Monday, January 26, 2015

লেনিনের পুস্তক 'গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল' সম্পর্কে আলোচনা




১৯৮৪ সালের বাংলা সংস্করণের প্রচ্ছদ

গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল (১৯০৫) (ইংরেজি: Two Tactics of Social Democracy in the Democratic Revolution) ভি. আই. লেনিনের লিখিত একটি পুস্তক। তিনি এই পুস্তকটি লেখেন ১৯০৫ সালের জুন-জুলাই মাসে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির তৃতীয় কংগ্রেস এবং একই সময়ে জেনেভায় আয়োজিত মেনশেভিক সম্মেলনের পরে। বইটি বের হয় জেনেভা থেকে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্করণে; তখন লেনিন সেখানে থাকতেন এবং কাজ করতেন। সেই ১৯০৫ সালেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক এবং আলাদাভাবে মস্কো কমিটি কর্তৃক দশ হাজার সংখ্যায় বইখানা আবার পুনর্মুদ্রিত হয়। রাশিয়ায় বহু শহরে বেআইনিভাবে ছড়িয়ে দেয়া এই বইখানি আন্ডারগ্রাউন্ডে পার্টি এবং শ্রমিক চক্রগুলিতে অধ্যয়ন করা হতো। ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিটার্সবুর্গ প্রেস কমিটি বইখানায় প্রকাশিত ভাব-ভাবনাকে জার সরকারের বিরোধী অপরাধজনক কার্য বিবেচনা করে সেটিকে নিষিদ্ধ করেছিলো। মার্চ মাসে পিটার্সবুর্গ আদালত ঐ নিষেধাজ্ঞাটাকে অনুমোদন করে পুস্তিকাটিকে নষ্ট করবার হুকুম জারি করেছিল। তবে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে_ ভি. আই. লেনিনের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ রচনাটি নষ্ট করতে সমর্থ হয়নি সরকার।[১]
লেনিন নতুন নতুন পাদটীকা দিয়ে এই বইখানির বয়ানটাকে সম্পূরিত করেছিলেন এবং রচনাটিকে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তার ‘বারো বছরে’ নামে রচনা-সংগ্রহের প্রথম খণ্ডে, সেটি পিটার্সবুর্গে প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯০৭ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। রচনা-সংগ্রহের ভূমিকায় তিনি বইটির তাৎপর্য সম্বন্ধে লিখেছিলেন,
“এখানে প্রণালীবদ্ধভাবেই বিশদে বিবৃত হয়েছে মেনশেভিকদের সংগে বুনিয়াদী রণকৌশলগত পার্থক্যগুলি। লন্ডনে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক শ্রমিক পার্টির (বলশেভিক) বসন্তকালীন তৃতীয় কংগ্রেস এবং জেনেভায় মেনশেভিক সম্মেলনের প্রস্তাবগুলি এইসব পার্থক্যকে চূড়ান্ত আকার দিয়েছে এবং প্রলেতারিয়েতের কর্তব্যের দৃষ্টিকোণ থেকে আমাদের সমগ্র বুর্জোয়া বিপ্লবের মূল্যায়নে পার্থক্যগুলিকে মূলগত ভিন্নমুখীনতায় নিয়ে এসেছে।”[১]
এই বইয়ে লেনিন দেখান সশস্ত্র অভ্যুত্থান হচ্ছে জারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের নির্ধারক উপায়। প্রলেতারিয়েত ও কৃষকসম্প্রদায়ের ক্ষমতা অর্থাৎ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করতে হবে; আগের বিপ্লবগুলোতে যা হয়েছে সেভাবে বিজয়ী অভ্যুত্থান থেকে বুর্জোয়ার ক্ষমতা স্থাপন চলবে না। অথচ মেনশেভিকরা মনে করত ক্ষমতা নেবে বুর্জোয়ারা, শ্রমিক শ্রেণির কর্তব্য হলো তাদের সমর্থন করা। মূলত এই বইয়ে লেনিন যে রণকৌশল রচনা করেন, তা ছিলো খাঁটি বৈপ্লবিক, বিপ্লবের বিজয় ছিলো তার লক্ষ্য।[২]
আর অন্যদিকে মেনশেভিকদের কৌশল ছিলো বুর্জোয়াদের সহযোগিতা করা। তারা ঘোষণা করে, বিপ্লব যেহেতু বুর্জোয়া, তাই তার নেতা হওয়া উচিত বুর্জোয়াদের, শ্রমিক শ্রেণির কাজ হলো তাঁকে শুধু সমর্থন করা। শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকের মৈত্রীর বিরোধী ছিলো তারা, কেননা কৃষকের বৈপ্লবিক শক্তিতে তারা বিশ্বাস করতো না। বিশেষ করে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে ছিলো তাদের ঘোর আপ্ততি। লেনিন দেখালেন যে মেনশেভিক কর্মনীতি হলো বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রলেতারিয়েতকে বুর্জোয়া নেতৃত্বের অধীনস্থ করার প্রয়াস। গণতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ভূমিকা সম্পর্কে এই গ্রন্থে লেনিন সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন,
মার্কসবাদ প্রলেতারিয়েতকে এই শিক্ষা দেয় যে, তারা যেন বুর্জোয়া বিপ্লব থেকে দূরে সরে না থাকে, এর প্রতি উদাসীন না হয়, বুর্জোয়াকে যেন বিপ্লবে নেতৃত্ব ছেড়ে না দেয়, বরং তারা যেন এতে খুবই প্রবলভাবে অংশগ্রহণ করে, সংগতিপরায়ণ প্রলেতারিয় গণতান্ত্রিকতার জন্য, বিপ্লবকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাবার জন্যে তারা যেন অতি দৃঢ়তাসহকারে সংগ্রাম চালায়।”[৩]
বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিকাশের তত্ত্ব রচনা লেনিনের একটি বড় কীর্তি। লেনিনিয় তত্ত্ব খণ্ডন করে রুশ মেনশেভিক ও পশ্চিম ইউরোপীয় সুবিধাবাদীদের নীতি। সুবিধাবাদীরা শহর ও গ্রামের আধা-প্রলেতারিয়দের পক্ষে যা করা সম্ভব সেটিকে ছোট করে দেখত, সুবিধাবাদীরা মনে করত, যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে প্রলেতারিয়েত নামবে একা, সহযোগী ছাড়াই, তাই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটতে পারবে শুধু যখন প্রলেতারিয়েত হবে দেশের অধিকাংশ। এই প্রতিপাদনের ভ্রান্তি ও ক্ষতিকারক দিক দেখিয়ে দেন লেনিন। রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের অক্টোবর বিপ্লব পুরোপুরি প্রমাণ করে লেনিনীয় তত্ত্বের সঠিকতা।[৪]  
গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল পুস্তকে লেনিন যেসকল ধ্যান-ধারনা বিকশিত করেছেন, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামে তা সারা বিশ্বের জনগণের কাছে প্রভূত তাৎপর্য ধারণ করে।

তথ্যসূত্র:
. ভি. আই. লেনিন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৮৪, পৃষ্ঠা-১৩৫।
২. ঐ, পৃষ্ঠা-৬।
৩. ঐ, পৃষ্ঠা-৪২।
৩. ঐ, পৃষ্ঠা-৬-৭।

No comments:

Post a Comment