Thursday, January 22, 2015

ভি. আই. লেনিনের গ্রন্থ কী করতে হবে'র আলোচনা




কী করতে হবে গ্রন্থের প্রচ্ছদ, বাংলা অনুবাদে, ১৯৮৪

কী করতে হবে? আমাদের আন্দোলনের জরুরি প্রশ্নগুলি, (ইংরেজিতে: What Is to Be Done? Burning Questions of Our Movement) হচ্ছে ভ্লাদিমির লেনিনের লেখা বই যা ১৯০১ সালের শরৎকাল থেকে ১৯০২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে লিখিত এবং ১৯০২ সালে প্রকাশিত এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা যার শিরোনাম নেয়া হয় উনিশ শতকের রুশ বিপ্লবী নিকোলাই চেরনিশেভস্কি (১৮২৮-৮৯) লিখিত একই নামের উপন্যাস থেকে। মার্কসবাদী শ্রমিক পার্টি গঠনের জন্য সংগ্রামের ক্ষেত্রে এই বই চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করে। বৈপ্লবিক মার্কসবাদ সংক্রান্ত অপূর্ব এই বইটিতে রুশ কমিউনিস্টগণ[১] বহু জরুরি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পান। এই বইতে শ্রমিক আন্দোলনের সচেতন ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক, প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক নেতা হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা, পরিপক্ক হয়ে ওঠা বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে রুশ কমিউনিস্টদের ভূমিকা এবং সংগ্রামী ও বৈপ্লবিক এক প্রলেতারীয় পার্টি প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক প্রকারভেদ, পথ ও পদ্ধতি প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়। এতে লেনি প্রলেতারিয় মার্কসবাদী পার্টি গঠনের পরিকল্পনা ও তার রণকৌশলের বুনিয়াদ বিশদভাবে উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। লেনিনের মত ছিলো এ-র্টিকে হতে হবে আগাগোড়া বিপ্লবী, নতুন ধরনের সংগ্রামী পার্টি।[২]  
এই বইখানি ‘অর্থনীতিবাদের’ ভাবাদর্শগত গোরখোদকের কাজ সুসম্পন্ন করে। লেনিনের মতে অর্থনীতিবাদ ছিলো আন্তর্জাতিক সুবিধাবাদেরই রুশ প্রকারভেদস্বরূপ। লেনিনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে সুবিধাবাদের স্বরূপ হচ্ছে ‘শ্রমিক শ্রেণির উপর বুর্জোয়া ও বুর্জোয়া ভাবাদর্শের প্রভাব, স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনের সামনে মাথা নত করা, শ্রমিক আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক চেতনার ভূমিকাকে ছোট করে দেখা’[২]। লেনিন লেখেন যে ১৯ শতকের শেষে এবং ২০ শতকের গোড়ায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে যে সুবিধাবাদী ধারা দেখা দেয় এবং যা ‘সমালোচনার স্বাধীনতার’ ছদ্মবেশে মার্কসবাদের সংস্কারসাধনে উদ্যত হয়েছিল, তা তার নিজ তত্ত্বসমূহ পুরোপুরিভাবে বুর্জোয়া সাহিত্য থেকে ধার নিয়েছিল, তাই বলা চলে যে, কুখ্যাত ‘সমালোচনার স্বাধীনতার’ অর্থ হলও কমিউনিজমে সুবিধাবাদী মতধারার স্বাধীনতা, কমিউনিস্ট পার্টিকে সংস্কারের গণতান্ত্রিক পার্টিতে পরিণত করার স্বাধীনতা, সমাজতন্ত্রের ভেতরে বুর্জোয়া ভাব-ধারনা আর বিভিন্ন বুর্জোয়া উপাদান ঢোকাবার স্বাধীনতা।[২]  
লেনিন যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমাণ করেন যে প্রলেতারিয়েতের সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ এবং বুর্জোয়া ভাবধারার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ও আপোষহীন সংগ্রাম বজায় রয়েছে।
এই গ্রন্থে লেনিন পুঁজিবাদের আমলে শ্রমিক শ্রেণির ভাবাদর্শ বিকাশের নিয়মশৃঙ্খলা সংক্রান্ত প্রশ্নগুলোকে সুনির্দিষ্ট রূপ দেন। এই বইয়ে দেখানো হয় যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলন-বহির্ভূত অবস্থায় উদ্ভূত এক ভাবাদর্শ। অথচ ‘অর্থনীতিবাদীরা’ মনে করে যে সমাজতান্ত্রিক চেতনা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বয়ং শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য থেকেই বৃদ্ধি পায় এবং তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রসঙ্গে লেনিন শ্রমিক আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্ততা এবং সচেতনতার মধ্যকার সম্পর্ক, স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ অন্তর্ভুক্ত করা সংক্রান্ত সমস্যা তুলে ধরেন। তিনি এই গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে, ‘আর্থনীতিক সংগ্রামের বাইরে থেকে’ই শ্রমিক আন্দোলনে সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ প্রোথিত করা চলে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলন থেকে সমাজতান্ত্রিক চেতনা উদ্ভূত হয় না, বৈপ্লবিক মার্কসবাদী পার্টি কর্তৃক তা শ্রমিক আন্দোলনে প্রোথিত হয়। প্রলেতারিয় পার্টির একান্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হলও সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শের নির্মলতা রক্ষার সমর্থনে, শ্রমিক শ্রেণির উপর বুর্জোয়া প্রভাবের বিরুদ্ধে, সুবিধাবাদী, তথা শ্রমিক আন্দোলনে বুর্জোয়া ভাবাদর্শ প্রচারক ও বাহকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালনায়।
শ্রমিক আন্দোলনের জন্য, শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক মার্কসবাদী পার্টি সমস্ত ক্রিয়াকলাপের জন্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক দিকটির বিশেষ গুরুত্বের স্বরূপ লেনিন উন্মোচন করেন এই গ্রন্থে। তিনি লেখেন, ‘যে-পার্টি সবচেয়ে অগ্রসর তত্ত্ব দিয়ে পরিচালিত একমাত্র সেটাই সেনামুখ-সংগ্রামীর ভূমিকা পালন করতে পারে’। লেনিন উল্লেখ করেন যে, রুশ সাম্যবাদীদের পক্ষে অগ্রণী তত্ত্বের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে তার বিকাশের পথে যেসব ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য ও তার সামনে যেসব বৈপ্লবিক কর্তব্য উত্থাপিত হয়েছে তার জন্য।
কী করতে হবে? বইটিতে বিশেষ দৃষ্টিপাত করা হয়েছে রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত ও তার পার্টির রণকৌশলের বুনিয়াদ গড়ে তোলার কাজে। লেনিন উল্লেখ করেন রুশ সাম্যবাদীদের প্রথম ও সর্বপ্রধান কর্তব্য হচ্ছে সারা রাশিয়াব্যাপী কেন্দ্রীয় এক সংগঠন গড়ে তোলা, অর্থাৎ কিনা এমন এক রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠা করা, জনগণের সংগে যার বজায় থাকবে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং যা শ্রমিক শ্রেণির বৈপ্লবিক সংগ্রামে নেতৃত্বদানে সক্ষম হবে। পার্টিকে চলতে হবে স্বতঃস্ফূর্ত শ্রমিক আন্দোলনের আগে আগে, তাকে পথ দেখাতে হবে, প্রলেতারিয়েত স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে-সমস্ত তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়, তার উত্তর দিতে হবে। ‘বিপ্লবীদের একটি শক্তিশালী সংগঠন এই সংগ্রামকে পরিচালিত না করা অবধি প্রলেতারিয়েতের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম তাদের সাচ্চা ‘শ্রেণিসংগ্রাম’ হয়ে উঠবে না’। এই ধরনের সংগঠন কীভাবে গড়ে তোলা উচিত, তার জন্য কোন পথ গ্রহণ করা প্রয়োজন_ কী করতে হবে? বইটিতে লেনিন তারই বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. সেসময় রাশিয়ার পার্টিকে বলা হতো সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং পার্টি সভ্যগণ নিজেদের সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিতেন। আমরা এখানে বর্তমানের প্রযোজ্য শব্দ কমিউনিস্ট ব্যবহার করছি।
২. ভ্লাদিমির লেনিন, কী করতে হবে, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৫-৯

No comments:

Post a Comment