Sunday, March 22, 2015

বাঁশ এবং এর বহুমুখী ব্যবহার




বাঁশ এবং এর ফুল
বাঁশ হলো poaceae পরিবারের অধীনে একটি ঘাস মাত্র (grass family)। তাই বলে এটাকে মাড়াবেন না যেন। বাঁশের শক্তিশালী কান্ড বিভিন্ন গঠনমূলক কাজে যেমন ঘরবাড়ির কাঠামো তৈরিতে কাজে দেয়। এছাড়া বাগানে লতানো সবজির জন্য টাল বা মাচা তৈরিতে কাজে লাগে। আমাদের গ্রাম বাংলার আর্দ্র আবহাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাঁশ অধিক উপযোগী, এটি পানি প্রতিরোধী একটা টিম্বার যা অতি আর্দ্রতায়ও সহজে পচন ধরেনা বা বাঁকা হয়ে যায় না। তাছাড়া মৎস্য শিল্পে এ কারণে এটা বিশেষ ভূমিকা রাখে। বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় মাছ ধরার ফাঁদ বা বৈচ্না, চাঁই, টেটা, খারি প্রভৃতি।
রান্নাঘরেও রয়েছে বাঁশের পরশ, রাধুনীকে পোড়া বাঁশীর শব্দ দিয়ে দিনদুপুরে উতলা করা ছাড়াও রয়েছে বাঁশের আরো ভূমিকা৷ তাই বাঁশি শুনে আর কাজ নেই। করিমন মনের সুখ দুঃখ এক করে চুলা ধরায়ে বাঁশে ফু দিয়ে, তাতে মধুর রোমাঞ্চকর সূর না বেরুলেও মোটেও ভাববেন না তা ফাটা বাঁশ, এবং উনুন জ্বললে পেটে ভাত পরবে মানুষের পেটের চুঁচুঁ শব্দ শান্ত হবে এতে। চালন, কূলা, ডুলা পাতি, বাঁশের শেলফ ইত্যাদি যেদিকে হাত দিবেন শুধু বাঁশ আর বাঁশ। চীন, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশেও অনুরূপ। আমার সবাই বাঁশের প্রতি প্রীতিতে একাত্ব।
বাঁশের টিম্বারটা আঁশ প্রযুক্ত হওয়ায় এর যথেষ্ট নমনীয়তা আর প্রসারণশক্তি আছে যার দরুণ এটা সহজে ভাঙে না আর পূর্ণবয়স্ক হলে সহজে ফাটেও না। একে ইচ্ছেমতো বাকিয়ে পচ্ছন্দসই কাঠামো দেওয়া যায়। শহুরে জীবনেও বাঁশের আসবাবপত্রের ছোঁয়া রয়েছে।
এবার বাঁশ খাওয়া নিয়ে আলোচনা করা যাক। না না এ এমন কোনো কঠিন কাজ নয়। বাঁশের কচি কুরুলি খুব পছন্দ করে নিজের বাগানে উৎপন্ন করে অনেকে আগ্রহ সহকারে খায়। এটা প্রচুর পুষ্টি গুণসম্পন্ন, প্রচুর আমিষ রয়েছে, জাপানী বিজ্ঞানীরা অনুসন্ধান করে এতে এমন উপাদান পেয়েছে যা ক্যান্সার প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সেবনে ক্যান্সার দূরে থাকে। এতে ভিটামিন বি আছে, রয়েছে প্রচুর রোগপ্রতিরোধী শক্তি।
latiflorus প্রজাতির বাঁশের কুরুলী উত্তোলন থেকে শুরু করে কিভাবে প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়ার উপযোগী করে তোলা হয় সেটার ধাপে ধাপে একটা সচিত্র প্রতিবেদন এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ সব বাঁশেই কম বেশি taxiphyllin নামক একটা toxin থেকে থাকে। এটা একটা cyanogenic glycoside যেটা পরিপাকতন্ত্রে গিয়ে cyanide বিষ এ পরিণত হয়, পাণ্ডা বা লেমুর জাতীয় প্রাণী সারাদিনে যে পরিমাণ বাঁশ পাতা খায় তাতে একটা মানুষ মারা যাবে cyanide poisoning হয়ে। কিন্তু এতে ওরা অভ্যস্ত ..... তাইতো বলা হয় বাঁশ খেয়ে হজম করতে পারাটা একটা গুণ।
এই বিষাক্ত যৌগটইকে নিষ্ক্রিয় করতে বাঁশের কুরুলিকে নুন্যতম এক থেকে দেড় ঘন্টা জ্বাল দিতে হয়। আমাদের দেশের লোকেরা বাঁশের কুরুলীর মিহি কুচি করে হলুদ লবণ দিয়ে জ্বাল দিয়ে পরে পানিটা ফেলে দিয়ে মাংসের মসল্লা দিয়ে ভাজি করে কিংবা চিংড়ি দিয়ে রান্না করে, কেউ কেউ নারিকেলের দূধ দিয়েও রাধে।
জাপানী পদ্ধতিটা আরো সহজ, মাঝ বরাবর বাঁশের কুরুলীটাকে ফেড়ে তারপর বড় হাড়িতে জ্বাল করে কুড়া এবং লবন দিয়ে, সামান্য চিনি দেওয়া যায়, ১.৫ ঘন্টা জ্বাল হলেই হয়, পরে তা ছুলে কুচি করে প্রয়োজন মত ব্যবহার করে। এক টুকরা চেখে দেখে যদি তেতো মনে হয় তাহলে পুনরায় আরো ২৫ মিনিট জ্বাল দিলেই হয়। এই প্রক্রিয়াটিতে বেশির ভাগ প্রজাতির toxin দূর হয়ে খাওয়ার উপযোগী ও উপাদেয় হয়ে উঠে। এখানে লক্ষণীয় ব্যাপার যে বাঁশের কুরুলী কিন্তু খেতে কচকচে। এটাই এর বিশেষ বৈশিষ্ট।
চীনা, জাপানি, থাই, ভিয়েতনামীয়, মালয়ী রান্নাতে stirfry, broth, curry, spring roll-এ এই বাঁশের কুরুলী ব্যবহৃত হয়। বাঁশ বাগানে লাগানোর সময় উল্লেখ্য এই clumping variety বাঁশ লাগাবেন, তাতে বাঁশ ঝাড় এক জায়গাতে বেড়ে উঠবে, অন্যত্র দ্রুত ছড়াবে না, running variety এর বাঁশ লাগালে তা দ্রুত চারিপাশে ছড়াবে ও পরে বাগানে বাঁশের ঝাড়ের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবেন, আগাছার মত ছড়াবে। আমাদের oldhamii প্রজাতি (calcutta bamboo নামে পরিচিত) টা বেশ লক্ষী, এক জায়গায় বিস্তার করে। latiflorus প্রজাতিগুলোও তাই।
আরো পড়ুন

. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

৬. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

No comments:

Post a Comment