Monday, April 21, 2014

মহুয়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় চিরসবুজ বৃক্ষ



মহুয়া, ফটো: সৈয়দ তারিক
প্রচলিত বাংলা নাম: মহুয়া
অন্যান্য নাম: মহুলা, মধুকা, মোহা, মোভা, মহুভা, বাটার ট্রি
বৈজ্ঞানিক নাম: Madhuca longifolia,
সমনাম: Madhuca indica, Bassis latifoli, Bassia latifolia
পরিবার: Sapotaceae.
জাতসমূহ: M. longifolia var. latifolia, M. longifolia var. longifolia

বিবরণ: ধারনা করা হয় মহুয়ার আদিবাস ভারতবর্ষে। মহুয়া প্রায় ২০ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট এভারগ্রীন বা সেমিএভারগ্রীন খরা প্রতিরোধী ট্রপিকাল/গ্রীষ্মমন্ডলীয় বৃক্ষ। এর পাতা মোটা এবং লেদারি। ফুল ছোট, সুগন্ধযুক্ত এবং শাখার মাথায় গুচ্ছাকারে ফোটে, রঙ ঈষৎ হলুদ বা ডাল হোয়াইট। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর বলে মহুয়া ফুল আদিবাসীদের কাছে খুব প্রিয়মহুয়া গাছের কালচারাল এবং ইকোনোমিক মূল্যও যথেষ্ট। Antheraea paphia নামীয় মথ মহুয়ার পাতা খেয়ে তসর সিল্ক tassar silk তৈরী করে যার বাণিজ্যিক মূল্য প্রচুর। মহুয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এগ্রোফরেস্ট্রি স্পিসিস। মহুয়ার শিকড় বিস্তৃত বিধায় সহজেই ভূমিক্ষয় রোধ করতে পারে। মহুয়া তীব্রগন্ধী ফুল এবং ফেব্রুয়ারী-এপ্রিলে ফুটে থাকে। মহুয়ার ফল জুলাইঅগাস্টে পাওয়া যায় । ফলের পাল্প মিষ্টি এবং কার্বোহাইড্রেটের একটি ভালো উৎস। কাঁচা মহুয়া সবুজ এবং পাকলে কমলা বা লালচে হলুদ হয়।
১০ বছর বয়স থেকেই ফুল দিতে শুরু করে মহুয়া গাছ। স্রেফ গাছ ধরে ঝাকালেই পাকা মহুয়া ফুল ঝরে পরে। মানুষের সাথে সাথে ময়ূর, অন্যন্য পাখী, বন্য পশু, ভালুক এবং হরিণও মহুয়া ফুলের ভক্ত। মহুয়ার ফুল কোন ধরণের প্রক্রিয়াকরণ বা রান্না ব্যতিরেকেই খাওয়া যায়। মহুয়ার বীজের কুড়া (seed kernels ) হতে এক ধরনের হলুদাভ তৈলাক্ত পদার্থ এক্সট্রাক্ট করা হয়। একে ভালোভাবে রিফাইন করার পর মহুয়া বাটার পাওয়া যায়। সম্ভবত এজন্য মহুয়া গাছের আরেক নাম বাটার ট্রি। এই বাটার উপজাতীয়রা রান্নার কাজে ব্যবহার করে। এ ছাড়াও এই বাটার দিয়ে সাবান ও মোম ও ত্বকের জন্য অয়েনমেন্ট তৈরি করা হয়। মহুয়ার বাটার ত্বকের সংস্পর্শে আসা মাত্র বিগলিত হয় বলে এটি ত্বকের শুস্কতারোধ ও রিংকেল রোধে খুব কার্যকর। ত্বকের বয়োবৃদ্ধি রোধে, নতুন সতেজ ত্বক সৃষ্টিতে এবং ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে এই বাটার তুলনাহীন। মহুয়ার ফুল খুব মিষ্টি বিধায় চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যহার করা যায়। যদিও অতিরিক্ত ফুলব্যবহারে নেশাগ্রস্থ হবার সম্ভাবনা থাকে। তাছাড়া ফুল হতে জ্যাম, জেলি, স্কোয়াস তৈরি করা হয়। শুকনো ফুল দিয়ে পিকেল, কিসমিস, বেকারী ও অন্যান্য কনফেকশনারী দ্রব্যাদি তৈরি করা যায়। খাবারে সুগন্ধ যুক্ত করতে মহুয়া ফুল রান্নায় ব্যবহার করা হয়। ফুলের মত ফলও কাঁচা ও পাকা উভয় অবস্থাতেই খাওয়া যায়। ফলের খোসা সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভিতরের অংশ শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়, পরবর্তীতে অন্যান্য খাবারের সাথে মিশিয়ে খাওয়া হয়।
প্রতি ১০০ গ্রাম ফুলে ১১১ ক্যালোরি শক্তি , ৭৩.৬ গ্রাম ময়েশ্চার, ২২.৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট, ১.৪ গ্রাম প্রোটিন, ১.৬ গ্রাম ফ্যাট, মিনারেলস, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রণ এবং ভিটামিন A, C থাকে।
মহুয়ার ব্যবহার: মহুয়ার তেল স্কীন কেয়ারের জন্য অতুলনীয়। এই তেল বীজ শোধন ও পেস্ট কন্ট্রোলেও ব্যবহার করা হয়, ফ্যাট/চর্বি দিয়ে সাবান ও ডিটারজেন্ট তৈরি হয়। তা ছাড়াও মহুয়ার চর্বি ভেজিটাবল বাটার হিসেবে খুব উপাদেয়। মহুয়ার বাটার ফুয়েল ওয়েল / বায়ো ডিজেল এর ভালো উৎস। মহুয়া বীজের তেলে mowin নামীয় সামান্য বিষাক্ত যৌগ রয়েছে, যথার্থ বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া যা সহজেই দূর করা সম্ভব। গাছের পাতা, ফুল, ফল ডালপালা ছাগল-ভেড়ার খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বীজের খৈল ভালো গোখাদ্য। তবে মহুয়া বীজকে গোখাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পূর্বে বীজটি mowin মুক্ত করা প্রয়োজন। বীজের খৈল/সীড কেক অত্যন্ত ভালো অর্গানিক সার ও ইনসেক্টিসাইড। মহুয়া খৈল-এ এ্যালকলয়েড বৈশিষ্ট থাকায় তা দিয়ে মাছ ধরা যায়। তা ছাড়াও এই খৈল পুকুরে সার হিসের এবং পোনা মাছের খাদ্য হিসেবেও ভালো কাজে দেয়। কাঁচা ফুল দিয়ে এ্যালকোহলিক ড্রিংক তৈরি হয়। আদিবাসীদের কাছে এ পানীয় খুব প্রিয় এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। অরণ্যবাসীদের প্রতিটি উৎসব-পার্বনে এ পানীয় অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে সমাদৃত।
মহুয়া গাছের বাকলসহ গাছের প্রতিটি অংশ ঔষধি গুণসম্পন্ন বিধায় আদিবাসী বিভিন্ন জাতির লোকজনের এ গাছ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুল দিয়ে ঔষধি সিরাপ তৈরি করা হয়। ফুল ব্রংকাইটিস ও চক্ষুরোগে উপকারে আসে। ফুল হতে যে তেল তৈরি হয় তাতে Fatty acid composition, palmitic acid, stearic acid, oleic acid linoleic রয়েছে। এই তেলের emollient প্রোপার্টিজ থাকায় এই তেল ত্বক, রিমোটিজম ও মাথাব্যথায় কার্যকর। মহুয়া ভালো ল্যাক্সেটিভ বিধায় কোষ্টকাঠিণ্য, পাইলস, এ্যানাল ডিজিজ ও বমনরোধে সুফলদায়ক। মহুয়াতে ট্যানিন থাকায় মহুয়া হিলিং গুণসম্পন্ন। এ ছাড়াও ক্রণিক আলসার, এ্যাকিউট টনসিলাইটিস, মাড়ির রক্তক্ষরণে, স্পঞ্জী মাড়ির জন্য মহুয়া উপকারী। পোড়ানো মহুয়ার পাতা ঘি সহযোগে পোড়া ক্ষতে ব্যবহার করলে খুব উপকার পাওয়া যায়। মহুয়া গাছের বাকল ডায়াবেটিসের জন্য উপকারী। দুধের সাথে মহুয়া ফুল জ্বাল করে খেলে ইম্পোটেন্সিতে কাজ দেয়। মহুয়ার ফুল ছিড়লে, কান্ড ও শাখা কাটলে দুধের মত এক ধরণের কষ বের হয় যা তীব্র আঠালো এবং এ্যাস্ট্রিনজেন্ট। এই কষ রিমোটিজমের জন্য উপকারী।
আয়ুর্বেদিক দৃষ্টকোণ হতে মহুয়া তাপ নিরোধক (coolant), যৌন উত্তেজক (aphrodisiac), শ্বাসতন্ত্রের রোগ নিরোধক (expectorant) পরিপাকতন্ত্রীয় সমস্যা নিরামায়ক (carminative) ও মাতৃদুগ্ধ বর্ধক গুণসম্পন্ন গাছ। 

মহুয়া ফুলকে নিয়ে আছে নানা উপ্যাখান, কত কবিতা, কত গান। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রয়েছে বহু গান। পাহাড়িরা এর ফুল দিয়ে নেশাদ্রব্য তৈরি করে। ভালুক নাকি রাতের বেলা এর ফুল খেয়ে মাতাল হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ তার মহুয়া কাব্যের ভূমিকায় লিখেছেন, “মহুয়া বসন্তের অনুচরণ, আর তার রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা। তিনি মহুয়া ফুলের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন-রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘু ধ্বনি তার, /উচ্চ শিরে তবু রাজকুলবনিতার/ গৌরব রাখিস উর্ধ্বে ধরে/ আমি তো দেখেছি তোরে/ বনস্পতি গোষ্ঠী-মাঝে অরণ্য সভায়/ অকুণ্ঠিত মর্যাদায়/ আছিস দাঁড়ায়ে/ শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে। প্রস্ফূটিত মহুয়া ফুলের মধুগন্ধী উদ্দমতা তুলনাহীন। এই গন্ধ দূরবাহী, তীব্র ও উন্মাদনাময়। আদিবাসী ও অরণ্যের পশুপাখির কাছে মহুয়া প্রিয় তরু। এই ফুলের নির্যাস উত্তেজক এবং আদীবাসীদের প্রিয় পানীয়। 

আরো পড়ুন:  

Sunday, April 20, 2014

সামাজিক শ্রেণির রূপ ও প্রকৃতি বিশ্লেষণ



পুঁজিবাদী সমাজের স্তরবিন্যাস
শ্রেণি বা সামিজক শ্রেণি, ইংরেজিতে Social Class, হলো একই প্রণালীতে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে সমাজের এরূপ এক একটি অংশ সমাজের একাংশের শ্রমকে অপরাংশ আত্মসাৎ করলেই শ্রেণি পাওয়া যায়। যেমন সমাজের একাংশ সমস্ত ভূমি আত্মসাৎ করলে হয় ভূস্বামী শ্রেণি ও কৃষক শ্রেণি। যদি সমাজের একাংশ হয় কলকারখানা, শেয়ার এবং পুঁজির মালিক, আর অন্য একটা অংশ কাজ করে ওইসব কলকারখানায়, তাহলে হয় পুঁজিপতি শ্রেণি এবং প্রলেতারিয়ান শ্রেণি অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণি। উৎপাদনের উপায়ের সংগে সম্পর্ক থেকেই নির্ধারিত হয়ে যায় শ্রমের সামাজিক সংগঠনে শ্রেণির ভূমিকা এবং সামাজিক সম্পদ পাবার উপায় ও পরিমাণ। শ্রেণিদের মধ্যে পার্থক্যের মৌল লক্ষণ হলো- সামাজিক উত্পাদনে তাদের স্থান, সুতরাং উত্পাদনের উপায়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে। প্রতিটি শ্রেণির থাকে উৎপাদনের উপায়ের সংগে সুনির্দিষ্ট নিজস্ব সম্পর্ক। এই লক্ষণ দিয়েই পার্থক্য করা যায় শ্রেণি আর অন্যান্য সামাজিক গ্রুপের মধ্যে যারা শ্রেণি নয়। যেমন, উত্পাদনের উপায়ের সাথে বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্ক নেই, তাই তারা শ্রেণি নয়, বুদ্ধিজীবীরা হলও বিভিন্ন শ্রেণির অংশবিশেষ নিয়ে একটা সামাজিক স্তর।
কার্ল মার্কস ও ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস শ্রেণি বিষয়টিকে অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে নির্ধারণ করেন। তাঁরা উৎপাদন প্রণালীতে বিভক্ত হয়ে পড়া বড় জনসমষ্টিকে শ্রেণি হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁদের মতে শ্রেণি হলো সমাজের মৌলিক কাঠামো এবং উৎপাদন প্রণালীতে তাদের স্থান দ্বারা বিভাজিত শ্রমের ফলশ্রুতি।
 
তথ্যসূত্র:
১. এম. আর. চৌধুরী সম্পাদিত; আবশ্যকীয় শব্দ-পরিচয়, প্রকাশক: হেলাল উদ্দীন, ঢাকা; এপ্রিল, ২০১২; পৃষ্ঠা- ১৪-১৫।
২. সমীরণ মজুমদার, সামাজিক বিভাজনের রূপ ও রূপান্তর; নান্দীমুখ সংসদ; কলকাতা, ২০০৩; পৃষ্ঠা- শেষাংশ-৩১।

রো পড়ুন অনুপ সাদির কয়েকটি মতবাদিক প্রবন্ধ:  

০১. ফ্যাসিবাদ কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে

০২. গণতান্ত্রিক ও আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা এবং পার্টির ভুল লাইন

০৩. জাতীয়তাবাদ কী এবং কেন ক্ষতিকর

০৪. প্রগতিশীলতা কী?

৫. গোষ্ঠিতন্ত্র কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে

০৬. সংস্কারবাদ কী এবং কেন বর্জনীয়

০৭. সংশোধনবাদ কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে

০৮. সুবিধাবাদ কী এবং কেন বর্জনীয়

০৯. মতান্ধতাবাদ কী এবং কেন প্রতিরোধ করতে হবে