Sunday, January 07, 2018

অনেক গুণের পাটশাক




পাট শাক বা পাট পাতা
মিশরের সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রা তাঁর সৌন্দর্য দিয়ে বিস্মিত করেছিলেন বিশ্বকে। জানা যায় যে তাঁর এই রূপ-রহস্যের একটি উপাদান ছিল পাটশাক। ত্বক সুন্দর রাখার জন্য নিয়মিত পাটশাক খেতেন এই সম্রাজ্ঞী। ফেরাউনদেরও পছন্দের তালিকায় ছিল পাটশাক। মিশরীয় সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে পাটশাক ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। জানা যায়, প্রাচীন মিশর ও আলেপ্পোতে সবজি হিসেবে বগী বা তোষা পাটের ব্যবহার ছিল। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে হিব্রু ভাষায় মাল্লচ (Malluach) শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায় যা থেকে তোষা পাটের ইংরেজি প্রতিশব্দ মেলো (Jute mallow) এর উৎপওি ঘটেছিল বলে মনে করা হয়। মিশর ছাড়াও আরব দেশসমূহ ও প্যালেষ্টাইনে বাগানের সবজি হিসেবে পাট চাষের প্রচলন আছে। আরব দেশগুলোতে মেহমানদের আপ্যায়ন করা হয় পাটশাকের তৈরি স্যুপ দিয়ে। আরবদের মুলোখিয়া(Mulukhiyya বা Molokhia) নামে পরিচিত পাটের পাতা পঞ্চদশ শতকে ব্যাবিলনের রাস্তায় বিক্রি করা হতো বলে জানা যায়। প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশেও পাটের পরিচিতি ছিল প্রথমত সবজি হিসেবে এবং দ্বিতীয়ত ঔষধ হিসেবে।

এক সময় গ্রীকরা পাটকে বলতো Korkhorusএই গ্রীক শব্দটি থেকেই সম্ভবত জেনেরিক নাম Corchorus এসেছে। এই জেনাসের বেশীর ভাগ প্রজাতি পাওয়া গেছে আফ্রিকাতে অর্থাৎ গরমের দেশগুলোতে। পাট Tiliaceae পরিবারের অন্তর্গত। Corchorus জেনাসের প্রায় সব গাছই বৃক্ষ ধরনের। এই জেনাসে ৫০ থেকে ৬০টি প্রজাতির তথ্য পাওয়া গেছে যা খুবই বৈচিত্র্যময়। সব প্রজাতির গাছ থেকেই আঁশ পাওয়া গেলেও বানিজ্যক ভাবে চাষ করা হয় মাত্র দুটি প্রজাতি। পাটশাকও আমরা এই দুই প্রজাতি থেকে পাই। Corchorus capsularis যাকে আমরা দেশি পাট বলি, এর পাতা তিতা হয়। Corchorus olitorius তোষা পাট নামে খ্যাত। এর পাতা হয় মিঠা। দেশী পাটকে অনেকে সাঁচি পাট বা সাদা পাট-ও বলে থাকেন। তোষা পাটকে অনেকে বগী পাট বলেন।

পাট সাধারণত আঁশ হিসেবে পরিচিত। তবে আঁশ হিসেবে ব্যবহারের বহু আগে থেকে শাকের ব্যবহার চলে আসছে। পাটের দুটি প্রজাতির গাছ চিহ্নিত করার সবচাইতে বড় পার্থক্য হল এদের ফলে। দেশিপাটের ফল হয় গোলাকার এবং গায়ের মধ্যে খাঁজ কাটা থাকে। ১.২ থেকে ২ সেমি লম্বা এবং ব্যাস। তোষাপাটের ফল লম্বাটে ধরনের এবং সিলিন্ড্রিক্যাল। ৭ থেকে ১০ সেমি লম্বা হয়। দেশিপাটের পাতার উপরিভাগ খসখসে, ল্যানসিওলেট, পাতা ২০ সেমি লম্বা হয়ে থাকে। তোষা পাটের পাতা অবলং, পাতার উপরিভাগ চকচকে। পাটের হলুদ ফুল ছোট হলেও দেখতে সুন্দর। দেশীপাটের বীজ তামাটে রং এর হয় এবং তোষাপাটের বীজ হয় সাধারনত কালচে ধূসর।

পাট মৌসুমে বাংলাদেশে দেশী ও তোষা উভয় জাতের পাটের পাতাই সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এখনও আমাদের দেশের একটা বিরাট অংশে দেশী ও তোষা পাটের চাষ হয় গ্রীষ্মকালে। সাধারণত আঁশের জন্য দেশী পাটের বীজ বপন করা হয় মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত এবং তোষা পাটের বীজ বপন করা হয় মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত ৷ বপন করার কিছুদিনের মধ্যেই পাটশাক চলে আসে বাজারে। আঁশ-পাট হিসেবে ফসলের পরিচর্যার সময় অর্থাৎ বীজ বপনের পর ২০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ২ থেকে ৩ বার পাটের চারাগাছ পাতলা করা হয়। এই সময় ক্ষেত থেকে তুলে ফেলা কচি পাটগাছ বাজারে চলে আসে শাক হিসেবে। সবুজ পাট পাতা এই ভাবে বিস্তৃত হয় সারা দেশে সবজি হিসেবে। তবে কি পরিমান পাট পাতা প্রতি বছর আমাদের দেশে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার কোন সঠিক পরিমান এখনো জানা যায় নাই।

ডিসেম্বর এবং জানুয়ারি মাস ছাড়া বছরের যে কোন সময় সবজি হিসেবে পাট পাতার উৎপাদন করা সম্ভব। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝিতে পাট বপন করলে গাছ বেশী বড় হয়না কিন্তু পাতার উৎপাদন ভালো হয়। পাতা শুকিয়ে সংরক্ষণ করলে বছরের যে কোন সময় চাহিদা মত ব্যবহার করা চলে। মাঝারী জৈব পদার্থ বিশিষ্ট উর্বর মাটিতে পাটের ভালো ফলন হয়৷ ইন্দো-বাংলাদেশ জুট বেল্ট এর রয়েছে পাট চাষ করবার মত সঠিক বৃষ্টিপাত, সূর্যের আলো এবং হিউমিডিটি যা পাটচাষের জন্য আদর্শ।

পাটের পাতা সিদ্ধ করে রসূন তেলে বাগার দিয়ে খাওয়া যায়। এর সাথে চিংড়ি মাছ অথবা শুটকিও দেয়া যায়। মসুর ডালের সাথে তিতা অথবা মিঠা পাট চচ্চরি করে খাওয়া যায়। কোন কোন গ্রামে পাটের শুক্তি খাবার প্রচলন রয়েছে। এ জন্য গ্রামের মহিলারা পাটের কচি পাতাকে ছায়া যুক্ত স্থানে রেখে ভালো করে শুকিয়ে নেন যাতে পাতার সবুজ রং অটুট থাকে। সেই পাতার গুঁড়ো বোয়মে ভরে সংরক্ষণ করা হয় ভবিষ্যতে খাবার জন্য। গ্রামের মানুষ সাধারণত সকালে বাসি ভাতের সাথে পাটপাতার গুঁড়ো মিশিয়ে একটু গরম করে শুক্তি তৈরি করেন। অনেকে তিতা ভাব কাটানোর জন্য বাসি ভাতের সংগে পিঁয়াজ কাঁচা মরিচ ও হলুদ মিশিয়ে তেলে ভেজে নিয়ে তাতে পাটপাতার গুঁড়ো ছেড়ে দেন। শুক্তি সাধারণত আলু ভর্তা দিয়ে খেতেই ভাল লাগে। ইচ্ছে মত তরকারি দিয়েও খাওয়া যায়।

পাটের পাতার রয়েছে বিভিন্ন ঔষধি গুণ। পাটের বিটা ক্যারটিন, থিয়ামাইন বা এ, বি, সি এর মতো ভিটামিনি যা প্রতিরোধ করে অনেক দুরারোগ্য ব্যাধি। পাট থেকে জীবন বাঁচানোর ঔষধ তৈরি করার পরিকল্পনা করছেন সরকার। গবেষণায় দেখা গেছে প্রতি একশ গ্রাম পাটপাতায় ক্যালরি পাওয়া যায় অন্তত পঞ্চাশ গ্রাম। এরপর রয়েছে শর্করা, বিটা ক্যারটিনসহ অন্যান্য পুষ্টিগুণ। মানবদেহের অনেক দরকারি মিনারেলস-ও রয়েছে এই পাটশাকে। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট এর তথ্য থেকে জানা যায় যে, পাটশাকের যে মেডিসিন্যাল ভ্যালু রয়েছে তা নির্ধারণ করে যদি ফার্মাসিটিক্যাল লেবেলে চিন্তা করা যায় তাহলে এটা থেকে অবশ্যই ট্যাবলেট অথবা ক্যাপসুল বানানো যেতে পারে। পাটে রয়েছে এন্টি-অক্সিডেন্ট। আর এই এন্টি-অক্সিডেন্টের জন্য যারা পাটশাক খান তারা ক্যান্সার থেকে দুরে থাকেন। পাটের পাতা থেকে জীবন বাঁচানোর ঔষধ বানানো সম্ভব বলে মনে করেন অ্যাডভান্স অ্যাগ্রোটেক এর সহ-সভাপতি এইচ এম ঈসমাইল খান। তিনি বলেন, পাটপাতা দিয়ে আমরা এখন শুধু চা তৈরি করছি কিন্তু আমাদের ভবিষ্যৎ গবেষণায় রয়েছে আমরা এটা থেকে ট্যাবলেট তৈরি করব, সাবান তৈরি করব এবং এই পাটপাতা থেকে উন্নতমানের কসমেটিকস তৈরি করব

পাটের পাতায় রয়েছে অনেক জানা অজানা পুষ্টি ও ঔষধি গুণ। দেশীয় অন্যান্য শাকের তুলনায় পাটশাকে ক্যারোটিনের পরিমাণও থাকে অনেক বেশি। এছাড়া পাটশাকে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, অ্যালকালয়েড, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, প্রোটিন, লিপিড, কার্বহাইড্রেট এবং ফলিক অ্যাসিড আছে। চিকিৎসা শাস্ত্র গ্রন্থ চরক সংহিতা তে বিভিন্ন রোগের বিরুদ্ধে পাটের ঔষধি গুন সম্পর্কে বলা হয়েছে। পাটশাক স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যেমন হৃৎপিন্ডের দক্ষতা বৃদ্ধি করে, হজম শক্তি বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। শক্ত হাড় গঠন করে। রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে, অনুভূতি শক্তি বাড়ায়, ঘুমের অভ্যাস স্বাভাবিক করে, শরীর বৃদ্ধি ও গঠনের ভারসাম্য রক্ষা করে, রক্ত সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে, এবং প্রদাহ ও জ্বালা কমায়। কবিরাজি চিকিৎসা শাস্ত্র মতে তিতা এবং মিঠা পাটের নানাবিধ ঔষধি ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমি এ পর্যন্ত পাটপাতার কোন অপকারিতার তথ্য পাইনি।

পাটশাক খাওয়ার রুচি বাড়ায়। এতে থাকা ভিটামিন সি ও ক্যারোটিন থাকায় মুখের ঘা দূর করতে সাহায্য করে। রাতকানা রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, বাতের ব্যথা এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় যাঁরা দীর্ঘদিন ভুগছেন, পাটশাকে সমাধান খুঁজতে পারেন। রক্ত পরিষ্কারক হিসেবেও পাটশাক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। পাটপাতায় টিউমার ও ক্যানসার রোধক পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান। পাটের শিকড় ঔষধের জন্য উন্নতমানের ম্যাটেরিয়ালস হিসেবে কাজ করবে। পাট নিয়ে গবেষণা চলছে। পাট দিয়ে কি কি ঔষধ তৈরি হবে পাট গবেষণা ইন্সটিটিউট সেটা দেখছে। জাপানী ব্যবহারকারীদের কাছে গাড় সবুজ রং-এর শুকনা পাট পাতা খুবই পছন্দনীয়। বাংলাদেশ থেকে জাপান এবং অন্যান্য দেশে রপ্তানীযোগ্য পন্যের তালিকায় পাট পাতাকে সহজেই অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। গত তিন বছর গবেষণা করে পাটপাতার চা তৈরি হয়েছে এবং গবেষকরা এর নাম দিয়েছেন মিরাকেল টি। জাপান থেকে এই চায়ের ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ফেসবুকের উদ্ভিদ চত্বর গ্রুপের প্রশাসক আসমা খাতুন ৬ জানুয়ারি, ২০১৮ তারিখে ফেসবুকে প্রকাশ করেন। আমরা লেখাটির জন্য তার কাছে কৃতজ্ঞ। 

জনপ্রিয় দশটি লেখা, গত সাত দিনের