Friday, April 17, 2015

লেনিনের বই বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা বিষয়ে আলোচনা




লেনিনের বই বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনার প্রচ্ছদ

বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা ভ্লাদিমির লেনিন লেখেন ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসে। এই গ্রন্থে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের বিরোধীদের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি এই গ্রন্থে আরো দেখান যে দর্শন ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বর্তমান।[১]
এই গ্রন্থটির পুরো নাম বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা: এক প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক মত প্রসঙ্গে বিচারমূলক মন্তব্য (ইংরেজিতে: Materialism and Empirio-criticism: Critical Comments on a Reactionary Philosophy)লেনিনের জীবদ্দশায় গ্রন্থটির দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়, প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে এবং দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রায় নয় মাস সময় নিয়ে লেনিন এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটি লেখার জন্য তাঁর প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন হয়েছিলো। প্রধানত জেনেভা শহরের গ্রন্থাগারে লেনিন এই গবেষণার কাজ সমাধা করেন, যদিও আরো কিছু বই পড়াশোনার জন্য ১৯০৮ সালের মে মাসে তিনি কিছুদিন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কাজ করতে যান।
এই গ্রন্থে মোট দুশোর বেশি বইয়ের উল্লেখ দেখা যায়। এই বইগুলোর ভেতরে যেমন আছে কঠিন দার্শনিক বিষয়ের বই, তেমনি বিশেষভাবে আছে বিশ শতকের প্রথম দশকে পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মহলে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টিকারী কিছু বিজ্ঞান বিষয়ের রচনা। লেনিনের মতো বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতার পক্ষে সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গভীর আগ্রহ যেকোনো পাঠকের কাছে গভীর আগ্রহের বিষয়। দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানের বিপুল পাঠ্য থেকে সংকলিত সমস্ত তথ্য নিপুণ দার্শনিক বিচারের কষ্টিপাথরে লেনিন যাচাই করেছেন। সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর পক্ষে প্রয়োজন হয়েছে তুমুল বিতর্কের অবতারণা করবার।
এই গ্রন্থটি লেখার অব্যবহিত উদ্দেশ্য ছিলো রুশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে কিছু তথাকথিত মার্কসবাদীরা যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিলেন তার নিরসন করা। সেসময় একদল রুশ বুদ্ধিজীবী আর্নস্ট মাখের (১৮৩৮-১৯১৬) দার্শনিক মত দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের মার্কসবাদী বলে ঘোষণা করতেন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মতাদর্শগত প্রচারেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। এসব তাত্ত্বিক রুশ নেতাদের মধ্যে ছিলেন এ. বগদানভ (১৮৭৩-১৯২৮), ভি. বাজারভ (১৮৭৪-১৯৩৯), এ. ভি. লুনাচারস্কি (১৮৭৫-১৯৩৩), জে. এ. বারমান (১৮৬৮-১৯৩৩) সহ আরো কয়েকজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে এঁদের মধ্যে বারমান ছাড়া বাকি সকলেই কালক্রমে বলশেভিক আন্দোলনের সংগে সম্পর্ক ত্যাগ করেন।
লেনিন উক্ত গ্রন্থে বিশপ বার্কলির (১৬৮৫-১৭৫৩) মতামতকে তুলে আনেন। বার্কলির মূল প্রতিপাদ্য হলো, সাধারণ মানুষ যাকে বাস্তব বহির্জগত বলে মনে করে আসলে তা নেহাতই মন গড়া। আমাদের মনের বাইরে বাস্তব বহির্জগত বলে সত্যিই কিছু থাকতে পারে না। সেই বার্কলির সাথে মাখের পার্থক্য হচ্ছে মাখ রকমারি অভিনব পরিভাষা ব্যবহার করেন। এছাড়া মাখপন্থীরা সকলেই বস্তুবাদকে আক্রমণ করেছেন। লেনিন ব্যঙ্গ করে বলেছেন যে,
“আর্নস্ট মাখের সাম্প্রতিক পজিটিভিজম মাত্র দুশো বছরের পুরনো এক দর্শন। ইতিপূর্বে বার্কলি পর্যাপ্তভাবেই প্রমাণ করেছেন যে ‘সংবেদন বা মানসিক উপাদান থেকে’ একজ্ঞাতাবাদ ছাড়া আর কিছুই গড়া সম্ভব নয়”।
লেনিন উক্ত গ্রন্থে একদিকে পজিটিভিজম, একজ্ঞাতাবাদ বা Solipcism, অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা এবং আপেক্ষিকতাবাদীদের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং অন্যদিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে আঁকড়ে ধরেন।[২]

তথ্যসূত্র:
১. গ. দ. অবিচকিন ও অন্যান্য; ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১; পৃষ্ঠা-৯৩
২. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দার্শনিক লেনিন, মনীষা কলকাতা, আগস্ট ১৯৮০, পৃষ্ঠা ২২-৪৩।

No comments:

Post a Comment