Monday, April 28, 2014

ভ্লাদিমির লেনিনের পুস্তক-আলোচনা ও লেনিনবাদের রূপ



মার্কসবাদী শ্রেণিসংগ্রামের স্বীকৃতিকে প্রসারিত করে প্রলেতারীয় একনায়কত্বের স্বীকৃতিতে

বিপ্লবী ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনকে ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সাইবেরিয়ায় তিন বছরের জন্য নির্বাসনের দণ্ডাজ্ঞা দেয়া হয়। ১৮৯৭ সালের মে মাসে তিনি মিনুসিনস্ক গ্রামে এসে পৌঁছেন। এখানেই লেনিন লিখে শেষ করেন রাশিয়ায় পুঁজিবাদের বিকাশ গ্রন্থ যা ১৮৯৯ সালে প্রকাশিত হয়এটি হলও রাশিয়ার অর্থনৈতিক বিকাশ নিয়ে একটি বৃহত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, যা সরাসরি কার্ল মার্কসের পুঁজি বইটির পূর্বানুসরণ। এই বইয়ে রাশিয়ার অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে লেনিন নতুন প্রতিপাদ্যে মার্কসীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেন। বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে তিনি দেখান যে রাশিয়ায় পুঁজিবাদ শুধু শিল্পে নয়, কৃষিতেও জোরদার হচ্ছেএই বইয়ের মাধ্যমে মূলত নারোদবাদের পরাজয় ও পরিপূর্ণ সমাধি রচিত হয়। এই বইয়ের ভেতর দিয়ে লেনিন পুঁজিবাদী সমাজের অন্তর্নিহিত গভীরতম বিরোধগুলি উদ্ঘাটন করে দেখান। এতে তিনি দেখান কীভাবে পুঁজিবাদী সমাজের গর্ভে বেড়ে উঠছে ও শক্তি সঞ্চয় করছে শ্রমিক শ্রেণি, যেই শ্রমিক শ্রেণি পুঁজিবাদের গোরখোদক ও নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজের স্রষ্টা। 
কী করতে হবে? আমাদের আন্দোলনের জরুরি প্রশ্নগুলি, (ইংরেজিতে: What Is to Be Done? Burning Questions of Our Movement) হচ্ছে লেনিনের লেখা বই যা ১৯০১ সালে লিখিত এবং ১৯০২ সালে প্রকাশিত এটি একটি রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা যার শিরোনাম নেয়া হয় উনিশ শতকের রুশ বিপ্লবী নিকোলাই চেরনিশেভস্কি (১৮২৮-৮৯) লিখিত একই নামের উপন্যাস থেকে। পার্টি গঠনে এই বইয়ের ভূমিকা ছিল বিশাল। এতে তিনি প্রলেতারিয় মার্কসবাদী পার্টি গঠনের পরিকল্পনা ও তার রণকৌশলের বুনিয়াদ বিশদভাবে উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন। লেনিনের মত ছিলো এপার্টিকে হতে হবে আগাগোড়া বিপ্লবী, নতুন ধরনের সংগ্রামী পার্টি। এই বইখানি ‘অর্থনীতিবাদের’ ভাবাদর্শগত গোরখোদকের কাজ সুসম্পন্ন করে। 
এক পা আগে, দুই পা পিছে হচ্ছে লেনিন লিখিত ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত এমন একটি বই যেখানে তিনি মেনশেভিকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামে নামা এবং পার্টির পক্ষে, রাশিয়ার বিপ্লবী আন্দোলনের পক্ষে মেনশেভিকবাদের বিপদসমূহকে বিশ্লেষণ করে দেখান। এতে লেনিন পার্টি জীবনের কঠোর মান ও পার্টি পরিচালনার নীতি রচনা করেন। এতে ছিলো পার্টির সব সদস্যের দ্বারা কঠোরভাবে নিয়মসমূহ পালন, একক পার্টি শৃঙ্খলা, সংখ্যাগুরুর কাছে সংখ্যাল্পের ও উচ্চতর সংগঠনের কাছে নিম্নতর সংগঠনের কাছে নতি স্বীকার, পার্টি সংস্থাগুলির নির্বাচন ও জবাবদিহির বাধ্যতা, পার্টি সদস্যগণের সক্রিয়তা, আত্মউদ্যোগ ও আত্মসমালোচনার বিকাশ।   
গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল (১৯০৫) লেনিন লেখেন ১৯০৫ সালের জুন-জুলাই মাসে এবং বইটি বের হয় জেনেভা থেকে রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংস্করণে; তখন লেনিন সেখানে থাকতেন এবং কাজ করতেন। সেই ১৯০৫ সালেই পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি কর্তৃক এবং আলাদাভাবে মস্কো কমিটি কর্তৃক দশ হাজার সংখ্যায় বইখানা আবার পুনর্মুদ্রিত হয়। ১৯০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পিটার্সবুর্গ প্রেস কমিটি বইখানায় প্রকাশিত ভাব-ভাবনাকে জার সরকারের বিরোধী অপরাধজনক কার্য বিবেচনা করে সেটিকে নিষিদ্ধ করেছিল এই বইয়ে লেনিন দেখান সশস্ত্র অভ্যুত্থান হচ্ছে জারতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র উচ্ছেদের নির্ধারক উপায়। প্রলেতারিয়েত ও কৃষকসম্প্রদায়ের ক্ষমতা অর্থাৎ বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্ব কায়েম করতে হবে; আগের বিপ্লবগুলোতে যা হয়েছে সেভাবে বিজয়ী অভ্যুত্থান থেকে বুর্জোয়ার ক্ষমতা স্থাপন চলবে না। অথচ মেনশেভিকরা মনে করত ক্ষমতা নেবে বুর্জোয়ারা, শ্রমিক শ্রেণির কর্তব্য হলও তাদের সমর্থন করা।  
বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা (ইংরেজিতে: Materialism and Empirio-Criticism) লেনিন লেখেন ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারি-অক্টোবর মাসে যেখানে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের বিরোধীদের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি এই গ্রন্থে আরো দেখান যে দর্শন ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বর্তমান।
জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের আধিকার, ইংরেজিতে “The Right of Nations to Self-Determination, হচ্ছে লেনিনের ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারি-মে মাসে লিখিত এবং এপ্রিল-জুন মাসে Prosveshcheniye জার্নালে প্রকাশিত প্রকাশিত একটি রাজনৈতিক প্রচারপুস্তিকা। এই প্রচারপুস্তকে এবং ‘জাতীয় সমস্যায় সমালোচনামূলক মন্তব্য’ নিবন্ধে লেনিন জাতীয় প্রশ্নের মার্কসবাদী কর্মসূচি এবং বলশেভিক পার্টির জাতীয় নীতি বিকশিত ও প্রতিষ্ঠিত করেন।
সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়  (ইংরেজিতে: Imperialism, The Highest Stage of Capitalism) হচ্ছে ১৯১৬ সালের জানুয়ারি-জুন মাসে  লেনিনের লিখিত বই যেটি তিনি লেখেন জুরিখে বসে পারুসপ্রকাশালয়ের জন্য। এই গ্রন্থে লেনিন দেখালেন যে বিশ শতকের শুরু নাগাদ পুঁজিবাদ তার বিকাশের নতুন পর্বে, সাম্রাজ্যবাদের পর্বে প্রবেশ করেছে।
রাষ্ট্র ও বিপ্লব (ইংরেজিতে: The State and Revolution) হচ্ছে ১৯১৭ সালের লেনিন লিখিত এমন আরেকটি বই যেখানে সমাজে সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং বিপ্লব অর্জনে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার পথে সমাজ গণতন্ত্রের তাত্ত্বিক অপর্যাপ্ততার বর্ণনা করা হয়েছে। রাষ্ট্র ও বিপ্লব গ্রন্থকে বিবেচনা করা হয় রাষ্ট্রের ওপরে লেনিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে এবং লুসিও কোলেত্তি এটিকে বলেছেন “রাজনৈতিক তত্ত্বে লেনিনের মহত্তম অবদান” মার্কসবাদী তাত্ত্বিক David McLellan-এর মতানুসারে, the book had its origin in Lenin's argument with Bukharin in the summer of 1916 over the existence of the state after a proletarian revolution. Bukharin had emphasised the 'withering' aspect, whereas Lenin insisted on the necessity of the state machinery to expropriate the expropriators. In fact, it was Lenin who changed his mind, and many of the ideas of State and Revolution, composed in the summer of 1917 - and particularly the anti-Statist theme - were those of Bukharin.  
প্রলেতারিয় বিপ্লব ও দলদ্রোহী কাউৎস্কি হচ্ছে ১৯১৮ সালের অক্টোবরে লেনিন লিখিত বই যেখানে তিনি সুবিধাবাদের উপর প্রচণ্ড আঘাত হানেন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে বিশুদ্ধ ও শ্রেণিবহির্ভূতবলে দেখাবার যে চেষ্টা কাউৎস্কি করেছিলেন, এ পুস্তকে লেনিন তার অযৌক্তিকতা খুলে দেখান
কমিউনিজমে ‘বামপন্থা’র শিশু রোগ হচ্ছে ১৯২০ সালে লেনিন লিখিত বই যেখানে তিনি বলশেভিক পার্টির সৃষ্টি, বিকাশ, সংগ্রাম ও বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরেন১৯০৩ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত বলশেভিকবাদের ব্যবহারিক কাজের ইতিহাসের নানান ধরন সম্পর্কে লিখেছেন। অর্থাৎ রুশদেশে লেনিনের বিপ্লবী নীতি ও কৌশলের নানা রূপ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্যের নানা দিক ব্যাখ্যাত হয় এই গ্রন্থে। লেনিনবাদি কৌশল বলতে আজ আমরা যা বুঝি তার রূপ রয়েছে এই বইতে।
তথ্যসূত্র:
১. এই নিবন্ধের প্রায় সব তথ্যই গ. দ. অবিচকিন ও অন্যান্য; ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১ থেকে নেয়া হয়েছে
২. ভি. আই. লেনিন, গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৮৪, পৃষ্ঠা-১৩৫।
৩. ভি. আই. লেনিন, সাম্রাজ্যবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদীদের প্রসঙ্গে; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; তারিখহীন; পৃষ্ঠা-১৯১।
৪. L. Colletti, From Rosseau to Lenin (London and New York, 1972, p.224)
৫. David Mclellan Marxism after Marx, 1979, New York: Harper and Row, p.98. For Lenin's considerable debt to Bukharin, see S. Cohen Bukharin and the Bolshevik Revolution (New York, 1973, pp.25ff; 39ff)

Sunday, April 20, 2014

সামাজিক শ্রেণির রূপ ও প্রকৃতি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ



পুঁজিবাদী সমাজের স্তরবিন্যাস

শ্রেণি বা সামাজিক শ্রেণি, ইংরেজিতে Social Class, হলো একই প্রণালীতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে সমাজের এরূপ এক একটি অংশ। সমাজ বিকাশের নিয়মগুলি বোঝা ও ব্যাখা করবার জন্য সমাজের বড় বড় দলের লোকগুলোকে বলা হয় সামাজিক শ্রেণি। এটি দেখা দিয়েছে সামাজিক শ্রম বিভাগ আর সেইসংগে উৎপাদনের উপায়ের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা উদ্ভবের ফলে। ব্যক্তিগত মালিকানা দেখা দেবার কারণেই সমাজ ভাগ হয়ে যায় ধনী আর দরিদ্রে, শোষক আর শোষিতে।
সমাজের একাংশের শ্রমকে অপরাংশ আত্মসাৎ করলেই শ্রেণি পাওয়া যায়। যেমন, ‘সমাজের একাংশ যদি সমস্ত ভূমি আত্মসাৎ করে থাকে তাহলে হয় জমিদার শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণি। সমাজের একাংশের হাতে যদি থাকে কলকারখানা, শেয়ার এবং পুঁজি, আর অপর অংশ যদি কাজ করে ওইসব কলকারখানায়, তাহলে হয় পুঁজিপতি শ্রেণি এবং প্রলেতারিয়ান শ্রেণি’[১] বা বৃহত্তর অর্থে শ্রমিক শ্রেণি। উৎপাদনের উপকরণ আর উপায়ের অধিকারীরা নিজেদের জন্য একদল লোককে খাটাতে সক্ষম হয়। এই একদল লোকের উৎপাদনের উপকরণ ও উপায়ের উপর মালিকানা থাকে না, তাই তারা সেসবের ব্যক্তিমালিকদের কাছে মজুরি নিয়ে শ্রমশক্তি বিক্রয়ে বাধ্য হয়। এতে উৎপাদনের উপায়ের মালিকেরা তাদের জন্য যারা খাটছে তাদের শ্রম আত্মসাৎ করতে পারে। একদল লোক শোষিত হয় অন্য দলের মারফত। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় দলটা সংখ্যায় অল্প, প্রথমটা অধিকাংশ। এই যে একদল লোক শোষক, উৎপীড়ক এবং অন্যদল শোষিত ও উৎপীড়িতরূপে সৃষ্ট হয়, তাদের বলা হয় বৈরী শ্রেণি, কারণ তাদের স্বার্থ আপোষহীন।[২]
মানুষ শ্রম করে। এই শ্রমকে ঘিরে সমাজে বিভাজনের নানা রূপ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমবিভাজন ঘটেছে দৈহিক শ্রমের ক্ষেত্রে, মানসিক শ্রমের ক্ষেত্রেও। সম্পত্তির বিষয়টি আসলে শ্রেণি সম্পর্কেরই ফলশ্রুতি। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“শিল্প-কারখানার (Industry) উন্নতির বিভিন্ন স্তরে সম্পত্তির প্রশ্নটি সম্পর্কিত করেছে সর্বদাই যে কোনো শ্রেণির জন্য জীবন প্রশ্ন হিসেবে। আধিপত্য এবং বশ্যতার সম্পর্কের পূর্ববর্তী কোনো সম্পত্তি নেই এবং আধিপত্য এবং বশ্যতা হচ্ছে খুব বেশি স্পষ্ট সম্পর্ক।”[৩]
একমাত্র সম অবস্থানে থেকে ও উৎপাদন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বৈরিমূলক দ্বন্দ্বকে ধারণ করে সংঘবদ্ধ চেতনায় এলেই শ্রেণি সৃষ্টি হয়। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“লক্ষ লক্ষ পরিবার যখন এমন আর্থিক অবস্থায় জীবনযাপন করে যার ফলে তাদের জীবনযাত্রার ধরন, তাদের স্বার্থ ও সংস্কৃতি অন্যান্য শ্রেণির থেকে স্বতন্ত্র হয় এবং শেষোক্তদের প্রতি তাদের বৈরিভাব জাগিয়ে তোলে, তখন সে দিক থেকে তারা একটি শ্রেণি বটে। এই ছোট ভূসম্পত্তির মালিক চাষিদের মধ্যে যোগাযোগ যে পরিমাণে স্থানীয় মাত্র, এবং স্বার্থের অভিন্নতা তাদের ভিতর যে পরিমাণে কোনো যৌথসত্ত্বা, জাতিগত বন্ধন অথবা রাজনৈতিক সংগঠন এনে দেয়নি, সেই পরিমাণে তারা আবার শ্রেণি নয়।”[৪] 
শ্রেণিসমাজের অবলুপ্তির জন্য প্রয়োজন প্রলেতারিয়েতের প্রয়োজন হয় শ্রেণিচেতনা। এই শ্রেণিচেতনা তৈরি হবার পূর্বেই দেখা দিয়েছে শ্রেণি হিসেবে প্রলেতারিয়েতের উদ্ভবযেমন কার্ল মার্কস ১৮৪৭ সালের জুলাইতে প্রকাশিত দর্শনের দারিদ্র গ্রন্থে যা লিখেছেন সেসবের সমর্থন পাবো তাঁর পুঁজি গ্রন্থেও,
“অর্থনৈতিক অবস্থা প্রথমে দেশের সাধারণ মানুষকে শ্রমিকে রূপান্তরিত করেছিল। পুঁজির ঐক্যজোট এই সব সাধারণ মানুষের জন্য একটি সাধারণ পরিস্থিতি, একটি সাধারণ স্বার্থের জন্ম দিয়েছে। এই জনতা, এইভাবে, পুঁজির বিরুদ্ধে একটি শ্রেণি হিসেবে পরিগণিত, কিন্তু তখনও নিজেদের জন্য একটি শ্রেণি হিসেবে নয়। সংগ্রামের ক্ষেত্রে, যে সংগ্রাম সম্পর্কে আমরা কয়েকটি স্তরের কথা উল্লেখ করেছি মাত্র, এই জনতা ঐক্যবদ্ধ হয় এবং নিজেদেরকে নিজেদের জন্যই শ্রেণি হিসেবে সংগঠিত করে”[৫]
কার্ল মার্কসের পুঁজি গ্রন্থের ১ম খণ্ডের ৮ম অধ্যায়টি আদি সঞ্চয়ের ভয়াবহ ইতিহাসকে তুলে ধরে। আদি সঞ্চয়ের সাথে সাথে বাড়তে থাকে শহুরে প্রলেতারিয়েতের সংখ্যা। এই বিপুল সংখ্যক প্রলেতারিয়েতকে গ্রাম থেকে উৎখাত করে শহরে নিক্ষেপ করা হয়। কার্ল মার্কস লিখেছেন যে, পুঁজিবাদী শ্রেণি গঠনের ক্ষেত্রে যেসব বিপ্লব হাতলের কাজ করে সেগুলোর ভেতরে,
“সর্বোপরি যুগান্তকারী হলও সেইসব সন্ধিক্ষণ যখন বিপুলসংখ্যক লোককে সহসা ও সবলে তাদের জীবনধারণের উপায় থেকে ছিন্ন করে এনে শ্রমবাজারে নিক্ষেপ করা হয় মুক্ত ও ‘অনাবদ্ধ’ প্রলেতারিয় হিসেবে। ভূমি থেকে কৃষি-উৎপাদকদের, কৃষকের উচ্ছেদই হলও গোটা প্রক্রিয়াটার মূলকথা।”[৬]  
উৎপাদনের উপায়ের সংগে সম্পর্ক থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায় শ্রমের সামাজিক সংগঠনে শ্রেণির ভূমিকা এবং সামাজিক সম্পদ পাবার উপায় ও পরিমাণ। শ্রেণিদের মধ্যে পার্থক্যের মৌল লক্ষণ হলো- সামাজিক উৎপাদনে তাদের স্থান, সুতরাং উৎপাদনের উপায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে। প্রতিটি শ্রেণির থাকে উৎপাদনের উপায়ের সংগে সুনির্দিষ্ট নিজস্ব সম্পর্ক। এই লক্ষণ দিয়েই পার্থক্য করা যায় শ্রেণি আর অন্যান্য সামাজিক গ্রুপের মধ্যে যারা শ্রেণি নয়। যেমন, উৎপাদনের উপায়ের সাথে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক নেই, তাই তারা শ্রেণি নয়, বুদ্ধিজীবীরা হলও বিভিন্ন শ্রেণির অংশবিশেষ নিয়ে একটা সামাজিক স্তর।[৭]
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস শ্রেণি বিষয়টিকে প্রধানত ও প্রথমত অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেন। তাঁরা উৎপাদন প্রণালীতে বিভক্ত হয়ে পড়া বড় জনসমষ্টিকে শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে শ্রেণি হলো সমাজের মৌলিক কাঠামো এবং উৎপাদন প্রণালীতে তাদের স্থান দ্বারা বিভাজিত শ্রমের ফলশ্রুতি[৮]
তাঁদের মতে, যে-শ্রেণি সমাজের শাসনে থাকে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিই পরিচালক ভূমিকায় থাকে। মার্কস এবং এঙ্গেলস জার্মান ভাবাদর্শ গ্রন্থে শ্রেণি স্বার্থ রক্ষায় ভাবাদর্শের (Ideology) ব্যবহারিক দিকটি তুলে ধরেন এবং এই মত ব্যক্ত করেন যে, কল্পনাশক্তিসম্পন্ন ভাবাদর্শবিদেরা নিজ শ্রেণিস্বার্থটিকে সমাজের সমস্ত মানুষের সাধারণ স্বার্থ হিসেবে হাজির করে। মার্কস এই গ্রন্থে, বুর্জোয়া ভাবাদর্শবিদরা যে ভাবনাকে (Ideas) শাসক শ্রেণির স্বার্থে ব্যবহার করে নিজ শ্রেণির স্বার্থকে আড়াল করে এবং শাসক শ্রেণির স্বার্থকে শাশ্বত, সর্বজনীন ও স্বাধীন বিষয় হিসেবে হাজির করার মধ্য দিয়ে ভাবাদর্শকে শ্রেণি হিসেবে টিকে থাকার কাজে ব্যবহার করে, তা তুলে ধরেন। এ থেকে ভাবাদর্শ, ভাবনা ও ভাববাদের (Idealism) ব্যবহারিক ও সামাজিক তাৎপর্যটি বেরিয়ে আসে। মার্কস মনে করেন, শ্রেণি সমাজে বস্তুগত উৎপাদনের উপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেই সমাজের কর্তৃত্বশালী শাসক শ্রেণি ভাবনাজগতের উপর নিয়ন্ত্রণের পরিবেশ সৃষ্টি করে। তিনি লিখেছেন,
“প্রত্যেকটা যুগে শাসক শ্রেণির ভাবনাই কর্তৃত্বশালী ভাবনা, অর্থাৎ কিনা, যে শ্রেণিটা সমাজে শাসনকারী বৈষয়িক শক্তি, সেটা একই সংগে কর্তৃত্বকর বুদ্ধিবৃত্তিগত শক্তিও বটে। বৈষয়িক উৎপাদনের উপকরণ যে শ্রেণির আয়ত্ত্বে থাকে সে শ্রেণিটাই একই সংগে নিয়ন্ত্রণ করে মানসিক উৎপাদনের উপায়-উপকরণ। মোটামুটি বলা যায়, এইভাবে, মানসিক উৎপাদনের উপায়-উপকরণ যাদের নেই তাদের ভাবনা ঐ শ্রেণির নিয়ন্ত্রণাধীন। কর্তৃত্বশীল ভাবনা প্রাধান্যশালী বৈষয়িক সম্পর্কসমূহের ভাবগত অভিব্যক্তির চেয়ে, ভাবনা হিসেবে উপলব্ধ প্রাধান্যশালী বৈষয়িক সম্পর্কসমূহের চেয়ে, আর তার থেকে, যেসব সম্পর্ক একটা শ্রেণিকে করে তোলে শাসক সেগুলোর চেয়ে বেশি কিছু নয়, কাজেই এই শ্রেণির প্রাধান্যের ভাবনা।[৯]
কার্ল মার্কস উল্লেখ করেছেন যে ভাবাদর্শ সমাজের বিদ্যমান বাস্তব সম্পর্ককে বিকৃত ও উলটোভাবে (twisting and inversion) হাজির করে। এর ফলে ভাবাদর্শ বাস্তব বিরোধকে গোপন করে শাসক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে। এভাবে তারা বাস্তব বিরোধকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক বিপ্লবের পক্ষে পৃথিবীকে পালটে দেবার কাজে অগ্রণী থাকেন।

তথ্যসূত্র:
১. দেখুন, ভি. আই. লেনিন, জনশিক্ষা; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, তারিখহীন; পৃষ্ঠা- ১০৭।
২. আ. ইয়ার্মাকোভা ও ভ. রাত্নিকভ; শ্রেণি ও শ্রেণিসংগ্রাম, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো;১৯৮৮; পৃষ্ঠা- ২১।
৩. কার্ল মার্কস, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমালোচনা, ইংরেজি বাক্যগুলো এরকম: The property question relating to the different stages of  development of industry has always been the life question of any class. There is no property anterior to the relation of domination and subjection which are far more concrete relation.
৪. কার্ল মার্কস; লুই বোনাপার্টের আঠারোই ব্রুমেয়ার।
৫. কার্ল মার্কস, দর্শনের দারিদ্র থেকে
৬. কার্ল মার্কস, পুঁজি, প্রথম খণ্ড, অষ্টম অধ্যায়।
. এম. আর. চৌধুরী সম্পাদিত; আবশ্যকীয় শব্দ-পরিচয়, প্রকাশক: হেলাল উদ্দীন, ঢাকা; এপ্রিল, ২০১২; পৃষ্ঠা- ১৪-১৫।
. সমীরণ মজুমদার, সামাজিক বিভাজনের রূপ ও রূপান্তর; নান্দীমুখ সংসদ; কলকাতা, ২০০৩; পৃষ্ঠা- শেষাংশ-৩১।
৯. কার্ল মার্কস, জার্মান ভাবাদর্শ; মার্কস-এঙ্গেলস নির্বাচিত রচনাবলী, বার খণ্ডের প্রথম খণ্ড; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৯; পৃষ্ঠা- ৫৮। ইংরেজি বাক্যগুলো এরকম: The ideas of the ruling class are in every epoch the ruling ideas, i.e. the class which is the ruling material force of society, is at the same time its ruling intellectual force. The class which has the means of material production at its disposal, has control at the same time over the means of mental production, so that thereby, generally speaking, the ideas of those who lack the means of mental production are subject to it. The ruling ideas are nothing more than the ideal expression of the dominant material relationships, the dominant material relationships grasped as ideas; hence of the relationships which make the one class the ruling one, therefore, the ideas of its dominance.