Wednesday, October 08, 2014

ভাষা মতিনের জীবন ও যুদ্ধ, একটি মূল্যায়ন




১৯৭৯ সালে তোলা ছবিতে ভাষা মতিন

কমরেড আবদুল মতিন (৩ ডিসেম্বর, ১৯২৬ _ ৮ অক্টোবর, ২০১৪) যিনি ভাষা মতিন নামে সমধিক পরিচিত, ছিলেন শ্রেণিসংগ্রামের রাজনীতির মানুষ। পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সভাপতি শহীদ কমরেড সিরাজ সিকদার আবদুল মতিনকে বলেছিলেন চে পন্থিচে যোদ্ধা ছিলেন, রাজনীতিবিদও ছিলেন, ভাষা মতিনও সেরকমই ছিলেন। তবে পার্থক্যরেখাগুলো খুব বড়। একজন গোটা দুনিয়ায় রাজনীতি করার জন্য বের হয়েছিলেন এবং সিআইএর হাতে মারা যান, অন্যজন দেশের ভিতরেই সারা জীবন কাজ করেছেন।
ভাষা মতিন নামটি এসেছিল ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে তাঁর অনন্যসাধারণ ভূমিকার জন্য। তাঁকে সৈয়দ আবুল মকসুদ এক লেখায় ভাষা সেনাপতি হিসেবে উল্লেখ করেছেনভাষা আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাস রচিত হয়েছে। একটু পেছন ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত বিশেষ সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ তার ভাষণে উর্দু কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষাউচ্চারণ করলে মতিন দাঁড়িয়ে তীব্রকণ্ঠে প্রতিবাদ করেন। জিন্নাহর মুখের ওপর প্রতিবাদ করা জীবনের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ ছিলো যা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহের সমতুল্য বলা যায়এই ঘটনাটি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের নিকট পরিচিত করে তোলে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের এক প্রতিবাদ মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার সময় পুলিশ সচিবালয়ের কাছ থেকে আবদুল মতিনকে গ্রেফতার করে এবং দুই মাসের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে প্রেরণ করে। তিনি হয়ে ওঠেন ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন,
“রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের বিষয়টি হয়ে গিয়েছিল তাঁর জীবনযাপনের অংশশুধু কোনো একটি দাবি আদায়ের ইস্যু নয়। তাঁর সহপাঠী ও বন্ধুদের থেকে জানা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ পর্যন্ত তিনি একটি কালো চামড়ার হাতব্যাগ সব সময় বহন করতেন। তাতে থাকত রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক কাগজপত্র। রাষ্ট্রভাষা নিয়ে অব্যাহত লেগে থাকায় তিনি অর্জন করেন একুশে ফেব্রুয়ারির অনেক আগেই একটি উপসাম - ভাষা মতিন।”[১]
ভাষা মতিন জন্মেছিলেন ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালী উপজেলার ধুবুলিয়া গ্রামে এবং মারা যান ২০১৪ সালে ৮ সেপ্টেম্বর বিএসএমএমইউতে। তাঁর কর্মময় জীবন ৬৭ বছরের। বেঁচে ছিলেন ৮৮ বছর। তাঁর পিতার নাম আবদুল জলিল, মাতার নাম আমেনা খাতুন। পিতার জমিজমা যমুনা নদীতে চলে গেলে পিতা ভাগ্যান্বেষণে সপরিবারে পাড়ি দেন দার্জিলিং। সেখানে এন্ট্রান্স, বর্তমানের এসএসসি, পাস করেন। ১৯৪৩ সালে তিনি রাজশাহী গভর্নমেন্ট কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে প্রথম বর্ষে ভর্তি হন এবং ১৯৪৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। ১৯৪৫ সালে আবদুল মতিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব আর্টসে পাস কোর্সে ভর্তি হন১৯৪৭ সালে স্নাতক পর্ব শেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হন, পরে সেটি বাতিল করে যান ইতিহাস বিভাগে। একই বছর আইন অনুষদেও ভর্তি হন। এসব তাঁর শক্তির উদাহরণ
১৯৪৯ সালের জেলজীবন ছিলো দুইমাস এবং এরপর তিনি আরো চারবার জেলে ছিলেন। দ্বিতীয়বার গ্রেফতার ও জেল ১৯৫২ থেকে ১৯৫৩ সালে। তৃতীয়বার ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্তচতুর্থবার ১৯৭২ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হন ১৯৮৬ সালে। আমরা দেখি রাষ্ট্রের নাম বদলে যায় কিন্তু ভাষা মতিনের জেল জীবনের ব্যত্যয় হয় না।
১৯৫২ সালে দুটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল। একটি ছিল সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ, যা গঠন করেছিল রাজনৈতিক দলগুলো। আরেকটি ছিল ১৯৪৮ সালে গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি দ্বিতীয়টি গঠন করেছিলেন শিক্ষার্থীরা, এবং আহ্বায়ক ছিলেন আবদুল মতিন। এই কমিটি ভাষার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করত। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ সুলতান প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন থেকে জানা যায়,
“এই রাষ্ট্রভাষা কমিটিই প্রতি বৎসর ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবসউদযাপন করত এবং এই কমিটিই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে প্রথম সংগঠিত রূপ দেয়।”[২]
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন তিনি। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখেছেন, আবদুল মতিনের
“সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই জনসভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের। তবে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এর বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের মত ছিল, সামনে নির্বাচন। এখন গোলযোগ হলে সরকার একটি অজুহাত পাবে নির্বাচন না করার বা তারিখ পিছিয়ে দেয়ার। কাজেই ১৪৪ ধারা ভাঙা সঠিক হবে না।”[৩]
উঠতি বুর্জোয়ারাও নির্বাচন বুঝেছিলো, সেই ১৯৫২ সালে। ছাত্ররা নির্বাচনের লোভে পড়েননি, নির্বাচন হয়েছে ১৯৫৪ তে এবং জনগণ ভোটের হিসাব উলটে দিয়েছে, মুসলিম লিগ পরাজিত হয়েছে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনগণ ভোটের অপেক্ষায় রাজনীতিবিদদের মতো সুবিধাবাদী হননি। তারা ১৪৪ ধারা বা কারফিউয়ের তোয়াক্কা করেননি। ২১ ফেব্রুয়ারির ইতিহাস আমাদের সকলের জানা। সেদিন সন্ধ্যা থেকে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়। কেউ গ্রেপ্তার হন, কেউ আত্মগোপন করেন। ১৯৫৩ সালে মোহাম্মদ সুলতান প্রকাশিত একুশে ফেব্রুয়ারি সংকলন জানাচ্ছে,
“৮ই মার্চ রাত্রে পুলিশ এক বাড়িতে হানা দিয়ে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ৯ জন আত্মগোপনকারী নেতাদের মধ্যে ৮ জনকে গ্রেফতার করে নেয়। তাদের মধ্যে জনাব অলি আহাদ, জনাব তোয়াহা, জনাব আবদুল মতিন প্রভৃতি ছিলেন।”[৪]
২১ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, ভাষা আন্দোলনকারী থেকে বের হয়ে তিনি রাজনীতির অঙ্গনে উঠে আসেন। সৈয়দ আবুল মকসুদ জানাচ্ছেন, ১৯৫১ সালের মার্চে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ গঠিত হয় এবং সেই সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদক হন আবদুল মতিন ও মোহাম্মদ তোয়াহা।
আরিফুজ্জামান তুহিনের লেখা থেকে জানা যায়, তিনি ১৯৫৩ সালে জেল থেকে বেরিয়ে ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন এবং সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা তাঁর না থাকলেও পার্টির সিদ্ধান্তের কারণে তিনি ওই দায়িত্ব নেন। ছাত্র ইউনিয়নে এক বছর দায়িত্ব পালনের পর তিনি কৃষক সংগঠনে কাজ শুরু করেন। মতিন ১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে পার্টির প্রার্থী সভ্য এবং ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে কমরেড মতিন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক নিযুক্ত হন। সংক্ষেপে এই হচ্ছে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়।
১৯৬৭ _ ৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী লেনিনবাদী)র ভাঙন দেখা দেয় এবং তাঁর জীবনে রাজনীতির দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়। ১৯৬৭ সালের ভাঙনে অন্তত ছয়টি গ্রুপ সক্রিয় ছিলো ১৯৬৮ সালে তিনি পাবনা জেলাকে ভিত্তি করে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী লেনিনবাদী)র ভেতরে আলাউদ্দিন আহমদকে নিয়ে এক উপদল গড়ে তোলেন। সেই বছরের অক্টোবরে তিনি দেবেন শিকদার, আবুল বাশার, আলাউদ্দিন আহমদ ও নুরুল হক চৌধুরীর সহায়তায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ১৯৬৯ সালে পার্টির সাধারণ সম্পাদক দেবেন শিকদার গ্রেফতার হবার পর আবদুল মতিন পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ জুলাই পর্যন্ত পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। ’৭১ সালের ১৬ জুলাই পাবনার শাহপুরে পার্টি প্লেনামে চারু মজুমদারের লাইন গৃহীত হলে তিনি ভিন্নমত পোষণ করেন এবং পার্টির সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দেন।
টিপু বিশ্বাস, আলাউদ্দিন আহমদ ও তাঁর নেতৃত্বে পাবনা জেলার জনগণ পাবনা শহরকে মুক্ত করা ও সশস্ত্র যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও শ্রেণিযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা পালন করেন।[৫]  
যুদ্ধ তিনি করেছিলেন জনগণের মুক্তির জন্য। এই মুক্তি একটি পতাকা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলো না। ফলে তাঁর যুদ্ধ শেষ হয় নি। আরিফুজ্জামান তুহিন লিখেছেন,

“১৯৭১ সালে আবদুল মতিন ও আলাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র জনতাকে সংগঠিত করে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি দেশের অভ্যন্তরে থেকেই জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। এ কারণে রাজাকার ও পাকবাহিনী আবদুল মতিনের গ্রামের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর বাবা পাবনা নগরবাড়ী ঘাটে রাজাকার ও পাকবাহিনীর হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন। তাঁর এক ভাই গোলাম হোসেন মনু পাকসেনাদের সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে আহত হন, পরে তাকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করে। অপর এক ভাই সিরাজগঞ্জ কলেজের ছাত্র আব্দুল গফ্ফার ঘটু স্বাধীনতা পরবর্তীতে রক্ষীবাহিনীর হাতে নিহত হন।”[৬]

স্বজন হারানো শ্মশানে তিনি একা যোদ্ধা ছিলেন না। লাখো মানুষের যুদ্ধকে তিনি ধারণ করেছিলেন শ্রেণিযোদ্ধার দৃষ্টিতে। ফলে তাঁর জীবনে কোনো সুবিধাবাদ নেই, মৃত্যুর পর দেহ এবং চোখ দান করে যান জনগণের জন্য।  
১৯৭২ সালের ৪ জুন আত্রাই লড়াই খ্যাত সশস্ত্র যুদ্ধে আবদুল মতিন গুলিবিদ্ধ অবস্থায় গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ কারাভোগের পর ১৯৭৭ সালে মুক্তি পান। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি আবার পার্টির সাথে যুক্ত হন। ১৯৭৮ সালে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল) এবং বাংলাদেশের মার্কসবাদী লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির ঐক্যের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট লীগ (এমএল) গঠিত হয়। ১৯৮২ সালে কমিউনিস্ট লীগ (এমএল), বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল), বাংলাদেশের বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ এবং সাম্যবাদী দল (বাদশা-মানিক) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হয়। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ ও ওয়ার্কার্স পার্টি (অমল-নজরুল) ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠন করে। সর্বশেষ ১৯৯২ সালের মে মাসে ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দল (আলী আব্বাস) ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেকমরেড আবদুল মতিন ঐক্যের প্রক্রিয়ায় গঠিত পার্টিসমূহের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য অথবা পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৪ সালের পর ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনৈতিক লাইন ও কর্মকান্ড নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়। পরবর্তীকালে ২০০৯ সালে হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠন) গঠিত হলে আবদুল মতিন তাঁদের সংগে যোগ দেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (পুনর্গঠিত) ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট লীগ ঐক্যবদ্ধ হয়ে বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হয় এবং আবদুল মতিন নবগঠিত বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাথে ঐক্যবদ্ধ হন। তিনি এই পার্টির কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর অন্যতম সদস্য মনোনীত হন এবং আমৃত্যু তিনি এই পদে আসীন ছিলেন।
বারবার পার্টি ভাঙা-গড়া প্রমাণ করে যে, এদেশীয় কমিউনিজম চর্চাকারীদের পার্টি সংক্রান্ত চিন্তায় ও অনুশীলনে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে আবদুল মতিনের দর্শনকে রপ্ত করার মতো লোকের খুব অভাব ছিলো। ফলে তিনি পার্টি ভাঙার প্রক্রিয়ায় নিরুপায় এক মানুষ ছিলেন যিনি আজীবন কমিউনিস্টদের ঐক্য কামনা করেছিলেন।
তাঁর সাথে আমার কথা হয়েছিলো ২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসের কোনো এক সন্ধ্যায়। সে বছর তাঁকে আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার দেয়া হয়। স্মারক পুরস্কার দেবার সিদ্ধান্ত হবার পর অনুমতি সংগ্রহের এবং তাঁর জীবনী সংক্ষিপ্ত আকারে রচনার জন্য আমি এবং তাহা ইয়াসিন তাঁর জিগাতলার বাসায় যাইঘণ্টাখানেকের আলাপচারিতায় এই লড়াকু মানুষটির জীবনের সামান্য কিছু কথা শুনি।
তিনি রাষ্ট্রের সকল রকমের নিপীড়নের বিরোধী ছিলেনযে রাষ্ট্র দুটি নামের ভেতর দিয়ে গেলেও আবদুল মতিনকে নির্যাতনে পিছপা হয় না, সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তিনি লড়ে গেছেন আজীবনতাঁর দর্শন অনুযায়ী, রাষ্ট্র শোষণের হাতিয়ার ভিন্ন কিছু নয়। তাই রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে বিবেচনা করতো। তিনি আন্দোলনের মানুষ ছিলেন, যুদ্ধকে রাজনীতির অংশ হিসেবেই দেখতেন, যুদ্ধে অংশও নিয়েছিলেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের আবদুল মতিনের চেয়ে কৃষক আন্দোলনের আবদুল মতিন হিসেবে তিনি নিজেকে পরিচয় দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করতেন। তাঁর তৃপ্তির জায়গা এটিই ছিলো যে তিনি কৃষক আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
আবদুল মতিন মাঝেমাঝে তাঁর এক সময়ের রাজনৈতিক সহকর্মী সত্যেন সেনের লেখা একটি গণসংগীতের কয়েকটি লাইন উদ্ধৃতি করতেন,  
মানুষেরে ভালোবাসি এই মোর অপরাধ,
হাসিমুখে তাই মাথা পেতে নেই দুঃখের আশীর্বাদ।
মানুষের কাছে পেয়েছি যে বাণী, তাই দিয়ে রচি গান,
মানুষের লাগি ঢেলে দিয়ে যাবো, মানুষের দেয়া প্রাণ।
গানের এই কথাগুলো সত্যি করে গত ৮ অক্টোবর তিনি ‘মানুষের দেয়া প্রাণ’ মানুষের জন্য ঢেলে দিয়ে গেলেন। তাঁর একটি পুস্তকের নাম বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলনরাষ্ট্রভাষা আন্দোলন থেকে যার রাজনৈতিক জীবনের আরম্ভ, যিনি বাঙালি মধ্যবিত্তের বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনের নেতা হিসেবে সারা জীবন সম্মানিত হয়েছেন, যিনি পরবর্তীতে প্রলেতারীয় আন্তর্জাতিকবাদের দিকে গিয়েছেন, তিনি কী জাতীয়তাবাদকে অতিক্রম করতে পেরেছিলেন; এই প্রশ্ন ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকুক। বিনম্র শ্রদ্ধা রইল এই আজীবন বিপ্লবীর প্রতি।[৭]

তথ্যসূত্র:
১. সৈয়দ আবুল মকসুদ, দৈনিক প্রথম আলো, শিরোনাম, চলে গেলেন ভাষা সেনাপতি, ৯ অক্টোবর, ২০১৪, পৃষ্ঠা ৮, লিংকঃ http://www.prothom-alo.com/opinion/article/338833/  
২. মোহাম্মদ সুলতান, একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৬৬
৩. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, রাজনীতিবিদ মতিন, লিংকঃ http://www.bonikbarta.com/2014-10-10/news/details/16147.html
৪. মোহাম্মদ সুলতান, একুশে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৩, ঢাকা, পৃষ্ঠা ১৭৯
৫. জয়নাল আবেদীন, উপমহাদেশের জাতীয়তাবাদী ও বামধারার রাজনীতি, প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, বাংলাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৩, পৃষ্ঠা ২৪৩
৭. এই প্রবন্ধটি ২০১৪ সালের ১৬ অক্টোবর ভাষা মতিন শোকসভা উদযাপন পর্ষদ আয়োজিত অনুষ্ঠানে পঠিত এবং সেই উদ্দেশ্যে সেইদিন লিখিত।

No comments:

Post a Comment