Wednesday, July 23, 2014

মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্মের স্বরূপ বিশ্লেষণ



ধর্ম সম্পর্কে মার্কসবাদ
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত প্রলেতারিয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি হচ্ছে প্রকৃতি ও সমাজ বিকাশের নিয়মাবলীর আবিষ্কার ও অনুশীলন। প্রকৃতিবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় মার্কসবাদ যেসব ক্ষেত্রে ধর্ম সংক্রান্ত আলোচনার প্রয়োজনবোধ করেছে শুধু সেসব আলোচনা থেকেই মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ধর্মের বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। ধর্মকে মার্কসবাদের স্রষ্টাগণ বিশিষ্ট বা স্বতন্ত্র কোনো বিষয় মনে করেননি। বরং তাঁরা এটিকে মনে করেছিলেন মানুষের জীবন যে অবস্থা ও ব্যবস্থার ভেতরে থাকে, সেই অবস্থা ও ব্যবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় হিসেবে। তাঁরা দেখেছিলেন যে, মানুষের চারদিকের পরিবেশগত অক্ষমতা থেকে পরিত্রাণ বা সান্ত্বনা হিসেবেই মানুষের কাছে ধর্মের আবির্ভাব।
মার্কসবাদ দেখিয়ে দিয়েছে ধর্মের ইতিহাস হলও বিজ্ঞানসম্মত চিন্তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাসযাজকসম্প্রদায়, রাজতন্ত্রী ইমাম ও পুরোহিত সম্প্রদায় মহত্তম বিজ্ঞানীদের অজস্র উপায়ে নির্যাতন, হত্যা এবং তাঁদের রচনাবলী নিষিদ্ধ করেছে। আর জঙ্গি বস্তুবাদ শেষ পর্যন্ত এই প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে অবিশ্রাম লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে। কিন্তু উনিশ শতকে ধর্মের বিরুদ্ধে হঠকারি লড়াইটিকে মার্কসবাদীরা ধিক্কার দিয়েছেনতাঁরা প্রমাণ করেছেন, ‘ধর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আর নিগ্রহের ফলে ধর্মীয় মনোভাব শুধু প্রবলতরই হতে পারে’[১]
মানুষ তার ভ্রান্ত চেতনার মূর্ত রুপায়ন করেছে তার ধর্মচিন্তায়। মানুষ নিজের রূপে অপরূপ ধর্মীয় মূর্তি গড়ে তারই অধীনস্থ হয়ে পড়েছে। এই মানুষই ধর্ম সৃষ্টি করেছে, যে ধর্ম হলও বাস্তব পৃথিবীর উলটানো প্রতিবিম্ব। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“মানুষ ধর্ম তৈরি করে, ধর্ম মানুষকে তৈরি করে নাযে-মানুষ, হয় এখনো নিজেকে খুঁজে পায়নি কিংবা ইতিমধ্যে আবার নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে, ধর্ম হলো সে মানুষের আত্মচেতনা এবং আত্মসম্মান। কিন্তু মানুষ তো জগতের বাইরে তাঁবু খাটিয়ে থাকা কোনো বিমূর্ত সত্তা নয়। মানুষ হলো মানুষের জগত, রাষ্ট্র, সমাজএই রাষ্ট্র, এই সমাজ তৈরি করে ধর্ম, একটা ওলটান জগত-চেতনা, কেননা সেগুলো হলো একটা ওলটান জগত। ধর্ম হচ্ছে সেই জগতের এক সামগ্রিক তত্ত্ব, এর সর্বব্যাপী সংক্ষিপ্তসার, জনপ্রিয় আঙ্গিকে সে জগতের যুক্তি, তার আধ্যাত্মিক সম্মানের আস্ফালন, তার উদ্দীপনা, তার নৈতিক প্রেরণা, তার আনুষ্ঠানিক পূরক, তার সান্ত্বনা ও ন্যায্যতা প্রতিপাদনের সর্বব্যাপী উৎস। ধর্ম হচ্ছে মানব সারমর্মের উদ্ভট বাস্তবায়ন, কেননা মানব সারমর্মের কোনো যথাবিহীত বাস্তবতা নেই। তাই ধর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম হলো ধর্ম যে জগতের আধ্যাত্মিক সৌরভ সেটার বিরুদ্ধে পরোক্ষ লড়াই।”[২]
ধর্মীয় দুঃখবাদ বা ক্লেশ হচ্ছে বাস্তব দুঃখেরই অভিব্যক্তি। ধর্ম আসলে অত্যাচারিতের বাঁচার নিঃশ্বাস। মার্কস বাণী দিলেন,
“ধর্মীয় দুঃখবাদ হচ্ছে বাস্তব দুঃখের প্রকাশ ও বাস্তব দুঃখের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম হচ্ছে নির্যাতিত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, আত্মাহীন জগত পরিবেশে কল্পিত আত্মা। ধর্ম হচ্ছে জনগণের জন্য আফিম।”[২]
দেবতা হলও মানুষের অস্পষ্ট, বিকৃত প্রতিচ্ছবি। মানুষের নিজস্ব প্রকৃতি এর থেকে যথেষ্ট উজ্জ্বল। এঙ্গেলস লিখেছেন,
“এযাবৎ প্রশ্নটি সর্বদাই হয়েছে, ঈশ্বর কী? এবং সাধারণ দর্শন প্রশ্নটির সমাধান করেছে_ ঈশ্বরই মানুষ। মানুষ শুধু পারে নিজের প্রতি, নিজের বিপরীতে জীবনের সব অবস্থার পরিমাপে, তার সত্ত্বানুসারে বিচার করতে, তার প্রকৃতির প্রয়োজন অনুসারে একটি সঠিক মানবিক উপায়ে বিশ্বকে সাজাতে_ তারপর সে আমাদের সময়ের ধাঁধাঁটির সমাধান করেছে ... ... কাল্পনিক প্রকৃতির চেয়ে মানব সত্ত্বার নিজস্ব প্রকৃতি হচ্ছে অনেক বেশি গৌরবময় ও মহৎ; এবং সর্ববিধ উপায়ে দেবতারা, যারা মোটের উপর মানব সত্ত্বার নিজের চেয়ে শুধু কম বা বেশি অস্পষ্ট এবং বিকৃত চিত্র।”[৩]
মানুষের মনের ভেতর বহির্জগতের কাল্পনিক প্রতিফলনই ধর্মীয় ভাবকে গড়ে তোলে। ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস এ্যান্টি-দ্যুরিং-এ বলেছেন,
“সমস্ত ধর্মই আর কিছুই নয়, যেসব বহিঃশক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবন নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের মনে সেগুলোর উদ্ভট প্রতিচ্ছায়া, যে প্রতিচ্ছায়ায় পার্থিব শক্তিগুলো ধারণ করে অতিপ্রাকৃত শক্তির রূপ।”[৪]
এইভাবে ক্রমবিকাশের ধারায় প্রাকৃতিক শক্তিগুলির পাশাপাশি সক্রিয় হয়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন সামাজিক শক্তি। এক পর্যায়ে উভয় শক্তিই প্রাকৃতিক অনিবার্যতার সংগে মানুষের উপর আধিপত্য করে। যেসব উদ্ভট মূর্তি প্রথমে প্রতিফলিত করেছিল শুধু প্রকৃতির রহস্যময় শক্তিগুলোকে সেগুলো এই অবস্থায় পায় বিভিন্ন সামাজিক গুণ, হয়ে উঠে ইতিহাসের শক্তিগুলোর নিদর্শনস্বরূপ।[৪]
স্বর্গের সমালোচনা না করে সমালোচনা করতে হবে পৃথিবীর, ধর্মের সমালোচনা না করে সমালোচনা করতে হবে নিয়মকানুনের, ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা না করে সমালোচনা করতে হবে রাজনীতির। মার্কস লিখেছেন,  
“কাজেই, সত্যের জগত অদৃশ্য হয়ে গেলেই ইতিহাসের করণীয় কাজ হলও এই জগতের সত্য প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের আত্ম-বিচ্ছিন্নতার পবিত্র রূপটার স্বরূপ প্রকাশ পেলেই ইতিহাসের সেবায় নিযুক্ত দর্শনের অবিলম্বে করণীয় কাজ হলও বিভিন্ন অপবিত্র রূপের আত্ম-বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ প্রকাশ করা। এইভাবে স্বর্গের সমালোচনা মর্ত্যের সমালোচনায় পরিণত হয়, ধর্মের সমালোচনা পরিণত হয় আইনের সমালোচনায় আর ধর্মতত্ত্বের সমালোচনা পরিণত হয় রাজনীতির সমালোচনায়।”[৫]
ধর্মকে প্রহেলিকাময় বা মোহ-মায়াময় (Illusory) সুখ হিসেবে পরিত্যাগ করতে হলে প্রকৃত সুখের সন্ধান করতে হবে। দূর করতে হবে সেই ব্যবস্থাকে যা ঐ প্রহেলিকার প্রয়োজন বোধ করে। আবার মার্কসের কথা,
“মানুষের মায়াময় সুখ হিসেবে ধর্মকে লোপ করাটা হলও মানুষের প্রকৃত সুখের দাবি করা। বিদ্যমান ব্যাপারসমূহের অবস্থা সম্বন্ধে মোহ পরিত্যাগ করার দাবিটা হলও যে বিদ্যমান ব্যাপারসমূহের অবস্থায় মোহ আবশ্যক সেটাকে পরিত্যাগ করার দাবি। তাই ধর্মের সমালোচনা হলও ধর্ম যার জ্যোতিষচক্র সেই অশ্রু উপত্যকার মূল্যের সমালোচনার সূত্রপাত।”[৬]
এই ভাবেই ধর্মের সমালোচনা একজন মার্কসবাদীর কাছে নিপীড়িত প্রলেতারিয়েতের অবিরাম দুঃখের সমালোচনা।[৭] আর ধর্মের প্রহেলিকাকে বাতিল করতে হলে বাতিল করতে হবে সেই পরিস্থিতিকেই যা ধর্মীয় প্রহেলিকা সৃষ্টি করে।        

তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; ধর্ম প্রসঙ্গে; ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রা. লি.; কলকাতা; সেপ্টেম্বর, ২০০৪, পৃষ্ঠা ৭
২. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; ঐ, পৃষ্ঠা- ৩১
৩. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, কার্লাইল।
৪. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; ঐ, পৃষ্ঠা- ১১৫
৫. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; ঐ, পৃষ্ঠা- ৩২।
৬. কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস; ঐ, পৃষ্ঠা- ৩২।
৭. এখানে ৩ নং উদ্ধৃতি ব্যতীত মার্কস ও এঙ্গেলসের যেসব উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলোর অনুবাদের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল বুক এজেন্সির বইটির সাহায্য নেয়া হলেও অনেক শব্দ পালটে ফেলা ও সহজীকরণ করা হয়েছে। এই নিবন্ধটি মূলত সমীরণ মজুমদার লিখিত মার্ক্সবাদ বাস্তবে ও মননে, স্বপ্রকাশ, কলকাতা; বৈশাখ ১৪০২ শিরোনামের গ্রন্থের ৭৯-৮১ পৃষ্ঠা অনুসরণ করে লেখা হয়েছে।

আরো পড়ুন:
২. ইসলামী সমাজের স্থবিরতা সম্পর্কে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের টিকা

Monday, July 21, 2014

বিষকাটালি বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদ




বিষকাটালি, ফটো: অনুপ সাদি
বাংলা নাম: বিষকাটালি
ইংরেজি নাম: Oriental pepper
বৈজ্ঞানিক নাম: Persicaria orientalis

বর্ণনা: পথ চলতে প্রায়ই দেখি এ গাছ, নাম তার বিষকাঁটালি ....কিছুটা স্যাতস্যাতে মাটিতে দিব্যি আরামে দিন পার করে। প্রজাতিভেদে ফুল দুই ধরণের দেখা যায়- গোলাপি-শাদা আর শাদা। এর ঔষধি অনেক গুণের মধ্যে একটা হলো টিউবারকলোসিস নিরাময়ে এর বীজের ব্যবহার। ভীমরুলের কামড় থেকে উৎপন্ন বিষের জ্বালা কমাতে বিষকাটালির রস ব্যবহার হয়। বিষ কাটালির সংস্কৃত নাম বিশল্যকরনী। গ্রামের কিশোরেরা কেঁচোকে মাটির নিচ থেকে বের করে আনার উদ্দেশ্যে যে স্থানে কেঁচো আছে সেই জায়গার উপরে এই গাছটির লতাপাতাকে পা দ্বারা কচলাতে থাকে এবং পায়ে পানি ঢালতে থাকে। গাছের পাতার রসমিশ্রিত পানি মাটিতে প্রবেশ করলে মাটির নিচ থেকে কেঁচোরা বের হয়ে আসে এবং সেই কেঁচো কিশোরেরা বড়শিতে মাছ শিকারে কাজে লাগায়। মজাটা হলও জলাভূমির ধারে এই গাছ জন্মায়, আর সেই জলার মাছ ধরতেই এই গাছের ব্যবহার করা হয়।



আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ