Thursday, August 20, 2015

গরিবের পথ




---অনুপ সাদি
 
অভিজাতের দৃষ্টিতে গরিবেরা বাউল হতে উ বাদ দেয়া মাল
সাধারণের মাঝখানে অতি সাধারণ,
যারা বেশি, যারা অসংখ্য অগণিত তাঁরা যেন
শাড়ি আর লুঙ্গি পরা এঁটো প্রাণী
খুব সামান্য পার্থক্য নিয়ে তাঁরা উৎপাদনে অগ্রসর।
নিখুঁতভাবে জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে লড়াইয়ে জাগরণে,
সুপ্তশক্তি নিয়ে উৎপাদনে সৃজনে সরব বহুদিন

গালিভারের মতো মানববিদ্বেষি জন্মাতে পারেনি তাঁরা,
দশদিক ঘুরে নিজের অজ্ঞতা ছাড়া কিছুই দেখেনি
সরীসৃপ হয়ে বর্ষাকালে দিন গুজরান করে
অন্ধত্বের ভয়ে দুচোখো সুরমা লাগিয়ে
নিজেদের শ্রমশক্তি অন্যের কাছে জমা রেখে,
নিজেদের অন্যের অধিকারে ছেড়ে দিয়ে
বাঁচিয়ে দিলো দশদিকের বায়ু
তাঁরা ঘুরেছিলো চাকার মতো সারাদুনিয়া জুড়ে;
নিস্ব তুচ্ছ অগনন মানুষের সঙ্গে সখ্যতা করে
থাকার জন্যই মানুষকে বেসেছে ভালো
আকাশ রঙধনুর রঙ হারালেও প্রেমই তাঁদের আলো,
হৃদয়ে প্রাকৃতিক রঙ,
ধানের র্শীষ তাঁদের এখন মার্কা জবরজঙ
পাঞ্জা গোলাপ নৌকা পাল্লা হযবরল
দুহাতে দুটাকা ঠেলে তাঁরা ব্যালটবাক্সে ফেলে
দেখে নেয় ভাগ্যের কী হলো,
তাঁদের বাস ভূমিহী গাঁয়ে বা ঘরহী শহরে,
নাম গোত্র পরিচয়হীন অপ্রয়োজনীমানব সন্তান,
ক্রোধের অগ্নি কুঠুরিতে সাঁতার কাটা মানুষ
নির্যাতনে নিপীড়নে অনবরত মৃত্যু হয়েছে বহুবার,
অভিজাতের পদতলে স্বপ্ন হয়েছে চুরমার।


মানুষেরও মেরুদন্ড বিক্রি হয় বাজারে

তাঁরা ভাঙা নৌকার নায়ক খোঁজো বারেবারে

তাঁরা রাতে পথে হেঁটে কিছুই খুঁজে পানি
পথভ্রষ্ট বৃষ্টিতে ভিজে গোটা শহরে দেখেছে কালাপানি,

সহজ মতে যারা ছোটে, সহজ পথে হাঁটে,
সন্নাসব্রত পলায়নবৃত্তি তাদের জীবনভর।

উদ্বেগ না বাড়লে তাঁরা না প্রতিবাদি
সারা পৃথিবীতে দুটি পথ_নী আর নির্ধনে;
একত্রে অধিকারে বিদ্রোহে গরিবেরা দারুণ মুগ্ধকর;
তাঁরা অগনন স্বশক্তি দিয়েই নিজ মূল্য বুঝে নিয়ে
নিজেই ক্ষমতা গ্রহরে ক্ষমতা বাগানে ফুল ফুটিয়ে
দেখবে স্বাধীনতার মন্ত্রে কত শক্তি ধরে
সকলের স্বাধীন বিকাশ, সাম্যবাদ নয় বহুদূরে,
তাঁরা জানে বীজ হতে ফুল, ফুল হতে বীজ বপনে,
মানুষের জন্য গ্রামে গঞ্জে মশাল হাতে
আলোর উজ্জীবনে মাঠ পাড়ি দিতে
তাঁদের আকাঙ্ক্ষা যেন বাঁচবার প্রয়োজনে,
শ্রমের ন্যায়পরতা, ন্যায়ের রাজ্য স্থাপনে।

Tuesday, June 09, 2015

পুঁজিবাদ প্রসঙ্গে মার্কসবাদ




শোষণ প্রসঙ্গে কার্ল মার্কস, পুঁজি গ্রন্থে

পুঁজিবাদ ইতিহাসের একটি সামাজিক স্তর। এই ব্যবস্থায় উৎপাদনের লক্ষ্য থাকে বিক্রয়, দ্রব্যের ব্যবহার করা নয়। বাজার এখানে শ্রমশক্তিকে পণ্য হিসেবে কেনা বেচার ব্যবস্থা করে এবং এই কেনাবেচায় অর্থ, মজুরি ও বেতন থাকে মাধ্যম। সামাজিক প্রয়োজন বা সম্পত্তি-নিরপেক্ষ উৎপাদনকারীর দ্বারাই উৎপাদন সাধিত হয়। ব্যক্তি বা রাষ্ট্র এই উৎপাদন পদ্ধতির মালিক হতে পারে।
পুঁজিবাদে যে প্রতিযোগিতা থাকে তাই এক পুঁজিপতি থেকে অন্য পুঁজিপতিকে উন্নততর উৎপাদন ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে প্রণোদিত করে। এই অর্থে পুঁজিবাদে উৎপাদন শক্তি বাড়তে থাকে। পরিশেষে তা আপন সংকটে জড়িয়ে পড়ে। তখন প্রয়োজন হয় নতুন উৎপাদন ব্যবস্থার। সে হিসেবে পুঁজিবাদ তার পূর্ববর্তী সমাজ থেকে সার্বিক অগ্রগতি। কিন্তু এই অগ্রগতি সহজে ঘটেনি। অনেকগুলো কৃষক বিদ্রোহ এবং উৎপাদনের নতুন পদ্ধতির অজেয় শক্তি সামন্তবাদকে ক্রমান্বয়ে উৎখাত করে এক নতুন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে যার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদ তার আধুনিক রূপে দেখা গেছে রেনেসাঁস আমলে কৃষিভিত্তিক পুঁজিবাদ এবং বণিকবাদ (mercantilism) আবির্ভূত হওয়ার সময় থেকে। ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে পুঁজিবাদ তার শক্তিমত্তা জানান দিয়েছিল এবং বিজয় অর্জন করেছিল সামন্তবাদের উপর। মার্কস ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে লিখেছেন,
“১৬৪৮ ও ১৭৮৯-এর বিপ্লব ইংরেজদের অথবা ফরাসিদের বিপ্লব নয়। এগুলি হলো ইউরোপীয় ছকে বিপ্লব। পুরনো রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমাজের কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির জয়লাভ এগুলো ছিলো না; এগুলি হলো নতুন ইউরোপীয় সমাজেরই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ঘোষণা। এই বিপ্লবগুলিতে বুর্জোয়ারা বিজয়ী হয়েছিলো, কিন্তু বুর্জোয়াদের এই বিজয় তখন ছিলো একটি নতুন সমাজব্যবস্থার বিজয়, সামন্ত সম্পত্তির বিরুদ্ধে বুর্জোয়া সম্পত্তির বিজয়; প্রাদেশিকতার বিরুদ্ধে জাতিসত্তার, গিল্ড-এর বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতার, সম্পত্তিতে জ্যেষ্ঠের অধিকারের বিরুদ্ধে সম্পত্তি-বিভাগের, মালিকের উপর জমির আধিপত্যের বিরুদ্ধে জমির মালিকের, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে জ্ঞানালোকের, পারিবারিক উপাধির বিরুদ্ধে পরিবারের, বীরোচিত আলস্যের বিরুদ্ধে শ্রমশীলতার, এবং মধ্যযুগীয় বিশেষ সুবিধাভোগের বিরুদ্ধে আধুনিক নাগরিক আইনের বিজয়।
পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে শ্রমিকের স্থায়ী শোষণের পরিবেশটি গড়ে উঠেছে। শ্রমিক সেখানে হয়ে পড়ে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বন্দি। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“সুতরাং পুঁজিবাদী উৎপাদন আপনা থেকেই শ্রমশক্তি ও শ্রমের উপকরণের মধ্যে বিছিন্নতাকে পুনরুৎপাদন করে। এই প্রথা তাই শ্রমিককে শোষণ করার শর্ত পুনরুৎপাদন ও স্থায়ী করে। এই প্রথা অবিরত তাকে বাঁচার জন্য নিজের শ্রমশক্তি বিক্রয় করতে বাধ্য করে, এবং পুঁজিপতিকে সমর্থ করে নিজেকে আরো ধনী করার জন্য শ্রমশক্তি কিনতে। এটা আর কোনো আকস্মিক ঘটনা নয় যে, পুঁজিপতি ও শ্রমিক বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা রূপে পরস্পরের সম্মুখীন হয়। এই প্রক্রিয়ায়ই অবিরাম শ্রমিককে তার নিজের শ্রমশক্তির বিক্রেতা রূপে বাজারে ঠেলে ফেরত পাঠাচ্ছে, এবং এই প্রক্রিয়াই তার নিজের উৎপাদকে এমন এক উপায়ে পরিণত করছে যার সাহায্যে অন্য একজন লোক তাকে কিনে নিতে পারে। বাস্তবে, শ্রমিক নিজেকে পুঁজির কাছে বিক্রি করে দেবার আগেই পুঁজির অধিকারভুক্ত। কিছুদিন পরে পরে নিজেকে বিক্রি করা, তার প্রভু বদল, এবং শ্রমশক্তির বাজার দাম ওঠানামার দ্বারা তার এই দাসত্ববন্ধন সৃষ্টি হয়, আবার ঢাকাও থাকে।”  

পুঁজিবাদী সমাজে শাসকশ্রেণি বুর্জোয়ারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে উৎপাদনের উপকরণগুলোর মালিক। অথচ এখানে উৎপাদন শক্তিগুলো পুরোপুরি সমাজিকৃত, তার কাজকারবার চলে বিশ্ববাজারে। পুঁজিবাদের উদ্ভবের জন্য দুটো প্রধান শর্ত লাগে, প্রথমটি হচ্ছে অল্প কিছু লোকের হাতে সম্পদের সঞ্চয়ন এবং পরেরটি হচ্ছে বিপুল সংখ্যক মানুষের নিঃস্ব হয়ে যাওয়া, যারা ব্যক্তিগতভাবে স্বাধীন হলেও এদের না থাকে উৎপাদনের উপকরণ না থাকে জীবনধারণের উপায়। ফলে এই বিপুল সংখ্যক মানুষ পুঁজিবাদী সমাজে মজুরি-দাস হয়ে যায় যাদেরকে এঙ্গেলস ও মার্কস শিল্পসংশ্লিষ্ট সংরক্ষিত বাহিনী (Industrial Reserve Army) বা আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা বলেছেন। পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্রের মধ্যেই রয়েছে পুঁজির ক্রমাগত বৃদ্ধির অনিবার্যতাকার্ল মার্কস লিখেছেন,

একমাত্র মূর্তিমান পুঁজি হিসেবেই পুঁজিপতি সম্মানীয়, এভাবে সে ধন হিসেবে ধনের প্রতি কৃপণের প্রবল আসক্তির শরিক। কিন্তু কৃপণের পক্ষে যা খেয়ালমাত্র, পুঁজিপতির পক্ষে তা হলো সমাজ-যন্ত্রের ক্রিয়া, যে সমাজ-যন্ত্রের সে একটি চাকামাত্র। উপরন্তু, পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিকাশ একটি নির্দিষ্ট শিল্পে নিয়োজিত পুঁজির পরিমাণ অবিরত বৃদ্ধি করে যাওয়াকে প্রয়োজনীয় করে তোলে, আর প্রতিযোগিতা প্রতিটি বিশেষ পুঁজিপতিকে পুঁজিবাদী উৎপাদনের সহজাত নিয়মগুলিকে এমনভাবে অনুভব করায় যেন তারা কতকগুলি বহিরাগত উৎপীড়নকারী নিয়ম। প্রতিযোগিতা তাকে বাধ্য করে তার পুঁজিকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে তাকে অবিরত প্রসারিত করে চলতে, কিন্তু একমাত্র ক্রমবর্ধমান হারে সঞ্চয়নের সাহায্যে ছাড়া সে তা প্রসারিত করতে পারে না।”
পুঁজিবাদের আকারগত চরিত্র দেখে এর বৈশিষ্ট্য সঠিক উপলব্ধি করা যায় না। কার্ল মার্কস লিখেছেন,
“এই যে বস্তুগত রূপ প্রকৃত সম্পর্ককে অদৃশ্য করে রাখে, এবং, বস্তুত, সেই সম্পর্কের ঠিক বিপরীতটাই দেখায়, সেই রূপটিই শ্রমিক ও পুঁজিপতি সম্পর্কে সমস্ত আইনগত ধারণার, পুঁজিবাদী উৎপাদন-প্রণালী সম্পর্কে সমস্ত হেঁয়ালি সৃষ্টির, স্বাধীনতা সম্পর্কে সমস্ত মোহের, আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য স্থূল অর্থনীতিবিদদের সমস্ত ছলের ভিত্তি।”
পুঁজিবাদ হলও সেই সমাজ সংগঠন যাতে পণ্য সম্পর্ক, অর্থাৎ কেনাবেচার সম্পর্ক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে পরিবার ও রাষ্ট্র থাকে। তবে পরিবার ক্রমাগত ক্ষুদ্র নিঃসঙ্গ পর্যায়ে নিছক বাণিজ্যিক বোঝাপড়ার জায়গায় গিয়ে ঠেকে। রাষ্ট্র এখানে জবরদস্তির হাতিয়ারগুলো ধরে রাখে। তবে ক্রমেই সে বাণিজ্যিক স্বার্থের খপ্পরে পড়ে, তার কার্যক্রম সম্প্রদায়ের পক্ষ হতে সেবা কেনাবেচার দালালিতে গিয়ে ঠেকে।

তথ্যসূত্র ও টিকা:  
১. কার্ল মার্কস, বুর্জোয়া শ্রেণি ও প্রতিবিপ্লব, ১১ ডিসেম্বর ১৮৪৮, মার্কস এঙ্গেলস রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, ১৯৭২, পৃষ্ঠা ৬০।
২. কার্ল মার্কস, পুঁজি, প্রথম খণ্ড, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, দ্বিতীয় অংশ, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৯৪-৯৫
৩. এই বিষয়ে পড়ুন, কার্ল মার্কসের পুঁজি, প্রথম খণ্ডের ২৫ অধ্যায়ের তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
৪. কার্ল মার্কস, পুঁজি, প্রথম খণ্ড, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, দ্বিতীয় অংশ, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ১১২
৫. কার্ল মার্কস, পুঁজি, প্রথম খণ্ড, প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, দ্বিতীয় অংশ, ১৯৮৮, পৃষ্ঠা ৪৯
৬. কার্ল মার্কস, ইহুদি প্রশ্নে, ভাষান্তর জাভেদ হুসেন, সংহতি, ফেব্রুয়ারি, ২০০৯, পৃষ্ঠা ৭৫-৭৬।

আরো পড়ুন:

Sunday, June 07, 2015

কেলিকদম এশিয়া এবং আফ্রিকার ফুল গাছ




কেলিকদম, ফটো: From Wikipedia

বৈজ্ঞানিক নাম: Mitragyna parvifolia,
সমনাম: Nauclea parvifolia Roxb. Stephegyne parvifolia (Roxb.) Korth.
সাধারণ নাম:
বাংলা নাম: কেলিকদম, ধুলিকদম, বসন্তপুষ্প, ক্রমুকপ্রসূন, সুবাস, নীপ ইত্যাদি

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae
বিভাগ: Angiosperms
অবিন্যাসিত: Eudicots  
অবিন্যাসিত: Asterids
বর্গ: Gentianales
পরিবার: Rubiaceae
উপপরিবার: Cinchonoideae
গোত্র: Naucleeae
গণ: Mitragyna
প্রজাতি: Mitragyna parvifolia (Roxb.)
বর্ণনা: কেলিকদম এশিয়া এবং আফ্রিকার ক্রান্তীয় ও উপ-ক্রান্তীয় অঞ্চলে পাওয়া যায়। এশিয়ার প্রজাতিটি রেইনফরেস্ট (rainforest) এলাকার এবং আফ্রিকার প্রজাতিটি জলাভূমি (swamp forest) এলাকার। এশিয়ার মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াতে কেলিকদম গাছ আছে। আমাদের দেশে এই গাছ প্রায় নাই বললেই হয়। বলধা গার্ডেনের সিবিলী অংশের পুকুরের পূর্ব-দক্ষিণ কোনায় একটি গাছ আছে। যশোরের মনিরামপুরের একটি দিঘিতে চারটি গাছ আছে। এছাড়াও বাংলাদেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে এই গাছ আছে বলে শুনেছি। গাছ সল্পতার কারনে সাধারণ কদমের মত কেলিকদম গাছ সকলের কাছে পরিচিত নয়।
আমাদের দেশে কেলিকদম গাছ কম থাকলেও ভারতে এই গাছ পাওয়া যায়। ভারতের অধিকাংশ স্থানে এটি জন্মে। হিমালয় সংলগ্ন নিম্নভূমি, দক্ষিণ ভারতের জঙ্গল সহ ভারতের অন্যান্য অংশেও এই গাছ আছে। সেখানে অযত্ন অবহেলায়ই এই গাছ বেঁচে থাকছে। তবে ছায়াদানকারি বৃক্ষ হিসেবে এটি ভারতের অনেকস্থানে লাগানো হয়। সাধারণ কদমের মত কেলিকদমের ফুলের সৌন্দর্যও কম নয়। কেলিকদম নিয়ে প্রাচীন কবিরা বহু কাব্য রচনা করেছেন। বিশেষত কৃষ্ণভক্তদের কাছে কেলিকদম নামটি খুবই আকর্ষণীয়। প্রাচীন রস-সাহিত্যিক বা অলঙ্কারিকগণ কেলি শব্দটিকে বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। কেলিকদম সম্পর্কে আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য মহাশয় বলেছেন ‘কদম্ব নামটাই যেন আমাদের মনে একটা সুখ-দুঃখের আবহাওয়া সৃষ্টি করে-এটা মানব মনের একটা বিশেষ অবস্থা; কিন্তু কদম্বের পূর্বে কেলি এসে যখন বসলো, তখন কিন্তু শব্দটি রসবাচকের পর্যায়ে গিয়ে পড়লো।’ বাংলা সাহিত্যে কেলিকদমের ব্যবহার খুবই কম। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখায় কেলিকদম সম্পর্কে জানা যায়।
কেলিকদম গাছ সাধারণ কদম গাছের চেয়ে আকারে ছোট। এটি বহুশাখা বিশিষ্ট পত্রমোচী গাছ। একটি কেলিকদম গাছ ৩০ মিটার বা তার বেশিও দীর্ঘ হতে পারে। আসলে কেলি কদমের সবকিছুই সাধারণ কদমের চেয়ে ছোট। গাছ, পাতা, ফুল বা ফল সবই ছোট। কেলিকদম গাছের কাঠ শক্ত, রং হলুদ। গাছের ছাল সাদা বা হালকা বাদামী রঙের এবং পুরু। কদম গাছের পাতা বড় এবং লম্বা। কিন্তু কেলিকদমের পাতা খাটো এবং ছোট ও শক্ত। পাতার মাঝখানটা চওড়া, অনেকটা হৃদয় (hart) আকৃতির মত। পত্রের বোটা ১০ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। শরৎকালে গাছের পাতা থাকে না। শীতের সময় পাতা গজায়। পাতা গজানোর সময় অঙ্কুরোদ্গম হয়। বসন্ত কালে ফুল ফোটা শুরু হয়। সাধারণ কদম ফুল বর্ষাকালে ফুটে। কিন্তু কেলিকদম ফুল বসন্ত ও গ্রীষ্মে ফোটে। বসন্তকালে ফুল ফোটা শুরু হয় বলে কেলিকদমের আর এক নাম বসন্তপুষ্প। ফুল ছোট, বৃত্তাকার। ফুলের মৌসুমে গাছের ডালে প্রচুর পরিমাণে কলি আসে। কলির রং সবুজ। ফুলের রং হলুদ। ফুল সুর্গন্ধ বিশিষ্ট। বর্ষাকালে ফল হয়। ফল পীত বর্ণের। একটি ফলে অনেক বীজ থাকে। বীজ এবং কলমের মাধ্যমে নতুন গাছ উৎপাদন করা যায়।
কদমের মত কেলিকদমও ঔষুধি গুণসম্পন্ন গাছ। বহু আগে থেকেই কেলিকদম গাছের পাতা, কুঁড়ি, ছাল বা বাঁকল, শিকড় ইত্যাদি ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আমাদের দেশে এই গাছ না থাকার এর ব্যবহার কম। ভারত বা শ্রীলংকায় কবিরাজী বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় কেলিকদম গাছ ব্যবহার করা হয়। গাছের ছাল রক্ত সংক্রান্ত রোগের জন্য ব্যবহার করা হয়। জ্বর সারানো জন্যও গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়। ছালের রস ক্ষতস্থানে লাগালে ক্ষতের জীবানু নষ্ট হয়ে যায়। পেটের ব্যথা এবং সর্দি সারাতেও গাছের ছাল ব্যবহৃত হয়। কামোদ্দীপক হিসেবেও গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কেলিকদম গাছের পাতা ব্যথা উপশম করে থাকে। কৃমির চিকিৎসাতেও এই গাছ ব্যবহৃত হয়। ব্রণ জনিত চিকিৎসায় কেলিকদমের পাতা ব্যবহার করা হয়। এছাড়া আরও অনেক রোগের ক্ষেত্রে কেলিকদম গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
তথ্যসূত্র: আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য, চিরঞ্জীব বনৌষধি, এবং বাংলা উইকিপিডিয়া। লেখাটি মিজানুর রহমানের লেখা থেকে নেয়া যেটি বৃক্ষকথা গ্রুপে প্রকাশিত। 

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

৪. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা