Friday, April 24, 2015

এমা গোল্ডম্যান এক মহান নৈরাজ্যবাদী-সাম্যবাদী লেখিকা




যদি ভোটে কোনোকিছু বদলাতো, ওরা ভোটকেও অবৈধ করতো, ---এমা গোল্ডম্যান

এমা গোল্ডম্যান (ইংরেজি: Emma Goldman) (জুন ২৭, ১৮৬৯ - মে ১৪, ১৯৪০) একজন নৈরাজ্যবাদী রাশিয়ান লেখক যিনি লেখা, বক্তৃতা এবং রাজনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে পরিচিত ছিলেন। বিংশ শতকের প্রথম ভাগে উত্তর আমেরিকা এবং ইউরোপে নৈরাজ্যবাদী রাজনৈতিক দর্শনের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি ১৮৮৫ সালে অভিবাসী হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটের মে দিবসের ঘটনার পর ‘হে মার্কেটের চক্রান্ত মামলা’ ও সেই মামলায় চারজন শ্রমিকের ফাঁসি তাঁর চিন্তাধারার মধ্যে বড় রকমের পরিবর্তন সৃষ্টি করে। এর অল্পদিন পরই তিনি তাঁর স্বল্পস্থায়ী ও অসুখী বিবাহ বিচ্ছেদ করেন। তিনি ছিলেন ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। একজন নারীবাদী হিসেবে তিনি মনে করতেন যে চার্চ অথবা রাষ্ট্রের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়াই নারী পুরুষ প্রত্যেকের নিজের সঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা থাকা দরকার। যৌন সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর মত তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে প্রচার করেন ও তাঁর জন্য নন্দিত ও নিন্দিত হন। তিনি বলেছেন,  
প্রেমের তো কোন নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই; সে নিজেই নিজের নিরাপত্তা। যতদিন পর্যন্ত প্রেম জীবনের জন্ম দেয় কোন কিছুই পরিত্যক্ত হয় না, অভুক্ত থাকে না, ভালবাসায় ক্ষুধার্ত থাকে না। আমি এটাকে সত্য বলে জানি। আমি নারীদের জানি যারা স্বাধীনভাবে যে পুরুষটিকে ভালবাসবে তার দ্বারা মা হতে চায়। স্বাধীন মাতৃত্ব যে যত্ন, নিরাপত্তা, মনোযোগ দিতে সক্ষম, বিবাহ-জন্ম খুব কম শিশুই তা ভোগ করে।
১৫ জুন ১৯১৭ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দুবছরের জন্য কারাবাস করতে হয়। তিনি ২৭ অক্টোবর ১৯১৯ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পান। তিনি তাঁর মতামত প্রচারের উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন এবং নৈরাজ্যবাদ, নারীবাদ, জন্মনিয়ন্ত্রণ, নাটক ইত্যাদি বিষয়ে অসংখ্য সভায় বক্তৃতা দেন। তিনি নির্বাচনকে বুর্জোয়াদের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে লিখেছেন,
“যদি ভোট কোনোকিছু পালটাতো, ওরা ভোটকেও অবৈধ করতো”।
তিনি বলশেভিক বিপ্লবে প্রাথমিকভাবে সহায়ক ছিলেন, ক্রোনস্ট্রাট বিদ্রোহের প্রাক্কালে গোল্ডম্যানের বিপরীত মতাদর্শ এবং স্বাধীন কণ্ঠ দমনের কারনে সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিন্দা জানান। মাই ডিসইলিউসনমেন্ট ইন রাশিয়ানামে ১৯২৩ সালে একটি বই প্রকাশ করেন। ইংল্যান্ড, কানাডা এবং ফ্রান্সে বসবাসকালেলিভিং মাই লাভনামক একটি আত্মজীবনীমূলক বই রচনা করেন। স্পেনের গৃহযুদ্ধ পরবর্তীকালে তিনি নৈরাজ্যবাদী বিপ্লব সমর্থনে স্পেন ভ্রমণে যান। তিনি ১৪ মে ১৯৪০ সালে ৭০ বছর বয়সে টরেন্টতে মারা যান।

তথ্যসূত্র
১. বাংলা উইকিপিডিয়া, নিবন্ধ, এমা গোল্ডম্যান।

Friday, April 17, 2015

লেনিনের বই বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা বিষয়ে আলোচনা




লেনিনের বই বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনার প্রচ্ছদ

বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা ভ্লাদিমির লেনিন লেখেন ১৯০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবর মাসে। এই গ্রন্থে তিনি মার্কসবাদী দর্শনের বিরোধীদের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি এই গ্রন্থে আরো দেখান যে দর্শন ও রাজনীতির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সংযোগ বর্তমান।[১]
এই গ্রন্থটির পুরো নাম বস্তুবাদ ও অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা: এক প্রতিক্রিয়াশীল দার্শনিক মত প্রসঙ্গে বিচারমূলক মন্তব্য (ইংরেজিতে: Materialism and Empirio-criticism: Critical Comments on a Reactionary Philosophy)লেনিনের জীবদ্দশায় গ্রন্থটির দুটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়, প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯০৯ সালে এবং দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৯২০ সালে। ১৯০৮ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে অক্টোবরের মধ্যে প্রায় নয় মাস সময় নিয়ে লেনিন এই গ্রন্থ রচনা করেন। এই বইটি লেখার জন্য তাঁর প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন হয়েছিলো। প্রধানত জেনেভা শহরের গ্রন্থাগারে লেনিন এই গবেষণার কাজ সমাধা করেন, যদিও আরো কিছু বই পড়াশোনার জন্য ১৯০৮ সালের মে মাসে তিনি কিছুদিন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে কাজ করতে যান।
এই গ্রন্থে মোট দুশোর বেশি বইয়ের উল্লেখ দেখা যায়। এই বইগুলোর ভেতরে যেমন আছে কঠিন দার্শনিক বিষয়ের বই, তেমনি বিশেষভাবে আছে বিশ শতকের প্রথম দশকে পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলে বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক মহলে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টিকারী কিছু বিজ্ঞান বিষয়ের রচনা। লেনিনের মতো বিপ্লবী রাজনৈতিক নেতার পক্ষে সমসাময়িক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণায় গভীর আগ্রহ যেকোনো পাঠকের কাছে গভীর আগ্রহের বিষয়। দার্শনিক ও পদার্থবিজ্ঞানের বিপুল পাঠ্য থেকে সংকলিত সমস্ত তথ্য নিপুণ দার্শনিক বিচারের কষ্টিপাথরে লেনিন যাচাই করেছেন। সেই উদ্দেশ্যেই তাঁর পক্ষে প্রয়োজন হয়েছে তুমুল বিতর্কের অবতারণা করবার।
এই গ্রন্থটি লেখার অব্যবহিত উদ্দেশ্য ছিলো রুশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে কিছু তথাকথিত মার্কসবাদীরা যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিলেন তার নিরসন করা। সেসময় একদল রুশ বুদ্ধিজীবী আর্নস্ট মাখের (১৮৩৮-১৯১৬) দার্শনিক মত দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই নিজেদের মার্কসবাদী বলে ঘোষণা করতেন এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মতাদর্শগত প্রচারেও সক্রিয় অংশগ্রহণ করতেন। এসব তাত্ত্বিক রুশ নেতাদের মধ্যে ছিলেন এ. বগদানভ (১৮৭৩-১৯২৮), ভি. বাজারভ (১৮৭৪-১৯৩৯), এ. ভি. লুনাচারস্কি (১৮৭৫-১৯৩৩), জে. এ. বারমান (১৮৬৮-১৯৩৩) সহ আরো কয়েকজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে এঁদের মধ্যে বারমান ছাড়া বাকি সকলেই কালক্রমে বলশেভিক আন্দোলনের সংগে সম্পর্ক ত্যাগ করেন।
লেনিন উক্ত গ্রন্থে বিশপ বার্কলির (১৬৮৫-১৭৫৩) মতামতকে তুলে আনেন। বার্কলির মূল প্রতিপাদ্য হলো, সাধারণ মানুষ যাকে বাস্তব বহির্জগত বলে মনে করে আসলে তা নেহাতই মন গড়া। আমাদের মনের বাইরে বাস্তব বহির্জগত বলে সত্যিই কিছু থাকতে পারে না। সেই বার্কলির সাথে মাখের পার্থক্য হচ্ছে মাখ রকমারি অভিনব পরিভাষা ব্যবহার করেন। এছাড়া মাখপন্থীরা সকলেই বস্তুবাদকে আক্রমণ করেছেন। লেনিন ব্যঙ্গ করে বলেছেন যে,
“আর্নস্ট মাখের সাম্প্রতিক পজিটিভিজম মাত্র দুশো বছরের পুরনো এক দর্শন। ইতিপূর্বে বার্কলি পর্যাপ্তভাবেই প্রমাণ করেছেন যে ‘সংবেদন বা মানসিক উপাদান থেকে’ একজ্ঞাতাবাদ ছাড়া আর কিছুই গড়া সম্ভব নয়”।
লেনিন উক্ত গ্রন্থে একদিকে পজিটিভিজম, একজ্ঞাতাবাদ বা Solipcism, অভিজ্ঞতাবাদী সমালোচনা এবং আপেক্ষিকতাবাদীদের বিপক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং অন্যদিকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে আঁকড়ে ধরেন।[২]

তথ্যসূত্র:
১. গ. দ. অবিচকিন ও অন্যান্য; ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সংক্ষিপ্ত জীবনী; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭১; পৃষ্ঠা-৯৩
২. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, দার্শনিক লেনিন, মনীষা কলকাতা, আগস্ট ১৯৮০, পৃষ্ঠা ২২-৪৩।

Sunday, April 12, 2015

মুক্তি প্রসঙ্গে মার্কসবাদ




স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মাও সেতুং


মুক্তি বা স্বাধীনতা (ইংরেজি Freedom বা Liberty) হচ্ছে একটি সমাজে মানুষের সম্ভাবনার পূর্ণ উন্নতির সংস্থান করে মানুষের নিজ কর্মসমূহ নির্ধারণ করার সামর্থ্য ও অধিকার। মুক্তি ব্যক্তিগতভাবে একজনও উপভোগ করতে পারেন কিন্তু তা সমাজের ভেতরেই করতে হয়। ব্যক্তিগত গুণগুলো সমাজের ভেতরেই বিভিন্ন দিকে কর্ষণ করা যায়, তাই শুধু সমাজের ভেতরেই ব্যক্তিগত মুক্তি সম্ভব। মানুষের উন্নতির জন্য, তার চাহিদা পূরণের জন্য, তার সামর্থ্য প্রতিভা প্রয়োগের জন্য সমাজের উপর, সমাজসৃষ্ট পরিস্থিতির উপরই ব্যক্তিস্বাধীনতা নির্ভরশীল
অতীতে রাষ্ট্রে ও সমাজে কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি তারাই অর্জন করতে পেরেছিলো যারা শাসক শ্রেণির সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে পেরেছিলো এবং সেই শ্রেণির ভেতরে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিলো। মার্কসবাদে এই ধরনের মুক্তির বিরোধিতা করে সমাজের সকল সদস্যের সামগ্রিক মুক্তির কথা বলা হয়েছে। মার্কস বলছেন মানুষের মুক্তির (Liberation of Man) কাজটি ঐতিহাসিকভাবে সম্পন্ন করতে হবে অর্থাৎ মানুষের মুক্তির মর্মের বস্তুগত রূপকে ধরতে হবে। আর সেই রূপটি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও অর্থশাস্ত্র দিয়ে ধরা সম্ভব।[১]
পুঁজিবাদে যাদের টাকা আছে তারাই স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে। যাঁদের শ্রমশক্তি বিক্রি করা ছাড়া বাঁচার কোনো উপকরণ নেই তাঁদেরও স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা খুবই নিয়ন্ত্রিত। বুর্জোয়া সমাজে অন্য সকলের চেয়ে কতিপয় ব্যক্তির স্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাদী সমাজে সৃষ্ট পুঁজি শ্রমিকেরই শ্রমশক্তির রূপান্তর। সেই পুঁজি তাকেই শ্রমদাসত্বে বন্দি করে রেখেছে। নীতি, নিয়ম, আইন, অর্থ, পণ্য, পুঁজি সবই মানুষেরই সৃষ্টি এবং এই সবই পিঞ্জর হয়ে উঠেছে মানুষেরই কাছে। মানুষকে তাই মানুষের সাথে মনুষ্য সম্পর্কে মিলিত হতে হবে। ফিরে আসতে হবে আত্মবোধে। এটাই হবে বিচ্ছিন্নতার অন্তর্ধান, মার্কসবাদে যাকে বলা হয় মুক্তি।[২]
মার্কসবাদে মুক্তি বলতে বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্তিকে বোঝানো হয় এবং এই মুক্তি জড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক মুক্তির সাথে। উৎপাদন ব্যবস্থা মানুষকে পণ্যে পরিণত করেছে এবং একটি অমানবিক সত্তায় নিয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ তাকে তাঁর উৎপাদিত দ্রব্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে অমানবিক করে তুলেছে। কার্ল মার্কস লিখছেন,
“উৎপাদন মানুষকে কেবল একটা পণ্য মানে মানব পণ্য হিসেবেই উৎপন্ন করে না, মানুষ এখানে শুধু পণ্যের ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হয় না। উৎপাদন তাকে এমন করে উৎপাদন করে যে সে এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে মানসিক এবং শারীরিকভাবে অমানবিক সত্ত্বায় পরিণত হয়।[৩]
শ্রম বিভাজন এবং বিনিময়ই হলো মানুষের কার্যক্রমের বিচ্ছিন্নতা বৈশিষ্ট্যটির রূপ। জেমস মিল বাণিজ্যকে উপস্থাপন করেছিলেন শ্রম বিভাজনের ফলাফল হিসেবে। মিলের কাছে মানব কর্মকাণ্ড ছিলো যান্ত্রিক গতিতে পর্যবসিত। মিলের চোখে শ্রমের বিভাজন ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদনের ধনদৌলতকে এগিয়ে নেয়। মার্কসের কাছে শ্রমের বিভাজন ও বিনিময়ের ব্যাপারটি হয়ে দাঁড়ালো প্রজাতি সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্নতা। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“শ্রম বিভাজন এবং বিনিময়ের ব্যাপারটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা খুবই কৌতূহলোদ্দীপক, কারণ প্রজাতি কর্মকাণ্ড এবং প্রজাতি ক্ষমতা থেকে সেগুলো হচ্ছে উপলব্ধিজাতভাবে মানব কর্মকাণ্ড ও অপরিহার্য ক্ষমতার বিচ্ছিন্ন [alienated] প্রকাশ।”[৪]
মার্কসবাদে মুক্তির পথ হচ্ছে পৃথিবীর মুখোমুখি হবার পথ। মুক্তির পথ হচ্ছে প্রকৃতির নিয়মকানুনকে, প্রকৃতির শৃঙ্খলাকে, স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতরভাবে চেনবার পথ। যত ভালো করে চিনতে পারা যাবে ততই সেগুলোকে বাঞ্ছিত উদ্দেশ্যের দিকে নিয়োগ করতে পারা যাবে। এই নিয়োগের নামই হলো পৃথিবীকে জয় করা, প্রকৃতির দাসত্ব থেকে মুক্তি। দিনের পর দিন প্রকৃতির শৃঙ্খলা সম্বন্ধে তার চেতনা যত স্পষ্ট হয়েছে ততই সে এগুলোকে কাজে লাগাতে পেরেছে নিজের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে। প্রকৃতির স্বাধীনতার অর্থ প্রাকৃতিক নিয়ম থেকে মুক্তি নয়, প্রাকৃতিক নিয়মের পূর্ণ জ্ঞানের অবস্থা। মানুষ প্রকৃতির নিয়মগুলোকে বদলাতে পারে না, তারা শুধু নিয়মগুলোকে জানতে পারে এবং সেগুলোকে কাজে লাগাতে পারে। এঙ্গেলস লিখেছেন,
“প্রকৃতির বিধানসমূহ থেকে কোনো কাল্পনিক বিমুক্তির মধ্যে স্বাধীনতা নিহিত নয়। প্রকৃতির বিধানসমূহের জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানের মাধ্যমে এই বিধানসমূহকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সাধনে সুশৃঙ্খলভাবে নিযুক্ত করার যে সম্ভাবনা আমরা লাভ করি তার মধ্যেই আমাদের স্বাধীনতা নিহিত। ... কাজেই তথ্য তথা বাস্তবজগত সম্পর্কে জ্ঞানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাই হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতা।”[৫]
প্রকৃতির নিয়ম ও শৃঙ্খলাকে মানুষ কাজে লাগিয়েছে প্রয়োজনীয় উৎপাদনের উদ্দেশ্যে। আর তাই দিনের পর দিন মুক্তির পথে সে এগিয়ে চলতে শিখেছে। কিন্তু একসময় দেখা যাচ্ছে সে তার উৎপাদিত পণ্যের অধীন হয়ে পড়েছে, একসময় সে নিজেই পণ্য হয়ে গেছে। তাই উৎপাদনের ব্যাপার নিয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক তাকে ঠিকমতো চিনতে পারা, বুঝতে পারা, আর ওই জ্ঞানের ভিত্তিতে নিয়ন্ত্রণ করা যতদিন সম্ভব না হচ্ছে ততদিন মানুষের পুরোপুরি মুক্তি আসবে না।[৬] মার্কস ও এঙ্গেলস বিজ্ঞানের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রকৃতির নিয়মসমূহ জানাকে মানবিক স্বাধীনতা অর্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন। মানুষের এই স্বাধীনতা অর্জনকে তাঁরা একটা ঐতিহাসিক বিকাশের ফলশ্রুতি বলে মনে করেন। তাঁরা মনে করেন, বিজ্ঞান ও সামাজিক অগ্রগতি এমন একটা পর্যায়ে উপনীত হবে যেখানে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হবে। এ থেকেই এঙ্গেলস বলেন যে সমাজে থাকবে না শ্রেণির বৈষম্য কিংবা ব্যক্তির জীবনধারণের জন্য দুশ্চিন্তা, যে সমাজে প্রকৃতির জ্ঞাত বিধানের সঙ্গে সঙ্গতির ভিত্তিতে মানুষের জীবন যাপন সম্ভব হবে, সে সমাজেই মাত্র প্রথমবারের মতো যথার্থ স্বাধীনতার চিন্তা করা সম্ভব হবে।[৭]
মুক্তি বা স্বাধীনতা সমাজতন্ত্রের মতোই আপনা থেকেই আসে না, স্বাধীনতাকে কর্মের মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। মানুষকে স্বাধীন হতে হলে তাকে দায়িত্ব পালন করা লাগে। মাও সেতুং বলেছেন যে এঙ্গেলস,
“প্রয়োজনের রাজ্য থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে গতির কথা বলেছেন এবং বলেছেন যে, প্রয়োজনের উপলব্ধিই হচ্ছে স্বাধীনতা। এই বাক্যটি সম্পূর্ণ নয়, এতে মাত্র অর্ধেক বলা হয়েছে এবং বাকিটা বলা হয়নি। শুধু উপলব্ধিই কী আপনাকে মুক্ত করে ফেলে? স্বাধীনতা হচ্ছে প্রয়োজনের উপলব্ধি এবং প্রয়োজনের রূপান্তর। একজন ব্যক্তিকে কিছু কাজও করতে হবে।”[৮]
কিন্তু পুঁজিবাদী সমাজে ফরাসি বিপ্লবের পর মুক্তি কথাটি বহুলভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যেত। সেই মুক্তিকে মার্কসবাদীগণ সবসময় অপূর্ণাঙ্গ মুক্তি হিসেবে দেখেছেন। পুঁজিবাদে মুক্তি কখনোই সম্ভব নয়। মার্কসবাদীগণ প্রমাণ করেছেন মানুষের মুক্তি সম্ভব হবে সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের পরে, সাম্যবাদ আসবার আগে মুক্তি কেবল বাগাড়ম্বর থেকে যাবে। মালিকদের শোষণের স্বাধীনতাকেই বুর্জোয়াদের তোয়াজকারী বুদ্ধিজীবীরা স্বাধীনতা হিসেবে উপস্থাপনের জোর চেষ্টা চালায়। যেমন, ভ. ই. লেনিন লিখেছেন,
“সামন্তবাদের পতনের পর ঈশ্বরের দুনিয়ায় ‘মুক্ত’ পুঁজিবাদী সমাজের আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই এ কথা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিলো যে, মেহনতি মানুষদের উপর পীড়ন ও শোষণের একটি নতুন ব্যবস্থাই হলো এ মুক্তির অর্থ।”[৯]
মার্কস কেবল প্রকৃতির অন্ধশক্তির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা স্বাধীনতা অর্জনের দিকটিই দেখেননি। তিনি সামাজিক শক্তির ওপরও মানুষের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। পুঁজির শৃঙ্খল থেকে মানবিক স্বাধীনতা অর্জনের কথা বলেন। মার্কসের মতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের স্বাধীনতা হলো কেবল বাজারে শ্রমশক্তির ক্রেতা বদলের স্বাধীনতা, যা স্বাধীনতার একটা বাহ্য রূপ মাত্র, মর্মগতভাবে তাঁরা অস্বাধীন। পুঁজিবাদী শ্রমিক এক অদৃশ্য সূত্রে পুঁজির শৃঙ্খলে বাঁধা। এ থেকে মার্কস বলেন ‘রোমান ক্রীতদাস লৌহ নিগড়ে বাঁধা থাকতঃ মজুরি-শ্রমিক তার মালিকের কাছে বাঁধা আছে অদৃশ্য সূত্রে। স্বাধীনতার বাহ্যরূপটা বজায় রাখা হয় ক্রমাগত মালিক পরিবর্তনের সাহায্যে এবং মামুলি এক চুক্তির কল্পনা দ্বারা’[১০] এ থেকে বলা যায়, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিকের স্বাধীনতাহীনতা ও জবরদস্তিমূলক শ্রমের কারণে মার্কস পুঁজিবাদের সমালোচনা করেন। মানবিক স্বাধীনতার ধারনার একটি নৈতিক দিক থাকায় মার্কস কর্তৃক পুঁজিবাদের স্বাধীনতাভিত্তিক আলোচনা হয়ে উঠেছে একটা বাস্তব ও নৈতিক সমালোচনা। পুঁজিবাদী স্বাধীনতার বিপরীতে মার্কস মনে করেন, সমাজীকৃত মানুষের মধ্যেই স্বাধীনতা বাস্তব রূপ লাভ করতে পারে। মার্কস বলেন,
“বস্তুতপক্ষে, স্বাধীনতার এলাকা সত্যি সত্যি শুরু হয় কেবল সেখানেই, যেখানে শ্রম, যা নির্ধারিত হয় প্রয়োজন ও সাংসারিক চিন্তা ভাবনার দ্বারা, তার বিরতি ঘটে; তাই স্বাধীনতার স্বাভাবিক অবস্থানই হচ্ছে সত্যিকারের বস্তুগত উপাদানের পরিধি ছড়িয়ে ... এক্ষেত্রে স্বাধীনতা রূপ ধারণ করতে পারে কেবল সমাজীকৃত মানুষের [socialised man] দ্বারা, সংঘবদ্ধ উৎপাদনকারীদের দ্বারা, প্রকৃতির সঙ্গে তাদের লেনা-দেনাকে যুক্তিসিদ্ধরূপে পরিচালন এবং প্রকৃতি-কর্তৃক, তথা তার অন্ধ শক্তিসমূহ কর্তৃক শাসিত না হয়ে, তাকে তাদের সামূহিক নিয়ন্ত্রণাধীনে আনয়ন করা এবং ন্যূনতম কর্মশক্তি-ব্যয়ে এবং তাদের মানব-প্রকৃতির পক্ষে সর্বাধিক অনুকূল ও উপযুক্ত অবস্থাধীনে এই লক্ষ্য সাধন করার মাধ্যমে। কিন্তু তৎসত্ত্বেও তা তখনো থেকে যায় প্রয়োজন-পূরণের পরিধির মধ্যে। এই পরিধি ছাড়িয়েই শুরু হয় মানবিক শক্তির সেই বিকাশ, যা নিজেই নিজের উদ্দেশ্য [end in itself], স্বাধীনতার সত্যিকারের জগত [true realm of freedom], কিন্তু যা কুসুমিত হতে পারে কেবল প্রয়োজন-পূরণের জগতের ভিত্তির উপরেই। কাজের দিনের দীর্ঘতা হ্রাস হচ্ছে তার মৌল পূর্বশর্ত।[১১]
স্বাধীনতার সঙ্গে মার্কস মুক্ত সময়কে যুক্ত করে দেখেন। তাঁর মতে প্রযুক্তির অটোমেশন মানুষের জন্য মুক্ত সময় সম্ভব করে তুলবে। তিনি মনে করেন সাম্যবাদে মানুষের এই স্বাধীন বিকাশ সম্ভব হবে। এ থেকে তিনি বলেন কমিউনিজমে ‘শ্রেণি ও শ্রেণিবিরোধ সংবলিত পুরানো বুর্জোয়া সমাজের স্থান নেবে এক সমিতি যার মধ্যে প্রত্যেকটি লোকেরই স্বাধীন বিকাশ হবে সকলের স্বাধীন বিকাশের শর্ত’।[১২] মার্কস মানুষের এই স্বাধীনতা অর্জনকে একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেন, যা সম্ভব হবে উৎপাদন-শক্তির উপর মানুষের যৌথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। এ কারণেই মার্কস বুর্জোয়া স্বাধীন মানবতার [free humanity] ধারনার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, বুর্জোয়া স্বাধীনতার ধারনা হলো আত্মকেন্দ্রিক নাগরিক ব্যক্তির স্বীকৃতি। বুর্জোয়া স্বাধীনতার ধারনা হলো অন্যের সম্পত্তি হরণের স্বাধীনতা, যা মুনাফার নোংরামি থেকে মুক্ত নয়। এটা হলো মুনাফাবৃত্তির স্বাধীনতা।[১৩]
ফলে শোষণ যতদিন থাকছে ততদিন মুক্তির কথা শুধু মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়েই প্রায়োগিকভাবে অর্জিত হতে পারে। ব্যক্তিগত মালিকানা শোষণের অবসান ঘটিয়ে কেবলমাত্র সমাজতন্ত্রই মানুষকে বাজারের খেয়ালীপনা, অর্থনৈতিক সংকট, বেকারী, দারিদ্র ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কায়েম করতে পারে মানবেতিহাসে প্রথম সমাজতন্ত্রই মানুষকে শোষকদের বদলে নিজের জন্য, সমাজের জন্য কাজ করার এবং শ্রমের মাধ্যমে এর ভিত্তিতে নিজস্ব বৈষয়িক আত্মিক চাহিদা পূরণের সুযোগ দিয়ে মানুষের শ্রমকে মুক্ত করবার সামর্থ্য রাখে
বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম বিমূর্ত মানুষের প্রত্যয়টি প্রত্যাখ্যান করে এবং মানবতাবাদের একটি বাস্তব ভিত্তি গড়ে তোলে মানুষ তৈরিতে সামাজিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত ভূমিকার যথার্থতা উদ্ঘাটনক্রমে বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম ব্যক্তিগত মালিকানা শোষণের বৈপ্লবিক উৎখাতসহ নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ, অত:পর সাম্যবাদী সমাজ গঠনের মাধ্যমে মানুষের জন্য কীভাবে সত্যিকার স্বাধীনতা কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায় তাও উপস্থাপন করেছে

তথ্যসূত্র:
১. গৌতম দাস অনূদিত, জার্মান ভাবাদর্শ, কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, গৌতম দাসের ১৪ নং ব্যাখ্যা, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৯, পৃষ্ঠা ২৩৩
২. সমীরণ মজুমদার, মার্ক্সবাদ বাস্তবে ও মননে, স্বপ্রকাশ কলকাতা, বৈশাখ ১৪০২, পৃষ্ঠা ৮৮
৩. কার্ল মার্কস, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি ১৮৪৪, জাভেদ হুসেন অনূদিত, বাঙলায়ন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, পৃষ্ঠা ৭৩
৪. কার্ল মার্কস, অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি ১৮৪৪, জাভেদ হুসেন অনূদিত, বাঙলায়ন, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১২, পৃষ্ঠা ১১৫
৫. সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, এঙ্গেলসের এ্যান্টি ডুরিং, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, অক্টোবর ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০৪
৬. দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, মার্ক্সবাদ, অনুষ্টুপ, কলকাতা, চতুর্থ সংস্করণ আগস্ট ২০১৩, পৃষ্ঠা ৫৩-৫৫
৭. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, এ্যান্টি-ডুরিং, সরদার ফজলুল করিম অনূদিত, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম পুনর্মুদ্রণ, অক্টোবর ১৯৯৭, পৃষ্ঠা ১০৪-১০৫
৮. মাও সেতুং, মাও সেতুঙের শেষ জীবনের উদ্ধৃতি, আন্দোলন প্রকাশনা, মে ২০০৫, পৃষ্ঠা ২৭
৯. লেনিন, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি উপাদান, মার্চ ১৯১৩, মার্কস এঙ্গেলস মার্কসবাদ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭৫, পৃষ্ঠা ৫৫
১০. মার্কস, পুঁজি প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৯০
১১. কার্ল মার্কস, ক্যাপিটাল, বাংলা সংস্করণ ষষ্ঠ খণ্ড, ইংরেজি তৃতীয় খণ্ড, শেষাংশ, বাণীপ্রকাশ, কলকাতা, সংশোধিত চতুর্থ সংস্করণ, জুন ২০০৯, পৃষ্ঠা ৩৫১-৩৫২
১২. মার্কস এঙ্গেলস, কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার, ১৮৪৮, মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন প্রথম খণ্ড প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ৪৬
১৩. এ বিষয়ে বিস্তারিত পড়ুন, আখতার সোবহান খান, মার্কসবাদ ও ন্যায়পরতার ধারণা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ১৫৬-১৭০