Wednesday, July 31, 2013

তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা




তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা.......

চিংকাং পাহাড়ের অগ্নিশিখা, দিয়েছে হানা

তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা.......

বুকে আছে হিম্মত পেটে নেই দানা

তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা.......

হাতে হাতে রাইফেল আছে নিশানা

তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা তেলেঙ্গানা.......

____হেমাঙ্গ বিশ্বাস

গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে। লিংক 

Friday, July 26, 2013

হাসনা বেগমের সাক্ষাতকার_ পুরুষ নারীর শত্রু নয়; আমাদের শত্রু হলো সমাজব্যবস্থা, আমাদের শত্রু হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা




হাসনা বেগম
হাসনা বেগম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। তিনি ২৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। আজীবন প্রগতিশীল আন্দোলনের সংগে জড়িত তিনি লিখেছেন দর্শন ও নারী বিষয়ক অনেকগুলো গ্রন্থ। প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে মিলের উপযোগবাদ, ম্যুওরের নীতিবিদ্যার মূলনীতি, নৈতিকতা নারী ও সমাজ(১৯৯০), মেয়ের কথা মায়ের কথা মেয়েদের কথা (২০০৮), নারী ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০০২)’, রূপে অরূপে ম্যাডোনা ইত্যাদি। অনুবাদ করেছেন জন স্টুয়ার্ট মিলের উপযোগবাদ (১৯৮৫), অ্যারিস্টটলের নিপোমেসিয়ান এথিকস (২০০৬) এবং মুরের প্রিন্সিপা এথিকা’ ( ১৯৮৫)। ইংরেজিতে লেখা তাঁর মৌলিক গ্রন্থ হলো ‘Ethics in Social Practice (২০০৬)’, ‘Moor’s theory and practice’, ‘Women of the third world: thoughts and ideals’ প্রভৃতি। রোকেয়ার ওপর তাঁর ইংরেজি গবেষণা গ্রন্থ Rokeya, the Feminist: Views and Vision (২০১১)সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত পত্রিকার সম্পাদনা পরিষদের সদস্য তিনি। তিনি এখনও লিখছেন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। তাঁর এই সাক্ষাকারটি আমি ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০০৩ তারিখে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় গ্রহণ করি।

অনুপ সাদি: আপনার প্রত্যাশিত সমাজে নারীর অবস্থান কেমন হবে বা নারীর অবস্থানের রূপরেখাটি কিরূপ হবে?
হাসনা বেগম: আমার প্রত্যাশিত সমাজে নারী বলে কাউকে আলাদা করে দেখা হবে না; সবাইকে সমান বলে দেখা হবে এবং সবাইকে সমান অধিকার প্রদান করা হবে; কেউ আলাদাভাবে নারী বা পুরুষরূপে গণ্য হবে না। সবাই সমানভাবে কর্তব্য পালন করবে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই যে সমান অধিকারই পাবে তা শুধু নয়, এই সমাজে সকলের জন্য সমান সুযোগও থাকতে হবে। সুযোগ থাকতে হবে অধিকার কি কি আছে তা জানার এবং সেই সব অধিকার আদায়ের বিষয়টিতেও। নারীর অবস্থানের রূপরেখাটি তাহলে সমাজে পুরুষের অবস্থানের অনুরূপই হবে।
অনুপ সাদি: সবাইকে সমান অধিকার দিতে হবে বা সমান কর্তব্য পালন করতে হবে বা নারীকে সমান অধিকার দিতে হবে বললে মনে হয় কথাগুলো ভাসাভাসা থাকে। আমি বলতে চাচ্ছি নারীরা কেমন হবে? ধরা যাক, তারা হবে স্বাধীন সার্বভৌম ও স্বশাসিত, অর্থের অভাব হতে মুক্ত, রাষ্ট্র তাদের উপর নির্যাতন করবে না, পেশার স্বাধীনতা, বিবেকের স্বাধীনতা থাকবে, সব রকম সমস্যাও জাড্যতা থেকে মুক্ত থাকবে, সংসারে সমদায়িত্ব পালন করবে কি না বা সংসারের রূপটি কেমন হবে, সন্তান চাওয়া না চাওয়ার অধিকার থাকবে, কিংবা একজন নারী মা হতে পারেন_ ক্ষেত্রে পিতা অবশ্যম্ভাবীরূপেই প্রয়োজন কি না এরকম কিছু  রূপরেখা শুনতে চাচ্ছি।
হাসনা বেগম: সম্পুর্ণরূপে কোনো মানুষই তো স্বাধীন নয়। সমাজে নারী পুরুষ উভয়কেই কিছু নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়; নারী পুরুষ উভয়কেই রাষ্ট্রের কিছু আইনকানুন মেনে চলতে হয়, কিন্তু নারী হওয়ার কারণে অন্য কোনো নিয়ম বা আইন মেনে চলতে হলে তা অগ্রহণযোগ্য। আমি বলতে চাচ্ছি নারী পুরুষ উভয়ের জন্যই বা মানুষের জন্য একই আইন থাকবে। নারীর জন্য অন্য আইন থাকতে পারবে না। আইন একই রকম হবে যদি কোনো আইন থাকতেই হয়। অন্য প্রশ্নটি কি বললেন?
অনুপ সাদি: অর্থনৈতিক মুক্তি?
হাসনা বেগম: অর্থনৈতিক মুক্তি তো অবশ্যই দরকার। তবে অর্থনৈতিক মুক্তি হলেই যে নারী সব রকম সমস্যা থেকে মুক্ত হবে তা তো নয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বি নারীও তো নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।ক্ষেত্রে সমাজব্যবস্থাটা পাল্টাতে হবে, পুরুষের ও নারীর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে; যে সমাজের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে মানুষ হিসেবে দেখবে এরকম দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাল্য অবস্থা থেকেই মেয়েদের বুঝিয়ে দেয়া হয় যে তারা মেয়ে হয়ে জন্মেই নিম্নমানের মানুষ হয়ে জন্মেছে। আর শিশুপুত্রকে শিশুকন্যা থেকে উচ্চমানের মানুষ বলেই বলা হয়। মেয়ে শিশু জন্মানো যে অনাকাঙ্খিত সে কথাটিও মেয়েরা বাল্যকাল থেকেই বুঝতে পারে। এই যে অনুভব এটা তাদের চরিত্রকে সুষ্ঠুভাবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রেও অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। এই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদল করা আশু প্রয়োজন। সমাজে বিজ্ঞানসম্মত আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমেই কেবল সেটা সম্ভব। এই শিক্ষাব্যবস্থা নারী পুরুষ নির্বিশেষে অবশ্যই সর্বজনীন প্রয়োগ করতে হবে। তাহলে অদূরভবিষ্যতেই সমাজে আমরা এর প্রতিফলন দেখতে পাবো। সমাজ বদলে যাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের সাথেই।
অনুপ সাদি: রাষ্ট্রের আইন আছে, সেই নারী নিপীড়নমূলক আইনগুলোর কি হবে?  
হাসনা বেগম: রাষ্ট্রের নারী নিপীড়নমূলক যেসব আইন আছে সেগুলোকে অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। তাছাড়াও বিবাহ বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে এখনও বৈষম্য আছে। একজন পুরুষ যত সহজে তার স্ত্রীকে আইনগতভাবে অস্বীকার করতে পারে একজন নারী তা পারে না। তারপরও বিয়ের সময়ই বিবাহবিচ্ছেদের অধিকারটিও নারীর থাকতে হবে। বাঙলাদেশে একজন নারী যখন স্বামীকে আইনগতভাবে পরিত্যাগ করতে চায় তখন তাকে যথাযথ কারদেখাতে হয় যেটা পুরুষকে দেখাতে হয় না। আবার মুসলমান বিয়ের কাবিননামায় লেখা থাকতে হয় যে নারীটি তালাক দেবার ক্ষমতা রাখে। তালাক দিতে হলে আদালতে স্বামীর অপরাধ প্রমাকরতে হয়। স্বামীর জন্য তেমন প্রমাণের প্রয়োজন হয় না। তাই আইনের সমতা থাকতে হবে নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে, এবং যে সব ক্ষেত্রে তা নেই সেই সব ক্ষেত্রে সমতার ভিত্তিতে আইন প্রনয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে।  
অনুপ সাদি: আপনি কি মুসলিম বিবাহ আইন-এর কথাই বলছেন?  
হাসনা বেগম: হ্যাঁ, আমাদের দেশের মুসলিম বিবাহ আইনে যে সব অধিকার আছে তার চেয়ে হিন্দু বা ক্রীশ্চান বিবাহ আইনে আরো অধিকার কম। এগুলোতে সমতা আনতে হবে এবং ধর্মীয় ভিত্তিতে যে আইন তা বাদ দিয়ে সব মানুষের জন্য একই রকম বিবাহ সম্পর্কীয় আইন করতে হবে।
অনুপ সাদি: এই বিবাহ ব্যবস্থাটির বা বিবাহ কাঠামোটির কি কোনো পরিবর্তন আনা প্রয়োজন? 
হাসনা বেগম: অন্যান্য দেশে যেমন হয়েছে আমাদের দেশেও সেরকম হতে পারে। আমাদের সমাজব্যবস্থাটা পাল্টালেই সেটা হয়ে যাবে। যেমন অনেক দেশেই সিংগল ফ্যামিলি (একক পরিবার) আছে; হয়তো বাবা আছে মা নেই, বা মা আছে বাবা নেই বা কে বাবা সেটা ছেলে মেয়েরা জানে না বা সমাজের অন্যান্যরাও জানে না। এরকমও হতে পারে। .......... তবে পরিবার থাকাটা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়, স্বামী স্ত্রী বা সহকর্মি যাই বলা হোক এই সম্পর্কটির সৌন্দর্য থাকাটাও সাভাবিক। একান্নবর্তি পরিবারের মানুষের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল তা মানুষকে একত্রিত করত। আর মানুষের সাথে মানুষের একত্রিত থাকার আকাঙ্ক্ষাটিকে তো উড়িয়ে দেয়া যায় না। কোনো না কোনো ধরনের পরিবার থাকা অবশ্যই বাঞ্ছনীয়।
অনুপ সাদি: নারীমুক্তির প্রশ্নে আপনি কোন আদর্শকে সমর্থন করেন? গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র না শুধু নারী মুক্তির আন্দোলন করে যেটুকু অধিকার পাওয়া যায় সেটুকুতেই?  
হাসনা বেগম: আমি নারীমুক্তির প্রশ্নে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। যে সমাজের কথা আমি ভাবি সে রকম সমাজ সম্বন্ধেই আমি আপনার প্রথম প্রশ্নের উত্তরেই বলেছি। সেই সমাজে উপাদনে যেমন নারীর সমান অবদান থাকবে, তেমনি বন্টনের ক্ষেত্রেও নারী পুরুষের সমান অধিকার থাকবে। কেবল উপাদনের ক্ষেত্রে অবদান রাখলেই সমান অধিকার পাওয়া যায় না। বন্টনের ক্ষেত্রে সমান অধিকার নারী মুক্তির জন্য অত্যন্ত জরুরি
অনুপ সাদি: তাহলে বোঝা যাচ্ছে যে সম্পত্তির ব্যাপারটি যদি রাষ্ট্রের হাতে যায় তাহলে দুজনকে অর্থের জন্য হন্যে হয়ে ছুটতে হবে না এবং দুজন পরস্পর স্বাধীন ও স্বশাসিত হবে?  
হাসনা বেগম: এরকম সমাজতন্ত্র হবে কী না আমি জানি না; হয়ত রাষ্ট্র নাগরিককে অর্থের প্রয়োজনীয়তা থেকে এ-মুহূর্তে মুক্ত করতে পারবে না; তবে একদিন এরকম হবে এ-আশা আমি করি।
অনুপ সাদি: সমাজতন্ত্রে একটি কথা আছে যে রাষ্ট্র একসময় থাকবে না .............।
হাসনা বেগম: রাষ্ট্র থাকবে না কিন্তু নাগরিকরাই সেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। নারীর ভূমিকা এক্ষেত্রে পুরুষের সমান হবে। যথার্থ অর্থে, প্রতিটি মানুষই রাষ্ট্রের এক একটি একক হিসেবে সুষ্ঠুভাবে উপাদন ও বন্টনের বিষয়টিতে অবদান রাখবে। রাষ্ট্র ওপর থেকে কোনো কিছু আরোপ করবে না। এভাবে সবাই সমান হয়ে যাবে, এবং সবাই যার যার মতো উপযুক্ত পেশা গ্রহণ করবে। এক পর্যায়ে নাগরিকই সব দায়িত্ব গ্রহণ করবে, তবে সাম্যের যে কথা সেখানে তো সবাই সমান হবেও না, শারীরিক কিছু পার্থক্য থাকবে আবার মানসিক কিছু পার্থক্যও নারী পুরুষের মধ্যে থাকবেই। পুরুষ পুরুষেও কিছু পার্থক্য আছে। এই বিবেচনা মনে রেখে নারী পুরুষের অধিকার ও সুযোগের মধ্যে আইনগতভাবে অথবা সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতেও নারী পুরুষের সমতাকে মেনে নিতে হবে। নারী বলেই সে উপযুক্ততার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নিম্নমানের হবেই সেই ভাবনাটা মুছে ফেলতে হবে।
অনুপ সাদি: লেনিন একটি কথা বলেছিলেন যে ঘরের কাজ বা গৃহস্থালীর কর্ম একজন নারীর সব রকম সৃজনশীলতাকে নষ্ট করে ফেলে। এই যে রান্নাঘরের কাজ এবং শিশুপালন; একঘেয়ে, খিটখিটে, তুচ্ছ কাজ, যেগুলোকে অনেকে বলেন গার্হস্থ্য বাঁদীগিরি। এই বাঁদীগিরি থেকে মুক্তি ছাড়া কী নারীমুক্তি সম্ভব?  
হাসনা বেগম: এই কাজ থেকে বাইরে আসলেই যে মুক্তি ঘটবে তা আমি মনে করি না। এসব কাজ স্বামী স্ত্রী দুজন মিলে করলে সমস্যাটার অনেক সমাধান হয়। নারীও তখন পুরুষের মতই নিজের সৃজনশীল কর্মের প্রতি মনোনিবেশ করার সময় ও সুযোগ পাবে। নারীর উপরই সমগ্র গৃহকর্মের ও শিশুপালনের ভারটা এই অবস্থায় আর থাকবে না।
অনুপ সাদি: দুজন মিলে করলেও এই তুচ্ছ কাজ কয়টির জন্য শ্রম ও সময়ের অপচয় হয়। এই কাজটি যৌথভাবে করলে যেমন হাজারখানেক লোকের রান্না একত্রে করা হলো; শিশু পালনের ক্ষেত্রেও এরকম করা যায়, ........ যেমন আমাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও এভাবেই থাকতে হয়।
হাসনা বেগম: তাহলে জীবনটা খুবই যান্ত্রিক হয়ে যাবে। সব বাড়িতে তো একই রকম রান্না হয় না, রান্নাটাও তো সৃষ্টিশীলতারই ব্যাপার, এখানেও বৈচিত্র আছে, প্রত্যেকের আলাদা রুচির ব্যাপার আছে, চারু ও কারুকলার ব্যাপার আছে; এটা নষ্ট হোক আমি চাই না। মানুষ বৈচিত্রবিলাসি। মানুষের এই কোমল গুণটা একেবারে নষ্ট করে দেযা ঠিক হবে না। মানুষের রুচি ও সৌর্ন্দযবোধ গৃহকর্মের মধ্যেও প্রকাশ পায় এবং রুচির ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশও এর মধ্য দিয়েই ঘটে থাকে। যৌথব্যবস্থায় এর বিকশিত হবার সুযোগ হারিয়ে যাবে। মানুষ চূড়ান্ত যৌথব্যবস্থার মধ্যে থাকতে থাকতে উপাদনের যন্ত্রে পরিণত হবে। এমন অবস্থায় মানবিকতার অবক্ষয় ঘটবে। তাই মনে করি, এমনটা বাঞ্ছনীয় নয়।
অনুপ সাদি: চলাফেরার ব্যাপারে আসি। নারীর চালাফেরার স্বাধীনতা বর্তমান সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো ছাড়াও সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে বেশি ছিলো বর্তমান উন্নত রাষ্ট্রগুলোর চেয়েও; সেটা কেমন ও কতটুকু ছিলো আপনি তো সেসব শুনেছেন বা দেখেছেন?
হাসনা বেগম: চলাফেরার স্বাধীনতার জন্যে প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন, মানসিকতা পরিবর্তন না হলে চলাফেরার স্বাধীনতা আসবে না। অন্যান্য স্বাধীনতার সাথে চলাফেরার স্বাধীনতা তো নারীর থাকতেই হবে। এখানেও মূল্যবোধের পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে শিখলেই নারীর জন্য চলাফেরার স্বাধীনতাও আসবে। এই নতুন মূল্যবোধে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের প্রতিফলন তো থাকতেই হবে।
অনুপ সাদি: বাঙলাদেশে তো এখন চলাফেরা বড় সমস্যা। রাত বারোটা একটায় তো নারীরা বাইরে কাজ করতে পারছে না, পুরুষরাও নির্বিঘ্নে চলাফেরা করতে পারছে না।
হাসনা বেগম: পুরুষরা যেটুকু বা পারছে নারীরা তাও পারছে না। নারীর চলাফেরায় দিন রাত প্রতি মূহূর্তেই তো প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে এগুতে হয়। আমি এত বয়সেও তো রাত নটার পরে বাইরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করি না। রাষ্ট্রের আদর্শ না বদলালে এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায় না।
অনুপ সাদি: এই যে রাষ্ট্র নিরাপত্তা দিতে পারছে না, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কি করা দরকার?   
হাসনা বেগম: আন্দোলন করতে হবে ........ তবে আন্দোলন করেই হবে না, সবকিছুকে নতুন করে গড়তে হবে, বিপ্লব করতে হবে। মানুষের সকল প্রকারের নিরাপত্তাহীনতার রূপটি এমনই হয়ে পড়ছে যে সাধারণ মানুষের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই অবস্থাতেই বিপ্লব হয়।
অনুপ সাদি: বিপ্লব করতে হবে বলছেন, কিন্তু ডানপন্থি বিপ্লবে তো নারীদের সমস্যা আরো বেড়েছে। যেমন, ইরানে যেটি হয়েছে, যেসব নারী সেই বিপ্লবে সাহায্য করেছে তাদের অনেকের উপরেই অত্যাচার নেমে এসেছে, খোমেনি সব নারীকেই ঘরে ঢুকিয়েছে; যারা এসব মানতে চায়নি তারা অত্যাচারিত হয়েছে।
হাসনা বেগম: ইসলামি বিপ্লব হলে তো তেমনটাই হওয়ার কথা। আমি ইসলমী বিপ্লবের কথা বলছি না। বলছি, সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যে বিপ্লব আসে সেই বিপ্লবের কথা। ইরানে নারীসমাজ তাদের পরিতি কি হবে বিপ্লবের পরে সে কথা না অবুধাবন করেই বিপ্লবী পুরুষদের সাথে হাত মিলিয়েছিলো। আমাদের দেশে যে বিপ্লব হবে বলে আমি আশা করছি সেই বিপ্লব সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে, নারী পুরুষের মধ্যে সমতা আনয়ন করবে। প্রতিটি মানুষ সেই নতুন রাষ্ট্রে মানুষের সম্মান পাবে, রাষ্ট্রে সাধ্য অনুযায়ী অবদান রাখবে, প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্র তাকে দেবে। মানুষের মত এবং মানুষের মর্যাদায় প্রতিটি নাগরিক বেচে থাকার সুযোগ পাবে।
অনুপ সাদি: এছাড়াও দুর্ভিক্ষ, বন্যা, যুদ্ধে নারীকে সহ্য করতে হয় অসীম যন্ত্রণা। আগ্রাসনের সময় সেনাবাহিনী নারী নির্যাতন করে, ধর্ষণ করে, ইরাকের উপর যে সাম্প্রতিক আক্রমণ হলো তাতেও তা দেখা গেছে; এই যে সারা বিশ্বের অবস্থা; তাতে এখন নারীকে আন্দোলনে নামতেই হবে। কিন্তু সে আন্দোলনে নারী নামছে না কেন ?
হাসনা বেগম: নারী যে আন্দোলন করছে না তা তো নয়। যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভে নারীরাও তো অংশ নিয়েছে। তবে নারীর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য যে আমূল আন্দোলন সে রকম হচ্ছে না। এই বোধ যদি জাগ্রত হয়, সমাজে যদি সে আকাঙ্খা জাগে তবে নারীরা বাইরে বের হয়ে আন্দোলনে আসবে। পুরুষের সাথে আসবে এবং নারীদের সমস্যা বলে নয় এই সমস্যাগুলো যে মানুষের সমস্যা এবং সমাধান প্রয়োজন সম্মিলিতভাবেই তা ব্যক্ত করে মানুষের মানবিক আচরণ বন্ধের জন্য আন্দোলন করবে। এই আন্দোলন যে ডানপন্থি হলে নারীমুক্তি আনতে পারবে না, সে তো আমরা অতীতেই দেখেছি। আন্দোলন হতে হবে বামপন্থি। আর সামনে থাকতে হবে একটি সঠিক আদর্শ। আন্দোলন আস্তে আস্তে বিপ্লবে রূপ নেবে। আন্দোলন ও বিপ্লব হবে আদর্শ সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার উপায় মাত্র। তবে সেই সঠিক সমাজব্যবস্থাটির রূপ সম্বন্ধে আমাদের বাস্তব ধারণা থাকা অবশ্যই দরকার।
অনুপ সাদি: আজকে (২৯.০৯.২০০৩) একটি ঘটনা ঘটেছে। আমি ভোরে এক বাসায় পড়াই। সেই বাসার গৃহর্কত্রী কাজের মেয়েকে পেটাচ্ছে, টাকা হারিয়ে গেছে সেজন্য। কিন্তু আমি জানি, সেই নারীও একজন কাজের মেয়েই। সে এম. এ. পাস করেছে। কোন চাকুরি করে না। সন্তানপালন করে এবং বড়জোর রান্নাটা দেখে। এই যে তার পড়াশুনার পেছনে সরকার এত টাকা খরচ করলো, সে সমাজকে কিছু দিতে পারছে না বরং তার অধন্তন আরেক নারীকে অত্যাচার করছে। এটাকে আমরা কিভাবে দেখবো?
হাসনা বেগম: শুধু মেয়েরাই যে কাজের মেয়েকে পেটায় তা নয়। আমি অনেক পুরুষকে জানি যারা কাজের মেয়েকে পেটায়, যারা শিক্ষিত তারাও পেটায়। এমনটা নারী পুরুষ নির্বিশেষেই ঘটে। মেয়েরা হয়ত কাজের মেয়েকে বেশি পেটায় গৃহর্কত্রীক্ষমতা তো একমাত্র কাজের মেয়ের উপরই দেখানো সম্ভব। সবলের দূর্বলের প্রতি অত্যাচারের প্রবণতা হয়তো সর্বজনীন। সবল রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রকে আক্রমণ করছে, দখল করছে। আমি সেই রকম সমাজব্যবস্থার কথাই এতক্ষণ বলছি যে ব্যবস্থায় সবল’ ‘দুর্বলএই কথাগুলো অর্থহীন হবে। অদূর ভবিষ্যতে এমন সমাজ গড়ে উঠবে সেটাই আমার স্বপ্ন ও আশা।
অনুপ সাদি: আরেকটি ব্যাপার বলছি যে কতিপয় এম. এ. পাস করা নারীরা শুধু একটি ভাল অর্থঅলা বা ভাল চাকুরি করে এরকম ছেলে পেলেই বিয়ে করছে এবং কোনো পরিশ্রম করছেনা, কেবল গৃহীনী ও মা হচ্ছে এবং ভাবখানা এমন যেন এসব এম. এ. পাশ নারী রবীন্দ্রনাথ বা শেকসপিয়র বা নেপোলিয়নের জন্ম দিবেন। কিন্তু গত ৫০ বছরে তো আমরা খুব উঁচুমানের দশজন মানুষও পেলাম না, এসব চাকরি বা কর্মহীন এম. এ. পাস করা গৃহিণী নারীরা তো কিছুই দেয়নি।
হাসনা বেগম: আমরা যে কথা বলি, আমার বিয়ে হয় প্রায় চৌদ্দ বছর বয়সে। এরপরে আমি প্রায় ১৩ বছর পড়াশুনা করিনি। পরে লেখাপড়া করেছি বলেই আপনি আজ আমার সাক্ষাতকার নিতে এসেছেন। আমাকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তাই বলি, সামাজিক বাধা বিঘ্নের কারণে আমাদের এখানকার সমাজে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য আমাদের মেয়েদের একটা চ্যালেঞ্জ থাকতে হবে। মেয়েরা যেদিন বুঝতে পারবে যে তাদের অনেক কিছু করার আছে সেদিনই তারা কাজের জন্য বাইরে বের হবে। আমাদেরও তাদেরকে বোঝাতে হবে। তাছাড়া আমরা তো দেখেছি বাঁচার তাগিদে আমাদের দেশের নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র ঘরের মেয়েরা বেরিয়ে আসছে। দারিদ্রের চাপে আরো মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছে। পুরুষেরা সেখানেও নিপীড়ন করছে। মেয়েদের আয়ের টাকা ছিনিয়ে নিচ্ছে। মেয়েদের মধ্যে কাউকে কাউকে দেহব্যবসায়ও নামতে হচ্ছে। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় এমনটাই হওয়ার কথা।
অনুপ সাদি: যে কথাটি বলছি যে ভাল অর্থঅলা স্বামী পেলে তো অনেক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, অর্থের অভাব নেই, ...................
হাসনা বেগম: এটা উচ্চ মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক মেয়েদের ক্ষেত্রে ঘটছে। যারা পরিশ্রম করতে চায় না, অথচ অর্থ চায়, যারা অলস, নারী বা নিজের বা মানুষের মুক্তি চায় না, অথবা সে ব্যাপারটিই বুঝতে চায় না। সবার বোধ তো একই রকম নয়। গ্রামের মেয়েদেরকে সব সময়ই পরিশ্রম করেই ভাত সংগ্রহ করতে হয়েছে যদিও সেই সাথে নানা ধরনের গঞ্জনারও শিকার হতে হয়।
অনুপ সাদি: ভাত তো ভাতারের দেবার কথা, কারণ ভাত দেয় যে সেই তো ভাতার। স্বামী শব্দটি তো আরো অশ্লীল।
হাসনা বেগম: হ্যাঁ, একথা ঠিক, তবে স্বামী বলতে প্রভু বোঝায় এবং সেই গ্রামের পুরুষটি প্রভুর মতোই কর্তৃত্ব করে। আবার এখন গ্রামের নারীরা শহরে গার্মেন্টসে কাজ করছে, যদিও মজুরি খুব কম পাচ্ছে। কাজেই পরিশ্রম করছে না কিছু মধ্যবিত্ত সুবিধাভোগি নারী, এখন অনেক নারীই বাইরে কাজ করছে।
অনুপ সাদি: তাহলে নারীমুক্তির ক্ষেত্রে কোন ধরনের নারীরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে?
হাসনা বেগম: সাধারণত আমরা দেখি সেই নারীরাই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে যারা ধর্মান্ধ, যারা নিজেরা নির্যাতিত হচ্ছে বা হয়েছে আর যারা যথার্থই শিক্ষার আলো মোটেও পায়নি। তবে এমন নারীও আছে যারা নিজেরা নির্যাতিত হয়েছে কিন্ত তার কন্যারা নির্যাতিত হোক সেটা তারা চায় না। তারা কন্যাদের স্বাধীনতা দেয়ার পক্ষপাতি, কিন্ত তাদের সেই অধিকার নেই। নারীমুক্তির জন্যে নারীর প্রথম কাজ হবে সে একজন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার সংগ্রাম করবে। সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার মানে একজন নারীকে বুঝতে হবে এবং সে অন্যদেরকে তা তখন বোঝাতে পারবে এবং প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তা বোঝাবেও। এইভাবেই সমাজ পরিবর্তিত হবে। যেমনটা আমরা দেখেছি আমাদের আগের প্রজন্মের থেকে আমরা কত এগিয়ে গিয়েছি। এভাবে এগুতে থাকবেই। তবে এভাবে এগুলে অনেক সময় লাগবে। সেইজন্যই বিপ্লবের কথা বলছি।
অনুপ সাদি: মানবিক বোধ কোনগুলো?
হাসনা বেগম: মানবিক বোধ হলো স্নেহ, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, জাগ্রত বিবেক, আত্মমর্যাদা সম্বন্ধে আত্মজ্ঞান এইসব আর কি।
অনুপ সাদি: আর মানবিক কর্মকান্ড? আমি রাজনৈতিক এবং সৃষ্টিশীল কর্মকান্ডের কথা বলছি।
হাসনা বেগম: মানবিক কর্মকান্ড হলো পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি কর্তব্যবোধ। এগুলো করতেই হয়। এরপরে আসে সৃজনশীল কর্মকান্ড, প্রগতির পথে সংগ্রাম, অধিকার আদায়ের লড়াই। সৃষ্টিশীল কর্মকান্ড হতে পারে একজন শিল্পীর কর্মকান্ড, একজন ভাস্করের কর্মকান্ড। আমার মেয়ে একজন ভাস্কর, তাকে পরিবার দেখতে হয়, তারপরে সে ভাস্করের কাজ করতে পারে। এখন পরিবারের কাজে যদি অন্যদের সহযোগিতা পায় তাহলে সে আরো সময় পেত, পুর্ণ মনোযোগ দিতে পারতো। তবেই সৃজনকর্ম সুন্দর হতো। এক্ষেত্রে একজন করেই তো হবে না। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেরই পরস্পরকে সহযোগিতা করা দরকার। আর স্ত্রী বাইরে কাজ করে শুধু টাকা আনলেই তো চলে না, গৃহের কাজ এখনো তাকেই দেখাশোনা করতে হয়। সে মানবিক কর্মকান্ডে অংশ নেবে কিভাবে? এজন্যে প্রথমে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে; সেটা কীভাবে বদলানো যায়_ সেটা শিক্ষার মাধ্যমে হতে পারে, সেকথা তো আগেই বলেছি।
অনুপ সাদি: প্রেমের যে রূপ তাতে তো বর্তমানে দেখা যায় একজন পুরুষ নারীকে অধিকার করতে চায়; আর নারী চায় পুরুষের মাঝে বিলীন হতে।
হাসনা বেগম: এটা পুরুষের বলা; পুরুষরা বলে নারী বিলীন হতে চায় কিন্ত একজন নারী চায় কেউ তাকে ভালোবাসুক, আর সে নিজস্ব সত্তা নিয়েই ভালবাসতে চায়। কিন্ত সে তা পুরুষের মতো খোলাখুলি বলতে পারে না।
অনুপ সাদি: প্রেম কি খুব  মানবিক সম্পর্ক? একজন সবকিছু_ তার পরিবার ছেড়ে অপরিচিত অচেনা গন্ডিতে চলে যাচ্ছে, আবার ভালো না বাসলে এসিড নিক্ষেপ বা অন্য ধরনের নির্যাতন করা হচ্ছে। এটা তো এক ধরনের আগ্রাসি সম্পর্কই। দুজন সমান হলে বন্ধুত্ব হয় কিন্ত প্রেমের ক্ষেত্রে একজনকে অধস্তন হতেই হয়?
হাসনা বেগম: সত্যিকারের প্রেম অবশ্যই আছে। কিন্ত প্রেমের নামে কেউ আগ্রাসি হতে পারে; মিথ্যা প্রেমের অভিনয়ও আছে, ভাঁওতাবাজিও নিশ্চয় আছে; এর মাঝে সত্যিকারের প্রেমও আছে। আর বন্ধুত্বের ব্যাপারে আগ্রাসী হওয়ার প্রশ্ন উঠে না। আগ্রাসন করার ইচ্ছা একটি বৈরী ইচ্ছা। যথার্থ প্রেম বা ভালোবাসার সাথে বৈরিতার কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না।
অনুপ সাদি: তাহলে প্রেম সম্পর্কটি যদি দুজনের সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় তাহলে তা সুন্দর।
হাসনা বেগম: হ্যাঁ খুবই সুন্দর সম্পর্ক, খুবই শুদ্ধ সম্পর্ক।
অনুপ সাদি: আচ্ছা একজন নারী যদি মা হতে চান, যেটি আনা কারেনিনার ক্ষেত্রে অনেকটা ঘটে,......
হাসনা বেগম: সেক্ষেত্রে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যেও সমস্যা তৈরি হবে, সমাজ মেনে নেবে না, একজন নারী মা হবে, স্বামীও থাকবে এবং একই সাথে প্রেমিকের সাথেও সম্পর্ক রাখতে চাইলে তাকে হয়তো আনার মতো পথেই যেতে হবে, সেরকম পরিণতিই হতে পারে। তবে আমি মনে করি, বিবাহিত নারী বা পুরুষ দুজনই অন্য কারো প্রতি আকর্ষণ বোধ করে এবং সেই আকর্ষণকে যদি স্বামীর প্রতি বা স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণের চেয়েও অধিক মূল্যবান মনে করে তবে সেক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদই কাম্য।
অনুপ সাদি: এই সমস্যাটা হতেই পারে। এসমস্যাটা কি কাটিয়ে উঠা প্রয়োজন নয়।
হাসনা বেগম: কাটিয়ে উঠা প্রয়োজন। আনার মতো কেউ যেন আত্মহত্যা না করে। আর ওই ধরনের জটিলতা এড়িয়ে যাওয়াই কাম্য। আর এড়ানো সম্ভব না হলে বিচ্ছেদই হয়তো সর্বাপেক্ষা উত্তম উপায়।
অনুপ সাদি: বিশ শতকের প্রথমার্ধে বিপ্লব আকাঙ্খি প্রীতিলতার মতো নারী পাচ্ছি, কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে কোনো নারী পাচ্ছি না কেনো?
হাসনা বেগম: বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে আমার কি প্রীতিলতার মতো পুরুষও পাচ্ছি; তাও তো পাচ্ছি না, সে রকম সূর্যসেনও আর নেই, সে রকম প্রীতিলতাও নেই। এখনো মানুষ নিশ্চয় আশা করে সে রকমানুষ আসবে। এখনো মানুষের স্বাধীনতার ঘোর কাটেনি। চর্তুদিকে যেভাবে হতাশা ও নৈরাজ্য বাড়ছে তাতে মানুষ এপথে আসবেই, আসতে বাধ্য। যখন পুরুষ পারবে তখন নারীও পারবে। বিপ্লব আকাঙ্খা থাকলেই তেমন নারী ও পুরুষকে আমরা পাবো।
অনুপ সাদি: একটি প্রশ্ন করে রাখি, ষাটের দশকেই সারা বিশ্বে বিপ্লবি আন্দোলন তুঙ্গে। সে সময়েই নারীবাদি আন্দোলন খুব শক্তিশালী। এটা কি মনে হয় না যে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্খাকে দমন করার জন্য সাম্রাজ্যবাদি শাসকগোষ্ঠি তাদের ডিভাইড এন্ড রুল পলিসিদিয়ে আন্দোলকারিদের বিভ্রান্ত করেছে, যে যেভাবো পারো আন্দোলন করো- এরকম একটি ব্যাপার।
হাসনা বেগম: হ্যাঁ সেটা হতে পারে। বিপ্লবি আকাঙ্খাকে ধামাচাপা দেবার জন্যে এটা হতে পারে। আর আন্দোলন পুরুষ ও নারী আলাদা আলাদাভাবে করলে তেমন কিছু করা যাবে না। পুরুষ নারী একত্রেই বিপ্লব করি বা আন্দোলন করি বা সংগ্রাম করি, একত্রেই করতে হবে। পুরুষ নারীর শত্রু নয়। আমাদের শত্রু হলো সমাজব্যবস্থা, আমাদের শত্রু হলো রাষ্ট্রব্যবস্থা; এই সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তনের লড়াই নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলকেই করতে হবে।
অনুপ সাদি: কিন্তু এখন রাষ্ট্র তো চরম শক্তিশালী, গরিব রাষ্ট্র হোক বা ধনী রাষ্ট্র হোক, উন্নত অনুন্নত যে রকমেরই হোক।
হাসনা বেগম: সব রকমের রাষ্ট্রই মহাশক্তিশালী রাষ্ট্র। এখন সব রাষ্ট্রই প্রায় ফ্যাসিস্ট হয়ে গেছে। এ রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব আন্দোলন ও বিপ্লবের মাধ্যমেই।
অনুপ সাদি: নারীবাদিদের একটি আন্দোলন হলো নারীকে নারী বলা যাবে না, মানুষ বলতে হবে। তারা he কিংবা she এর পার্থক্য মানেন না, সবাই মানুষ, কিন্তু এখন পরিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা তো খুবই কম; শেকসপিয়ার, রবীন্দ্রনাথ, আইনস্টাইন  বা মাদাম কুরির মতো মানুষ তো নেই; মানুষের মানটাকে বাড়ানো কিভাবে সম্ভব?
হাসনা বেগম: মানুষেমান বাড়াতে হলে মানুষের অধিকার বাড়াতে হবেসমাজ পরিবর্তন করতে হবে, রাষ্ট্র পরিবর্তন করতে হবেআর আপনি আমাকে নারী বললেন না পুরুষ বললেন তাতে কিছু এসে যায় নাHe আর she তো শুধু শব্দের পাথক্য মাত্রকিন্ত she বলে যখন হেয় করা হয তখনই সমস্যাটা ঘটেআর নারী আর পুরুষের মধ্যে অন্তত বাহ্যিক পার্থক্যকে তো আমাদের মেনে নিতেই হবেযদিও এই বাহ্যিক পার্থক্যকে আমি মোটেও গুরুত্ব দেই না
অনুপ সাদি: সমাজতন্ত্রের আকাঙ্খায় শ্রমিকরা উচ্ছেদ করতে চায় বুর্জোয়াদের। নারীবাদে দেখি আমূল নারীবাদিরা পুরুষাধিপত্যের বিরুদ্ধে, পুরুষের বিরুদ্ধে যেন গেরিলাযুদ্ধ শুরু করেছেন, এভাবে কি কিছু করা সম্ভব?
হাসনা বেগম: আমি নারী পুরুষ দুজনেরই মুক্তির জন্যে সংগ্রামের ক্ষপাতিনারী পুরুষ মিলেই সংগ্রাম করতে হবে সব শোষণ অসম্যের বিরুদ্ধে
অনুপ সাদি: বাঙলদেশে নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য বেশকিছু এনজিও কাজ করছে। এগুলোর কর্মকান্ডকে কিভাবে দেখেন?
হাসনা বেগম: আমি মনে করি তাদের কর্মকান্ড তত বেশি প্রভাব বিস্তার করে না, তাদের কাজের ব্যাপকতা কম। এনজিওর মাধ্যমে নারীর অবস্থার তেমন পরিবর্তন হয়নি। রাজনীতির মাধ্যমে অনেক বেশি কাজ করা যায় এবং তা আগে শুরু করলে করা যেতও। এনজিওরা তো রাজনীতি করে না। আর যে সব নারী রাজনীতি করছে না তারা কি আদর্শ নিয়ে কাজ করছেন? আমার তো মনে হয় তাদের কোনো আদর্শই নেই। দুর্নীতি লুটপাটে বোঝায় ক্ষমতার আশপাশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল। অবস্থার পরিববর্তন করার জন্য আদর্শ দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর কি আদর্শ আছে? আমার তো মনে হয় আদর্শ যদি থেকে থাকে সেটা কট্টর পুঁজিবাদী আদর্শ-নিজে ও নিজের দলের অন্যান্যদের ধন সম্পদ বৃদ্ধি করাই যেন তাদের আদর্শ। এইখানটাতেই আমাদের দুর্বলতা। এই দুর্বলতাকে কাটাতে হলে আমাদের নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন। আর এই নতুন নেতৃত্ব আসতে হবে বামপন্থিদের থেকে, সমাজতন্ত্র যাদের আদর্শ।
অনুপ সাদি: বাঙলাদেশে লাঞ্ছনা, নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, এসিড নিক্ষেপ ইত্যাদি বাড়লো কেন?
হাসনা বেগম: রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা নেই, বেকার সমস্যা বেড়েছে, শিক্ষার মান কমেছে। শিক্ষা পাওয়ার পর অর্থা ডিগ্রী পাওয়ার পর চাকরির নিরাপত্তা নেই। এই সব কারণে নৈরাশ্য ও নৈরাজ্য এসে ভর করেছে আমাদের উপর। সর্বোপরি সুশাসনের অভাব তো সর্বত্রই। এই সমস্যগুলো কাটিয়ে উঠতে না পারলে দেশের অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়।
অনুপ সাদি: বিশ শতকে পৃথিবীতে মহ রাজনীতিবিদ পাওয়া যাচ্ছে, যেমন লেনিন, স্তালিন, ক্যাস্ত্রো, মাও সেতুং, চৌ এন-লাই, হো চি মিন- যারা সব রকম দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিমুক্ত মহামানব। আমরা এরকম মানুষের জন্ম দিতে পারলাম না কেন?একবার চৌ-এন-লাই পাকিস্থান সফরে আসলে উনাকে জিজ্ঞ্যাসা করা হয় আপনার গাড়ি নেই কেন। উত্তরে তিনি বলেন যে যেদিন সব চীনার গাড়ি হবে সেদিন আমারও গাড়ি হবে। এরকম স্বার্থত্যাগী নেতার জন্ম এদেশে হলো না কেন?  
হাসনা বেগম: পুঁজিবাদের মধ্যে থেকে নিঃস্বার্থ রাজনীতিক পাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি না। পুঁজিবাদে অবিশ্বাসি ব্যক্তিরা সমাজতন্ত্রের আদর্শে বিশ্বাসি হয়ে আন্দোলন করতে করতে কেউ কেউ তেমন নিঃস্বার্থ রাজনীতবিদ হয়ে উঠতে পারেন। আমাদের আশাও যে সে রকম রাজনীতিবিদ আমরা অদূর ভবিষ্যতে পাবো।
অনুপ সাদি: একজন নারীর কি আলাদা কোনা মহত্ব থাকতে পারে? না মানুষের মহত্বই মাপকাঠি হবে? মা হওয়া কতটুকু মহ কর্ম
হাসনা বেগম: নারী বা পুরুষের জন্য আলাদা মাপকাঠিই তো প্রচলিত আছে শতাব্দির পর শতাব্দি থেকে। নারীবাদীরা এই দ্বৈততার বিরুদ্ধেই বলে আসছেন। আমরা চাই মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতে। শুধু নারী হিসেবে বিবেচিত হলে সেটা আংশিক বিবেচনা হবে। মা হওয়ার মধ্যে কোনো মহত্ব আছে বলে মনে করি না। নারীই শুধু মা হতে পারে। এটা প্রাকৃতিক নিয়মেই ঘটে থাকে। তবে মায়ের একটি বিশেষ মমতা আছে তার সন্তানের জন্য। এই মমতার জোরেই মা নারী হয়েছে বলেই বাধা পড়ে। মা হওয়ার মধ্যে মহত্ব না থাকলেও কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব আছে বলে আমি মনে করি।
অনুপ সাদি: সময় দেবার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
হাসনা বেগম: ধন্যবাদ তোমাকেও।[১]

টীকাঃ
১. এই সাক্ষাতকারটি এখন আর স্মরণে নেই কোন পত্রিকার জন্য গ্রহণ করেছিলাম। পরে এটি শফিকুল কাদির সম্পাদিত গফরগাঁও, ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত ছোটকাগজ অর্ঘ-তে মে, ২০০৯ সালে প্রকাশিত হয়।