়ে জুট করতে চায়। তিনি সিপিবি ছেড়ে বাসদে যোগ দিয়েছিলেন, আজ বাসদের সুবিধাবাদকে কি বেঁচে থাকলে পরিত্যাগ করতে পারতেন?

সাংসারিক দায়িত্ব পালন করেও তিনি বিপ্লবি চেতনায় আজীবন সক্রিয় থেকেছেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মতো দৃঢ়তা হয়তো তার ছিলো না, প্রথমত নারী হবার কারণে, দ্বিতীয়ত ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণিতে অবস্থানের কারণে; কিন্তু আমরা যারা পুরুষ এবং যুদ্ধকে রাজনীতির অংশ হিসেবে নিতে পারিনি, তাদের ব্যর্থতাগুলো খুব বিশাল এক আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নয় কি? যে রাজনীতিটিতে তিনি সক্রিয় হয়েছিলেন তার ধারাবাহিকতা দেখলে আমরা দেখবো তিনি, ন্যাপ থেকে সিপিবি হয়ে বাসদে এসে থিতু হয়েছিলেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কোনোদিন ডানদিকে হেলে পড়েননি। একজন মানুষ হিসেবে স্বৈরাচার কবলিত এদেশে সেটি কম বড় ব্যাপার ছিল না। তিনি ১৯৭১ সনের শ্রেণিযুদ্ধে নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেছেন। মানবসেবায় শেষদিন পর্যন্ত নিবেদিত ছিলেন। পরিবার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি, তৃণমূল পর্যায়ের নারী-পুরুষ, সকলের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, একান্ত ভরসাস্থল। সারাজীবন মিছিলে সভায় সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করেছেন।
তার মৃত্যুতে কিছু মানুষ শোককাতর হয়েছিলো। যেমন, কবি শামসুল ফয়েজ তাঁর মৃত্যুতে যে শোক বিহ্বল কবিতাটি লিখেছিলেন তার কয়েকটি লাইন এইরকম:  
সমস্যায় সংকটে দুর্দিনে দুঃসময়ে
আশ্বস্ত হয়েছে যারা তার মধুর কণ্ঠের বচনে,
তারা রুদ্ধবাক অবিরাম শোকের দহনে।
দুধঅলা, গৃহকর্মি, দৈনিক পত্রিকার হকার,
বিপন্ন বিপ্লবী, চন্দ্রাহত কবি, অচেনা কমরেড,
রবীন্দ্র সংগীতের বিমুগ্ধ অনুরাগী,
লাঞ্ছিত-বঞ্চিত নারী প্রিয়জন হারানোর
বেদনায় মুহ্যমান-ব্যথাহত।”[১]

এডভোকেট এডভোকেট রোকেয়া বেগম ময়মনসিংহের ২৮নং কালিবাড়ি বাইলেনে ১৯৪০ সালের ১ মার্চ জন্মেছিলেন। নারীদের লেখাপড়া তখনো চোখে পড়ার মতো ছিলো না। তার পিতা ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ ও মাতা সৈয়দা মরিয়ম আক্তার। বাল্যকালেই তিনি বড় ভাই নেছার উদ্দিনের সাহচর্যে মানবমুক্তির আদর্শে উজ্জীবিত হন। তার পিতার বাড়ি বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার জঙ্গলবাড়ি এলাকার মাস্টারবাড়ি নামে পরিচিত ছিল

তিনি ১৯৪৮ সালে বিদ্যাময়ী স্কুলে গমন করেন। কৈশোর বয়সে ভাষা আন্দোলনের তরঙ্গে আন্দোলিত হয়েছিল কালিবাড়ি বাইলেন। তার ভাইয়ের ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি (ন্যাপ)-এর সাথে জড়িত থাকার সূত্রেই তিনি নারীমুক্তির কামনায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে নিজেকে উজ্জীবিত করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে মেট্রিক পাস করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেই বছরের ২৮ অক্টোব আশরাফ হোসেনকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে স্বামীর কর্মস্থলের সূত্রে নকলা, বারহাট্টা, বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে নিজেকে প্রগতিশীল কাজে নিয়োজিত করেন। প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে আই.এ. পাস করার পর তিনি বরিশালের চাখার কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেন। পরম মমতায় সন্তানদের লালন পালনের সাথে তার নিজের লেখাপড়াও চালাতে থাকেন অদম্য গতিতে। প্রথমে তিনি ভর্তি হন বরিশাল ল কলেজে। কিন্তু তিনি এল.এল.বি. ডিগ্রি নেন ময়মনসিংহ ল কলেজ থেকে। তিনি ১৯৭৪ সালে আইন পেশাতে যোগ দেন। তিনি পেশাগত জীবনে সরকারি সহকারী উকিল (APP) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

তিনি ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সক্রিয় সংগঠক। নিরলসভাবে এই সংগঠনটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সাল পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাথে যোগাযোগের সূত্রে এবং নারীদের অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ২০০৮ সালে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য হন এবং তখন থেকেই ময়মনসিংহ জেলা শাখার আহবায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

তিনি বিএনএসবি-ময়মনসিংহের কার্যনির্বাহি কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার কার্যনির্বাহি কমিটির আমৃত্যু সদস্য জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার আমৃত্যু সহসভাপতি এবং শিশুতীর্থ আনন্দধ্বনি সংগীত বিদ্যায়তনের সভাপতি এবং সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন

আপনার সাথে জীবনের এক সরল ও স্মৃতিঘন পরিস্থিতিতে আমার পরিচয় হয়েছিল। সেই স্মৃতিটুকু খুব গভীর না হলেও ক্ষুদ্র এক জীবনের জন্য সতেজ সম্বল। আপনার সাহস ও ধৈর্য জনগণের চলার পথকে গৌরবময় করুক, এই কামনা করি।

No comments:

Post a Comment