Monday, April 28, 2014

ভ্লাদিমির লেনিনের পুস্তক-আলোচনা ও লেনিনবাদের রূপ



মার্কসবাদী শ্রেণিসংগ্রামের স্বীকৃতিকে প্রসারিত করে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের স্বীকৃতিতে

বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাইবেরিয়ায় তিন বছরের জন্য নির্বাসনের দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হয়। ১৮৯৭ সালের মে মাসে তিনি মিনুসিনস্ক গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই লেনিন লিখে শেষ করেন রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থ যা ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয়এটি হলও রাশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ নিয়ে একটি বৃহত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা সরাসরি কার্ল মার্কসের পুঁজি বইটির পূর্বানুসরণ। এই বইয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে লেনিন নতুন প্রতিপাদ্যে মার্কসীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেন। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দেখান যে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ শুধু শিল্পে নয়, কৃষিতেও জোরদার হচ্ছেএই বইয়ের মাধ্যমে মূলত নারোদবাদের পরাজয় ও পরিপূর্ণ সমাধি রচিত হয়। এই বইয়ের ভেতর দিয়ে লেনিন পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্নিহিত গভীরতম বিরোধগুলি উদ্ঘাটন করে দেখান। এতে তিনি দেখান কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজের গর্ভে বেড়ে উঠছে ও শক্তি সঞ্চয় করছে শ্রমিক শ্রেণি, যেই শ্রমিক শ্রেণি পুঁজিবাদের গোরখোদক ও নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্রষ্টা। 
কী করতে হবে? আমাদের আন্দোলনের জরুরি প্রশ্নগুলি, (ইংরেজিতে: What Is to Be Done? Burning Questions of Our Movement) হচ্ছে লেনিনের লেখা বই যা ১৯০১ সালে লিখিত এবং ১৯০২ সালে প্রকাশিত এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা যার শিরোনাম নেয়া হয় উনিশ শতকের রুশ বিপ্লবী নিকোলাই চেরনিশেভস্কি (১৮২৮-৮৯) লিখিত একই নামের উপন্যাস থেকে। পার্টি গঠনে এই বইয়ের ভূমিকা ছিল বিশাল। এতে তিনি প্রলেতারিয় মার্কসবাদী পার্টি গঠনের পরিকল্পনা ও তার রণকৌশলের বুনিয়াদ বিশদভাবে উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। লেনিনের মত ছিলো এপার্টিকে হতে হবে আগাগোড়া বিপ্লবী, নতুন ধরনের সংগ্রামী পার্টি। এই বইখানি ‘অর্থনীতিবাদের’ ভাবাদর্শগত গোরখোদকের কাজ সুসম্পন্ন করে। 
এক পা আগে, দুই পা পিছে হচ্ছে লেনিন লিখিত ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত এমন একটি বই যেখানে তিনি মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামে নামা এবং পার্টির পক্ষে, রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে মেনশেভিকবাদের বিপদসমূহকে বিশ্লেষণ করে দেখান। এতে লেনিন পার্টি জীবনের কঠোর মান ও পার্টি পরিচালনার নীতি রচনা করেন। এতে ছিলো পার্টির সব সদস্যের দ্বারা কঠোরভাবে নিয়মসমূহ পালন, একক পার্টি শৃঙ্খলা, সংখ্যাগুরুর কাছে সংখ্যাল্পের ও উচ্চতর সংগঠনের কাছে নিম্নতর সংগঠনের কাছে নতি স্বীকার, পার্টি সংস্থাগুলির নির্বাচন ও জবাবদিহির বাধ্যতা, পার্টি সদস্যগণের সক্রিয়তা, আত্মউদ্যোগ ও আত্মসমালোচনার বিকাশ।   
গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল (১৯০৫) লেনিন লেখেন ১৯০৫ সালের জুন-জুলাই মাসে এবং বইটি বের হয় জেনেভা থেকে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্করণে; তখন লেনিন সেখানে থাকতেন এবং কাজ করতেন। সেই ১৯০৫ সালেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক এবং আলাদাভাবে মস্কো কমিটি কর্তৃক দশ হাজার সংখ্যায় বইখানা আবার পুনর্মুদ্রিত হয়। ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিটার্সবুর্গ প্রেস কমিটি বইখানায় প্রকাশিত ভাব-ভাবনাকে জার সরকারের বিরোধী অপরাধজনক কার্য বিবেচনা করে সেটিকে নিষিদ্ধ করেছিল এই বইয়ে লেনিন দেখান সশস্ত্র অভ্যুত্থান হচ্ছে জারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের নির্ধারক উপায়। প্রলেতারিয়েত ও কৃষকসম্প্রদায়ের ক্ষমতা অর্থাৎ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করতে হবে; আগের বিপ্লবগুলোতে যা হয়েছে সেভাবে বিজয়ী অভ্যুত্থান থেকে বুর্জোয়ার ক্ষমতা স্থাপন চলবে না। অথচ মেনশেভিকরা মনে করত ক্ষমতা নেবে বুর্জোয়ারা, শ্রমিক শ্রেণির কর্তব্য হলও তাদের সমর্থন করা।  
বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা (ইংরেজিতে: Materialism and Empirio-Criticism) লেনিন লেখেন ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারি-অক্টোবর মাসে যেখানে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের বিরোধীদের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি এই গ্রন্থে আরো দেখান যে দর্শন ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বর্তমান।
জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের আধিকার, ইংরেজিতে “The Right of Nations to Self-Determination, হচ্ছে লেনিনের ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মে মাসে লিখিত এবং এপ্রিল-জুন মাসে Prosveshcheniye জার্নালে প্রকাশিত প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা। এই প্রচারপুস্তকে এবং ‘জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য’ নিবন্ধে লেনিন জাতীয় প্রশ্নের মার্কসবাদী কর্মসূচি এবং বলশেভিক পার্টির জাতীয় নীতি বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়  (ইংরেজিতে: Imperialism, The Highest Stage of Capitalism) হচ্ছে ১৯১৬ সালের জানুয়ারি-জুন মাসে  লেনিনের লিখিত বই যেটি তিনি লেখেন জুরিখে বসে পারুসপ্রকাশালয়ের জন্য। এই গ্রন্থে লেনিন দেখালেন যে বিশ শতকের শুরু নাগাদ পুঁজিবাদ তার বিকাশের নতুন পর্বে, সাম্রাজ্যবাদের পর্বে প্রবেশ করেছে।
রাষ্ট্র ও বিপ্লব (ইংরেজিতে: The State and Revolution) হচ্ছে ১৯১৭ সালের লেনিন লিখিত এমন আরেকটি বই যেখানে সমাজে সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বিপ্লব অর্জনে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পথে সমাজ গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক অপর্যাপ্ততার বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থকে বিবেচনা করা হয় রাষ্ট্রের ওপরে লেনিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে এবং লুসিও কোলেত্তি এটিকে বলেছেন “রাজনৈতিক তত্ত্বে লেনিনের মহত্তম অবদান” মার্কসবাদী তাত্ত্বিক David McLellan-এর মতানুসারে, the book had its origin in Lenin's argument with Bukharin in the summer of 1916 over the existence of the state after a proletarian revolution. Bukharin had emphasised the 'withering' aspect, whereas Lenin insisted on the necessity of the state machinery to expropriate the expropriators. In fact, it was Lenin who changed his mind, and many of the ideas of State and Revolution, composed in the summer of 1917 - and particularly the anti-Statist theme - were those of Bukharin.  
প্রলেতারিয় বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কি হচ্ছে ১৯১৮ সালের অক্টোবরে লেনিন লিখিত বই যেখানে তিনি সুবিধাবাদের উপর প্রচণ্ড আঘাত হানেন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে বিশুদ্ধ ও শ্রেণিবহির্ভূতবলে দেখাবার যে চেষ্টা কাউৎস্কি করেছিলেন, এ পুস্তকে লেনিন তার অযৌক্তিকতা খুলে দেখান
কমিউনিজমে ‘বামপন্থা’র শিশু রোগ হচ্ছে ১৯২০ সালে লেনিন লিখিত বই যেখানে তিনি বলশেভিক পার্টির সৃষ্টি, বিকাশ, সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরেন১৯০৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বলশেভিকবাদের ব্যবহারিক কাজের ইতিহাসের নানান ধরন সম্পর্কে লিখেছেন। অর্থাৎ রুশদেশে লেনিনের বিপ্লবী নীতি ও কৌশলের নানা রূপ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্যের নানা দিক ব্যাখ্যাত হয় এই গ্রন্থে। লেনিনবাদি কৌশল বলতে আজ আমরা যা বুঝি তার রূপ রয়েছে এই বইতে।
তথ্যসূত্র:
১. এই নিবন্ধের প্রায় সব তথ্যই গ. দ. অবিচকিন ও অন্যান্য; ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১ থেকে নেয়া হয়েছে
২. ভি. আই. লেনিন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৮৪, পৃষ্ঠা-১৩৫।
৩. ভি. আই. লেনিন, সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের প্রসঙ্গে; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; তারিখহীন; পৃষ্ঠা-১৯১।
৪. L. Colletti, From Rosseau to Lenin (London and New York, 1972, p.224)
৫. David Mclellan Marxism after Marx, 1979, New York: Harper and Row, p.98. For Lenin's considerable debt to Bukharin, see S. Cohen Bukharin and the Bolshevik Revolution (New York, 1973, pp.25ff; 39ff)

Monday, April 21, 2014

মহুয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরসবুজ বৃক্ষ



মহুয়া, ফটো: সৈয়দ তারিক
প্রচলিত বাংলা নাম: মহুয়া
অন্যান্য নাম: মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা, বাটার ট্রি
বৈজ্ঞানিক নাম: Madhuca longifolia,
সমনাম: Madhuca indica, Bassis latifoli, Bassia latifolia
পরিবার: Sapotaceae.
জাতসমূহ: M. longifolia var. latifolia, M. longifolia var. longifolia

বিবরণ: ধারনা করা হয় মহুয়ার আদিবাস ভারতবর্ষে। মহুয়া প্রায় ২০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এভারগ্রীন বা সেমিএভারগ্রীন খরা প্রতিরোধী ট্রপিকাল/গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃক্ষ। এর পাতা মোটা এবং লেদারি। ফুল ছোট, সুগন্ধযুক্ত এবং শাখার মাথায় গুচ্ছাকারে ফোটে, রঙ ঈষৎ হলুদ বা ডাল হোয়াইট। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলে মহুয়া ফুল আদিবাসীদের কাছে খুব প্রিয়মহুয়া গাছের কালচারাল এবং ইকোনোমিক মূল্যও যথেষ্ট। Antheraea paphia নামীয় মথ মহুয়ার পাতা খেয়ে তসর সিল্ক tassar silk তৈরী করে যার বাণিজ্যিক মূল্য প্রচুর। মহুয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এগ্রোফরেস্ট্রি স্পিসিস। মহুয়ার শিকড় বিস্তৃত বিধায় সহজেই ভূমিক্ষয় রোধ করতে পারে। মহুয়া তীব্রগন্ধী ফুল এবং ফেব্রুয়ারী-এপ্রিলে ফুটে থাকে। মহুয়ার ফল জুলাইঅগাস্টে পাওয়া যায় । ফলের পাল্প মিষ্টি এবং কার্বোহাইড্রেটের একটি ভালো উৎস। কাঁচা মহুয়া সবুজ এবং পাকলে কমলা বা লালচে হলুদ হয়।
১০ বছর বয়স থেকেই ফুল দিতে শুরু করে মহুয়া গাছ। স্রেফ গাছ ধরে ঝাকালেই পাকা মহুয়া ফুল ঝরে পরে। মানুষের সাথে সাথে ময়ূর, অন্যন্য পাখী, বন্য পশু, ভালুক এবং হরিণও মহুয়া ফুলের ভক্ত। মহুয়ার ফুল কোন ধরণের প্রক্রিয়াকরণ বা রান্না ব্যতিরেকেই খাওয়া যায়। মহুয়ার বীজের কুড়া (seed kernels ) হতে এক ধরনের হলুদাভ তৈলাক্ত পদার্থ এক্সট্রাক্ট করা হয়। একে ভালোভাবে রিফাইন করার পর মহুয়া বাটার পাওয়া যায়। সম্ভবত এজন্য মহুয়া গাছের আরেক নাম বাটার ট্রি। এই বাটার উপজাতীয়রা রান্নার কাজে ব্যবহার করে। এ ছাড়াও এই বাটার দিয়ে সাবান ও মোম ও ত্বকের জন্য অয়েনমেন্ট তৈরি করা হয়। মহুয়ার বাটার ত্বকের সংস্পর্শে আসা মাত্র বিগলিত হয় বলে এটি ত্বকের শুস্কতারোধ ও রিংকেল রোধে খুব কার্যকর। ত্বকের বয়োবৃদ্ধি রোধে, নতুন সতেজ ত্বক সৃষ্টিতে এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে এই বাটার তুলনাহীন। মহুয়ার ফুল খুব মিষ্টি বিধায় চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যহার করা যায়। যদিও অতিরিক্ত ফুলব্যবহারে নেশাগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ফুল হতে জ্যাম, জেলি, স্কোয়াস তৈরি করা হয়। শুকনো ফুল দিয়ে পিকেল, কিসমিস, বেকারী ও অন্যান্য কনফেকশনারী দ্রব্যাদি তৈরি করা যায়। খাবারে সুগন্ধ যুক্ত করতে মহুয়া ফুল রান্নায় ব্যবহার করা হয়। ফুলের মত ফলও কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই খাওয়া যায়। ফলের খোসা সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভিতরের অংশ শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়, পরবর্তীতে অন্যান্য খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়।
প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলে ১১১ ক্যালোরি শক্তি , ৭৩.৬ গ্রাম ময়েশ্চার, ২২.৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১.৪ গ্রাম প্রোটিন, ১.৬ গ্রাম ফ্যাট, মিনারেলস, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রণ এবং ভিটামিন A, C থাকে।
মহুয়ার ব্যবহার: মহুয়ার তেল স্কীন কেয়ারের জন্য অতুলনীয়। এই তেল বীজ শোধন ও পেস্ট কন্ট্রোলেও ব্যবহার করা হয়, ফ্যাট/চর্বি দিয়ে সাবান ও ডিটারজেন্ট তৈরি হয়। তা ছাড়াও মহুয়ার চর্বি ভেজিটাবল বাটার হিসেবে খুব উপাদেয়। মহুয়ার বাটার ফুয়েল ওয়েল / বায়ো ডিজেল এর ভালো উৎস। মহুয়া বীজের তেলে mowin নামীয় সামান্য বিষাক্ত যৌগ রয়েছে, যথার্থ বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া যা সহজেই দূর করা সম্ভব। গাছের পাতা, ফুল, ফল ডালপালা ছাগল-ভেড়ার খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বীজের খৈল ভালো গোখাদ্য। তবে মহুয়া বীজকে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পূর্বে বীজটি mowin মুক্ত করা প্রয়োজন। বীজের খৈল/সীড কেক অত্যন্ত ভালো অর্গানিক সার ও ইনসেক্টিসাইড। মহুয়া খৈল-এ এ্যালকলয়েড বৈশিষ্ট থাকায় তা দিয়ে মাছ ধরা যায়। তা ছাড়াও এই খৈল পুকুরে সার হিসের এবং পোনা মাছের খাদ্য হিসেবেও ভালো কাজে দেয়। কাঁচা ফুল দিয়ে এ্যালকোহলিক ড্রিংক তৈরি হয়। আদিবাসীদের কাছে এ পানীয় খুব প্রিয় এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। অরণ্যবাসীদের প্রতিটি উৎসব-পার্বনে এ পানীয় অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে সমাদৃত।
মহুয়া গাছের বাকলসহ গাছের প্রতিটি অংশ ঔষধি গুণসম্পন্ন বিধায় আদিবাসী বিভিন্ন জাতির লোকজনের এ গাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুল দিয়ে ঔষধি সিরাপ তৈরি করা হয়। ফুল ব্রংকাইটিস ও চক্ষুরোগে উপকারে আসে। ফুল হতে যে তেল তৈরি হয় তাতে Fatty acid composition, palmitic acid, stearic acid, oleic acid linoleic রয়েছে। এই তেলের emollient প্রোপার্টিজ থাকায় এই তেল ত্বক, রিমোটিজম ও মাথাব্যথায় কার্যকর। মহুয়া ভালো ল্যাক্সেটিভ বিধায় কোষ্টকাঠিণ্য, পাইলস, এ্যানাল ডিজিজ ও বমনরোধে সুফলদায়ক। মহুয়াতে ট্যানিন থাকায় মহুয়া হিলিং গুণসম্পন্ন। এ ছাড়াও ক্রণিক আলসার, এ্যাকিউট টনসিলাইটিস, মাড়ির রক্তক্ষরণে, স্পঞ্জী মাড়ির জন্য মহুয়া উপকারী। পোড়ানো মহুয়ার পাতা ঘি সহযোগে পোড়া ক্ষতে ব্যবহার করলে খুব উপকার পাওয়া যায়। মহুয়া গাছের বাকল ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী। দুধের সাথে মহুয়া ফুল জ্বাল করে খেলে ইম্পোটেন্সিতে কাজ দেয়। মহুয়ার ফুল ছিড়লে, কান্ড ও শাখা কাটলে দুধের মত এক ধরণের কষ বের হয় যা তীব্র আঠালো এবং এ্যাস্ট্রিনজেন্ট। এই কষ রিমোটিজমের জন্য উপকারী।
আয়ুর্বেদিক দৃষ্টকোণ হতে মহুয়া তাপ নিরোধক (coolant), যৌন উত্তেজক (aphrodisiac), শ্বাসতন্ত্রের রোগ নিরোধক (expectorant) পরিপাকতন্ত্রীয় সমস্যা নিরামায়ক (carminative) ও মাতৃদুগ্ধ বর্ধক গুণসম্পন্ন গাছ। 

মহুয়া ফুলকে নিয়ে আছে নানা উপ্যাখান, কত কবিতা, কত গান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রয়েছে বহু গান। পাহাড়িরা এর ফুল দিয়ে নেশাদ্রব্য তৈরি করে। ভালুক নাকি রাতের বেলা এর ফুল খেয়ে মাতাল হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার মহুয়া কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন, “মহুয়া বসন্তের অনুচরণ, আর তার রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা। তিনি মহুয়া ফুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন-রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার, /উচ্চ শিরে তবু রাজকুলবনিতার/ গৌরব রাখিস উর্ধ্বে ধরে/ আমি তো দেখেছি তোরে/ বনস্পতি গোষ্ঠী-মাঝে অরণ্য সভায়/ অকুণ্ঠিত মর্যাদায়/ আছিস দাঁড়ায়ে/ শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে। প্রস্ফূটিত মহুয়া ফুলের মধুগন্ধী উদ্দমতা তুলনাহীন। এই গন্ধ দূরবাহী, তীব্র ও উন্মাদনাময়। আদিবাসী ও অরণ্যের পশুপাখির কাছে মহুয়া প্রিয় তরু। এই ফুলের নির্যাস উত্তেজক এবং আদীবাসীদের প্রিয় পানীয়। 

আরো পড়ুন: