Saturday, June 29, 2013

সাঁওতাল বিদ্রোহ চলছে, গণমুক্তির লড়াই থামে নাই




সিধু কানহু


৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহের ১৫তম বার্ষিকী বা মহান সান্তাল হুলদিবস। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে একটি বিশেষ এবং উজ্জ্বলতম দিবস এই সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। সুদখোর মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ-অত্যাচার ও পুলিশ-দারোগার নির্যাতনে অতিষ্ঠ সাঁওতাল জনগণের মুক্তির পথ খুঁজতে ১৮৫৫ সালের এই দিনে সিধু মূরমূ এবং কানহু মূরমূ তাঁদের নিজ গ্রাম ভগনাডিহিতে এক গণসমাবেশের ডাক দিয়েছিলেন। সেই সময় সুদখোর মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের শোষণ ও ঠকবাজীতে সাঁওতাল জনগণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন। মহাজনের ঋণ যতই ফের দিক, কখনও শোধ হতো না। বংশ পরম্পরায় পরিশোধ করতে হতো, ঋণ পরিশোধের নামে স্ত্রী-পুত্র-কন্যাকে সারাজীবন গোলাম করে রাখা হতো। পুলিশের সহায়তায় তারা সাঁওতালদের গরু-ছাগল কেড়ে নিতো, জমি কেড়ে নিতো, প্রতিবাদ করলে গ্রেফতার করে কারাগারে আটকে রাখতো। ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রতিকার চাইলে উল্টো অত্যাচারের খড়গ নেমে আসতো।
সেসময় ভারতের ভাগলপুর, মুর্শিদাবাদ ও বীরভূম জেলার প্রায় দেড় হাজার বর্গমাইল এলাকা দামিন-ই-কোহ্ বা পাহাড়ের ওড়নাএলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। ৩০ জুন গণসমাবেশ আয়োজন প্রক্রিয়ার লড়াকু সৈনিক ছিলেন তাঁদের আপন দুই ভাই চাঁন্দ মূরমূ, ভায়রো মূরমূ এবং বিদ্রোহী-লড়াকু-প্রতিবাদী দুই বোন ফুলো মূরমূ এবং ঝানো মূরমূ। সিধু-কানহু, চান্দ-ভায়রো চার ভাই সাঁওতাল সমাজের ঐতিহাসিক পদ্ধতিতে আম গাছের ডাল কাঁধে নিয়ে দামিন-ই-কোহ্ এলাকার চারশতাধিক সাঁওতাল গ্রামে গণসমাবেশের প্রচার করেন। ফলে দুর্গম গহীন বনাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও ৩০ হাজার, মতান্তরে ৫০ হাজারেরও অধিক, সাঁওতাল জমায়েত হয়েছিলেন। সেদিনের ঐতিহাসিক গণসমাবেশে সমবেত জনতার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিধু-কানহু তাঁদের আবাসভূমিকে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে ঘোষণা করেন। সমবেত জনতা রাজ্যের সকল দায়-দায়িত্ব সিধু-কানহুর ওপর অর্পণ করেন। তাঁরা সকল সমস্যা সমাধানের জন্য ব্রিটিশরাজকে ১৫ দিনের সময় বেঁধে দেন, সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হলে তাঁরা রাজ্যের সকল দায়-দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেন।
সেই ঐতিহাসিক গণসমাবেশের মাধ্যমে উত্থাপিত দাবিসমূহ বড় লাটকে জানানোর উদ্দেশ্যে হাজার হাজার সাঁওতাল নারী-পুরুষ সিধু-কানহুর নেতৃত্বে কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে। পথিমধ্যে পারগানা সাম টুডু প্রেরিত সংবাদ আসে যে জঙ্গিপুরের মহেশ দারোগা এলাকার অত্যাচারি সুদখোর মহাজন কেনারাম ভগত এর সহযোগিতায় ৬/৭ জন সাঁওতাল সামাজিক নেতাকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করে ভাগলপুরে নিয়ে যাচ্ছে। পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা ৭ জুলাই পাঁচকাঠিয়া নামক স্থানে মহেশ দারোগা গংদের পথ রোধ করে সাঁওতাল সামাজিক নেতাদের ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেয়। এ সময় মহেশ দারোগা সিধু-কানহুকে আটক করতে উদ্যোত হলে সমবেত জনতা মহেশ দারোগা ও কেনারাম ভগতসহ তাদের দলের ১৯ জনকে সেখানেই হত্যা করে এবং হুল’, ‘হুল,’ ‘হুলে হুলস্লোগান দেয়। হুল শুরু হয়। গোটা সাঁওতাল এলাকায় যুদ্ধ শুরু হয়। বিদ্রোহী কণ্ঠে সাঁওতালরা শ্লোগান দেয়ঃ আবুদ শান্তি বোন খজোয়া; জমিবুন হাতা ওয়াঅর্থা জমি চাই, মুক্তি চাই
হুল শুরু হবার পর তীর ধনুকে সজ্জিত সাঁওতাল নারী-পুরুষ যোদ্ধারা আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বৃটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ মাস যুদ্ধ করে দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার জন্য এই গণযুদ্ধে দামিন--কোহ্ অঞ্চলের সাঁওতাল ছাড়াও কামার-কুমার, তাঁতি, মুসলমান কৃষকসহ সর্বস্তরের শোষিত নির্যাতিত জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন
 
সমবেত সাঁওতাল কৃষকেরা সেদিন শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় শপথ নিয়েছিলেন। সেদিনের শপথ ছিল বিদ্রোহের শপথ। জমায়েতে সিদ্ধান্ত হয়, অত্যাচারী শোষকদের হাত থেকে রক্ষায় সবাইকে এক হয়ে লড়তে হবে, জমির খাজনা দেওয়া হবে না, প্রত্যেকের যত খুশি জমি চাষ করার স্বাধীনতা থাকবে, নিজেদের মতো করে সরকার কায়েম করা হবে ইত্যাদি। জমিদার, মহাজন ও ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ওই বিদ্রোহের পরে এলাকার শোষিত-বঞ্চিত বাঙালি ও বিহারি হিন্দু-মুসলমান গরিব কৃষক এবং কারিগরেরাও যোগ দেন।
সাঁওতাল বিদ্রোহ বাংলার ও ভারতের কৃষক-সংগ্রামের ঐতিহ্যকে শুধু উজ্জ্বল আর গৌরবান্বিতই করেনি; বরং সামন্তবাদের রক্ষক বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে মোড় নেয়া এই মহাবিদ্রোহ, যা দুই বছর পর ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহকেও উসাহ জোগায়।
 
সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবসে আদিবাসীদের আজও গাইতে শোনা যায়, ‘সিদো-কানহু খুড়খুড়ি চাঁদ-ভায়রো ঘোড়া উপরে দেখ সে রে! চাঁদ রে! ভায়রো রে! খোড়া ভায়য়োরে মুলিনে মুলিনে।বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেওয়া সিধু ও কানু পালকিতে এবং চাঁদ ও ভৈরব ঘোড়ায় চড়ে বিদ্রোহীদের পাশে থেকে উসাহ দিতেন। হুলে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা পরাজয় বরণ করেছেন, আত্মসমর্পণ করেন নাই। সেই যুদ্ধ এখনও চলমান।

Wednesday, June 19, 2013

উন্মাদনামা


উন্মাদনামা বইয়ের প্রচ্ছদ

উন্মাদনামা


























অনুপ সাদি




প্রথম প্রকাশঃ ১৯ ডিসেম্বর, ২০০৬
দ্বিতীয় মুদ্রণঃ ১১ জানুয়ারি, ২০০৭
তৃতীয় মুদ্রণঃ ১১ মার্চ, ২০০৭

ই-বই সংস্করণঃ ১৪ আগস্ট, ২০১৩



কম্পোজ ও প্রচ্ছদঃ অনুপ সাদি

প্রচ্ছদের ছবিঃ ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে বাসন্তীর জাল পরা ফটো অবলম্বনে






সর্গ


১৯৪৭
সালে বাংলা
ভাগের ফলে যে সব
মানুষ নিঃস্ব রিক্ত সহায় সম্বলহীন হয়ে
দুই বাংলাতেই অবর্ণনীয়
দুঃখ কষ্টে নিপতিত
হয়েছেন
তাদের
এবং
বাঙলা
ভাগের যন্ত্রণায়
সর্বাপেক্ষা দগ্ধ বাঙলা
চলচ্চিত্রের সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচালক
ঋত্বিক ঘটকের
মহান স্মৃতির
উদ্দেশ

সূচিপত্র

০১. উন্মাদনামা

০২. চা, ইলেকশন এবং ইতিহাস

০৩. নেতা বনাম ভাতার

০৪. আমরা গনশত্রু খুঁজছি

০৫. দল ও পরাধীনতার ধারাবাহিকতা

০৬. জনসম্পদের স্বপদে দাঁড়ানো

০৭. বিপন্ন শ্রমিকদের ইতিহাস

০৮. আমরা কী?

০৯. মাওবাদ ও জনগণের আমরা

১০. দখল, ঘরে বাইরে বা যৌনতাই মুক্তি

১১. পরমাণু ও সাম্প্রদায়িক বোমা

১২. মৃত্যুকুপের মাঝে বাঁচার ধুর্ততা

১৩. গর্ততত্ত্ব ও সংগ্রাম

১৪. সাধারনের দাসত্ব

১৫. কিছু রক্তই সবকিছু 

১৬. শ্রমিকের বেদনা গীত

১৭. আধুনিক নেতাদের পচনক্রিয়া

Tuesday, June 18, 2013

আধুনিক নেতাদের পচনক্রিয়া




১৭.
নেতারা আকৃষ্ট করেছে আলোর মতো,
তার কাছে ছুটে গেছে সবাই,
যেমন যায় ছোট পোকা আগুনের কাছে মৃত্যুর সাথে সখ্যতার জন্য,
আপেক্ষিক জীবনের হিসেবে কতোটুকু ভুল হলে
মৃত নক্ষত্রের আলো দেখা যায়,
যে নেতা এখনো আছে আমাদের অনুভবে
যে বাড়েনি ভোরের আলোর মতো
যে মিশেছে জনতার সাথে
যে চিহ্ন রেখে চলে গেছে নিজের গন্তব্যে
সেই তাকে আমি দেখতে চাই
হাজারো মানুষের ভিড়ে;
তিনি একক মোহনায়
এক মোড়ে এক রাস্তার মালিক,
আর আমি আর আমরা গঙ্গা ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় হাঁটি,
দেখি নীল গাই, শালিক, চিত্রল হরিন,
কয়েকটি বাঘ খেলছে ভোরবেলা তৃনভুমিতে,
মাঘের শীতে এক ঘাটে বাঘে-মহিষে বন্ধুত্বের জল খাওয়া,
দুরে অনেক দুরে মাইকে শ্লোগান শুনছি,
বিপ্লব মহাকালিন হোক
এবং নদী তীরে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম
বাপুজি নেঙটি খুলে বসেছেন গঙগার তীরে,
আর এক বিশালদেহী দৈত্য বলছে ছাড়ুন বাপুজি ছাড়ুন পেট উজাড় করে ছাড়ুন,
কিন্তু বাপুজি পারছেন না, প্রচুর কোষ্ঠকাঠিন্য
অনেক কষ্টে বায়ুর গর্জন ছাড়লেন  
দৈত্যের মেজাজ বিগড়ে গরম
ধমকালেন ছাড় বেটা ছাড়, 
তিনি ধমক খেয়ে আবার বায়ু ছাড়লেন,
এবার আরো রেগে ধমকের সংগে দৈত্য বললো,
ছাড় সোনা ছাড়, সোনার দেশে ছাড়,
সবকিছুর উপরে ছাড়,


দেখলাম ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বাপুজি একটু কালো পিণ্ড ছাড়লেন,
দৈত্য আবার ধমকালো,
তোর বাপকে ডেকে এনে ছাড়,
বাপুজি ডাকামাত্রই হেরু এসে
পুরো গঙ্গায় হড়হড় ভড়ভড় করে পুরো নদী বোঝাই করলেন,
আর বাপুজি, হেরুজীর দেখাদেখি এলেন
আরো অনেক নির্বাচিত অনির্বাচিত ছাড়নবীরেরা
গঙ্গা নদী ও তীর পুর্ন করলেন,
এরপর তারা যমুনা ইরাবতী, সিন্ধু, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা,
সর্বত্র সব নদীর তীরে প্রফুল্লচিত্তে ছাড়তে থাকলেন,
গোটা দেশেতে কর্মযজ্ঞ শুরু হলো
রাজধানীগুলোতে সে বিষয়ে মন্ত্রনালয় খোলা হলো
সে বস্তু রপ্তানি প্রক্রিয়াকরন অঞ্চল
সে বস্তু ভিত্তিক বিদ্যুত উপাদন প্রকল্প
গবেষক ও বিজ্ঞানিতে গোটা দেশ ছেয়ে গেলো
পত্রিকায় সেটির কেলেঙ্কারি নিয়ে খবর বের হতে থাকল
ওই বিষয়ক বক্তৃতা বিবৃতি প্রবন্ধ সেমিনার হাততালি ইত্যাদি হলো,
অনেক মন্ত্রি ওটিকে প্রনাম করা শুরু করলো
ওটির সামনে দাঁড়িয়ে অনেকে অনুতাপ অনুশোচনায়
মুখ কাচুমাচু করে চোখ দুটো নামিয়ে রাখলো,
সেটি ভক্তি বিষয়ক উপাসনালয় খোলার জন্য
কতিপয় বেয়াড়া ছোকরা দুএকদিন শ্লোগান দিলো
সেটি রপ্তানি আমদানি ইত্যাদিতে জনতা কর্মমুখর হলো
আইএমএফ বিশ্বব্যাংক বিভিন্ন প্রকল্পে ঋণ দিলো,
প্রকল্প পরির্দশনের জন্য বিদেশিদের আনাগোনা বাড়লো
ওটি বিষয়ক বিশাল বিশাল বই ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাষায়
লেখা হতে থাকলো
বিদেশি গবেষকরা
গবেষনায় নিত্য নতুন প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত করলো,
কালো লাল নীল সবুজ হলুদ তৈলাক্ত নরম শক্ত জলীয় পাতলা
ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের বর্জ প্রক্রিয়াজাত হতে থাকলো
মুতের দামও বাড়লো
গ্যাসের দাম বাড়লো
ফলে এসবে ভেজাল দেয়া শুরু হলো

একবার নতুন মন্ত্রি গোয়ায় পাইপ লাগিয়ে রপ্তানী করতে চাইলো,
ফলে নতুন শতকে খাঁটি বর্জ ও বায়োগ্যাস পাওয়া খুব কঠিন হলো
আমরা নিরাশ হলাম না

আমরা আশা ছাড়লাম না

আমরা কতিপয় লোক সঠিক নতুন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায়
আবাদের জন্য উদগৃব হলাম
মনে হচ্ছে ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টাতে পারে
আমরা দুএকজন অবস্থার হেরফের ঘটানোর জন্য নড়াচড়া শুরু করলাম,
কিন্তু মাঝে মধ্যেই অতীত এসে ভিড় করে, হতাশা ভিড় করে,
নেতাজির প্রেতাত্মারা ফিসফিস করে
সুবিধাভোগিরা ধ্বংস করতে চায়;
শীতকালে একদিন ফুটবল খেলা দেখতে গেলাম
আমরা সাহস পেলাম একটি গরুর খেলা দেখে,
আহা, কী চমকার গরু, কী তার শক্তি, কী চমকার তার গোবর,
এরকম চমকার গরুরই দরকার খেলোয়াড় হিসেবে,
আমরা মুগ্ধ বিমুগ্ধ
আহা হা কী আনন্দদায়ক ও মর্যাদাকর দৃশ্য
দেশের ভুলুন্ঠিত মান এরকম গরুই পারে ফেরাতে
খেলা শুরু হলো সীমান্তের সর্বত্র
আহা হা কী দারুন আক্রমন বিপক্ষ দলকে;
এই প্রথম দেখলাম গরু ব্যাজ পরছে, সেনানির পোশাক পরছে,
বাহবা মারহাবা এরকম যোদ্ধা গরুইতো চাই,
যুদ্ধংদেহি খোলায়াড় উপযোগি দি অক্স  
কী চমকার লেজ, লেজের মাথায় একগোছা শক্ত চুল,
কী আনন্দদায়ক ফিতা কাটার ভংগি,
আহা কী চমকার বিপক্ষের খেলোয়াড়দের সাথে হ্যান্ডশেক করে
পাশে বলদেরা হাততালি দিচ্ছে,
ষাঁড়েরা খুশিতে গদ গদ, গাভীরা আনন্দনৃত্য করছে,
বাছুরেরা লেজ উঠিয়ে লাফাচ্ছে,
আহা ওইতো জাতীয় গানা বাজলো, কী মোহনীয় সুর
খেলা বন্দ, জিতে গেলো গরুর টিম,
মারহাবা মারহাবা, সকলেই খুশি
পুরষ্কার বিতরণ শেষ, সুখবর সুখবর সুখবর,
ফুটবল খেলায় বিজয়িরা বিজয় উসব পালন করবেন,
অদ্য বিকেলে উপস্থিত থাকুন স্টেডিয়ামে,
আমরা পাড়া প্রতিবেশিরা সেন্ডেল, কোদাল ঝাড়ু হাতে
মাঠে উপস্থিত হলাম,
উপস্থিত হলেন মহামান্য শাহজাদা শাহজাদী পীরজাদা পীরজাদীরা,
তারা বিস্তর বক্তৃতা করলেন হাত পা ছুঁড়ে
মাথাহীন মানুষদের সামনে,
শ্লোগান শুরু হলো মরণবাদ জিন্দাবাদ,
সাঁই সাঁই করে আকাশে হেলিকপ্টার উড়ছিলো,
পাতি নেতাদের বক্তৃতার পর
মুল নেতা বক্তৃতা শুরু করলেন
আজ যে শাহান শাহ এখানে উপস্থিত
তিনি ক্ষমতায় এলে আর কোনো ভদ্রতার হবে না,
আমাদের শাহজাদা ক্ষমতায় এলে আর কোনো যন্ত্রের দরকার হবে না
আমাদের শাহজাদা বহুত রসালো আর তৈলাক্ত,
হের আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতিতে 
সবকিছু অটোমেটিক তইরি হইয়া যায়, 
যা চাইবা, তাই পাইবা
সব মনোবাঞ্ছা পূরণে মাত্র দু'মিনিট, পোঁপোঁপোঁ
আর শোনরে সম্বন্ধীর পুতেরা, তোরা আর একবার ভোট দে,
ভোট দিলেই আমাদের শাহ সুলতানজাদা সব ফকফকা করে দেবে,
আর গত সরকারের সময় কষ্টে যাদের ইয়ে দিয়া
এখনো ধুয়া বের হইতেছে তাদের ঐহানে ভাপা পিঠা
সিদ্ধ কইরা বিদেশে রপ্তানি করা হইবো আমরা ক্ষমতায় আইলে,
সবাই আমাগো জানের জান কলিজার আধখান হইবা,
এই বইলা শেষ করলাম
সবাই আমাগো শাহজাদা শাহজাদীদের কুর্নিশ কর, মরণবাদ জিন্দাবাদ
(চতুর্দিকে অফুরন্ত হাততালি)

শ্রমিকের বেদনা গীত




১৬.
দাস ক্যাপিটাল, মানে পুঁজি, কার্ল মার্কস,
রাষ্ট্রের মালিক, আমরা, দেখলাম
আমরা রাষ্ট্রের কর্তা অথচ আছি গৃহকর্তা
খবরদারি মাতব্বরি সব ঘরের মধ্যেই
ফেমেলি, পোলাপান, ঝগড়া,
গালাগাল যে শিল্প তা আমাদের গ্রামে এলে দেখবেন
এখন নজর টাকার উপর,
দারোয়ান, বাড়ির গাড়ির মধ্যে খেলনা পুতুল,
স্বপ্নের সিঁড়ি, আকাশে আলোকিত গ্রহ, আমাদের নগর,
পরিশ্রম, দৈনন্দিন ঘাম, নাইট ডিউটি, ওভারটাইম,
মনে নয় দেহেই বেশি ক্লান্তি, বাদল দিনে হিন্দি গানে,
পত্রিকা, টিভি, মাটি কাটা জটিল কাজ,
কীভাবে খবর আসে ্রতিদিন আমার অফিসে,
ছোটোবেলার চড় থাপ্পড়,
সন্তানের জন্য কান্না, চম্পা বকুলের গন্ধ,
শিশুর ওষুধ, মায়ের শাড়ি,
ছোটোখাটো চুরি, খুঁজে পাওয়া স্কুলের ঘর
পাখির গানে স্মৃতি দেখা,
বিড়ির সংগে বন্ধুত্ব, সিগ্রেট প্রত্যাশি,
স্বপ্ন এবং কয়লাখনি,
কবে ঘরবাড়ি সব উধাও লো নদী ভাঙনে,
ঘরবাড়ি নিলো সরকার, ক্ষতিপুরনবিহীন
পুরোনো ঘাট কোথায় হারিয়েছে
কে আর জল আনতে যায়,
রাধারা সব বোতলে বোতলে লবনাক্ত জল খায়
এখন মালখালাসকারি জল আনে কার্ভাড ভ্যানে
পাইপে জল আসে শহরে,
মুল্য দিয়ে কিনতে হয় খাবার পানি,
আমার অন্য বন্ধুরা হাঁটে মাঠে ঘাটে সমুদ্রবন্দরে
ওইখানে তারা মাল খালাসকারি
ভাবনা আর চাহিদা অনেক কম তাই এই বেশ ভালো থাকা
মজুরি বাড়লে ভালো হত;
অনেক দিন ভালো ঘুমাইনি,
আমার সমবয়সি বন্ধুরা উপশহরে কাজ করে
টিভি দেখে, সিনেমা দেখে
ভাত খায়, সিটি মেরে গান গায়
মেয়েরা বড় হয়, বিয়ে দেয়,
মা হয়, মায়েরা বুড়ায়,
বুড়া-বুড়ির যত্নআত্তি পথ্য, মেলা কষ্ট,
আপনার লগে বিড়ি আছে, ধরাইতাম,
মেলা গল্প, পরে শুনবেন,
সব অভাবের গল্প একই রকম,
বাঁচার নিয়মে ফুর্তি,
মাঝে মাঝে পালাইতে মন চায়,
পাখির মতো ছোট্ট মেয়েটা চিড়িয়াখানায় যেতে চায়
ওর হাতি খুব পছন্দ, মানুষজন অপছন্দ রে
বুঝলেন নিজে ভাল হলে বিপদ বেশি
অন্যকেও ভাল করা লাগে
নীতি চাই, মাইর দিয়া খুব কম কাজই হয়,
তদুপরি শক্তি প্রদর্শন এক বিশাল ফ্যাক্টর
আমার প্রথম টার্গেট শিশুরা সুন্দর হবে
ওরা ভুলপথে যাবে না,

পৃথিবীর সারা শরীরে ব্যথা,
মলম দেবে কে,
কষ্টের কাজ পৃথিবীকে মাথায় বহন,
তার চেয়ে ভালো হয়
এটিকে কোনো ভাগাড়ে ফেলে দিলে

মাটি কাটার শ্রমিকের জীবন অন্তহী,
সত্যকে মাটির গভীরে পাওয়া যায় না,
পোড়া সত্য পোড়া মাটিতেই থাকে,
অর্ধসত্য মিথ্যাবাদির ঘরে ইট বালু পাথরের সংগে মিশে যায়
রিক্সাঅলা, ফেরিঅলার জীবনের অর্থ এবং
আলকাতরা জ্বালিয়ে হয় নতুন শহর,
পুড়ে যায় দেহের স্বাদ,
আমার পড়শি চাকার গতি বাড়াতে ব্যস্ত মানুষ
অথচ তাদের জীবনের চাকা ঘোরে না,
গতিহী আরো অনেকের সাথে আমরা থেমে যাই,
শুধু বাড়ে উপরতলার লিফটের গতি,
উপরে বিশাল ছাদ, নিচে আমি চিহ্নহী
চিহ্ন রাখি ভালোবাসার,
মৃতশিল্প গড়ে কেউ, ফুল রাখে কেউ ফুলদানিতে,
হাতে হাত রেখে কয়েকজন হলো শক্তিশালি
প্রতিবাদি হতে গিয়ে কেউ হলো সুবিধাভোগি,
কেউ আদম ব্যবসার দালাল,
দাদাগিরি চোরাচালানি নারী পাচারকারি,
আজকাল মেপে মেপে দেহ বিক্রি হয় গজ ফিতায়,
বিক্রি হয় হৃদপিন্ড, পাপড় ভাজা, নতুন মিস্ত্রি,
কে বেশি ভাত খায়_ আধুনিক দাস না গৃহের দাসি
কে বলে আরাম নাই আরো আরাম চাই;  
কে জিগায়, কোথায় চলেছো বাজান
উত্তরে কে বলে আশা নগরে আশা কেনা যায় কেজি দরে
কে ভাবে, কীভাবে হবে শ্রমদাসের অবস্থার উন্নতি

এখন তাই শহরের সবাই শক্ত পাথরে খোদাই করে লেখে
দুই সম্রাজ্ঞীর াম
পাদন প্রক্রিয়ায় আগামির মানুষেরা গনতান্ত্রিক
হবে কী হবে না এই নিয়ে বক্তৃতা,
পত্রিকা বিক্রি লাল ক্ষরে
শেষকালে ঝাড়ুমিছিল,
একটা ছেঁড়া টাকা বা ভাঙা কয়েন,
শেষমেষ দাদা, সাদা কাগজে মাতলামি
রাষ্ট্রপ্রধান, রাষ্ট্রধর্ম, হিন্দু ট্রেন, মুসলমান বাস, পাদ্রী রাষ্ট্র
এইসব নিয়ে কবিতা,
দাদা, কবির কী দোষ,
স্নেহ আর চর্বি, তেল আর পিচ্ছিল বিপ্লবের
পার্থক্য কবি কতটুকু আর বোঝে,
কুলি আর বেলির প্রেম,
শেলির কবিতা আর গীতবিতানের গান,
জলে ডোবা নদী,
পানি খায় পানকৌড়ি সকাল থেকে সন্ধা অবধি
ডুবে কোনো ক্লান্তি নাই
মাথার খুলিতে গজ নাই
আর একবার সামলালেই
সব ঠিক হয়ে যাবে,
ভরসা চাই ভরসা দাও, সুযোগ আর সম্ভাবনা
তাহলেই এসে যাবে নতুন কবিতা
তু বিপ্ল

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের