Tuesday, September 30, 2014

আকাশমনি বাংলাদেশে আগ্রাসি উদ্ভিদ




আকাশমনির পর্ণবৃন্ত, ফুল ও পাতা

আকাশমনি বা একাশিয়া হচ্ছে বাংলাদেশে আগ্রাসি উদ্ভিদAcacia auriculiformis-কে আমরা আকাশমনি নামেই বেশি চিনি দ্রুতবৃদ্ধিসম্পন্ন এই বৃক্ষ রাস্তার দুইপার্শ্বে শোভাবর্ধনকারী অ্যাভিনিউ ট্রি (tree alley) হিসেবে লাগানো হয় কান্তাবর্ণা ঝুলন্ত মঞ্জরির শ্রীতে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথ আবার এর নাম দিয়েছিলেন সোনাঝুরি সত্যিই সুন্দর এর পুষ্পমঞ্জরি
আকাশমনির পাতাগুলো কেমন? কেউ দেখেছেন? সত্যি বলতে কি এই গাছের পাতা অনেকেই দেখেন নাই এই গাছের যেটাকে আমরা অনেকেই পাতা বলি সেটি আসলে পাতা নয়, এটি মূলত পর্ণবৃন্ত বোটা যখন রূপান্তরিত হয়ে পাতার মত দেখায় তখন তাকে পর্ণবৃন্ত বলা হয় এই গাছটি যখন চারা অবস্থায় থাকে তখন এর যৌগিক পাতা দেখা যায় পরবর্তীতে এর পাতা ঝরে যায় বয়স্ক গাছে শুধু চর্মবৎ পর্ণবৃন্তই দেখা যায়


প্রথম ছবিতে পর্ণবৃন্ত (বোঁটা) ও পুষ্পমঞ্জরি এবং দ্বিতীয় ছবিতে চারা গাছে পাতা দেখানো হয়েছে


আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

উদ্ভিদজগতে লেন্টিসেল-এর ভূমিকা




আপেলের লেন্টিসেল, সাদা দাগগুলো

জায়েদ ফরিদ: একটি গাছ থেকে যখন কোনো ফল ছিঁড়ে ফেলা হয় তখন সেই ফলকে আমরা কি বলবো, জীবিত না কি মৃত? আর সেই ফলের ভেতরে আছে যে শক্ত কাষ্ঠল বীজ, তা কি মৃত? কিন্তু মৃত হলে তার থেকে জীবিত গাছের অঙ্কুরোদ্গম হবে কিভাবে! অতএব গাছ থেকে আলাদা করে ফেললেও আম আপেল বড়ই নাশপাতি মৃত নয়, মৃত নয় তাদের বীজও। তবে ফলের এহেন বৃক্ষ্যচ্যুত জীবন একটি সীমিত সময় পর্যন্ত, যতদিন গাছের সান্নিধ্য ছাড়া তারা টিকে থাকতে পারে ততদিন পর্যন্ত। আর না টিকে থাকতে না পারলে সেই তাজা ফল আমাদের খাওয়ার সৌভাগ্য হত কিভাবে, সেটাও ভাবি!
এখন প্রশ্ন হল কিভাবে বেঁচে থাকে এসব বৃন্তচ্যুত ফল? বেঁচে থাকার জন্যে শক্তির প্রয়োজন হয়। এই শক্তির জন্যে চিনি বা শর্করাকে বিশ্লিষ্ট করতে হয়, আর এই কাজ করার জন্যে দরকার হয় অক্সিজেনের। চিনি তো ফলের ভেতরেই মওজুদ থাকে কিন্তু অক্সিজেন নিতে হয় বাইরে থেকে। এই অক্সিজেন ঢোকার জন্যে ফলের শরীরে থাকে এককপ্রকার রন্ধ্র যার নাম লেন্টিসেল (Lenticel) বা বায়ুরন্ধ্র। শক্তি উৎপাদনের সময় যে উপজাত কার্বন ডাই অক্সাইড ও জল তৈরী হয় সেসব নিষ্কাশনের জন্যেও ব্যবহৃত হয় বায়ুরন্ধ্র।
অবিরাম শক্তি উৎপাদন করতে করতে এক পর্যায়ে আম-আপেলের রঙ নষ্ট হতে থাকে, ঘ্রাণ আর স্বাদ অপ্রিয় হতে থাকে, দেহ শুকিয়ে যায়, পচে যায়, অর্থাৎ মরে যায় ফল। কিন্তু আঁটি থাকে তখনো জীবিত। অধিকাংশ ফলের গায়ে লেন্টিসেল স্পষ্ট দেখা না গেলেও কিছু ফলের গায়ে তা বেশ স্পষ্ট। এমন একটি ফল হল আপেল, লাল বা হলুদ আপেল। বায়ুরন্ধ্র নাশপাতির গায়েও দেখা যায় বেশ স্পষ্ট, আর নিত্যিকার আলুর গায়ে যে ফুটকি দাগ দেখা যায় তাও তো লেন্টিসেল-এর কারণেই।
আমাদের দেশে ভারত থেকে কয়েক রকমের আপেল আসে যার মধ্যে দেখা যায় লাল আর হলুদ রঙের দুটি প্রজাতি, রেড ডেলিশিয়াস আর গোল্ডেন ডেলিশিয়াস, যেগুলি স্বাদে-গন্ধে সারা দুনিয়া জুড়ে খ্যাত। বিংশ শতাব্দির প্রথম থেকে কাশ্মীর, হিমাচল এবং উত্তর প্রদেশে এগুলোর ফলন শুরু হয়। এই আপেলের গায়ে শাদা বা কালচে রঙের যে ফুটকি দেখা যায় সেগুলোই লেন্টিসেল। এর ভেতর দিয়েই অক্সিজেন ভেতরে প্রবেশ করে, নির্গত হয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানি। তবে এই ছিদ্রপথ সরাসরি বহির্জগতের সাথে যুক্ত থাকার কারণে এর ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়তে পারে ক্ষতিকর ব্যাক্টেরিয়া, ছত্রাক এবং ভাইরাস। যে কারণে ফল কখনো বিবর্ণ-বিস্বাদ হয়ে নষ্ট হতে পারে। ফ্রিজে রাখলে ঠাণ্ডায় রন্ধ্র সঙ্কুচিত হয়ে গ্যাস বিনিময় কম হয়, বিপাক ক্রিয়া স্তিমিত হয়ে যায়, আবার লেন্টিসেলের ভেতর দিয়ে ক্ষতিকর জীবাণুও ঢুকতে পারে কম, তাই ফলও টিকে থাকে বেশিদিন।
একটি ফলের ভেতর লেন্টিসেলের ব্যবহার থাকে সীমিত সময়ের জন্যে কিন্তু গাছের কাণ্ডে এবং শেকড়ে তাদের উপস্থিতি থাকে দীর্ঘকালব্যাপী যা গাছের জীবদ্দশার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একটি গাছের বাকলের বাইরের দিকটা প্রায়শই থাকে মৃত এবং শোলা-ধর্মী যা জল এবং তাপ নিরোধক। কিন্তু ভেতরের দিকটা থাকে জীবন্ত যার ভেতর দিয়ে চলাচল করে শর্করার মতো কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি। উপরিভাগে থাকলেও ক্ষুধার্থ প্রাণীরা এই ছাল খেতে পারে না কারণ এখানকার উদ্ভিদকোষগুলির স্বাদ থাকে তিক্ত ও বিষাক্ত। এই বাকলের ভেতর থাকে লেন্টিসেল যা আর কিছু নয় পত্ররন্ধ্রের মতো ছিদ্র বিশেষ, প্রভেদ হল, এই রন্ধ্রের আকার পত্ররন্ধ্রের মতো নিয়ন্ত্রিত নয়।
যাবতীয় প্রাণির মতো গাছেরও জীবন ধারণের জন্যে দরকার হয় অক্সিজেন-এর। পত্র কাণ্ড শেকড়ে সর্বত্রই চাই অক্সিজেন। এই অক্সিজেন গাছ নিজেই তৈরি করে নিতে পারে সবুজ পাতা থেকে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে। কিন্তু এই ঘটনা দিনের বেলার, যখন সূর্যরশ্মি থাকে। রাতের বেলা তাদের লেন্টিসেলের মাধ্যমে অক্সিজেন নিতে হয় বাইরে থেকেই। এখন আমরা ভাবতে পারি, গাছ যদি সেই অক্সিজেন ব্যবহার করে ফেলে নিজেদের জীবিত রাখার তাগিদে তাহলে প্রাণিজগতের জন্যে তারা অক্সিজেন সরবরাহ করে কিভাবে! হ্যাঁ, প্রশ্নটা সমীচীন, তবে তারা যতোটা অক্সিজেন ব্যবহার করে রাতে, দিনের বেলা তৈরি করে দেয় তার দশগুণ।
ঐতিহ্যবাহী সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে এই লেন্টিসেল আরো দেখা যায় ঠেশমূলে এবং শ্বাসমূলে। যখন ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটার অঞ্চলে নদীবাহিত পলিমাটির কারণে চর জেগে ওঠে তখন প্রথমেই আস্তানা করে ঠেসমূল সম্বলিত গেওয়া গাছ, বনের মাঝখানে লবণাক্ততা কমে এলে সেখানে জন্ম নেয় সুন্দরী গাছ এবং মিঠা পানিতে থাকে অন্যান্য গাছপালা। গেওয়া গাছের শেকড় যদি জলের উচ্চতার ওপরে থাকে তবে তাতে লেন্টিসেলের পরিমাণ থাকে কম, কিন্তু জলমগ্ন গাছের শেকড়ের উপরিভাগে থাকে প্রচুর লেন্টিসেল। এর ভেতর দিয়ে বায়ু প্রবেশ করে পৌঁছে যায় গাছের সর্বত্র। শ্বাসমূল দেখা যায় অনেক গাছেই তার মধ্যে বাইন গাছ অন্যতম। এদের জলমগ্ন শেকড় থেকে সরাসরি ওপরের দিকে মাথা বের করে মোচার আকৃতির শেকড় যার ওপরিভাগ থাকে লেন্টিসেল সমৃদ্ধ।
পশ্চিমের দেশগুলিতে বিভিন্ন রকম লেন্টিসেল সমৃদ্ধ গাছগুলিকে অনেক সময় নির্বাচন করা হয় ল্যান্ডস্কেপিং-এর সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্যে। পাতা ঝরে যাবার পর লেন্টিসেলগুলি বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে চোখে। ছাত্রদের অনেক সময় নিয়ে যাওয়া হয় পত্রমোচী বৃক্ষের বনে যেখানে শুধু লেন্টিসেল দেখে গাছ সনাক্ত করার একটি মহড়া চলে।

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

Wednesday, September 24, 2014

বোতাম ব্রাজিল পানামা ও গুয়েতেমালার ফুল যা গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়েছে


বোতাম ফুল, ফটো: উইকিপিডিয়া থেকে


বৈজ্ঞানিক নাম: Gomphrena globosa
সমনাম:
বাংলা নাম: বোতাম ফুল
ইংরেজি নাম: Globe Amaranth বা Bachelor Button

জীববৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ/রাজ্য: Plantae - Plants
বিভাগ: Magnoliophyta
শ্রেণী: Magnoliopsida
বর্গ: Caryophyllales
পরিবার: Amaranthaceae
গণ: Gomphrena
প্রজাতি: Gomphrena globosa
বোতাম ফুল হচ্ছে Amaranthaceae পরিবারের Gomphrena গণের একটি উদ্ভিদ। এর গাছ ২০-৪০ সেমি উঁচু, কাণ্ড রসাল ও ভঙ্গুর, পাতা বিপরীত, উপবৃত্তাকৃতি, ৫-১০ সেমি লম্বা। এই গাছের প্রতি শাখার আগায় আঁটসাঁট গোলাকৃতির মঞ্জরিতে পাপড়িবিহীন ছোট ছোট ফুল হয়। ফুলের বর্ণ সাদা, বেগুনি বা লালচে হতে পারে। বছরের যেকোনো সময় এটি জন্মান যায়। এটি একটি এভারলাস্টিং ফুল।
ইংরাজি Bachelors Button নামের ঘটনা হল, এক সময় ইউরোপে জামায় বোতামফুল লাগিয়ে যুবক ছেলে বোঝানোর চেষ্টা করতো যে সে মেয়ে খুঁজছে। এই ফুল বেশ কিছুদিন টিকে থাকে, তাই তারা বেশ খানিকটা সময় পেতো প্রেমিকা যোগাড়ের জন্যে। এই কাণ্ড তাহিতি-হাওয়াই দ্বীপের মেয়েরা করে কানে জবা ফুল গুঁজে, আর প্রাচীনকালে ব্রাজিলের মেয়েরা রাতের বেলা দীর্ঘ-ঈ-কারের মতো চুল ফুলিয়ে তার ভেতর ঢুকিয়ে রাখতো জোনাকি।
এই বোতাম ফুলের যে অংশকে ফুল বলা হয় তা আদতে ফুল নয়। সেগুলোকে আসলে উদ্ভিদবিদ্যার ভাষায় ইংরাজিতে bract  বলা হয়; যার বাংলা প্রতিশব্দ রূপান্তরিত পত্র বা মঞ্জরীপত্র। উদ্ভিদ এই রূপান্তরিত পত্রকে কীট পতংগ আকর্ষণের কাজে ব্যবহার করে। এখানে চারদিকে যে ছোট ফুল দেখা যাচ্ছে, সেগুলিই প্রকৃত ফুল, যেমনটা দেখে পাই বাগানবিলাসে

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ

উপকারি বাঁশ ও তার গণপুষ্পায়ণ




বাঁশের ফুল, ছবি: উইকিপিডিয়া থেকে

যায়েদ ফরিদ: কাষ্ঠল চিরহরিৎ উদ্ভিদ বাঁশ আসলে ঘাস পরিবারের সদস্য। ঘাস পরিবারের এরা বৃহত্তম সদস্য। বাঁশ গাছ সাধারণত একত্রে গুচ্ছ হিসেবে জন্মায়। এক একটি গুচ্ছে ১০-৭০/৮০ টি বাঁশ গাছ একত্রে দেখা যায়। এসব গুচ্ছকে বাঁশ ঝাড় বলে।
বাঁশ যে একপ্রকার ঘাস তা ভাবতে বিস্ময়কর মনে হলেও সত্যি। এই অতি প্রয়োজনীয় গাছটির শুধু অবয়বে নয় স্বভাবেও আছে কিছু অদ্ভুত আচরণ। নানা প্রকার বাঁশঝাড়ে নানা সময়ে ফুল ধরে; কোনোটিতে ফি-বছর, কোনোটিতে ৩ বছর, কোনোটিতে ৫০ বছর, কোনোটিতে বা একশো-সোয়াশো বছর পরেও। ভারতের নিজোরাম রাজ্য, বার্মার চিন আর বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে Melocanna baccifera নামে একপ্রকার মুলি বাঁশ জন্মে যাতে ৪৮ বছর পরে ফুল ধরে। এদিকে জাপানী বাঁশ Phyllostachys bambusoids ১৩০ বৎসর পর পর্যন্ত ফুলবতী হতে পারে। তিমুর দ্বীপের কালো বাঁশের ফুল ধরে ১২০ বছর অন্তর।
এই গাছের বীজ বা রাইজোম নিয়ে যদি একই সময়ে লাগানো হয় আমেরিকা, ইউরোপ বা আমাজনের অরণ্যে তবু একই সময়ে ফুল ফুটবে তাতে। পরিবেশ, আবহাওয়া কোনো কিছুই তাদের এই ৪৮ বছর পর ফুলফোটার নিয়মকে ভাংতে পারবে না। কেন এমন হয়, এর সঠিক কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো অনুসন্ধান করে চলেছেন। তবে এই বাঁশ গাছের প্রতিটি উদ্ভিদকোষের ভেতরে এর ফুলফোটার আঙ্কিক নিয়ম-নীতি নির্ধারিত থাকে বলে মনে করা হয়।
নিয়মিত ফুল ধরলে কোনো অসুবিধা নেই, কিন্তু বহু বছর পর যদি বাঁশঝাড়ে হঠাৎ একছড়া ফুল ফুটে ওঠে তাহলে প্রমাদ গোণে মিজোরামের দরিদ্র মানুষ। এই ফুল কয়েক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে অবিরাম ফুটতে থাকবে ২-৩ বছর ধরে। পূর্বপুরুষদের অভিজ্ঞতা থেকে তাদের ভেতর প্রচণ্ড ভীতি ঢুকে পড়লে তারা কঞ্চির খোঁচা খেয়ে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ঘিঞ্চি বাঁশের ঝাড়ে গিয়ে অশুভ ফুলের ছড়া কেটে ফেলে দিয়েছে পাগলের মতো। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি তাতে। আবার সেই একই জায়গা থেকে বেরিয়েছে সর্বনাশা ফুলের ছড়।
এই ফুল থেকে ফল হয়, অন্য বাঁশের তুলনায় বেশ বড়সড় ফল, জলপাইয়ের চেয়েও বড়। ফল পড়ে গাছের তলা বিছিয়ে থাকে। আর আশেপাশের সাত গ্রামের ইঁদুর আসে এই ফল খেতে; মাটি থেকে খায়, গেছো ইঁদুর, গাছে চড়েও খায়। এই ফলের পুষ্টিগুণ অনেক, এর পরে এটা আবার আফ্রোডিসিয়াক। তাই ইঁদুরের সংখ্যা বাড়তেই থাকে, হাজারে হাজারে লক্ষে লক্ষে। বাঁশতলা থেকে এবার ইঁদুরের দল মাঠে নেমে আসে, ফসলের দিকে মনোযোগী হয়। ফসল শেষ করে চলে আসে শস্যের ডোলে। সারারাত জেগে ইঁদুর তাড়িয়ে মাত্র দশ ভাগ শস্য যা তারা উঠিয়েছিল শস্যাধারে তাও শেষ হয়ে যায়। মিজোরা এবার শিকড়বাকড় কচু-ঘেঁচু আর মেটে আলু খায়, সেগুলো শেষ হলে প্রাণে বাঁচার জন্যে ধরে ধরে ইঁদুরই খেতে থাকে চুলোর ওপরে রোস্ট করে।।
এ সময় এলাকাবাসীদের মধ্যে নানারকম রোগ ছড়িয়ে দেয় ইঁদুর, টাইফয়েড, টাইফাস, প্লেগ। রোগ আর পুষ্টির অভাবে দুর্বল শরীর নিয়ে তারা আর গাছের গোড়া খুঁড়ে কন্দ জাতীয় খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। যথকিঞ্চিৎ সরকারি রিলিফের খাদ্য আর ওষুধ আসার আগেই প্রাণহানি ঘটে অজস্র মানুষের। এরপর লক্ষ লক্ষ ইঁদুরও মরে যেতে বাধ্য হয় খাদ্যের অভাবে। বাঁশঝাড়ও মরে যায়, যে প্রচণ্ড শক্তি ব্যয় করে সে বংশ-ফসল ফলায় তাতে তার আর জীবনীশক্তি থাকে না। বাঁশঝাড়তলায় লক্ষ লক্ষ ভুক্ত ফলের মধ্যে তখনো অলক্ষ্যে লুকিয়ে থাকা অনেক ফল থেকে জন্ম নেয় নতুন বাঁশের চারা। আবার গড়ে ওঠে বাঁশের নতুন জনপদ।
এই গণপুষ্পায়ণ ও সংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় নিয়ে টিভিতে ইন্টারভিউ দিয়েছেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ডানিয়েল জ্যানজেন। গাছ তার বংশরক্ষার জন্যেই এমন কৌশল অবলম্বন করেছে বলে তার বিশ্বাস। এ ব্যাপারে তিনি আরো উল্লেখ করেন প্রাণীজগতের স্যামন মাছ ও প্যাসেঞ্জার পিজিয়নের কথা।
প্রকৃতি বিষয়ক চ্যানেলে আমরা প্রায়ই দেখি, জলের কিনার থেকে অল্প পানিতে থাবা দিয়ে স্যামন মাছ তুলে নিচ্ছে ভল্লুক। যুগ যুগ ধরে ভল্লুকের শিকার হয়ে হয়ে এখন বেবি স্যামনরা কি তবে পালিয়ে যায় সমুদ্রে? যেখানে সে বাস করে ৪-৫ বছর, খেয়ে দেয়ে স্বাস্থ্য লাভ করে অসংখ্য স্যামন একযোগে ফিরে আসে নদীতে। তারপর সেখানে তারা ডিম পাড়ে, যে ডিম ফুটে এত অধিক সংখ্যক বাচ্চা হয় যে সারা নদীতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। এখন যত মাছই পশু পাখি মানুষ খাক না কেন স্যামনের বংশ ধ্বংস করার সাধ্য কারো থাকে না।
সব ওক গাছের ফল (একর্ন) যদি মোটামুটি পরিমাণমত ধরতো তবে হরিণ, কাঠবিড়ালি আর কবুতর নিঃশেষে খেয়ে ফেলতো সব ফল, ওকের আর বংশ রক্ষা হত না। তাই ৩ বছর পর পর একর্নের বাম্পার ফলন হয় যা পশুপাখি খেয়ে শেষ করতে পারে না কিছুতেই। ওদিকে অন্তরবর্তীকালীন সময়ে খাবার সংগ্রহে কষ্ট হয় বলে পশু-পাখির সংখ্যাও নিয়ন্ত্রণে থাকে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে।
ভারতের মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যে বাঁশের গণপুষ্পায়ন হয়েছে ১৯৫৮-৫৯ সনে। এর ৪৮ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬-০৭ সনেও এর প্রভাব দেখা গেছে ভারত, মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের বান্দরবাণ, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়িতে। জুম চাষ নষ্ট হবার ফলে এতে উপজাতীয় লোকজন ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী পুষ্পায়ন হবে ২০৫৪-৫৫ সনে।
প্রকৃতিতে খাদ্য পুষ্টি বাসস্থান নিয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে পরস্পরের মধ্যে নিদারুণ প্রতিযোগিতা চলে। হঠাৎ ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে যাবার ঘটনা থেকে সাহিত্যক্ষেত্রে রচিত হয়েছে রবার্ট ব্রাউনিং-এর অনন্য কাহিনী "হ্যামিলনের বংশীবাদক", আলোচিত হয়েছে লন্ডন শহরের গ্রেট প্লেগ, ইঁদুর নিয়ন্ত্রণের জন্যে হেলিকপ্টার দিয়ে বিড়াল নামাতে হয়েছে মালয়েশিয়ার এক দ্বীপে।
আমরা প্রকৃতির এক বিপুল অংশ। লুপ্ত প্রাণীর তালিকায় আমরাও রয়েছি বেশ ওপরের দিকেই, ১১ নম্বরে। এই প্রতিযোগিতার মধ্যে সফলভাবে বেঁচে থাকার জন্যে প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে আমাদেরও বেঁচে থাকতে হবে।

তথ্যসূত্র: ফেসবুক গ্রুপ বৃক্ষকথার লেখক যায়েদ ফরিদের লেখা থেকে।

আরো পড়ুন:

. বাংলাদেশের পাখির তালিকা 

. বাংলাদেশের স্তন্যপায়ী প্রাণীর তালিকা

৩. বাংলাদেশের ঔষধি উদ্ভিদের একটি বিস্তারিত পাঠ

৪. বাংলাদেশের ফলবৈচিত্র্যের একটি বিস্তারিত পাঠ