Monday, April 06, 2015

মার্কসের মানব প্রকৃতি তত্ত্বের স্বরূপ




মানুষ সম্পর্কে মার্কসবাদ

মানুষই হলও মার্কস এঙ্গেলসের জীবনবীক্ষার কেন্দ্রীয় বিষয়। বর্তমানকে বদলাবার প্রয়োজন তারা অনুভব করেছিলেন এই মানব প্রজাতির জন্যই। প্রাণী হিসেবে ‘মনুষ্য’ নাম প্রযুক্ত হলেও সামাজিক প্রাণী হিসেবে বা নৃতাত্ত্বিক অবস্থা থেকে বর্তমান মনুষ্য হিসেবে ‘মানুষ’ শব্দটি একই সাধারণ অর্থ প্রকাশ করে না।
মার্কসের মানব প্রকৃতি তত্ত্ব পুঁজিবাদের সমালোচনায়, তাঁর সাম্যবাদী ধারনায়, ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারণায় এক গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। তাঁর কাছে মানব প্রকৃতি শুধু মানুষের চিন্তা, অনুভব বা কাজের বৈশিষ্ট্য নয়, তাঁর কাছে মানব প্রকৃতি হচ্ছে প্রজাতি সত্ত্বা বা প্রজাতি সারমর্ম (জার্মান: Gattungswesen) এবং একই সাথে মানুষ হচ্ছে সামাজিক সত্ত্বার প্রতিনিধি।
মার্কস প্রাকৃতিক ও মানবিক এই দুই অর্থে মানুষকে দেখেছেন। মানুষ প্রকৃতির অংশ, জীববিজ্ঞান সম্মত বিবর্তনের পথে সক্রিয় ভাবে পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া গঠন, পুনর্গঠনের পথে নিজেকে গড়ে তুলেছে। এটিই তার প্রাকৃতিক সত্ত্বা।
মানুষ নিজেকে গড়ছে আবার বদলাচ্ছে, আবার প্রকৃতি থেকে নিজেকে পৃথকও করছে; একই সাথে পারিপার্শ্বিক প্রকৃতিকেও বদলে ফেলছে। এই সম্পূর্ণ অবস্থাটাই মানবিক। এই দুই ক্ষেত্রেই মানুষ একটা ওতপ্রোত সম্পর্ক ও ক্রিয়ার ফল। তাই মার্কসবাদ অনুসারে মানুষ হলও, প্রাক্সিস, একটি আন্তঃক্রিয়া।
মানুষ ইতিহাসের পথেই আবির্ভূত। তার মৌলিক বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তমান এবং ভিন্ন ভিন্ন স্বরূপে আবির্ভূত। যেমন যৌন অনুভূতি অপরিবর্তনীয়, কিন্তু যৌন জীবন পরিবর্তনশীল। প্রতিটি মানুষ স্বতন্ত্র ব্যক্তি, কিন্তু সামাজিক মানুষ হিসেবে তার সৃজনশীলতার দ্বারা অন্যেও সমৃদ্ধ হয়। মানুষ সর্বদা সৃজনশীল এবং মুক্তিপ্রবণ। শ্রমবিভাজন, ব্যক্তিগত সম্পত্তি, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, পুঁজির শোষণ, মিথ্যাচেতনা তার সত্ত্বাকে বর্তমান ঐতিহাসিক স্তরে আবদ্ধ করে রেখেছে। পরিস্থিতি বদলালে নতুন মানুষ আবির্ভূত হবে।
মানুষ বলতে তা হলে কী বুঝি আমরা_ নৃতাত্ত্বিক মানুষ, সামাজিক মানুষ, অর্থনৈতিক মানুষ কিংবা কোনো আধ্যাত্মিক পবিত্র মানুষ। তার চেতনার স্বরূপই বা কী? মার্কসের কাছে মানুষ হয়ে যায় এক উৎপাদনশীল মানুষ, অষ্টাদশ ও উনিশ শতকে তার প্রাধান্যকারি শক্তি শ্রমিক, সেই শ্রমিক পুঁজিবাদী সমাজে তার উৎপন্নকে পায় না, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষ সুসম্পূর্ণ অস্তিত্বসম্পন্ন কোনো সত্ত্বা নয়। তার অস্তিত্ব অনবরত গড়ে ওঠার অনন্ত প্রক্রিয়ার চলমানতায়।
ফলে মানব প্রকৃতি সম্পর্কে মার্কসের ক্ষেত্রে আমরা পাবো বেশ কিছু ধারনা। মার্কসবাদে ন্যায়পরতার ধারনা, পুঁজিবাদী সমাজে পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা এবং তার উৎপন্ন পণ্য থেকে বিচ্ছিন্নতার ধারনা এবং এই উভয়বিধ বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত মানুষের ধারনা, মার্কসবাদে মানব প্রকৃতির ধারনা মিলিয়ে গড়ে উঠেছে মার্কসের মানব প্রকৃতি তত্ত্ব। তবে মার্কসের তত্ত্ব শুধু মানব প্রকৃতিকে বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হয় না, এটি উৎখাত করতে নেমে পড়ে বর্তমানের মানব সমাজে বিদ্যমান এমন সকল রকম সম্পর্ক যেখানে মানুষ হয়ে রয়েছে হেয়, দাসে পরিণত, বিস্মৃত ও ঘৃণিত জীব।

No comments:

Post a Comment