Tuesday, May 12, 2015

দ্বন্দ্ববাদ প্রসঙ্গে মার্কসবাদ



দ্বন্দ্ববাদ প্রসঙ্গে মার্কসবাদ

দ্বন্দ্ববাদ বা দ্বন্দ্ববিদ্যা হচ্ছে বিভিন্ন মতের বিরোধের মধ্য দিয়ে সত্যে পৌঁছাবার পদ্ধতি। কোনো একটি বিষয়ে বিশ্লেষণ, প্রস্তাবনা, আলোচনা বা কথোপকথন চালানোর সময় বিপরীত মতগুলোকে খুঁজে বের করা, একটার সাথে অন্যটার তুলনা করা, পারস্পরিক মতগুলোকে অনুধাবন করা, বিপরীত মতকে খণ্ডন করা এবং যুক্তিসম্মত তর্কের মাধ্যমে বিষয়টির সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার পদ্ধতিকে দ্বন্দ্ববাদ বলে। প্রজ্ঞার [Reason] দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্য খোঁজার লক্ষ্যে যৌক্তিক আলোচনার মধ্য দিয়ে মতপার্থক্যসমূহের অবসান।
ইংরেজি Dialectic, Dialectics বা গ্রীক διαλεκτική শব্দটির বাংলা করা হয়েছে দ্বন্দ্ব, দ্বান্দ্বিকতা, দ্বন্দ্বতত্ত্ব, দ্বন্দ্ববাদ, দ্বন্দ্ববিদ্যা, দ্বন্দ্বাত্মক তর্কপদ্ধতি ও ন্যায়শাস্ত্র। প্রাচীন গ্রিসে শব্দটির উৎপত্তি এবং প্লেটো তাঁর সক্রেটিসের সংলাপে শব্দটিকে জনপ্রিয় করেন।
কার্ল মার্কস এবং ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস প্রস্তাব করেছেন যে হেগেল খুব বেশি বিমূর্তভাবে দর্শনকে ভাববাদের উপরে উপস্থাপন করেছিলেন:
হেগেলের হাতে দ্বন্দ্বতত্ত্ব অতীন্দ্রিয়তামণ্ডিত হলেও, তাতে তাঁর পক্ষে এই তত্ত্বের সাধারণ কার্যকর রূপটির সর্বতোমুখী ও সচেতন উপস্থাপনের সর্বপ্রথম প্রবক্তা হতে বাধেনি। তাঁর দ্বন্দ্বতত্ত্ব মাথায় ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মিথ্যে আবরণের আড়ালে যুক্তির শস্যকণাটিকে আবিষ্কার করতে হলে তাকে আবার ঘুরিয়ে পায়ের উপর দাঁড় করিয়ে দিতে হবে।”[১]
হেগেলিয় ভাববাদের বিরোধিতায়, কার্ল মার্কস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে উপস্থাপন করেছেন:
আমার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি হেগেলের পদ্ধতি থেকে শুধু যে ভিন্ন তাই নয়, তার একেবারে বিপরীত। হেগেলের মতে, মনুষ্যমস্তিষ্কের জীবনপ্রক্রিয়া অর্থাৎ চিন্তনপ্রক্রিয়া, 'ভাব' নামে যাকে তিনি একটি স্বতন্ত্র সত্তায় পরিণত করেছেন, তা হলো বাস্তব জগতের স্রষ্টা এবং বাস্তব জগত সেই ভাবেরদৃশ্যমান বাহ্যরূপ মাত্র। পক্ষান্তরে, আমার মতে মানব মনের মধ্যে বাস্তব জগত প্রতিফলিত হয়ে চিন্তার যে বিভিন্ন রূপে পরিণত হয়, ভাব তাছাড়া আর কিছুই নয়।”[২]
মার্কসের পুঁজি গ্রন্থে দুটি কেন্দ্রীয় মতবাদ, (i) উদ্বৃত্ত মূল্য এবং (ii) ইতিহাসের বস্তুবাদী ধারনার, রূপরেখা দেয়া হয়েছে এবং মার্কসীয় দ্বন্দ্বতত্ত্ব উদাহরণ সহকারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মার্কস দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে ব্যাখ্যা করেছেন:
যুক্তিসিদ্ধরূপে এই দ্বন্দ্বতত্ত্ব ছিলো বুর্জোয়াতন্ত্র এবং তার তত্ত্ববাগীশ অধ্যাপকদের কাছে ঘৃণ্য ও কলঙ্কবিশেষ, কারণ তাতে বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে উপলব্ধি ও ইতিবাচক স্বীকৃতি যেমন আছে, সেই সংগেই আছে সেই অবস্থার নেতিকরণের, তার অবশ্যম্ভাবী ভাঙনেরও স্বীকৃতি; কারণ এই তত্ত্ব অনুসারে, ঐতিহাসিকভাবে বিকাশপ্রাপ্ত প্রতিটি সমাজ-রূপই একটি গতিশীল প্রবাহের মতো, কাজেই এই তত্ত্ব যেমন তার অচিরস্থায়ী প্রকৃতিকে স্বীকার করে, তেমনই স্বীকার করে তার ক্ষণকালীন অস্তিত্বকে; কারণ, এই তত্ত্ব কোনো কিছুর দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় না, তা হলো মূলত বিচার-বিশ্লেষণমূলক ও বৈপ্লবিক।”[৩]
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস উল্লেখ করেছেন যে প্রকৃতি হচ্ছে দ্বান্দ্বিক, প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতায় তিনি লিখেছেন,
“সেই একই ভদ্রলোকেরা আজ পর্যন্ত পরিমাণ থেকে গুণে রূপান্তরকে অতীন্দ্রিয়বাদ ও দুর্বোধ্য তুরীয়বাদ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, তাঁরাই সম্ভবত এখন ঘোষণা করবেন যে এটা হচ্ছে সত্যিই এমন কিছু যা স্পষ্টতই স্বতঃসিদ্ধ, তুচ্ছ এবং অতি সাধারণ ব্যাপার। যা তাঁরা অনেকদিন ধরেই প্রয়োগ করে আসছেন, এবং কাজেই তাঁরা নতুন কিছু শিখছেন না। কিন্তু প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার বিকাশের সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য একটি নিয়ম সর্বপ্রথম সূত্রবদ্ধ করাটা সর্বদাই একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ বলে পরিগণিত হবে।”[৪]  
মার্কসবাদী দ্বন্দ্ববাদ বিভিন্ন দেশের সাম্যবাদী দলগুলো এবং সাম্যবাদী ব্যক্তিগণ তাঁদের প্রচারণা, বিদ্রোহ ও বিপ্লবে কাজে লাগিয়েছেন।

তথ্যসূত্র:
১., ২. ও ৩. কার্ল মার্কস, পুঁজি, দ্বিতীয় জার্মান সংস্করণের উত্তরভাষ, ২৪ জানুয়ারি, ১৮৭৩; অনুবাদ, প্রথম খণ্ড, প্রথম অংশ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৩২-৩৩
৪. ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, প্রকৃতির দ্বান্দ্বিকতা, ১৮৮৩, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, আগস্ট ২০১০, পৃষ্ঠা ৪৮।

আরো পড়ুন:

Friday, May 08, 2015

তোমাসো কাম্পানেলা ইতালিয়ান মহান দার্শনিক ও কল্পলৌকিক চিন্তাবিদ




তোমাসো কাম্পানেলা, ফ্রান্সেসকো কোজ্জা অংকিত চিত্রশিল্পে

তোমাসো কাম্পানেলা (ইতালিয়ান: tomˈmazo kampaˈnɛlla; ৫ সেপ্টেম্বর ১৫৬৮ ২১ মে ১৬৩৯), ছিলেন একজন ইতালিয়ান দার্শনিক, ধর্মতাত্ত্বিক, জ্যোতিষী, কবি এবং কল্পলৌকিক চিন্তাবিদ।
১৫৮২ সালে কাম্পানেলা সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করেন। ১৬২৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো তাঁর রচিত বই সিভিটাটিস সলিস বা ‘সূর্য নগরী’। টমাস মুরের ‘ইউটোপিয়া’র শতাধিক বছর পরে দেখা দিলো সমাজের সাম্যবাদী পুনর্গঠনের এক নতুন পরিকল্পনা। সূর্য নগরী গ্রন্থটি তিনি রচনা করেন বন্দি অবস্থায়, যাঁর জীবন বিচ্ছিন্ন, একাকি থাকেন ইতালির সবচেয়ে ভয়ংকর তমসাচ্ছন্ন এক ভূগর্ভস্থ কারাগারে। সত্তর বছরের সামান্য বেশি জীবনের মধ্যে ২৭ বছর কাম্পানেলা কাটিয়েছেন নেপলসের কারাগারে, আর তারপর রোমের ধর্ম-আদালতের চারদেয়ালে।
কাম্পানেলার চিন্তার মধ্যে অ-খ্রিস্টীয় অভিমত, ম্যাকিয়াভেলীর বাস্তববাদ এবং খ্রিস্টীয় ধর্মীয় ভাবের মিশ্রণ দেখা যায়। স্কলাসটিসিজম বা মধ্যযুগের ধর্মীয় যুক্তিবাদের বদলে কাম্পানেলা প্রকৃতি এবং ইতিহাসের ব্যাখ্যায় শক্তি, যুক্তি এবং প্রেম_ এই তিন নীতি অধিকতর শ্রেয় বলে বিশ্বাস করতেন। সিভিটাটিস সলিস নামে সংলাপের রীতিতে তিনি যে কল্পলোক রচনা করেন সেখানে রাজা হলো একদল নির্বাচকমণ্ডলী দ্বারা নির্বাচিত; রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় কাজের সেখানে সম্মিলন ঘটেছে এবং সর্বজনীন শ্রমের মাধ্যমে যে সম্পদ উৎপাদিত হচ্ছে তার মালিকানা হচ্ছে যৌথ। কালের বিচারে কাম্পানেলার এরূপ কল্পলৌকিক সাম্যমূলক চিন্তার সেকালে একটি প্রগতিশীল ভূমিকা ছিলো। মুক্তচিন্তার জন্য ক্যাম্পানেলা ধর্মীয় গির্জার কোপানলে পতিত হন।
এই তরুণ ডোমিনিকান পাদ্রি তাঁর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ শুরু করেন স্পেনীয় শাসনের বিরুদ্ধে এক চক্রান্ত গড়ার দ্বারা, যে-শাসনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিলো তাঁর নিজের শহর স্টিলো। এই বিপ্লবী ইতালিকে স্পেনের দখলকারী শাসন থেকে মুক্ত করার জন্য একটি দেশপ্রেমিক বিদ্রোহ সংঘটিত করার চেষ্টা করেন। তিনি স্পেনের শাসন থেকে ইতালির মুক্তির কথাই শুধু ভাবতেন না, বরং ভাবতেন যে তাঁর স্বাধীন জন্মভূমি বিশ্ব পুনর্গঠনের সূচনা ঘটাবে, যার ভিত্তি হবে ন্যায় ও সমতা এবং অবশিষ্ট মানবজাতিকে দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করবে। ১৫৯৯ সালে বিশ্বাসঘাতকতার জন্য চক্রান্ত ব্যর্থ হয় এবং চক্রান্তকারীরা ধরা পড়েন। বন্দিদশার তৃতীয় বছরে আত্মিক ও দৈহিক নির্যাতন সহ্যকারী এই বিদ্রোহী ও বিপ্লবী বিশ্ব পুনর্গঠন সংক্রান্ত নিজের পরিকল্পনার ব্যাপারে আরো বেশি দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং রচনা করেন তাঁর অমর গ্রন্থ ‘সূর্য নগরী’।
কাম্পানেলা খুবই সঠিকভাবে বহু সাম্যবাদী বৈশিষ্ট্যকে সূত্রবদ্ধ করতে, একগুচ্ছ প্রতিভাসম্পন্ন অনুমান ব্যক্ত করতে সমর্থ হয়েছেন। ব্যক্তিগত মালিকানা ও শোষণ উচ্ছেদ, সর্বজনীন বাধ্যতামূলক মেহনত, উৎপাদন ও বণ্টনের সামাজিক সংগঠন ব্যবস্থা, নাগরিকদের শ্রমশিক্ষা, সামাজিক জীবনে বিজ্ঞানের ভূমিকা, জনশিক্ষা, যুদ্ধ ও বিবাদ বন্ধ করা সম্বন্ধে তাঁর নানা ভাবধারার কল্যাণে আজ চারশত বছর ধরে ‘সূর্য নগরী’ বইটি টিকে আছে।

০১. এদুয়ার্দ বের্নস্তাইন এক সংশোধনবাদি সমাজ-গণতন্ত্রী

০২. মাও সেতুং কেন প্রাসঙ্গিক

০৩. ভিয়েতনামের জাতিয়তাবাদি বিপ্লবী নেতা হো চি মিন

০৪. ফ্রানয মেহরিং জার্মানির সমাজতান্ত্রিক তাত্ত্বিক ও নেতা

০৫. সাম্যের লেনিন, শ্রমিকের লেনিন, লেনিনময় পৃথিবী

Sunday, May 03, 2015

ডোরা কাল কেউটে বাংলাদেশের আবাসিক বিপন্ন সাপ




ডোরা কাল কেউটে, শঙ্খিনী, ফটো: মোল্ল্যা রেজাউল করিম, মে ২০১৫

দ্বিপদ নাম/Scientific Name: Bungarus fasciatus,
সমনাম: Pseudoboa fasciata, Boa fasciata, Bungarus annularis
বাংলা নাম: ডোরা কাল কেউটে, দাগি কাল কেউটে, শঙ্খিনী,

ইংরেজি নাম/Common Name: Banded Krait.


জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্যKingdom: Animalia
বিভাগ/Phylum: Chordata
উপপর্ব: Vertebrata
শ্রেণী/Class: Reptilia
বর্গ: Squamata
উপবর্গ: Serpentes
পরিবার/Family: Elapidae
গণ/Genus: Bungarus, Daudin, 1803,
প্রজাতি/Species: Bungarus fasciatus, (স্নাইডার, ১৮০১);
ভূমিকা: বাংলাদেশের সাপের তালিকাBungarus গণে বাংলাদেশে রয়েছে এর টি প্রজাতি এবং পৃথিবীতেও রয়েছে এই ৫টি প্রজাতি। বাংলাদেশে প্রাপ্ত এবং আমাদের আলোচ্য প্রজাতিটি হচ্ছে ডোরা কাল কেউটে।
বর্ণনা: ডোরা কাল কেউটে সাপের দৈর্ঘ্য ১৫০ সেমি, সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ২২৫ সেমি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। সদ্য প্রস্ফুটিত অবস্থায় এদের দৈর্ঘ্য ২০ থেকে ৪০ সেমি উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বভাব: ডোরা কাল কেউটে সাপ সমতল ভূমির উন্মুক্ত স্থানে বাস করে। তবে পাহাড়ি জলস্রোতেও এদের দেখা যায়। এরা ধীর গতিসম্পন্ন এবং তীব্র বিষ ধারণ করে। স্ত্রী সাপ এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ৪ থেকে ১৪টি ডিম দেয় এবং ডিমের পরিস্ফুটনকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করে। ডিমের পরিস্ফুটনের জন্য ৬১ দিন সময় লাগে।
বিস্তৃতি: বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষে ডোরা কাল কেউটে সাপকে বাংলাদেশের আবাসিক সাপ হিসেবে ধরা হয়েছে। এ প্রজাতির সাপ বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ব্যাপক বিস্তৃত। এরা ভারত, নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, লাওস, ম্যাকাও, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনেই অংশে পাওয়া যায়।
অবস্থা: আইইউসিএন এটিকে বাংলাদেশে বিপন্ন এবং বিশ্বে বিপদমুক্ত বলে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে এ প্রজাতি সংরক্ষিত।
ছবির ইতিহাস: মোল্যা রেজাউল করিমের তোলা ছবি। সাপ ক্রেতা-বিক্রেতাদের খপ্পর হতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ্ই শংখিনী সাপটি ২০১৫ সালের মে মাসে উদ্ধার ও প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়।   

আরো পড়ুন: