Saturday, January 31, 2015

লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি ফরাসি কল্পলৌকিক সাম্যবাদের বিশিষ্ট প্রবক্তা




লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি, ফটো: উইকিপিডিয়া থেকে

লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি (ফরাসি: Louis Auguste Blanqui) (১ ফেব্রুয়ারি, ১৮০৫- ১ জানুয়ারি, ১৮৮১) ছিলেন ফরাসি সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে বিখ্যাত বিপ্লবী, ফরাসি কল্পলৌকিক সাম্যবাদের বিশিষ্ট প্রবক্তা। ফ্রান্সের আল্প-মেরিটিমের পুগেত তেনেরিতে ব্লাঁকির জন্ম হয়। তাঁর পিতা কঁভঁসিয়ঁর সদস্য ছিলেন। ব্লাঁকি আইন ও চিকিৎসাবিদ্যায় শিক্ষালাভ করেন। কিন্তু এই দুই বিদ্যার একটিতেও তাঁর মন বসেনি। তাঁর মন টেনেছিলো রাজনীতিতে। ১৮৩০ সালের বিপ্লবে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু লুই ফিলিপের শাসনে অল্পদিনেই তাঁর মোহভঙ্গ হয়। তিনি প্রজাতন্ত্রী সমিতি সংগঠন করতে শুরু করেন। ১৮৩১ ও ১৮৩৬ সালে দুবার তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৮৩৮-এ তিনি ‘ঋতুর সমিতি’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনে তাঁর সহযোগী ছিলেন আর্মাঁ বার্বে ও মার্তাঁ রেবনার। ১৮৩৯ সালে এই সমিতি যে অভ্যুত্থানের ডাক দেয়, তা ব্যর্থ হয়। ব্লাঁকি ও তাঁর সহযোগীদের প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অবশ্য পরে প্রাণদণ্ড মকুব করে এঁদের যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ড দেওয়া হয়।
জেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ঠিক আগে তিনি জেলের হাসপাতাল থেকে মুক্তি পান। কিন্তু তাঁর সহযোগী বার্বে তাঁর বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনায় মে মাসে তাঁকে আবার দশ বছরের জন্য কারাগারে পাঠানো হয়।
কারাবাসের এই সময় তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক মতবাদ গড়ে ওঠে। ১৮২৮ সালে বুয়োনারতি (১৭৬১-১৮৩৭) প্রকাশিত বাব্যুফের ‘সাম্যের জন্যে ষড়যন্ত্র’ নামক গ্রন্থ থেকেই তিনি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব ধারনায় পৌঁছান। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার একমাত্র পন্থা হিসেবেই তিনি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বকে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি মনে করতেন যে, প্রলেতারিয়েতদেরকে বুর্জোয়া শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। এই সংগ্রামের হাতিয়ার, ট্রেড ইউনিয়ন, ধর্মঘট ও বৈপ্লবিক অভ্যুত্থান। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো যে, বুর্জোয়া শাসন তার সামাজিক বিকাশের চরম বিন্দুতে পৌঁছাবার আগেই এই বুর্জোয়া সামাজিক সংগঠনকে উপড়ে ফেলতে হবে। এখানেই মার্কসীয় মতবাদের সংগে তাঁর মৌলিক পার্থক্য। ব্লাঁকির দর্শনে বিপ্লব মানেই প্রগতি। শেষ পর্যন্ত ব্লাঁকির দর্শনে সামাজিক লক্ষ্য নয়, বিপ্লবই বিপ্লবের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
১৮৫৯ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই আবার গুপ্ত সমিতির সংগঠন আরম্ভ করেন। স্বভাবতই ১৮৬৭ সালে আবার তাঁকে জেলে যেতে হয়। ১৮৬৫? সালে তিনি বেলজিয়ামে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকে গুপ্ত সমিতির পরিচালনা করতে থাকেন। ১৮৭০ সালে তিনি আবার যখন ফ্রান্সে ফিরে আসেন, তখন তিনি প্যারিসের একটি সশস্ত্র, সুশৃঙ্খল গুপ্ত সমিতির অবিসংবাদিত নেতা। এই বাহিনীর সংখ্যা তখন প্রায় চার হাজার। এই সশস্ত্র বাহিনীর বাইরেও তাঁর অনুগামিরা ছড়িয়ে ছিলো।
সেঁদার বিপর্যয়ের পর প্যারিসের জনতার নেতৃত্ব দেয় ব্লাঁকির অনুগামিরা। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের পতনে এঁদের ভূমিকা অনেকখানি। কিন্তু নতুন সরকারে ব্লাঁকিপন্থীদের নেয়া হয়নি। ব্লাঁকিপন্থীগণ বিপ্লবী পার্টির ক্রিয়াকলাপের বদলে মুষ্টিমেয় চক্রান্তকারীর অভিযানে বিশ্বাসী ছিলো, অভ্যুত্থানের বিজয়ের জন্য প্রয়োজনীয় প্রত্যক্ষ বাস্তব পরিস্থিতির পরোয়া করত না এবং জনসংযোগ উপেক্ষা করত।
১৮৭১ সালের ৩১ অক্টোবর ব্লাঁকির নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সংগে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষ হয় এবং কয়েক ঘণ্টার জন্যে যে অস্থায়ী সরকার গঠিত হয় তাঁর নেতাও ছিলেন ব্লাঁকি১৮৭১ সালের জানুয়ারিতে তিয়ের জার্মানদের সংগে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ব্লাঁকিও স্বাস্থ্যউদ্ধারের জন্য ‘ল’তে (Lot) চলে যান। সেখানে ঠিক প্যারিস কমিউনের অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পূর্বে ১৭ মার্চ তিয়েরের আদেশে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় ৩১ অক্টোবরের প্যারিসের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের জন্যে। সুতরাং ব্লাঁকি স্বয়ং প্যারিস কমিউনের নেতৃত্ব দিতে পারেননি। কিন্তু তাঁর অনুগামিরা অর্থাৎ ব্লাঁকিপন্থীরা এই কমিউনের নেতৃত্ব দেন। প্যারিস কমিউনের পরাজয়ের পর তাঁকে আবার যাবজ্জীবন কারাবাসের দণ্ড দেয়া হয়। ১৮৭৯ সালের রাজক্ষমার পর তিনি বন্দিদশা থেকে মুক্তি পান। ১৮৮১ সালের ১ জানুয়ারি প্যারিসে তাঁর মৃত্যু হয়।
লুই অগ্যুস্ত ব্লাঁকি রচিত গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ফরাসি ভাষায়,
১. L’Armée esclave et opprimée
২. Critique sociale, দুই খণ্ডে: Capital et travail এবং Fragments et notes,
৩. Instructions pour une prise d’armes,
৪. Maintenant il faut des armes,
৫. Ni dieu ni maître,
৬. Qui fait la soupe doit la manger,
৭. Réponse,
৮. Un dernier mot.

ইংরেজিতে অনূদিত ও প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে,
১. The Eternity According to the Stars, tr. by Mathew H. Anderson, with an afterword by Lisa Block de Behar (Literary Escapes and Astral Shelters of an Incarcerated Conspirator). In CR: The New Centennial Review 9/3: 61-94, Winter 2009. The first full-length translation into English.
২. Eternity by the Stars, tr. with an intro by Frank Chouraqui (New York: Contra Mundum Press, 2013). First critical edition.


তথ্যসূত্র:
১. প্রফুল্ল কুমার চক্রবর্তী; ফরাসি বিপ্লব; পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, জানুয়ারি, ২০০০; পৃষ্ঠা, ৩৫-৪৩৬।
২. ভ. ই. লেনিন, আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য প্রসঙ্গে; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৩; পৃষ্ঠা-৪৩৩।

Tuesday, January 27, 2015

কাকডুমুর বাংলাদেশের পরিচিত উপকারি গাছ




কাকডুমুর গাছের ফল, ডাল ও পাতা, ফটো: অনুপ সাদি

বৈজ্ঞানিক নাম: Ficus hispida
সমনামঃ Ficus oppositifolia Roxb. Ficus compressa, Covellia hispida
ইংরেজি নাম: Hairy Fig, devil fig, opposite-leaved fig-tree, rough-leaved fig.
বাংলা নাম: কাকডুমুর

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Angiosperms
অবিন্যাসিত: Eudicots
অবিন্যাসিত: Rosids
বর্গ: Rosales
পরিবার: Moraceae
গণ: Ficus
প্রজাতি: Ficus hispida L.f.
পরিচিতি: কাকডুমুরের ফল ছোট এবং খাওয়ার অনুপযুক্ত। এই গাছ অযত্নে-অবহেলায় এখানে-সেখানে ব্যাপক সংখ্যায় গজিয়ে ওঠে। গাছও তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে থাকে। এদের পাতা অত্যন্ত খসখসেএই পাতা দিয়ে গ্রামাঞ্চলে অনেকে শিং, মাগুরজাতীয় মাছ কাটার আগে ঘষে পিচ্ছিলতা পরিষ্কার করেনঅনেক ক্ষেত্রে বাড়িতে গবাদিপশু জবাই করার পর মাংসে পশুর লোম লেগে গেলে এই পাতা ঘষে সেই লোম ছাড়ানো হয়এ ছাড়া কাকডুমুর পাখপাখালির ও নানা পতঙ্গের প্রিয় খাদ্যএর পাতা প্রজাপতির মথের খাবার পাখিরাই প্রধানত এই প্রজাতির ডুমুরের ফল খেয়ে থাকে এবং পাখির বিষ্ঠার মাধ্যমে বীজের বিস্তারণ ঘটে থাকে
প্রাপ্তিস্থান: মূলতঃ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকাসমূহেই এ প্রজাতির গাছ দেখা যায়বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন প্রমূখ দেশসসহ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যায়
ভেষজ গুণ: ডুমুর খুবই উচ্চমানের ভেষজ গুণসম্পন্ন উদ্ভিদবিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় স্মরণাতীতকাল থেকে ডুমুরের পাতা, কাঁচা ও পাকা ফল, নির্যাস, বাকল, মূল প্রভৃতি কার্যকরভাবে ব্যবহূত হয়ে আসছেপ্রতি ১০০ গ্রাম ডুমুরে খাদ্যশক্তি ৩৭ কিলোক্যালরি, ১২৬ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিনসহ ভিটামিন এ, বি, সি এবং অন্যান্য উপাদান আছেগুটিবসন্ত, ডায়াবেটিস, হূদরোগ, কিডনি ও মূত্রসংক্রান্ত সমস্যা, স্নায়বিক দুর্বলতা, মস্তিষ্কের শক্তিবৃদ্ধি, সর্দিকাশি, ফোড়া বা গ্রন্থস্ফীতি (টিউমার) ও স্ত্রীরোগের চিকিৎসায় জগডুমুর কার্যকরসরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশ জাতীয় ইউনানী ফরমুলারীতে ডুমুর নিয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হচ্ছেভারতে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে

প্রচলিত কুসংস্কার আছে যে, যে ব্যক্তি ডুমুরের ফুল দেখতে পায় সে অনেক ভাগ্যবান হয়; ডুমুরের ফুল যদি সত্যি ভাগ্য পাল্টাত তাহলে মনে হয় মানুষ গাছটি রক্ষা করার চেষ্টা করত। বাড়ি বাড়ি ডুমুর গাছ রক্ষা করা  দরকার। এ গাছ লাগাতে হয় না; পাখির বিষ্ঠা থেকে যত্রতত্র জন্মায়। আমরা নিজের জন্য নয় পাখির জন্য গাছটি বাঁচাতে চাইআমরা কি পারি না পাখির জন্য গাছটি রক্ষা করতে? পরিবেশের বন্ধু এই গাছটি আমাদের একটি উপকারী বন্ধু। আসুন এটিকে বাঁচাই

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

৪. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

Monday, January 26, 2015

লেনিনের পুস্তক 'গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল' সম্পর্কে আলোচনা




১৯৮৪ সালের বাংলা সংস্করণের প্রচ্ছদ

গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল (১৯০৫) (ইংরেজি: Two Tactics of Social Democracy in the Democratic Revolution) ভি. আই. লেনিনের লিখিত একটি পুস্তক। তিনি এই পুস্তকটি লেখেন ১৯০৫ সালের জুন-জুলাই মাসে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস এবং একই সময়ে জেনেভায় আয়োজিত মেনশেভিক সম্মেলনের পরে। বইটি বের হয় জেনেভা থেকে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্করণে; তখন লেনিন সেখানে থাকতেন এবং কাজ করতেন। সেই ১৯০৫ সালেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক এবং আলাদাভাবে মস্কো কমিটি কর্তৃক দশ হাজার সংখ্যায় বইখানা আবার পুনর্মুদ্রিত হয়। রাশিয়ায় বহু শহরে বেআইনিভাবে ছড়িয়ে দেয়া এই বইখানি আন্ডারগ্রাউন্ডে পার্টি এবং শ্রমিক চক্রগুলিতে অধ্যয়ন করা হতো। ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিটার্সবুর্গ প্রেস কমিটি বইখানায় প্রকাশিত ভাব-ভাবনাকে জার সরকারের বিরোধী অপরাধজনক কার্য বিবেচনা করে সেটিকে নিষিদ্ধ করেছিলো। মার্চ মাসে পিটার্সবুর্গ আদালত ঐ নিষেধাজ্ঞাটাকে অনুমোদন করে পুস্তিকাটিকে নষ্ট করবার হুকুম জারি করেছিল। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে_ ভি. আই. লেনিনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রচনাটি নষ্ট করতে সমর্থ হয়নি সরকার।[১]
লেনিন নতুন নতুন পাদটীকা দিয়ে এই বইখানির বয়ানটাকে সম্পূরিত করেছিলেন এবং রচনাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তার ‘বারো বছরে’ নামে রচনা-সংগ্রহের প্রথম খণ্ডে, সেটি পিটার্সবুর্গে প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯০৭ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। রচনা-সংগ্রহের ভূমিকায় তিনি বইটির তাৎপর্য সম্বন্ধে লিখেছিলেন,
“এখানে প্রণালীবদ্ধভাবেই বিশদে বিবৃত হয়েছে মেনশেভিকদের সংগে বুনিয়াদী রণকৌশলগত পার্থক্যগুলি। লন্ডনে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির (বলশেভিক) বসন্তকালীন তৃতীয় কংগ্রেস এবং জেনেভায় মেনশেভিক সম্মেলনের প্রস্তাবগুলি এইসব পার্থক্যকে চূড়ান্ত আকার দিয়েছে এবং প্রলেতারিয়েতের কর্তব্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সমগ্র বুর্জোয়া বিপ্লবের মূল্যায়নে পার্থক্যগুলিকে মূলগত ভিন্নমুখীনতায় নিয়ে এসেছে।”[১]
এই বইয়ে লেনিন দেখান সশস্ত্র অভ্যুত্থান হচ্ছে জারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের নির্ধারক উপায়। প্রলেতারিয়েত ও কৃষকসম্প্রদায়ের ক্ষমতা অর্থাৎ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করতে হবে; আগের বিপ্লবগুলোতে যা হয়েছে সেভাবে বিজয়ী অভ্যুত্থান থেকে বুর্জোয়ার ক্ষমতা স্থাপন চলবে না। অথচ মেনশেভিকরা মনে করত ক্ষমতা নেবে বুর্জোয়ারা, শ্রমিক শ্রেণির কর্তব্য হলো তাদের সমর্থন করা। মূলত এই বইয়ে লেনিন যে রণকৌশল রচনা করেন, তা ছিলো খাঁটি বৈপ্লবিক, বিপ্লবের বিজয় ছিলো তার লক্ষ্য।[২]
আর অন্যদিকে মেনশেভিকদের কৌশল ছিলো বুর্জোয়াদের সহযোগিতা করা। তারা ঘোষণা করে, বিপ্লব যেহেতু বুর্জোয়া, তাই তার নেতা হওয়া উচিত বুর্জোয়াদের, শ্রমিক শ্রেণির কাজ হলো তাঁকে শুধু সমর্থন করা। শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকের মৈত্রীর বিরোধী ছিলো তারা, কেননা কৃষকের বৈপ্লবিক শক্তিতে তারা বিশ্বাস করতো না। বিশেষ করে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে ছিলো তাদের ঘোর আপ্ততি। লেনিন দেখালেন যে মেনশেভিক কর্মনীতি হলো বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রলেতারিয়েতকে বুর্জোয়া নেতৃত্বের অধীনস্থ করার প্রয়াস। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে এই গ্রন্থে লেনিন সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন,
মার্কসবাদ প্রলেতারিয়েতকে এই শিক্ষা দেয় যে, তারা যেন বুর্জোয়া বিপ্লব থেকে দূরে সরে না থাকে, এর প্রতি উদাসীন না হয়, বুর্জোয়াকে যেন বিপ্লবে নেতৃত্ব ছেড়ে না দেয়, বরং তারা যেন এতে খুবই প্রবলভাবে অংশগ্রহণ করে, সংগতিপরায়ণ প্রলেতারিয় গণতান্ত্রিকতার জন্য, বিপ্লবকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্যে তারা যেন অতি দৃঢ়তাসহকারে সংগ্রাম চালায়।”[৩]
বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিকাশের তত্ত্ব রচনা লেনিনের একটি বড় কীর্তি। লেনিনিয় তত্ত্ব খণ্ডন করে রুশ মেনশেভিক ও পশ্চিম ইউরোপীয় সুবিধাবাদীদের নীতি। সুবিধাবাদীরা শহর ও গ্রামের আধা-প্রলেতারিয়দের পক্ষে যা করা সম্ভব সেটিকে ছোট করে দেখত, সুবিধাবাদীরা মনে করত, যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত নামবে একা, সহযোগী ছাড়াই, তাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটতে পারবে শুধু যখন প্রলেতারিয়েত হবে দেশের অধিকাংশ। এই প্রতিপাদনের ভ্রান্তি ও ক্ষতিকারক দিক দেখিয়ে দেন লেনিন। রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব পুরোপুরি প্রমাণ করে লেনিনীয় তত্ত্বের সঠিকতা।[৪]  
গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল পুস্তকে লেনিন যেসকল ধ্যান-ধারনা বিকশিত করেছেন, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে তা সারা বিশ্বের জনগণের কাছে প্রভূত তাৎপর্য ধারণ করে।

তথ্যসূত্র:
. ভি. আই. লেনিন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৮৪, পৃষ্ঠা-১৩৫।
২. ঐ, পৃষ্ঠা-৬।
৩. ঐ, পৃষ্ঠা-৪২।
৩. ঐ, পৃষ্ঠা-৬-৭।

Recommended