Friday, October 24, 2014

কমরেড এম.এ. মতিন ও জমিলা খাতুন স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত




কমরেড এম. এ. মতিনের স্মরণসভায় বক্তৃতা করছেন অনুপ সাদি

মাওবাদী নেতা, বাংলাদেশের ময়মনসিংহের বাম রাজনৈতিক অঙ্গনের প্রিয় ব্যক্তিত্ব কমরেড এম. এ. মতিনের ১ম মৃত্যুবর্ষিকী এবং বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলন ও ময়মনসিংহ কালিবাড়ী বস্তি আন্দোলনের নেত্রী কমরেড জমিলা খাতুনের স্মরণে ২৪ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে কালিবাড়ী চর বস্তি সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র বেড়ি বাঁধে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বক্তাগণ সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ বিরোধী ভূমিকা জোরদার করার আহ্বান জানান। প্রয়াত নেতাদের স্মরণে স্মৃতিচারণায় বক্তাগণ বলেন, শ্রেণিসংগ্রামের ভবিষ্যৎ আন্দোলনে কমরেড এম. এ. মতিন ও কমরেড জমিলা খাতুন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। ময়মনসিংহের চর কালীবাড়ি আন্দোলনের সৃষ্টি এই দুজন কমরেডের লড়াই ও আত্মত্যাগের দিকে তাকালে বর্তমান বামপন্থীদের আন্দোলনের খরা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। জনগণের জীবন যন্ত্রণাকে জড়িয়ে আন্দোলন গড়লে জনগণের অংশগ্রহণ থাকে এবং সেখান থেকেই বেরিয়ে আসেন কমরেড এম. এ. মতিন, কমরেড জমিলা খাতুন ও কমরেড বিকাশ ভৌমিকের মতো নেতাগণ যারা শ্রমিক-কৃষকের মাঝখানে থেকে জনগণের জন্য আজীবন কাজ করে যান। আলোচনা সভার আয়োজন করে শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখা। আলোচনা সভাটির উপস্থাপনা ও পরিচালনা করেন নয়া-গণতান্ত্রিক গণমোর্চার নেতা আবু বকর সিদ্দিক রুমেল এবং সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন স্মৃতি সংগঠকের সংগঠক ও নয়া-গণতান্ত্রিক গণমোর্চার কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য প্রফেসর মাহমুদুল আমিন।

আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন ময়মনসিংহের চর কালীবাড়ি বস্তি আন্দোলন বিভিন্ন বামপন্থী প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দউল্লেখ্য, গত ২০১৩ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর কমরেড এম. এ. মতিন, ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী কমরেড জমিলা খাতুন এবং গত ১৮ অক্টোবর কমরেড বিকাশ ভৌমিক মারা যান। আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদান করেন বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের জেলা সভাপতি শেখ আবেদ আলী, শহীদ বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিক স্মৃতি সংসদের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য বিজন সম্মানিত, প্রগতিশীল কৃষিবিদ ফোরামের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য কৃষিবিদ শামসুল হোসেন, কবি শামসুল ফয়েজ, লেখক অনুপ সাদি, নয়া গণতান্ত্রিক গণমোর্চার নেতা ফরিদুল ইসলাম ফিরোজ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের জেলা সমন্বয়ক আ.ন.ম. খায়রুল বাশার জাহাঙ্গীর, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের জেলা যুগ্ম আহ্বায়ক তোফাজ্জল হোসেন, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা আবুল কালাম আল আজাদ, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির নেতা আজহারুল ইসলাম আজাদ, প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী এরশাদুজ্জামান,  ছাত্রফ্রন্টের জেলা শাখার নেতা অজিত দাশ, কমরেড এম. এ. মতিনের স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের নেত্রী রহিমা বেগম।
সূত্র: প্রেস বিজ্ঞপ্তি
আরো পড়ুন:

০১. কমরেড এম. এ. মতিন এক লড়াকু মাওবাদী

০৪. সমাজতান্ত্রিক নারীনেত্রী এডভোকেট রোকেয়া বেগম

Thursday, October 23, 2014

সমাজতান্ত্রিক নারীনেত্রী এডভোকেট রোকেয়া বেগম




এডভোকেট রোকেয়া বেগম

এডভোকেট রোকেয়া বেগমকে (১ মার্চ, ১৯৪০ - ২৪ অক্টোবর, ২০১২) নানা নামে ডাকা যায়। তিনি সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রিয় কমিটির উপদেষ্টা এবং ময়মনসিংহ জেলা শাখার আহ্বায়ক, নারী জাগরণের সংগঠক, সমাজতন্ত্রের যোদ্ধা, প্রগতিশীল আন্দোলনের কাণ্ডারি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের ময়মনসিংহ জেলা কমিটির প্রবীণ সদস্য, সমাজতান্ত্রিক নারীনেত্রী, বাসদ পরিবারের খালা। তিনি ২৪ অক্টোবর, ২০১২ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাতটায় মারা যান। প্রবীণ বয়সে মরণ ব্যাধী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর তিনি মারা গিয়েছিলেন মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭৩ বছর

এডভোকেট রোকেয়া বেগম ছিলেন সমাজতন্ত্রের অকুতোভয় সংগ্রামি এবং বাংলাদেশের নারীমুক্তির এক সাহসী সৈনিকতিনি নারী শিক্ষা ও নারীমুক্তির জন্য নিরলস কাজ করেছেনতিনি ময়মনসিংহের সকল গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্বের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছিলেনগত ৫০ বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি স্বৈরাচার বিরোধি আন্দোলন, নারীমুক্তি সংগ্রাম, বর্তমান আওয়ামি সরকারের (২০০৮-২০১২) স্বেচ্ছাচারি নারী নীতি ও শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯০ পরবর্তীকালে তিনি কতিপয় বামপন্থিদের আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তির বিরুদ্ধে তীব্র মতাদর্শিক সংগ্রাম পরিচালনা করেনতিনি চার দশকের লুটপাটের রাজনীতির বিরুদ্ধে ছিলেন সর্বদাই উচ্চকণ্ঠ

ময়মনসিংহসহ সারাদেশে তার গুণগ্রাহী অনেকেই আছেন, কারণ তিনি যে শ্রেণিতে অবস্থান করতেন তাতে নুন অনেককেই খাওয়ানো যেত। কিন্তু তার যে গুণটির জন্য তাকে স্মরণ করা যায় সেটি হচ্ছে তিনি সুবিধাবাদীদের সুবিধাবাদীই বলতেন। সুবিধাবাদীদের সাথে সম্পর্ক শেষ করার ক্ষমতাও তিনি রাখতেন।

তার হৃদয়টি ছিল সমাজতন্ত্রী, সমাজ-গণতন্ত্রী, প্রগতিশীল ও মানবতাবাদীদের আশ্রয়স্থল। তিনি আজ নেই; কিন্তু সুবিধাবাদী, সংশোধনবাদী, মতান্ধতাবাদী ও অসর্বহারা চিন্তার তল্পিবাহকেরা তার পার্টি সিপিবি-বাসদসহ আরো নানা জায়গায় আছে। এদের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোটাই মার্কসবাদী পার্টিকে শক্তিশালী করার একমাত্র পথ; এবং সেপথে তিনি হয়তো তীব্রভাবে লড়াই করতে পারেননি, কিন্তু নানা সময়ে ভুল পথের পথিকদের সমালোচনা করেছেন। তিনি ১৯৯০ দশকের আগেই সিপিবিকে ত্যাগ করেছিলেন তার সুবিধাবাদীতার কারণে, সেই সিপিবির সাথে সুবিধাবাদী বাসদ এখন একসাথে থেকে সাম্রাজ্যবাদের দালাল কামাল হোসেনকে নিয়ে জুট করতে চায়। তিনি সিপিবি ছেড়ে বাসদে যোগ দিয়েছিলেন, আজ বাসদের সুবিধাবাদকে কি বেঁচে থাকলে পরিত্যাগ করতে পারতেন?

সাংসারিক দায়িত্ব পালন করেও তিনি বিপ্লবি চেতনায় আজীবন সক্রিয় থেকেছেন। যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার মতো দৃঢ়তা হয়তো তার ছিলো না, প্রথমত নারী হবার কারণে, দ্বিতীয়ত ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণিতে অবস্থানের কারণে; কিন্তু আমরা যারা পুরুষ এবং যুদ্ধকে রাজনীতির অংশ হিসেবে নিতে পারিনি, তাদের ব্যর্থতাগুলো খুব বিশাল এক আশ্চর্যবোধক চিহ্ন নয় কি? যে রাজনীতিটিতে তিনি সক্রিয় হয়েছিলেন তার ধারাবাহিকতা দেখলে আমরা দেখবো তিনি, ন্যাপ থেকে সিপিবি হয়ে বাসদে এসে থিতু হয়েছিলেন। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কোনোদিন ডানদিকে হেলে পড়েননি। একজন মানুষ হিসেবে স্বৈরাচার কবলিত এদেশে সেটি কম বড় ব্যাপার ছিল না। তিনি ১৯৭১ সনের শ্রেণিযুদ্ধে নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেছেন। মানবসেবায় শেষদিন পর্যন্ত নিবেদিত ছিলেন। পরিবার আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশি, তৃণমূল পর্যায়ের নারী-পুরুষ, সকলের কাছে তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র, একান্ত ভরসাস্থল। সারাজীবন মিছিলে সভায় সাধ্যমতো অংশগ্রহণ করেছেন।
তার মৃত্যুতে কিছু মানুষ শোককাতর হয়েছিলো। যেমন, কবি শামসুল ফয়েজ তাঁর মৃত্যুতে যে শোক বিহ্বল কবিতাটি লিখেছিলেন তার কয়েকটি লাইন এইরকম:  
সমস্যায় সংকটে দুর্দিনে দুঃসময়ে
আশ্বস্ত হয়েছে যারা তার মধুর কণ্ঠের বচনে,
তারা রুদ্ধবাক অবিরাম শোকের দহনে।
দুধঅলা, গৃহকর্মি, দৈনিক পত্রিকার হকার,
বিপন্ন বিপ্লবী, চন্দ্রাহত কবি, অচেনা কমরেড,
রবীন্দ্র সংগীতের বিমুগ্ধ অনুরাগী,
লাঞ্ছিত-বঞ্চিত নারী প্রিয়জন হারানোর
বেদনায় মুহ্যমান-ব্যথাহত।”[১]

এডভোকেট এডভোকেট রোকেয়া বেগম ময়মনসিংহের ২৮নং কালিবাড়ি বাইলেনে ১৯৪০ সালের ১ মার্চ জন্মেছিলেন। নারীদের লেখাপড়া তখনো চোখে পড়ার মতো ছিলো না। তার পিতা ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ ও মাতা সৈয়দা মরিয়ম আক্তার। বাল্যকালেই তিনি বড় ভাই নেছার উদ্দিনের সাহচর্যে মানবমুক্তির আদর্শে উজ্জীবিত হন। তার পিতার বাড়ি বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার জঙ্গলবাড়ি এলাকার মাস্টারবাড়ি নামে পরিচিত ছিল

তিনি ১৯৪৮ সালে বিদ্যাময়ী স্কুলে গমন করেন। কৈশোর বয়সে ভাষা আন্দোলনের তরঙ্গে আন্দোলিত হয়েছিল কালিবাড়ি বাইলেন। তার ভাইয়ের ন্যাশনাল আওয়ামি পার্টি (ন্যাপ)-এর সাথে জড়িত থাকার সূত্রেই তিনি নারীমুক্তির কামনায় সমাজতান্ত্রিক আদর্শে নিজেকে উজ্জীবিত করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে মেট্রিক পাস করেন। তিনি ১৯৫৬ সালে আনন্দমোহন কলেজে ভর্তি হন। সেই বছরের ২৮ অক্টোব আশরাফ হোসেনকে বিয়ে করেন। পরবর্তীকালে স্বামীর কর্মস্থলের সূত্রে নকলা, বারহাট্টা, বরিশালসহ বিভিন্ন স্থানে নিজেকে প্রগতিশীল কাজে নিয়োজিত করেন। প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে আই.এ. পাস করার পর তিনি বরিশালের চাখার কলেজ থেকে বি.এ. পাস করেন। পরম মমতায় সন্তানদের লালন পালনের সাথে তার নিজের লেখাপড়াও চালাতে থাকেন অদম্য গতিতে। প্রথমে তিনি ভর্তি হন বরিশাল ল কলেজে। কিন্তু তিনি এল.এল.বি. ডিগ্রি নেন ময়মনসিংহ ল কলেজ থেকে। তিনি ১৯৭৪ সালে আইন পেশাতে যোগ দেন। তিনি পেশাগত জীবনে সরকারি সহকারী উকিল (APP) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন

তিনি ১৯৬৯ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠার অন্যতম সক্রিয় সংগঠক। নিরলসভাবে এই সংগঠনটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সাল পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সাথে যোগাযোগের সূত্রে এবং নারীদের অধিকার আন্দোলনে অংশগ্রহণের অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি ২০০৮ সালে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রিয় কমিটির সদস্য হন এবং তখন থেকেই ময়মনসিংহ জেলা শাখার আহবায়কের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

তিনি বিএনএসবি-ময়মনসিংহের কার্যনির্বাহি কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার কার্যনির্বাহি কমিটির আমৃত্যু সদস্য জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, ময়মনসিংহ জেলা শাখার আমৃত্যু সহসভাপতি এবং শিশুতীর্থ আনন্দধ্বনি সংগীত বিদ্যায়তনের সভাপতি এবং সমন্বিত শিক্ষা কার্যক্রম ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি ছিলেন

আপনার সাথে জীবনের এক সরল ও স্মৃতিঘন পরিস্থিতিতে আমার পরিচয় হয়েছিল। সেই স্মৃতিটুকু খুব গভীর না হলেও ক্ষুদ্র এক জীবনের জন্য সতেজ সম্বল। আপনার সাহস ও ধৈর্য জনগণের চলার পথকে গৌরবময় করুক, এই কামনা করি।

তথ্যসূত্র:
১. পুরো কবিতাটি পড়ুন একজন মহীয়সী নারীর প্রস্থানে

আরো পড়ুন

. প্রসঙ্গ বাসদ: ভুল বিতর্কের কাছে নতজানু নই

. মার্কসবাদের মৌলিক শিক্ষাসমূহ ও শিবদাস ঘোষের সংশোধনবাদ

. জাসদ, ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নের এক গণবিরোধী দলের নাম

৫. মার্কসবাদ লেনিনবাদবিরোধী বাসদ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের জন্য তার ঐতিহাসিক শিক্ষা

৬. চার্বাক সুমনের ব্যঙ্গগল্প দলভাঙা নেতার একটি পর্যালোচনা

৭. মার্কসবাদ লেনিনবাদবিরোধী জাসদ বাসদ এবং একটি পুস্তকের মূল্যায়ন

৮. বাংলাদেশে ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন ও বামপন্থি সংশোধনবাদীদের রাজনীতি

Tuesday, October 21, 2014

প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রসঙ্গে




প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রসঙ্গে স্তালিন
প্রলেতারিয়েত শ্রেণির রাজনৈতিক ক্ষমতা হচ্ছে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব যা তারা সমাজতন্ত্র বিনির্মাণ ও দৃঢ়করণের জন্য ব্যবহার করে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের ফলে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতা থেকে অপসারিত শোষকদের বিরুদ্ধে শ্রেণিসংগ্রামের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে এটি ক্রিয়া করে। প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের প্রয়োজনীয় শর্ত হলও সমাজতন্ত্র গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত সমস্ত কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শোষক শ্রেণিগুলো যেসব প্রতিরোধমূলক প্রচেষ্টা গ্রহণ করে সেগুলোকে দমন করা। প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সৃজনশীলতা। অর্থাৎ, নিপীড়ক ও নিপীড়িত শ্রেণিসমূহের মধ্যে সমাজের বিভক্তির অবসান ঘটানো; মানুষের উপর মানুষের শোষণের লোপ করবার অবস্থা সৃষ্টি। প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ক্ষমতার প্রয়োগ ঘটে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং সামাজিক সংগঠনগুলো যেমন শ্রমজীবীদের রাজনৈতিক দল, ট্রেড ইউনিয়ন সমবায়, যুব সংগঠন ইত্যাদির মাধ্যমে। প্রলেতারীয় একনায়কত্বে নেতৃভূমিকা থাকে প্রলেতারিয়েত শ্রেণির সাম্যবাদী পার্টির।[১]
প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব সমাজতান্ত্রিক সমাজের বিকাশ ঘটাতে উত্তরণ পর্বে এক প্রয়োজনীয় জিনিস। এটি কমিউনিস্ট পার্টিকে উত্তরণ পর্ব ও পরবর্তীকালে বিজ্ঞানসম্মত পথে জটিল করণীয় কাজগুলো সমাধা করতে পথ দেখায়কমিউনিস্ট পার্টি নেতৃত্ব দেবার ফলে দল বহির্ভূত জনগণের সংগে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি গঠনের কাজে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব দরকারি। সহজ কথায়, বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদ ধ্বংস ও নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ার দায়িত্ব ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয়েছে প্রলেতারিয়েতের উপর এবং এটি প্রয়োগ করা যাবে শোষকদের বিরুদ্ধে একনায়কত্বের মাধ্যমে। ফলে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের প্রয়োজন শোষকদের দমন করার স্বার্থে।
সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে কথা উঠলেই আসে গণতান্ত্রিক সাম্যের কথা। কিন্তু বুলিবাগিশ ও সকল ধরনের সমাজগণতন্ত্রী ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা এই সত্য মেনে নেয় না যে গণতন্ত্র কখনোই শ্রেণি নিরপেক্ষ হতে পারে নাঅর্থাৎ তথাকথিত বুর্জোয়া গণতন্ত্র যে শ্রমিক ও প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিদৃষ্টিতে এক ধরনের একনায়কতন্ত্র, এটা তারা বুঝতে চায় না।
এছাড়াও বুলিবাগিশদের রাষ্ট্র সম্পির্কিত ধারনায় তারা রাষ্ট্রের শোষণ প্রক্রিয়াটিকে আড়াল করেনবুলিবাগিশরা, বুর্জোয়া গণতন্ত্রীরা ও সকল সমাজ গণতন্ত্রীরা বুঝতে চায় না যে, রাষ্ট্র একটা যন্ত্র ভিন্ন অন্য কিছু নয়, রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যই হচ্ছে শ্রেণি শত্রুকে দমন করা এবং একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির স্বার্থ হাসিল করার সব রকমের সুযোগ সুবিধার বৈধতা দেয়া।
সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে পুরনো রাষ্ট্রযন্ত্রের উচ্ছেদ করে নতুন রাষ্ট্রের স্থাপন, শ্রমিক শ্রেণির রাজনৈতিক প্রভুত্ব বা প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা। প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্বের প্রশ্নটি বৈজ্ঞানিক কমিউনিজম তত্ত্বের প্রধান কথা। প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব ছাড়া কমিউনিজম নির্মাণ অসম্ভব। সহজভাবে বলতে গেলে বলতে হয়, প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব হলও বর্তমান বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্বের বিপরীতে প্রলেতারিয়েতের হাতে সমাজতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের কর্মনীতি প্রদান।   
শ্রমিকশ্রেনীর একনায়কত্ব প্রসংগে লেনিন বলেন,
“বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রূপ অসাধারণ বিচিত্র, কিন্তু তাদের মূলকথাটা এক: এ সমস্ত রাষ্ট্রই কোনো না কোনোভাবে, এবং শেষ বিচারে অবধারিতভাবেই বুর্জোয়া একনায়কত্ব। পুঁজিবাদ থেকে কমিউনিজমে উৎক্রমণে অবশ্যই রাজনৈতিক রূপের বিপুল প্রাচুর্য ও বৈচিত্র্য না দেখা দিয়ে পারে না, কিন্তু তাদের মূলকথাটা থাকবে অনিবার্যভাবে একটা: প্রলেতারীয় একনায়কত্ব”।[২]
লেনিনের বক্তব্যকে যদি আমরা বিপরীতভাবে দেখি তাহলে বর্তমানে জারি থাকা বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে দেখতে পাই যা মুলত শ্রমিকশ্রেণির উপর বুর্জোয়া শ্রেণির একনায়কত্ব যা শুধু আইন কানুন দ্বারা সীমাবদ্ধ নয়, বল প্রয়োগের উপর প্রতিষ্ঠিত। এবং এ শাসনের প্রতি আছে গুটিকয়েক বুর্জোয়ার সহানুভুতি আর সমর্থন। এক্ষেত্রে স্তালিনের বক্তব্য আরো পরিষ্কার। তার মতে,
“রাষ্ট্র হলো শ্রেণিশত্রুকে দমন করার জন্য শাসকশ্রেণির হাতে যন্ত্রবিশেষ। এই হিসাবে শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্বের সংগে অন্য কোন শ্রেণির একনায়কত্বের তফাত নেই; কারণ শ্রমিকের রাষ্ট্র বুর্জোয়াদের দমন করার যন্ত্র ছাড়া কিছু নয়। কিন্তু এ দুয়ের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য হলো এই যে, ইতিহাসে এ পর্যন্ত যত শ্রেণি-রাষ্ট্র হয়েছে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত জনসাধারণের উপর সংখ্যালঘু শোষকের একনায়কত্ব; আর শ্রমিকশ্রেণির একনায়কত্ব হলো সংখ্যালঘু শোষকের উপর শোষিত সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ব”।[৩]
সংক্ষেপে প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব দরকার বুর্জোয়াদের প্রতিরোধ চূর্ণ করার জন্য, প্রতিক্রিয়াশীলদের মনে ভীতি সঞ্চারের জন্য, মজুরি-দাসত্বের অবসানের জন্য, বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য এবং প্রলেতারিয়েত যাতে তাদের প্রতিপক্ষদের বলপূর্বক দমিয়ে রাখতে পারে তার জন্য। সর্বোপরি প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব দরকার সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের জন্য।

তথ্যসূত্র:
১. সোফিয়া খোলদ, সমাজবিদ্যার সংক্ষিপ্ত শব্দকোষ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ১০০-১০১।  
২. লেনিন, রাষ্ট্র ও বিপ্লব, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭৬, পৃষ্ঠা ৩৬।