Saturday, September 14, 2013

মার্কসবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা গিওর্গি প্লেখানভ




গিওর্গি প্লেখানভ

গিওর্গি ভালেন্তিনোভিচ প্লেখানভ (২৬ নভেম্বর, ১৮৫৭-৩১ মে, ১৯১৮) মার্কসবাদী পণ্ডিত ও তাত্ত্বিক, প্রখ্যাত রুশ চিন্তাবিদ, রুশ সমাজ-গণতন্ত্রী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তিনি রাশিয়ায় প্রথমদিকের সেইসব ব্যক্তিদের একজন যিনি নিজেকে মার্কসবাদী হিসেবে পরিচিত করেন।  ভি. আই. লেনিন তাকে মার্কসবাদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

পুরনো ক্যালেন্ডারে ১৮৫৭ সালের ২৯ নভেম্বর রাশিয়ার তাম্বোভ প্রদেশের গুদালভকা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে প্লেখানভ জন্মগ্রহণ করেন। গিওর্গি প্লেখানভের পিতা, ভ্যালেন্তিন প্লেখানভ, তাতার নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের সম্ভ্রান্ত সামন্তপ্রভু ছিলেন।

প্লেখানভের লেখাপড়া ১৮৬৬ সালে ১০ বছর বয়সে শুরু হয় যখন তিনি ভরোনেঝের কন্সতান্তিনভ মিলিটারি একাডেমিতে প্রবেশ করেন। ১৮৭৩ সাল পর্যন্ত সেখানেই তার শিক্ষকদের দ্বারা ভালোভাবে লেখাপড়া শেখেন। এরপর পিতার মৃত্যু হলে তিনি মিলিটারি একাডেমি ছেড়ে যান এবং সেন্ট পিটার্সবুর্গ Metallurgical Institute-এ ভর্তি হন। এখানে ছাত্র থাকাকালিন তিনি ১৮৭৫ সালে একজন তরুণ বিপ্লবি বুদ্ধিজীবী পাভেল আক্সেলরদের (১৮৫০-১৯২৮) সাথে পরিচিত হয়েছিলেন এবং পরে পাভেল আক্সেলরদ লিখেছিলেন যে প্লেখানভ তাক্ষনিকভাবে তার মনে ভাল ছাপ ফেলতে সক্ষম হন। 
"He spoke well in a business-like fashion, simply and yet in a literary way. One perceived in him a love for knowledge, a habit of reading, thinking, working. He dreamed at the time of going abroad to complete his training in chemistry. This plan didn't please me... This is a luxury! I said to the young man. If you take so long to complete your studies in chemistry, when will you begin to work for the revolution?"[১]

আক্সেলরদের প্রভাবে প্লেখানভ কর্মী হিসেবে পপুলিস্ট (নারোদনিক) আন্দোলনে প্রথমদিকের সেইসময়ের বিপ্লবি প্রতিষ্ঠান জমি ও স্বাধীনতায় যোগ দেন। প্লেখানভ ১৮৭৭ এবং ১৮৭৮ সালে দুবার গ্রেপ্তার হন এবং কিছুদিন পরই মুক্তি পান। তিনি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড প্রবণতার জন্য এই সংগঠন ত্যাগ করেন। তিনি রাশিয়া ত্যাগ করেন ১৮৮০ সালে এর পরবর্তী প্রায় চল্লিশ বছর যাবত নির্বাসনে থাকেন, অধিকাংশ সময়ই তিনি ছিলেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে। ১৮৮৩ সালে জেনেভাতে শ্রমিক মুক্তি সংঘ গ্রুপ গঠন করেন। এই শ্রমিক মুক্তি সংঘ রুশ মার্কসবাদী আন্দোলন তথা রুশ সমাজ-গণতন্ত্রী আন্দোলনে ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ১৮৯৫ সালে প্লেখানভ তার বিখ্যাত গ্রন্থ ইতিহাসের অদ্বৈতবাদী ব্যাখ্যা বিষয়ে আলোচনা (The Development of the Monist View of History) প্রকাশ করেন। লেনিন বলেন, রুশ দেশে মার্কসবাদীদের গোটা একটা জীবনকালকে শিক্ষিত করে তুলতে এই গ্রন্থটি প্রভূত সাহায্য করে। এছাড়া তিনি সমাজতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংগ্রাম(Socialism and the Political Struggle, 1883), আমাদের মতবিরোধ ইত্যাদি গ্রন্থ রচনা করেন। এসব পুস্তক রচনা ছাড়া তিনি রুশ ভাষায় মার্কস ও এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তেহার ১৮৮২ সনে অনুবাদ করেন, যার ভূমিকা লেখেন কার্ল মার্কস। তিনি ও তার সহকর্মী ভেরা জাসুলিচ (১৮৪৯-১৯১৯), আক্সেলরদ প্রমুখ মার্কস ও এঙ্গেলসের মজুরি শ্রম ও পুঁজি, বৈজ্ঞানিক ও কাল্পনিক সমাজতন্ত্র প্রভৃতি প্রখ্যাত গ্রন্থ অনুবাদ করেন। মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব গ্রন্থটি তিনি সম্পাদনা করেন। তাদের এসব কর্মকাণ্ড রাশিয়ার মার্কসবাদী আন্দোলনের মূল তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। ১৯০০ সালে শ্রমিক মুক্তি সংঘের সহযোগিতায় প্লেখানভ, আক্সেলরদ, জাসুলিচ, পেত্রসভ, মার্তভ প্রমুখের বিশেষ উদ্যোগে লেনিন সারা রাশিয়ার প্রথম মার্কসবাদী পত্রিকা স্ফুলিঙ্গ বা ইস্ক্রা প্রকাশ করেন। এসব যাবতীয় কর্মকাণ্ডের অন্যতম পুরোধা ছিলেন প্লেখানভ। ১৯০৩ সালে রুশ সমাজ-গণতন্ত্রী শ্রমিক দল প্রতিষ্ঠিত হয়। দলে প্লেখানভ এবং তার অনুসারীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। কিন্তু লেনিনের মতের বিরুদ্ধে যাওয়ায় পার্টিতে মেনশেভিক ও বলশেভিক এই দুটি পরস্পর বিরোধী ধারা পোক্ত হতে থাকে যা পরবর্তীকালে মতাদর্শগত বিরোধে পরিণত হয়। তিনি ১৯০৫ সনে রাশিয়ার বিপ্লব প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেননি। এবং তারপর থেকেই নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। ১৯১২ সালের জানুয়ারি মাসে প্রাগে ঐ দলের ষষ্ঠ সারা রুশ পার্টি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। এই কনফারেন্সে মেনশেভিকরা অর্থা প্লেখানভ ও তার দল পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন। তার শিল্পকলা ও সমাজ জীবন (Art and Social Life; 1912–1913) এবং ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা গ্রন্থদ্বয়ে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিল্প সাহিত্যকে দেখার চমকার বিশ্লেষণ রয়েছে।[২]
মার্কসের তত্ত্বকে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ নামে তিনিই প্রথম ভূষিত করেন। তিনিই সর্বজনীনভাবে দ্বন্দ্বনীতি ও বস্তুবাদকে কেবল সমাজ অর্থনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে সাহিত্য দর্শন ও বিজ্ঞানে সার্বিকভাবে প্রযোজ্য বলে তুলে ধরেন। তিনি বলেন রাশিয়াতে বিপ্লব হবে দুই স্তরে। সামন্তবাদ ও জারতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক বিপ্লব। এরপর পুঁজিবাদী পর্যায়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। দুটির ভিতর বিরাট ব্যবধান কিছু নাও থাকতে পারে। এই কাজে শ্রমিকদেরই এগিয়ে আসা প্রয়োজন। তবে রাশিয়ায় শ্রমিক-সংখ্যা কম, চেতনায় তারা পিছিয়ে সুতরাং এই বিপ্লবে বুদ্ধিজীবী অংশের এগিয়ে আসতে হবে। তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়াতে ফিরে এসে যুদ্ধ সমর্থন করেন। অক্টোবর বিপ্লবকেও তিনি অপ্রস্তুত এবং অপরিণত বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে বিপর্যয় ডেকে আনবে। ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা গ্রন্থ ও অন্যান্য কাজের জন্য প্রশংসা জানালেও লেনিন কঠোরভাবে প্লেখানভের সমালোচনা করেন।[৩]

১৯১৮ সনের ৩০ মে তিনি ফিনল্যান্ডের তেরিজোকিতে নির্বাসিত অবস্থায় যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে ৬১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে সেন্ট-পিটার্সবুর্গের ভল্কোভো সিমেট্রিতে সমাহিত করা হয়।   

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
১. Samuel H. Baron, Plekhanov: The Father of Russian Marxism. Stanford, CA: Stanford University Press, 1963; pg. 31.
২. আফজালুল বাসার; বিশ শতকের সাহিত্যতত্ত্ব; বাংলা একাডেমী, ঢাকা; ফেব্রুয়ারি, ২০০৩; পৃষ্ঠা- ৩০১-২।
৩. সমীরণ মজুমদার; মার্কসবাদ, বাস্তবে ও মননে; স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১ বৈশাখ, ১৪০২। পৃষ্ঠা- ১৬৩।  

Thursday, September 12, 2013

এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন এক সংশোধনবাদি সমাজ-গণতন্ত্রী


এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন


এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন (৬ জানুয়ারি, ১৮৫০-১৮ ডিসেম্বর, ১৯৩২) জন্মেছিলেন বর্তমান বার্লিনের  সচনোবার্গে এক ইহুদি পরিবারেস্কুল ত্যাগের পর ১৮৬৬-১৮৭৮ সালে তিনি একটি ব্যাংকে পিয়নের কাজ করেন ১৮৭২ সালে তার রাজনৈতিক জীবনায়ন শুরু হয় যখন তিনি জার্মানির সমাজ-গণতান্ত্রিক শ্রমিক দলে যোগ দেন এবং শীঘ্রই একজন ভাল কর্মী হিসেবে নিজেকে পরিচিত করতে সক্ষম হনমার্কসের সংস্পর্শে আসেন সেই সময়পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে এঙ্গেলসের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য লাভ করেনদলের মুখপত্রের তিনিই সম্পাদক নিযুক্ত হন

১৮৯৬ সালে তিনি প্রথম মার্কসবাদেরঅপ্রয়োজনীয় অংশদেখিয়ে কিছু রচনা প্রকাশ করেনতিনি মার্কস কথিত পুঁজির কেন্দ্রিভবন, শ্রমিকের ক্রমশ দরিদ্র হয়ে পড়ার কথা স্বীকার করতেন নাশ্রেণিসংগ্রাম ও বলপ্রয়োগের তত্ত্ব এবং তা থেকে সর্বহারার একনায়কত্ব অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করতেনপুঁজিবাদ ভেঙে পড়বে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন নাতার মতে সমাজতন্ত্র আসবে উদারনীতির উত্তরোত্তর বৃদ্ধির মধ্য দিয়েতিনি দেখান যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন সমাজের, দেশের অনেক পরিবর্তন ঘটিয়েছেগণতান্ত্রিক নানা সংস্কার এর ফলে ঘটেছে[১] 

কাউতস্কির সাথে এই সমস্ত প্রশ্নে তার মতবিরোধ হয়১৯২৮ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মান সমাজ গণতন্ত্রী দলে থাকেনপরে এই দল ভাগ হয়ে যায়তিনি সংসদীয় পথে সমাজতন্ত্রের রাস্তায় চলবার জন্য অবিচল থাকেন তাকে জার্মান সমাজ-গণতন্ত্রী ও দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের চরম সুবিধাবাদি অংশের নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়১৯১৭ সালে মহান নভেম্বর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর সোভিয়েত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ান 

তিনি একসময় বলেছিলেন, “প্রাচীন রোমের কথা স্মরণ করুন, এমন একটা শাসকশ্রেণি ছিল যারা কাজ করতো না, কিন্তু থাকত আরামে; আর এর ফলশ্রুতিতে, এই শ্রেণিটির পতন ঘটেএ ধরনের একটি শ্রেণিকে অবশ্যই ক্রমান্বয়ে তার ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবেদাস মালিকদের পতন হচ্ছে এমন একটি সত্য যা বের্নস্তাইন গোপন করতে পারেননি; কিন্তু তিনি গোপন করেছেন একথা যে দাসমালিকেরা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেআমরা ইতিহাসের সবগুলো যুগেই দেখি প্রভু ও মালিকশ্রেণি স্বেচ্ছায় কখনোই ক্ষমতা ত্যাগ করে নাদাসমালিক, সামন্তপ্রভু ও কারখানামালিকদের শাসন উচ্ছেদ হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী পৌনপুনিক ও বিরামহীন বিপ্লবের দ্বারাই।[২]  

বের্নস্তাইনের ভাবনাকেই মার্কসবাদীরা সংশোধনবাদ বলে চিহ্নিত করেনসুবিধাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ১৯০০-১৯০৩ সালেই প্লেখানভ দল থেকে বের্নস্তাইনকে বহিষ্কারের দাবি করেছিলেন।[৩] তার সম্পর্কে ভি. আই. লেনিন লিখেছেন,
আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়’_ বের্নস্তাইনের এই বাঁধা বুলিটিতে অনেক দীর্ঘ প্রবন্ধের চেয়েও ভাল ভাবেই শোধনবাদের মর্ম প্রকাশিত হয়েছে[]

বর্তমান বিশ্বেও যারাই সশস্ত্র পথে বিপ্লবের রাস্তায় থাকেনি তারা কার্যত বের্নস্তাইনের দৃষ্টিভঙ্গিকেই অনুসরণ করেছে

তথ্যসূত্র ও টিকাঃ
১. সমীরণ মজুমদার; মার্কসবাদ, বাস্তবে ও মননে; স্বপ্রকাশ, কলকাতা; ১ বৈশাখ, ১৪০২
. লেনিনবাদ দীর্ঘজীবী হোক; ১৬ এপ্রিল, ১৯৬০; সিপিসির রেড ফ্ল্যাগ-এর প্রবন্ধ 
৩. ভি. আই লেনিন; কমিউনিজমে বামপন্থার শিশু রোগ; লেনিন রচনাবলী, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৪; চতুর্থ ভাগ; পৃষ্ঠা ২৬ 
৪. ভি. আই লেনিন; মার্কসবাদ ও সংশোধনবাদ; ১৯০৮ ১৭শ খণ্ড, পৃ. ১৫-২৬

Saturday, September 07, 2013

নাকতা হাঁস বাংলাদেশের প্রাক্তন আবাসিক এবং বর্তমানে বিরল পরিযায়ী পাখি




নাকতা হাঁস, ছেলে; ফটো: ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে
দ্বিপদ নাম: Sarkidiornis melanotos (Pennant, 1769)
সমনাম: Anser melanotos Pennant, 1769
বাংলা নাম: নাকতা হাঁস, নকতা (আলী)
ইংরেজি নাম: Knob-billed Duck (Comb Duck)

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্যKingdom: Animalia
বিভাগ/Phylum: Chordata
শ্রেণী/Class: Aves
পরিবার/Family: Anatidae
গণ/Genus: Sarkidiornis, Eyton, 1838;
প্রজাতি/Species: Sarkidiornis melanotos (Pennant, 1769)

ভূমিকাঃ বাংলাদেশের পাখির তালিকাSarkidiornis গণে ১টি প্রজাতি রয়েছে এবং পৃথিবীতে রয়েছে ১টি প্রজাতি রয়েছে। বাংলাদেশ ও পৃথিবীর প্রজাতিটি হচ্ছে ১. বাদি হাঁস। 
বর্ণনা: নাকতা হাঁস বিরাট আকারের কালচে ডানার হাঁস (দৈর্ঘ্য ৬৬ সেমি, ওজন ২.২ কেজি, ডানা ৩৪ সেমি, ঠোঁট ৬.৪ সেমি, পা ৭ সেমি., লেজ ১৪.৫ সেমি)পুরুষ ও স্ত্রীহাঁসের আকার ও চেহারায় কিছুটা পার্থক্য আছেপুরুষপাখির পিঠ দেখতে কালো, সবুজ ও বেগুনি আভা আছে; সাদা মাথা ও গলা; সাদা গলায় কালো তিলা এবং ঠোঁটে স্ফীত মাংসপিন্ড থাকেস্ত্রীহাঁস অনেক ছোট ও এর অনুজ্জ্বল পিঠে বাদামি ফোঁটা ছিটানো; ঠোঁটে স্ফীত মাংসপিন্ড নেইপুরুষ ও স্ত্রীহাঁসের উভয়েরই চোখ ঘন বাদামি, ঠোঁট কালো এবং পা ও পায়ের পাতা ফ্যাকাসে অপ্রাপ্তবয়স্ক হাঁসের হালকা ভ্রু-রেখা, অনুজ্জল দেহ, পিঠে পীতাভ আঁশের দাগ ও দেহতল লালচে-বাদামি২টি উপ-প্রজাতির মধ্যে S. m. melanotos বাংলাদেশে দেখা যায়
নাকতা হাঁস, মেয়ে; ফটো ইংরেজি উইকিপিডিয়া থেকে
স্বভাব: নাকতা হাঁস নলবনে ও বাদাভূমিতে বিচরণ করে; সাধারণত ৪-১০টির পারিবারিক দলে দেখা যায়, ২৫-১০০টির ঝাঁকও চোখে পড়েঅগভীর জলাশয়ে সাঁতার কেটে ও মাথা পানিতে অল্প ডুবিয়ে খাবার খায়; খাদ্যতালিকায় আছে শস্যদানা, কচিকা-, জলজ উদ্ভিদের বীজ, ব্যাঙ ও জলজ পোকামাকড়বেশ উড়তে সক্ষমবিপদে পড়লে এরা পানিতে ডুব দিয়ে পালায়; তবে খাদ্যের খোঁজে তা করে না; প্রায়শঃ গাছের ডালে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম করেপুরুষপাখিরা নিচু স্বরে ব্যাঙের মত ডাকে এবং প্রজনন ঋতুতে গাড়ির হর্নের শব্দে ডাক দেয় জুলাই-সেপ্টেম্বর মাসের প্রজনন ঋতুতে পানির কাছাকাছি কোন প্রাচীন গাছের প্রাকৃতিক গর্তে ডালপালা, ঘাস, শুকনো পাতা ও পালক দিয়ে বাসা বেঁধে ডিম পাড়েডিমগুলো ফ্যাকাসে ও পীতাভ, সংখ্যায় ৭-১৫টি, মাপ ৬.২-৪.৩ সেমি স্ত্রীহাঁসএকাই ডিমে তা দেয়; ৩০ দিনে ডিম ফোটে
বিস্তৃতি: নাকতা হাঁস বাংলাদেশের প্রাক্তন আবাসিক এবং বর্তমানে বিরল পরিযায়ী পাখি; এখন শীতে ঢাকা ও সিলেট বিভাগের আর্দ্রভূমি ও হাওরে চোখে পড়ে যেখানে তারা আগে স্থায়িভাবে বাস করতবাসা তৈরির উপযুক্ত জায়গার অভাবে এখন এ দেশে এর প্রজনন সম্ভব নয়দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ায় এর বৈশ্বিক বিস্তৃতি রয়েছে; এশিয়ার মধ্যে দক্ষিণ চিন, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কাম্পুচিয়া, লাওস, এবং ভুটান ও মালদ্বীপ ব্যতীত ভারত উপমহাদেশের অন্যান্য দেশে আছে
অবস্থা: নাকতা হাঁস বিশ্বে বিপদমুক্ত ও বাংলাদেশে মহাবিপন্ন বলে বিবেচিতবাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত
বিবিধ: নাকতা হাঁসের বৈজ্ঞানিক নামের অর্থ নাকওয়ালা কালোপিঠ (গ্রিক: sarc = মাংসল উপাঙ্গ, ornis = পাখি, melas = কালো, notos = পিঠের)

বাংলাদেশের উদ্ভিদ প্রাণী জ্ঞানকোষে এই নিবন্ধটির লেখক মো: আনোয়ারুল ইসলাম ও এম. কামরুজ্জামান।


আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের